Home স্বপ্নমুখর জীবন মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড়ো -আমিনুল ইসলাম ফারুক

মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড়ো -আমিনুল ইসলাম ফারুক

ছোটো ছোটো ভাবনা, ছোটো ছোটো স্বপ্ন আর ছোটো ছোটো কাজের সমষ্টিই জীবন। প্রতিটি চিন্তা, প্রতিটি স্বপ্ন প্রভাবিত করে জীবনকে। এই জীবনের চলার পথে মানুষ মাত্রই স্বপ্ন দেখে। আসলে স্বপ্ন ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। বলা হয়, স্বপ্ন সাধারণত দুই রকমের হয়। যার একটি হলো স্বাভাবিক স্বপ্ন, যা আমরা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখি, এই স্বপ্নের কোনো মানেই থাকে না।
আরেক ধরনের স্বপ্ন আছে, যা স্বপ্ন বা মনছবি অথবা আমরা বলতে পারি ‘জীবন ছবি’। আর এটা হলো বড়ো হওয়ার স্বপ্ন, জীবনে একটা কিছু করার স্বপ্ন। এই স্বপ্নই আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন- ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আলেম, লেখক, ব্যবসায়ী, গায়ক, শিক্ষক ইত্যাদি হওয়ার স্বপ্ন। পক্ষান্তরে ঘুমিয়ে দেখা স্বপ্ন অনেকে মনেও রাখেন না।
মানুষ তার আশার চেয়েও সুন্দর, বিশ্বাসের চেয়েও বড়ো হতে পারে। প্রত্যেকের হৃদয়ে একজন মানুষ বসবাস করে। সে কথা বলে, আত্মনিমগ্ন হয়ে কান পাতলে তার কথা শোনা যায়। সে যা বলে ঠিক সে অনুযায়ী কাজ করলেই জীবনে সফল হওয়া যায়, বড়ো কিছু করা যায়। কারণ সেখানে আমি বা আপনি সম্পূর্ণ একা।
আপনার বা আমার বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব কেউ নেই। একেবারে রাজার মতো একা। রাজা নিঃসঙ্গ, কারণ একই সিংহাসনে একসাথে দুইজন বসতে পারেন না। দুই হাজার মাইল হিমালয় পর্বতমালায় হয়তো কোটি কোটি লোকের জায়গা হতে পারে। কিন্তু শৃঙ্গের সর্বোচ্চ শিখরে দুইজন লোক এক সাথে আরোহণ করতে পারে না। একজনকে আগে উঠতে হয়। এ জন্য তেনজিং এবং হিলারি এক সাথে শিখরে আরোহণ করতে পারেননি। তেনজিং আগে ওঠার কারণে সর্বপ্রথম এভারেস্ট শৃঙ্গ আরোহণকারী হিসেবে এক নম্বরে তেনজিংয়ের নাম চলে এসেছে।
বাস্তব স্বপ্ন ও চেষ্টা কখনোই ব্যর্থ হয় না এমন নজির অনেক আছে। রাইট ভ্রাতৃদ্বয় স্বপ্ন দেখতেন এমন এক যন্ত্র বানাবেন যাতে করে আকাশে ওড়া সম্ভব। তারা তৈরি করলেন প্লেন। সভ্যতার চেহারাই পরিবর্তন হয়ে গেল তাদের এই আবিষ্কারের ফলে। মার্কনি স্বপ্ন দেখতেন, স্রষ্টার শক্তিকে জয় করে কাজে লাগাবেন। তিনি যে ভুল স্বপ্ন দেখেননি তার প্রমাণ বেতার ও টেলিভিশন আবিষ্কার। উল্লেখ্য যে মার্কনি যখন দাবি করলেন তিনি তারের সাহায্য ছাড়াই বাতাসের মধ্য দিয়ে সংবাদ প্রেরণের পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, তখন তার বন্ধুরা তাকে মনস্তাত্ত্বিক হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন মাত্র তিন মাস স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। অতিমাত্রায় অপদার্থের অপবাদ নিয়ে স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হতে হয়েছিল। হেলেন কেলার মাত্র ১৯ মাস বয়সে শ্রবণশক্তি, বাকশক্তি আর দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন। বিশ্বাস আর স্বপ্নের সংমিশ্রণে হয়ে ওঠেন মহীয়সী এবং তার জীবন বিরাট এক সত্যের প্রমাণ- বাস্তবে পরাজয় স্বীকার না করলে কেউ পরাজিত হয় না।
সংবাদ পাঠক পদের জন্য এক আবেদন প্রার্থীকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। কারণ তার কণ্ঠস্বর যথার্থ ছিল না। তিনিই আজকের ‘অমিতাভ বচ্চন’! একজন স্কুল শিক্ষক অঙ্কে মনোযোগী না হওয়ায় এবং ছোট্ট অঙ্ক করতে না পারায় এক ছাত্রকে বলেছিলেন, তুমি জীবনে কিছুই হতে পারবে না। সেই বালক বড়ো হয়ে হয়েছিলেন মস্তবড়ো বিজ্ঞানী। তার নাম ‘আলবার্ট আইনস্টাইন’।
ওপরের উদাহরণগুলোর সারমর্ম হচ্ছে : যিনি কখনো পরাজিত হন, কিন্তু লক্ষ্যহীন হন না, তিনিই প্রকৃত বিজয়ী।
মানুষের মস্তিষ্ক এক অসাধারণ বায়ো-কম্পিউটার। এই কম্পিউটারে যে মানুষ যে রকম প্রোগ্রাম করবেন, তিনি সেরকম ফল পাবেন। যিনি হতাশ হয়ে নিজেকে বলবেন, তার দ্বারা কিছুই হবে না, তিনি জীবনে ব্যর্থ হবেন। আর যিনি হাজারো প্রতিকূলতার মাঝে বড়ো কিছু করার স্বপ্ন দেখবেন, তিনি ঠিকই তা করে ফেলবেন। বিশ্বাস বা প্রোগ্রামিং হয়ে গেলে বায়ো কম্পিউটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে বিজয়ের মালা পরিয়ে দেবে আপনাকে। সাফল্যের জন্য যা কিছু করতে হয়, মন শরীরকে দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে করিয়ে নেবে।
বাস্তব কখনো কখনো কল্পনার চেয়েও অবিশ্বাস্য হয়। কেউ যদি বলে আমি পঁচিশ বছর বয়সে অর্ধ পৃথিবীর সম্রাট হবো- কথাটা গাঁজাখুরি বলে উড়িয়ে দেবেন অনেকে, কিন্তু আলেকজান্ডার তা হয়েছিলেন। এজন্য মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড়ো হতে পারে। মানুষ যা আশা করে তা যদি সে বিশ্বাসে রূপান্তরিত করতে পারে।
সত্যিকার অর্থে, জীবন চলার পথে দেয়াল কিংবা হিমালয় পর্বতের মতো শত বাধা-বিপত্তি আমাদেরকে থমকে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু যারা স্বপ্নবাজ, অধ্যবসায়ী তারা নিজের পুরোটা দিয়ে লড়াই করে বিজয়কে ছিনিয়ে আনে, স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদান করে। আর যারা জীবন নামের সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে নারাজ, তাদের স্বপ্নের অপমৃত্যু হয় খুব সহজেই। আর তাই হেনরি ডেভিড বলেছেন, ‘কেউ যদি বিশ্বাস নিয়ে তার নিজের স্বপ্নের পথে নিজের জীবন ও পরিশ্রমকে নিবেদিত করে, একসময় সে ধারণার চেয়েও বেশি সাফল্য পাবে।’ এক কথায় জীবনে সফল হওয়ার একমাত্র তন্ত্র-মন্ত্র ও জাদুবিদ্যা হলো পরিশ্রম। পরিশ্রমী ব্যক্তি তরতর করে সাফল্যের খাড়া সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে যায়। বিশ্বব্যাপী মানুষের অভিনন্দন আর কৃতজ্ঞতাবোধে তারা চিরকাল বেঁচে থাকেন কোটি মানুষের হৃদয়ে।
সার্বিকভাবে জীবনকে ডানা মেলা একটি উড়ন্ত পাখির সাথে তুলনা করা যায়। কেননা, একটি পাখি যেমন অবিরাম তার পাখা ঝাপটিয়ে নীল আকাশে উড়ে বেড়াতে পারে, ঠিক একইভাবে যেকোনো ব্যক্তি তার অনবরত কর্মতৎপরতার মাধ্যমে স্বপ্নকে ছোঁয়ার জন্য বহুদূর এগিয়ে যেতে পারে। হেনরি ফোর্ড বলেছেন, ‘যত বেশি পরিশ্রম করবে তত বেশি ভাগ্যবান হবে।’ ডিকশনারির ওপর সারা দিন বসে থাকলে যেমন শব্দ শেখা যায় না, ঠিক তেমনি কঠোর পরিশ্রম ছাড়া কেউ কখনো কিছুই অর্জন করতে পারে না।
অ্যান্ডরু কার্নেগি বলেছেন, ‘একজন গড়পড়তা লোক তার উৎসাহ ও ক্ষমতার শতকরা ২৫ ভাগ কাজের জন্য ব্যয় করে। যারা শতকরা ৫০ এর বেশি ক্ষমতা ও উৎসাহ ব্যয় করেন, তারা বিশ্বের মানুষের অভিনন্দন পান। আর যারা শতকরা ১০০ ভাগ ব্যয় করেন, তাদের জন্য সারা পৃথিবীর মানুষের উচ্ছ্বসিত কৃতজ্ঞতাবোধ।’ এছাড়াও স্বপ্নকে সত্যি করার জন্য নিজের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। হেনরি ফোর্ড বলেছেন, ‘যদি তুমি মনে করো তুমি পারবে কিংবা পারবে না, তাহলে দুই ক্ষেত্রেই তোমার বিশ্বাস সঠিক।’ তাই সবসময় মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে হবে, হ্যাঁ আমি পারব আমি পারবই। আত্মবিশ্বাসের জোরে চীনের ৬৯ বছরের শিয়া বোও দুই পা না থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম পা নিয়ে অ্যাভারেস্ট জয় করেছে।
আর এ উদাহরণ থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়, আত্মবিশ্বাস কতটা শক্তিশালী। সত্যিকার অর্থে, একজন স্বপ্নবাজ তার স্বপ্ন পূরণ করার জন্য নিরলস পরিশ্রম ও দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারে এবং নিজের সাফল্য দিয়ে হিমালয়ের উচ্চতাকেও হার মানায়। তাই একজন স্বপ্নবাজকে দৃঢ়চেতা লড়াকু বলাই শ্রেয়। সততা, নিষ্ঠা ও অসীম সাধনার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর সকল স্বপ্নবাজের স্বপ্ন পূরণ হোক।

SHARE

Leave a Reply