Home গল্প সেকেন্ড স্যারের একুশের গল্প -আবুল হোসেন আজাদ

সেকেন্ড স্যারের একুশের গল্প -আবুল হোসেন আজাদ

ঢং ঢং করে স্কুলে ক্লাস বসার ঘণ্টা পড়ে গেল। আমরা সবাই হুড়মুড় করে ক্লাসে গিয়ে বসে পড়লাম। একটু পরেই হেডস্যার রোল কলের খাতা চক ডাস্টার নিয়ে ক্লাসে ঢুকলেন। আমরা ক্লাস ফোরে পড়ি। হেডস্যার প্রথম রোল কল করলেন। আমি ক্লাসের সেকেন্ড বয়। ফার্স্ট বয় পলাশ। ওর সঙ্গে আমার দারুণ বন্ধুত্ব। এক সাথে সব সময় ঘুরি ফিরি খেলাধুলা করি। এক গ্রামের এক পাড়াতেই বাড়ি।
আমাদের ফার্স্ট পিরিয়ডে অঙ্ক। হেডস্যার অঙ্ক করান। প্রথম পিরিয়ডটা আমার কাছে খুবই অস্বস্তির। কারণ অঙ্ক মোটেই মাথায় ঢোকে না, বুঝতে পারি না। বার্ষিক পরীক্ষায় তাই অঙ্কে কম নম্বর পেয়ে আমাকে সেকেন্ড হতে হয়েছে। অন্যান্য সব সাবজেক্টেই আমার নম্বর পলাশের চাইতে ভালো। হেড স্যারের নাম আমজাদ হোসেন। ছিপছিপে ফর্সা লম্বা। ফুলশার্ট গায়ে আর সাদা পায়জামা পরে স্কুলে আসেন। রাশভারি লোক। তবে আমাদের প্রতি উনি খুব ¯েœহপরায়ণ।
প্রথম পিরিয়ড পার হয়ে এলো দ্বিতীয় পিরিয়ড। এবার বাংলা পিরিয়ড। বাংলা পড়ান মোবারক স্যার। মুখে দাড়ি, গায়ে খয়েরি পাঞ্জাবি, পরনে সাদা পায়জামা। রং শ্যামলা। তবে মুখে সবসময় মিষ্টি হাসি লেগে থাকে। উনি ক্লাসে এলে আমরা সব শিক্ষার্থী খুশিতে মেতে উঠি। কারণ স্যার বাংলা এমনভাবে পড়ান মনে হয় আমাদের সাথে উনি গল্প করছেন। বাংলার মোবারক স্যারকে সবাই সেকেন্ড স্যার বলেন। এই নামেই উনি পরিচিত।
সেকেন্ড স্যার ক্লাসে ঢুকেই হাসি হাসি মুখে আমাদেরকে বললেন : কেমন আছো তোমরা? আমরা সবাই সাথে সাথে জবাব দিই ভালো স্যার। স্যার এবার বললেন : তোমরা জানো কাল আমাদের ছুটি। অনেকেই বলল : জানি স্যার। বলোতো কী জন্য কাল ছুটি? আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম : আমি বলবো স্যার।
স্যার : বলো।
আমি বললাম : অমর একুশে ফেব্রুয়ারি।
স্যার বললেন : ঠিক। তবে অমর একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়। একুশে এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সারা বিশ্বের জন্য এইটুকু বলে স্যার থামলেন। তারপর আবার বললেন : অমর একুশে ফেব্রুয়ারি বা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস কীভাবে এলো তা কি তোমরা কেউ জানো। আমায় বলতে পারবে? ক্লাসে সবাই চুপচাপ। রীতা দাঁড়িয়ে বলল : স্যার বাংলা ভাষার জন্য রফিক, শফিক শহীদ হয়েছিল তাই।
স্যার বললেন : হ্যাঁ, আমি সে কথাতেই আসছি। স্যার শুরু করলেন। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। জন্মের পর মায়ের মুখ থেকে শুনে শুনে আমরা যে ভাষা বলতে শিখি সেটাই হচ্ছে মাতৃভাষা। মাতৃভাষা মানে মায়ের মুখের ভাষা। একটি শিশু যখন মায়ের কোল আলো করে পৃথিবীতে আসে তখন সবাই বিশেষ করে তার বাবা মা আত্মীয় স্বজন খুশিতে মেতে ওঠে। শিশুটি ধীরে ধীরে একদিন বড়ো হয়ে যখন কচি মুখে মা ডাকে তখন মায়ের মন যেমন খুশিতে ভরে যায় তেমনি মন ভরে যায় সবারও। মা ডাকটি কত না মধুর। এই মা ডাক যদি কেউ কেড়ে নিতে চায় তখন কেমন হয় বলতো? চঞ্চল তখনি বলে উঠল : স্যার খুব খারাপ হয়। সামনে পেলে যারা কাড়তে চায় তাদের দিতাম পিঠে ঘা কতক লাগিয়ে। চঞ্চলের কথায় ক্লাসের সবাই আমরা হো হো করে হেসে উঠলাম। স্যার নিজেও হেসে ফেললেন। বললেন হ্যাঁ ঠিকইতো। এবার চুপ কর। আমি বলি। স্যার আবার বলা শুরু করলেন। আমাদের এই বাংলা ভাষাকে চিরদিনের জন্য আমাদের মুখ থেকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার ২১ শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সাল। বাংলা ৮ ফাল্গুন ১৩৫৮। সেদিন এদেশের ছেলেরা রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথে রক্ত ঢেলে দিয়েছিল।
তোমরা কি জানো? প্রতিটি ভাষাই আল্লাহর দান। মানুষের মনের ভাব প্রকাশের জন্য আল্লাহই মানুষের মুখে ভাষা দিয়েছেন। আল্লাহ আল কোরআনের সূরা আর রহমানে এই ভাষা প্রসঙ্গে বলেছেন : “রহমান আল্লাহ, কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন, মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন।” সুতরাং এ আয়াত থেকে বোঝা যায়- পৃথিবীর প্রতিটি জাতির প্রতিটি ভাষা আল্লাহরই দান।
তোমরা কি জানো আমাদের মাতৃভাষা বাংলার ইতিহাস দেড় হাজার বছর আগের। আমাদের বাংলাদেশে ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু হয় সেই হযরত ওমর (রা)-এর রাজত্বকাল থেকে। সুদূর আরব থেকে তাঁরা এসে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা শিক্ষালাভ করে এখানে ইসলামের বাণী প্রচার করতে থাকেন। সেটি ছিল ঐতিহাসিকদের মতে ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দে। তারপর ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে বখতিয়ার খিলজী বাংলা বিজয় করলে বাংলা রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা পায়। তারপর অনেক ঘটনা। তোমরা বড়ো হলে আরো জানতে পারবে। তবে শেষে এইটুকু বলি ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয় ১৪ আগস্টে। আমরা ছিলাম পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্গত। কিন্তু সেই সময় থেকে আমাদের বাংলাভাষকে ওরা রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চায়নি। উর্দুকেই ওরা একমাত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণা করে। যার প্রতিবাদে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই ফ্লাগ হাতে ও স্লোগানে মুখরিত করে তোলে ঢাকার রাজপথ। সেই মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে শহীদ হয় রফিক, সালাম, শফিক, বরকত, জব্বারসহ অনেকে। অবশেষে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নিতে ওরা বাধ্য হয়। সেই থেকে আমরা অমর একুশে ফেব্রুয়ারি যথাযথভাবে পরম শ্রদ্ধার সাথে আলোচনা সভা ও শহীদদের জন্য দোয়ার মাধ্যমে দিনটি পালন করে আসছি। দিনটি এখন দেশের সীমানা পেরিয়ে ১৯১টি দেশে পালন করা হচ্ছে গত ২০০০ সাল থেকে। বিগত ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের ইউনেস্কোর অধিবেশনে এই স্বীকৃতির কথা ঘোষণা করে।
যাহোক কাল তোমরা নিশ্চয়ই দিনটি পালন করবে। আমাদের স্কুলেও ছোটো একটি অনুষ্ঠান হবে। এ নিয়ে গুণীজনরা আরো অনেক কথা বলবেন। জানতে পারবে তখন তোমরা আরো অনেক কিছু।
স্যারের কথা শেষ না হতেই ঢং ঢং করে দুটো ঘণ্টাই পড়ল। দ্বিতীয় পিরিয়ড শেষ। এবার তৃতীয় পিরিয়ডে ইংরেজি ক্লাস নিতে আসবেন সুরেন স্যার।
স্যার ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমরা সবাই উঠে দাঁড়ালাম।

SHARE

Leave a Reply