Home দেশ-মহাদেশ ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র ইউক্রেন -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র ইউক্রেন -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

ইউক্রেন পূর্ব ইউরোপের একটি দেশ। রাশিয়ার পর এটা ইউরোপের দ্বিতীয়-বৃহত্তম রাষ্ট্র। রাশিয়ার সাথে এর পূর্ব ও উত্তর-পূর্বে সীমান্ত রয়েছে। এছাড়াও ইউক্রেনের সীমান্তে রয়েছে উত্তরে বেলারুশ, পশ্চিমে পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি, দক্ষিণে রুমানিয়া ও মালদোভা এবং আজভ সাগর ও কৃষ্ণ সাগর বরাবর একটি উপকূল রেখা। ইউক্রেনের আয়তন ৬ লাখ ৩ হাজার ৬২৮ বর্গকিলোমিটার (২ লাখ ৩৩ হাজার ৬২ বর্গমাইল)। জনসংখ্যা ৪ কোটি ১৪ লাখ। ইউক্রেনের সরকারি ভাষা ইউক্রেনিয়ান হলেও রুশ ভাষা ব্যাপকভাবে কথিত হয়ে থাকে। জাতিগত গ্রুপের মধ্যে রয়েছে ৭৭.৮ শতাংশ ইউক্রেনীয়, ১৭.৩ শতাংশ রুশ ও ৪.৯ শতাংশ অন্যান্য। প্রধান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রয়েছে খ্রিষ্টান ৮৭.৩ শতাংশ, মুসলিম ০.৯ শতাংশ (তবে ক্রিমিয়ায় মুসলিমদের হার ১২ শতাংশ) অধার্মিক ১১ শতাংশ এবং অন্যান্য ০.৮ শতাংশ। ইউক্রেন ইউরোপের অষ্টম জনবহুল দেশ। দেশটির রাজধানী ও বৃহত্তম নগরী কিয়েভ।
আধুনিক ইউক্রেনের ভূখণ্ডে ৩২ হাজার খ্রিষ্টপূর্ব থেকে জনবসতি ছিল। মধ্যযুগে এলাকাটি ছিল পূর্ব স্লাভিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এসময় শক্তিশালী রাষ্ট্র ‘কিয়েভান রাস’ ইউক্রেনীয় পরিচিতির ভিত্তি গঠন করে। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বেশ কয়েকটি প্রিন্সিপালিটি বা ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে খণ্ড-বিখণ্ড হওয়া এবং মঙ্গল আগ্রাসনে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞের পর ভূখণ্ডগত ঐক্য ভেঙে পড়ে এবং বেশ কয়েকটি শক্তি এই এলাকাটি নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, শাসন ও ভাগাভাগি করে। ঐ শক্তিগুলোর মধ্যে ছিল পোলিশ-লিথুয়ানিয়ান কমনওয়েলথ, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, উসমানীয় সা¤্রাজ্য এবং মস্কোভির জারতন্ত্র। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীকালে কসাক হেটমানেটের আবির্ভাব ঘটে এবং সমৃদ্ধি লাভ করে, কিন্তু পরিশেষে এর ভূখণ্ড পোল্যান্ড ও রাশিয়া সা¤্রাজ্যের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। রুশ বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে আত্ম-নিয়ন্ত্রণের জন্য ইউক্রেনীয় জাতীয় আন্দোলনের উদ্ভব ঘটে এবং ১৯১৭ সালের ২৩ জুন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইউক্রেনীয় গণপ্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউক্রেনের পশ্চিম অংশ ইউক্রেনিয়ান সোভিয়েত সোস্যালিস্ট রিপাবলিকের সাথে একীভূত হয়ে যায় এবং গোটা দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ হয়ে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর ১৯৯১ সালে ইউক্রেন স্বাধীনতা লাভ করে।
স্বাধীনতার পর ইউক্রেন নিজেকে নিরপেক্ষ রাষ্ট্র ঘোষণা করে এবং রাশিয়া ও অন্যান্য সিআইএস (স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের কমনওয়েলথ) ভুক্ত দেশের সাথে সীমিত সামরিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলে। এছাড়াও দেশটি ১৯৯৪ সালে ন্যাটোর সাথেও অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ২০১৩ সালে, প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের সরকার ইউক্রেন-ইউরোপীয় ইউনিয়ন অ্যাসোসিয়েশন চুক্তি সাময়িকভাবে বাতিল করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং রাশিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়ার পর ইউরোমেইডান নামে কয়েক মাসব্যাপী বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ শুরু হয়। যা পরে ২০১৪ ইউক্রেনীয় বিপ্লবে রূপ নেয়। যার ফলে ইয়ানুকোভিচ ক্ষমতাচ্যুত হন এবং একটি নতুন সরকার প্রতিষ্ঠত হয়। এসব ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটে রাশিয়া ২০১৪ সালের মার্চে ক্রিমিয়াকে কুক্ষিগত করে এবং ২০১৪ সালের এপ্রিলে ডনবাসে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি ইউক্রেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে গভীর ও ব্যাপকভিত্তিক মুক্ত বাণিজ্য এলাকার অর্থনৈতিক অংশীদার হওয়ার জন্য আবেদন করে।
ইউক্রেন একটি উন্নয়নশীল দেশ। এটা মলদোভার পাশাপাশি ইউরোপের সবচেয়ে গরিব দেশ। তবে বিস্তৃত উর্বর কৃষিজমি থাকার কারণে ইউক্রেন বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো শস্য রফতানিকারকদের মধ্যে অন্যতম। এদেশের সামরিক শক্তি ইউরোপে রাশিয়া ও ফ্রান্সের পর তৃতীয়। দেশটি জাতিসংঘ, কাউন্সিল অব ইউরোপ, ওএসসিই (অর্গানাইজেশন ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন ইন ইউরোপ), জিইউএএম অর্গানাইজেশন ও লাবলিন ট্রায়াঙ্গেলের সদস্য। ইউক্রেন সিআইএসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা দেশ হলেও কখনোই এই সংস্থার সদস্য হয়নি।
ইউক্রেনের প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য বহুলাংশে উর্বর সমভূমি (তৃণভূমি) ও মালভূমি নিয়ে গঠিত। বেশ কয়েকটি নদী যেমন দনিপার (দনিপ্রো), সেভারস্কি ডোনেটস, দনিয়েস্টার ও সাউদার্ন বাগ এদেশের ভূমি অতিক্রম করেছে এবং নদীগুলো দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে কৃষ্ণ সাগর ও অধিকতর ছোটো আজভ সাগরে পতিত হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমে দানিউবের ব-দ্বীপ রোমানিয়ার সাথে সীমান্ত গঠন করেছে। ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলের উচ্চভূমি থেকে নিম্নভূমি পর্যন্ত বিচিত্র ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। দেশটির একমাত্র পর্বতমালা পশ্চিমে কারপেথিয়ান পর্বতমালা, যার সর্বোচ্চ স্থান হোরা হভেরলার উচ্চতা ২,০৬১ মিটার (৬,৭৬২ ফুট) এবং উপকূল বরাবর একেবারে দক্ষিণে ক্রিমিয়ায় আছে ক্রিমিয়ান পর্বতমালা। পর্বতগুলো থেকে বরফ গলে নদীতে পড়ে এবং উচ্চতা থেকে হঠাৎ পতনে যে প্রাকৃতিক পরিবর্তন ঘটেছে তা থেকে বেশ কয়েকটি জলপ্রপাতের সৃষ্টি হয়েছে।
ইউক্রেনের তাৎপর্যপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে রয়েছে লৌহ আকরিক, কয়লা, ম্যাঙ্গানিজ, প্রাকৃতিক গ্যাস, তেল, লবণ, সালফার, গ্রাফাইট, টিটানিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, কাওলিন, নিকেল, পারদ, কাঠ এবং বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি। তা সত্ত্বেও দেশটিকে বেশ কয়েকটি প্রধান পরিবেশগত সমস্যা মোকাবেলা করতে হয় যেমন, পানযোগ্য পানির অপর্যাপ্ত সরবরাহ, বাতাস ও পানি দূষণ, বন উজাড় এবং ১৯৮৬ সালের চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের দুর্ঘটনা থেকে নিঃসৃত তেজষ্ক্রিয়া দূষণ।
ইউক্রেনের আবহাওয়া বহুলাংশে নাতিশীতোষ্ণ এবং আটলান্টিক মহাসাগর থেকে আসা সহনীয় উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস দিয়ে প্রভাবিত। গড় বার্ষিক তাপমাত্রা উত্তরের ৫.৫-৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে দক্ষিণের ১১-১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে। বৃষ্টিপাত অসমানুপাতিকভাবে হয়ে থাকে। পশ্চিম ও উত্তরে সবচেয়ে বেশি এবং পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বে সবচেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয়। যার বার্ষিক পরিমাণ যথাক্রমে ১২০০ মিলিমিটার (৪৭.২ ইঞ্চি) ও ৪০০ মিলিমিটার (১৫.৭ ইঞ্চি)।
ইউক্রেন আধা-প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির অধীনে একটি একক প্রজাতন্ত্র। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জনপ্রিয় ভোটে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হন এবং তিনিই আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান। এদেশের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং প্রধানমন্ত্রী ডেনিস শমিহাল। এদেশে এককক্ষবিশিষ্ট ৪৫০ আসনের একটি পার্লামেন্ট আছে, নাম ভারখোভনা রাদা। ইউক্রেন ২৭টি অঞ্চলে বিভক্ত: ২৪টি অবলাস্ট (প্রদেশ), একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্র (ক্রিমিয়া) ও দু’টি বিশেষ মর্যাদার নগরী রাজধানী কিয়েভ ও সেভাসটোপোল। এগুলো আবার ১৩৬টি জেলায় বিভক্ত।
ইউক্রেনের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল। ২০০৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে এদেশের জাতীয় দল সেমিফাইনালে পৌঁছে এবং তদানীন্তন চ্যাম্পিয়ন ইতালির কাছে হেরে বিদায় নেয়।
ঐতিহ্যবাহী ইউক্রেনীয় খাবারের মধ্যে রয়েছে মুরগি, গরুর গোশত, মাছ ও মাশরুম। ইউক্রেনীয়রা প্রচুর পরিমাণে আলু, শস্য, টাটকা, সিদ্ধ বা আচারকৃত শাকসবজি খায়। জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোর মধ্যে রয়েছে ভ্যারেনিকি, নালিসনিকি, কাপুসনিয়াক, বরসচট, হলুবতসি ও পিয়েরগি।

SHARE

Leave a Reply