Home স্বাস্থ্য কথা শীতকালের চর্মরোগ স্ক্যাবিস -ডা. এহসানুল কবীর

শীতকালের চর্মরোগ স্ক্যাবিস -ডা. এহসানুল কবীর

শীতকালটা যেমন মজা তেমনি জ্বালাও কম না। শীতের গরম ভাপাপিঠার মজা আর লেপমুড়ি দিয়ে ঘুম কতই না আরামের। কিন্তু শীতের বিরূপ আবহাওয়া সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করে ত্বককে। এ সময়ে ত্বক হয়ে পড়ে রুক্ষ-শুষ্ক। আর তখনই হয় নানান চর্মরোগ যা খুবই বিরক্তিকর বটে। সে রকম একটি চর্মরোগের নাম ‘স্ক্যাবিস’। রোগটা এই সময়টাতেই বেশি হতে দেখা যায় এবং সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় শিশু-কিশোররা।

আসলে এটি কী ধরনের রোগ?
এটি একটি মারাত্মক ধরনের ছোঁয়াচে চর্মরোগ। একজনের হলে সেটা পাশের জনকে সহজেই আক্রান্ত করতে পারে। দেখা যায় যে, একসঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে থাকা-খাওয়া, মেলামেশা, একে অন্যের পোশাক-পরিচ্ছদ অদল-বদল করে পরা ইত্যাদির মাধ্যমে সহজেই এ রোগ ছড়াতে পারে। স্ক্যাবিস-এর জীবাণুর নাম ‘সারকপটিস স্ক্যাবি’।

তাহলে কারণটা কী?
ওই যে বললাম, শীতের শুষ্ক আবহাওয়ায় এ রোগের জীবাণু বাতাসে ভেসে বেড়ায়, বংশবিস্তার করে। বিস্তৃতি ঘটায় এ রোগের। এ ছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, হোস্টেল, মেস, বোর্ডিংয়ে ঘনিষ্ঠভাবে বসবাস অথবা অস্বাস্থ্যকর নোংরা পরিবেশে নিজে বা ব্যবহার্য জিনিসপত্র অপরিষ্কার ও অপরিচ্ছন্ন রাখা স্ক্যাবিস হওয়ার জন্য দায়ী। একই পুকুরে বা বাথরুমে গোসল করলেও স্ক্যাবিস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কী করে চেনা যাবে স্ক্যাবিস রোগটাকে?
প্রথমেই যেটা প্রকাশ পাবে সেটা হলো, সারা গায়ে চুলকানি। তারপর শরীরের বিশেষ বিশেষ জায়গায় ত্বকে ফুসকুড়ি মতো ওঠে এবং ক্রমশ তা বড়ো ও বিস্তৃত আকার ধারণ করে। চুলকানির মাত্রাটাও ক্রমাগত বাড়তেই থাকে। এমনকি চুলকাতে চুলকাতে চামড়ায় ঘা বা ইনফেকশন পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। ফলে আক্রান্ত স্থানে ব্যথা হতে পারে, পুঁজ জমতে পারে। সাধারণত শরীরের যে সমস্ত জায়গায় সবচেয়ে বেশি হতে দেখা যায় সেগুলো হলো- হাতের তালু, দুই আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে, কনুই, বগল, নাভির চারপাশে, ঊরুর সন্ধিস্থলে, নিতম্বে, যৌনাঙ্গের চারপাশে, হাঁটু, গোড়ালি ইত্যাদি স্থানে স্ক্যাবিস হতে পারে।

তাহলে চিকিৎসা কী?
প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো স্ক্যাবিস নামক চর্মরোগ যথাসম্ভব দ্রুত ও উপযুক্ত চিকিৎসা করা উচিত। না হলে এই রোগের জটিলতায় কিডনি, লিভার, হৃৎপিণ্ডসহ অন্যান্য অঙ্গসমূহ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই রোগ পুষে না রেখে যত তাড়াতাড়ি চিকিৎসা করানো সম্ভব হবে ততই মঙ্গল। অন্যথায় নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পাশের জন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এজন্য এক ধরনের মলম বা লোশন বিশেষ পদ্ধতিতে ব্যবহার করতে হয় এবং তাতে ফল ভালো পাওয়া যায়। পারমিথ্রিন ক্রিম গ্রুপের মলম বা লোশনটা গোসলের পর শরীর শুকিয়ে গেলে সারা গায়ে লাগাতে হবে মুখমণ্ডল ছাড়া। ২৪ ঘণ্টা পর গোসল করে ধুয়ে ফেলতে হবে। পরদিন আবার রকই নিয়মে মাখতে হবে। এ সময়ের মধ্যে শরীরে পানি যথাসম্ভব কম লাগানোর চেষ্টা করাই শ্রেয়। এর পাশাপাশি ব্যবহৃত জামাকাপড় গরম পানি দিয়ে সিদ্ধ করে শুকিয়ে পরিষ্কার করা খুব জরুরি। যাতে স্ক্যাবিসের অবশিষ্ট জীবাণুগুলো ধ্বংস হয়ে যায়।
উল্লেখ্য, এক সপ্তাহ পরে একই নিয়মে উপরোক্ত লোশন বা মলমটি আবার মাখতে হবে। এর সাথে চুলকানির জন্য অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ একটা করে তিনবেলা ৭ থেকে ১০ দিন সেবন করতে হয়। ট্যাবলেট তিনবেলা খাবারের ঝামেলা পোহাতে না চাইলে অন্য গ্রুপের ট্যাবলেট একটা করে ৭ থেকে ১০ দিন খেতে হবে। এ ছাড়া আক্রান্ত স্থানে পুঁজ জমে গেলে অ্যান্টিবায়োটিকের ৭ দিনের একটি কোর্স সম্পন্ন করা ভালো। মনে রাখতে হবে যে, পরিবারের একজনের স্ক্যাবিস হলে সকলেই আক্রান্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। তাই পরিবারের সবাইকেই একই চিকিৎসাপদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। নইলে নিস্তার নেই। কারো না কারো মাধ্যমে এটা আবার হতে পারে।
সবচেয়ে বড়ো কথা সতর্কতা। এ রোগের কারণগুলো যথাসম্ভব পরিহার করে চলতে পারাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। তাই শীতের মিষ্টি আমেজ যেন নিজেদের সামান্য অসতর্কতায় মলিন হয়ে না যায় সে দিকে একটু খেয়াল রাখলেই উপভোগ করা যাবে পুরো শীতের আনন্দটা।

SHARE

Leave a Reply