Home নিবন্ধ ফিলিস্তিনের শিশু ভয়ের মাঝেই স্কুলে যায় ওরা -আহমেদ বায়েজীদ

ফিলিস্তিনের শিশু ভয়ের মাঝেই স্কুলে যায় ওরা -আহমেদ বায়েজীদ

বাড়ি থেকে বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়া কিংবা স্কুল থেকে বাড়ি ফেরা বিশ্বের যে কোন শিশু-কিশোরের জন্য নিয়মিত ও স্বাভাবিক একটি বিষয়। কখনো নিজেরা দলবেঁধে আনন্দ করতে করতে, কখনো বা অভিভাবকের সাথে স্কুলে যায় তারা; কিন্তু ইসরাইল অধিকৃত ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের শিশু-কিশোরদের জীবন অন্যদের মতো নয়। তাদের প্রতিটি দিন কাটে দখলদার ইসরাইলি বাহিনীর অত্যাচার-নিপীড়নে। এমনকি স্কুলগামী কোমলমতি শিশুরাও তা থেকে নিরাপদ নয়।
নাবলুস শহরের পার্শ্ববর্তী একটি গ্রামের নাম লুবান আশ-শারকিয়া। যেখানকার শিশুদের প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় ইসরাইলি সেনাদের সাথে ‘ইঁদুর বিড়াল খেলা’ খেলতে হয়। স্কুলে যাওয়া কিংবা স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে তাদের প্রতিদিন বিরক্ত করে, কখনো গ্রেফতারও করে ইসরাইলি সেনারা। কখনো অবৈধ দখলদার ইহুদিরাও এসব শিক্ষার্থীর ওপর হামলা করে।
নাবলুস শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণের এই গ্রামটিতে ৩৫ হাজার ফিলিস্তিনির বসবাস। গ্রামটির পাশেই অবৈধভাবে জমি দখল করে ইহুদিদের জন্য ইলি ও মা’আলে নামের দুটি বসতি (মহল্লা) নির্মাণ করেছে ইসরাইল। পুরো ফিলিস্তিনেই এমন অনেক অবৈধ ইহুদি বসতি করা হয়েছে। রামাল্লা ও নাবলুস শহর থেকে লুবান আশ-শারকিয়া গ্রামটিতে ঢোকার মুখে প্রতিদিন পাহারা দেয় ভারী অস্ত্রে সজ্জিত ইসরাইলি সেনারা। গ্রামের ছেলে-মেয়েদের তাই গ্রামের বাইরের স্কুলটিতে যাওয়ার সময় সেনা ও দখলদার ইহুদিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলতে হয়। তাদের সামনে পড়লেই নানাভাবে হেনস্তা করা হয় কোমলমতি এসব শিশুকে। মাওদ আওয়াইস নামের এক অভিভাবক বলেন, আমি প্রতিদিন আমার ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দেই, আবার স্কুল থেকে নিয়ে আসি। কারণ সব সময় ভয়ে থাকি সেনারা তাকে আঘাত করে কিংবা গ্রেফতার করে নিয়ে যেতে পারে।
মাহমুদ নামে তার ১১ বছরের ছেলে জানায়, একবার ইসরাইলি সেনাদের সাথে তার বন্ধুদের সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকে সে স্কুলে যাওয়ার সময় প্রচণ্ড ভয়ে থাকে। মাহমুদ বলে, আমরা দলবেঁধে স্কুলে যাচ্ছিলাম। সেনারা আমাদের রাস্তায় থামিয়ে হুমকি দিয়েছে।
গত অক্টোবর মাসের মাঝামাঝিতে গ্রামের রাস্তায় স্কুলগামী মেয়েদের ধাওয়া করে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর একটি গাড়ি এবং তাদের উদ্দেশে আজেবাজে কথা বলতে থাকে। এসব কারণে প্রায়ই দেখা যায় শিক্ষার্থীরা রাস্তা দিয়ে না চলে ফসলের ক্ষেতের পাশ দিয়ে স্কুলে যাচ্ছে। ফালাস্তিন নুবানি নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, সেনারা প্রায়ই ছাত্রদের ভয় দেখাতে উচ্চস্বরে হুইসেল বাজায়। কখনো তাদের থামিয়ে তল্লাশি করে। যার ফলে তারা আতঙ্কে থাকে।
লুবান গ্রামের পার্শ্ববর্তী আরেকটি গ্রামের নাম উরিফ। এখানকার পৌরসভার কর্মকর্তা আমের সাফাদি জানান, তাদের গ্রামের পাশেই ইহুদিদের একটি বসতি রয়েছে। তারা যাতে স্কুলে যাওয়ার পথে কোনো ঝামেলা করতে না পারে সে কারণে নিজে সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দেন প্রতিদিন। তিনি বলেন, অতীতে দখলদার ইহুদিরা অনেকবার স্কুলেও হামলা চালিয়েছে।
আমের সাফাদি আরো জানান, দখলদাররা প্রায়ই স্কুলে পাথর ছোড়ে। যে কারণে ছাত্রদের সুরক্ষার জন্য স্কুলের মূল ভবনের বাইরের খোলা জায়গার ওপরেও ছাদ দেওয়া হয়েছে। অনেক বারই তাদের ছোড়া পাথরে স্কুলের জানালা ভেঙে গেছে।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে বেথলেহেমের কিসান গ্রামের ছেলেরা স্কুল থেকে ফেরার পথে দখলদারদের একটি গাড়ি তাদের তাড়া করে। ছেলেরা চিৎকার করতে করতে দৌড়ে আবার স্কুলের ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়ে। পশ্চিম তীরের দক্ষিণাঞ্চলীয় আত তুবানিসহ পার্শ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামের শিক্ষার্থীদেরও একই রকমভাবে স্কুলে যেতে হয় হামলা-হেনস্তার ভয়ের মধ্যে।
এই চিত্র যে শুধু এমন কয়েকটি গ্রামে তা নয়। ইসরাইল অধিকৃত পুরো পশ্চিম তীরের সর্বত্রই প্রায় একই অবস্থা। গত আগস্টের ১৫ তারিখে ফিলিস্তিনে নিযুক্ত জাতিসঙ্ঘের মানবিক কার্যক্রম বিষয়ক সমন্বয়কারী লিন হাস্টিংসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের শুরু থেকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত পশ্চিম তীরে পাঁচ মেয়েসহ ২৪ ফিলিস্তিনি শিশু আহত হয়েছে দখলদারদের হামলায়। বিবৃতিতে ওই কর্মকর্তা বলেন, স্কুলে যাওয়ার পথে সহিংসতা ও হেনস্তা থেকে শিশুদের রক্ষা করা ইসরাইলের দায়িত্ব।

সূত্র: আলজাজিরা অবলম্বনে

SHARE

Leave a Reply