Home খেলার চমক ধর্মপ্রাণ ফুটবলার কন্তে -আবু আবদুল্লাহ

ধর্মপ্রাণ ফুটবলার কন্তে -আবু আবদুল্লাহ

ফ্রান্স জাতীয় দল ও ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব চেলসির মিডফিল্ডার এন’গলো কন্তে। মাঠে তিনি প্রতিপক্ষের জন্য আতঙ্ক। মাঠের বাইরে সদা হাস্যোজ্জ্বল আর ধর্মপ্রাণ এক মানুষ তিনি। দেশের হয়ে জিতেছেন বিশ^কাপ। ক্লাবের হয়ে জিতেছেন এফএ কাপ, ইউরোপা লিগ ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা। অথচ কন্তের ফুটবল ক্যারিয়ার এতটা উজ্জ্বল হবে কেউ ভাবেনি এক সময়।
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালি থেকে ফ্রান্সে অভিবাসী হওয়া একটি পরিবারের সন্তান কন্তে। উন্নত জীবনের আশায় ফ্রান্সে এলেও তাদের জীবনটা সহজ ছিল না। ১৯৯১ সালে প্যারিসের উপকণ্ঠে জন্ম তার। মা-বাবা দু’জনেই ছোটো চাকরি করতেন। কন্তের বয়স যখন ১১ বছর তখন তার বাবার মৃত্যু হয়। চার সন্তান নিয়ে অনেক কষ্টে সংসারের চাকা সচল রাখেন তার মা। সামান্য কিছু উপার্জনের জন্য কন্তে নিজেও ছোটোবেলায় ময়লার স্তূপ থেকে বিভিন্ন জিনিস সংগ্রহ করে রিসাইক্লিং ফ্যাক্টরিতে সরবরাহ করতেন।
ছোটোবেলায় ফুটবল খেলতেন ঠিকই; কিন্তু বড়ো ফুটবলার হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না ততটা। ১৯৯১ সালের মার্চ মাসে জন্ম তার। স্থানীয় একটি একাডেমিতে ফুটবল শিখলেও ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত ভালো কোনো ক্লাব তার দিকে নজর দেয়নি। যে কারণে ভবিষ্যতের চিন্তা করে খেলার পাশাপাশি অ্যাকাউন্টিংয়ে অ্যাকাডেমিক ডিগ্রি অর্জন করেছেন কন্তে।
২০১০ সালে বোলন ক্লাবে জায়গা হয় তার। সেটিও মূল দলে নয়, রিজার্ভ টিমে। দুই মৌসুম পর দ্বিতীয় বিভাগের দল কেইন থেকে ডাক আসে। পরের মৌসুমে কেইন দলটি প্রমোশন পেয়ে প্রথম বিভাগে ওঠে এবং সেই সাথে ভাগ্য খুলে যায় কন্তের।
২০১৫-১৬ মৌসুমে তাকে দলে নেয় লেস্টার সিটি। ক্লাবটির মাঝ মাঠের ভরসা হয়ে ওঠেন কন্তে। সেবার লেস্টার চ্যাম্পিয়ন হয় ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে। পরের বছর ৩২ মিলিয়ন ইউরোতে তাকে কিনে নেয় লন্ডনের ক্লাব চেলসি। চেলসিতে গিয়েও প্রথম মৌসুমে জেতেন লিগ শিরোপা। এরপর পর্যায়ক্রমে ক্লাবটির হয়ে জিতেছেন এফএ কাপ, ইউরোপা লিগ ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা। ২০২১ সালে চেলসির চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল তার।
কন্তেকে এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা মিডফিল্ডার হিসেবে মেনে নিতে কারো আপত্তি নেই। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খেলেন তিনি। মাঝমাঠে তার সবচেয়ে বড়ো দক্ষতা প্রতিপক্ষের ফুটবলারদের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়া। বিশ্লেষকরা বলেন, কন্তের পজিশনিং সেন্স খুব ভালো। কোথায় দৌড়ে গেলে বল পাওয়া যাবে সেটি তিনি ভালোই বোঝেন। সেই সাথে রয়েছে দুর্দান্ত গতি। ম্যাচে পুরো নব্বই মিনিট সমান তালে দৌড়াতে পারেন। চেলসির হয়ে গোলও করেছেন ১১টি। ক্লাবটির কোচ থমাস টুখেল বলেন, কন্তে মাঠে থাকা মানে আমার দল সাড়ে ১১ জন নিয়ে খেলে। কারণ কন্তে একাই ১৫০ শতাংশ পরিশ্রম করে।
ফ্রান্সের জাতীয় দলে কন্তের অভিষেক ২০১৬ সালের মার্চে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচে। ২০১৮ সালের বিশ^কাপ জয়ী দলের হয়ে খেলেছেন দুর্দান্ত। ফ্রান্সের হয়ে এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন ৫১টি। সব কিছু ঠিক থাকলে ২০২২ কাতার বিশ^কাপেও নামবেন নীল জার্সি পরে। কারণ কন্তে এখন ফ্রান্স দলের অটো চয়েজ।
শুধু যে সেরা মিডফিল্ডার তাই নয়, এন’গলো কন্তে মানুষ হিসেবেও অসাধারণ। সব সময় তার মুখে হাসি লেগেই থাকে। কন্তেকে কেউ কখনো রাগতে দেখেনি। চেলসিতে তার বেতন প্রতি সপ্তাহে ৩ লাখ ২৫ হাজার ইউরো; কিন্তু এখনো ব্যবহার করেন ২০১৫ সালে কেনা একটি সেকেন্ডহ্যান্ড গাড়ি। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলেন তাই, নাইট ক্লাব, বারের আড্ডা এড়িয়ে চলেন। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে লন্ডনের একটি মসজিদে এশার নামাজ পড়তে গেলে এক ফুটবল ভক্ত মুসল্লি তাকে বাসায় দাওয়াত করেন। কন্তেও সাড়া দেন তাতে। ওই ভক্ত ও তার কয়েক বন্ধুর সাথে রাতের খাবার খেয়ে তবেই বাসায় ফেরেন।
রাস্তায়, মাঠে, কিংবা শপিং মলে- ভক্তরা ছবি তোলার জন্য ঘিরে ধরলে কখনো বিরক্ত হতে দেখা যায় না তাকে। তাইতো ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমগুলো তাকে আখ্যা দিয়েছে সবচেয়ে বিনয়ী ফুটবলার হিসেবে। নিজের এই আচরণ সম্পর্কে ডেইলি মিররকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কন্তে বলেন, এই পর্যায়ে ফুটবল খেলতে পারছি সেটি আমার সৌভাগ্য। আর এ সবই আল্লাহর দয়া। কাজেই সব কিছু সহজ ভাবেই নিতে চাই।
২০১৮ সালে ফ্রান্সের বিশ্বকাপ জয়ের পর সব সতীর্থরা যখন বিশ^কাপ ট্রফি নিয়ে ছবি তুলছিল, তখন লাজুক স্বভাবের কন্তে ছবি তুলতেই চাইছিলেন না। এক পর্যায়ে সতীর্থরা জোর করে তার হাতে কাপ দিয়ে ক্যামেরার সামনে বসিয়ে দেয়। কন্তে এমনই!
২০১৮ সালে চেলসি ক্লাবের পক্ষ থেকে কন্তেকে চাপ দেওয়া হয় অফশোর ট্যাক্স হেভেনের মাধ্যমে বেতন নিতে। ট্যাক্স হেভেন বলা হয় সেই সব ছোটো দেশগুলোকে, যারা ইউরোপ আমেরিকার বড়ো বড়ো কোম্পানিকে ট্যাক্স ছাড়াই বিনিয়োগ ও অর্থ লেনদেন করার সুযোগ দেয়। ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার জন্য অনেক প্রতিষ্ঠান এসব দেশের ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লেনদেন করে। বিশ^ ফুটবলে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার এই কৌশলটি অনেক পুরনো। ডিয়াগো ম্যারাডোনা, লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোসহ অনেক তারকার বিরুদ্ধেই এই অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু কন্তে রাজি হননি ট্যাক্স ফাঁকি দিতে। ক্লাব কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করেছেন লন্ডনের ব্যাংকের মাধ্যমেই বেতন পরিশোধ করতে। যে কারণে কন্তেকে অনেকেই ফুটবল বিশে^র রোল মডেল হিসেবে অভিহিত করেন।

SHARE

Leave a Reply