Home খেলার চমক ছাই নিয়ে ক্রিকেট যুদ্ধ -আবু আবদুল্লাহ

ছাই নিয়ে ক্রিকেট যুদ্ধ -আবু আবদুল্লাহ

ক্রিকেটের সবচেয়ে প্রাচীন, ঐতিহ্যবাহী আর জমজমাট লড়াইয়ের নাম অ্যাশেজ সিরিজ। ইংরেজি ‘অ্যাশ’ যার অর্থ ছাই- শব্দ থেকেই সিরিজটির নামকরণ করা হয়েছে অ্যাশেজ সিরিজ। এই সিরিজের ট্রফিটিও তৈরি করা হয় ছোট্ট একটি ছাইদানির মতো করে। এমন নামকরণের পিছনে আছে বিরাট ইতিহাস। সেটা একটু পরে বলছি।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শেষ করে কয়েকটা দিন ছুটি কাটিয়ে ইংল্যান্ড দলকে আবারো চড়তে হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার বিমানে। পাঁচ ম্যাচের অ্যাশেজ সিরিজ ৮ ডিসেম্বর শুরু হয়ে চলবে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। এবারের স্বাগতিক দেশ অস্ট্রেলিয়া। প্রতি দুই বছরে একবার, আরো স্পষ্ট করে বললে প্রতি ১৮ থেকে ৩০ মাসের মধ্যে একবার মাঠে গড়ায় এই সিরিজ। এখন পর্যন্ত ৭১টি আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে এই সিরিজের। অস্ট্রেলিয়া জিতেছে ৩৩ বার আর ইংল্যান্ড ৩২ বার। বাকি ৬টি সিরিজ ড্র হয়েছে। টানা আটটি করে সিরিজ জেতার রেকর্ড আছে উভয় দলেরই। কতটা ‘সেয়ানে সেয়ানে’ লড়াই তা বুঝতেই পারছো!
পালা করে একবার অস্ট্রেলিয়া ও একবার ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হয় সিরিজটি। এবারের আসরটি ৭২তম। সর্বশেষ অ্যাশেজ সিরিজ অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০১৯ সালে ইংল্যান্ডের মাটিতে। সেটি ২-২ ম্যাচে ড্র হয়েছে। যে কারণে ২০১৭ সালের সিরিজ জেতা অস্ট্রেলিয়ার ঘরেই ট্রফিটি রয়ে গেছে। এই সিরিজকে ঘিরেই ক্রিকেটে পরস্পরের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আখ্যা পেয়েছে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া। একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা দ্বিপক্ষীয় এই সিরিজটি দুই দেশের মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
ক্রিকেটের অনেক কিংবদন্তির উত্থান হয়েছে অ্যাশেজ সিরিজে। কত গল্প, কত বিতর্ক, কত উপাখ্যান যে আছে এই সিরিজের তা বলে শেষ করা যাবে না। টেস্ট ক্রিকেটেও যে টানটান উত্তেজনা, হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে তা দেখিয়েছে অ্যাশেজ। কারো দাপট, কারো বা কোণঠাসা হয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ানো- কী দেখেনি এই সিরিজ! এই সিরিজ দেখেছে কিংবদন্তি ডন ব্রাডম্যানকে। দেখেছে ইয়ান বোথামের বুক চিতিয়ে লড়ে যাওয়া, শেন ওয়ার্নের ঘূর্ণি জাদু কিংবা রিকি পন্টিংয়ের দাঁতে দাঁত চেপে ম্যাচ বাঁচানো।

নামকরণের ইতিহাস

১৮৭৭ সালে ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ম্যাচটি খেলে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া। মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে জয় পায় স্বাগতিক অজিরা। তবে এরপর তারা দুইবার ইংল্যান্ড সফর করে একটি ম্যাচও জিততে পারেনি। ইংল্যান্ডের দলটাও তখন দারুণ প্রতাপশালী, ওদেরই মাঠে ওদেরকে হারানোটা ছিল প্রায় অসম্ভব। সেই অসম্ভব ঘটনাটাই অজিরা ঘটিয়ে ফেলে ১৮৮২ সালে। আগস্ট মাসে লন্ডনের দ্য ওভাল স্টেডিয়ামে বৃষ্টি বিঘিœত লো-স্কোরিং ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ৭ রানে হারায় অস্ট্রেলিয়া।
অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম ইনিংসে মাত্র ৬৩ রানে অলআউট করে দিয়ে ৩৮ রানের লিড নিয়েছিল ইংল্যান্ড। তবে দ্বিতীয় ইনিংসে ৮৫ রান তাড়া করতে নেমেও পারেনি তারা। এই পরাজয়ে আঁতে ঘাঁ লাগে অহঙ্কারী ব্রিটিশদের। বলা হয়, ক্ষোভে, দুঃখে নাকি সেই ম্যাচের স্ট্যাম্পের বেল পুড়িয়ে দিয়েছিলেন এক নারী। এখানেই শেষ নয়, ম্যাচের পরদিন স্পোর্টিং টাইমস নামক পত্রিকা শোক সংবাদ স্টাইলের একটি ব্যঙ্গধর্মী লেখা ছাপে। যাতে লেখা ছিল-
‘স্নেহের সাথে স্মরণ করছি ইংলিশ ক্রিকেটকে- ১৯৮২ সালের ২৯ আগস্ট যে ওভালে মারা গেছে। তার পরিচিত বন্ধু, চেনাজানা লোকেরা সবাই গভীর দুঃখের সাথে তাকে স্মরণ করছি। শান্তিতে ঘুমাও।
বি. দ্র. তার লাশ দাহ করে ছাই-ভস্ম অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যাওয়া হবে।’

সে সময় অস্ট্রেলিয়া ছিল ইংল্যান্ডের উপনিবেশ। একটা উপনিবেশের খেলোয়াড়রা তাদেরই দেশে এসে তাদেরকে হারিয়ে যাবে সেটা মেনে নিতে পারেনি ইংরেজরা। পরের বার আবার যখন ইংল্যান্ড দলের অস্ট্রেলিয়া সফর সামনে এলো। বেজে উঠলো যুদ্ধের দামামা। চারদিকে ধ্বনি উঠলো- ‘প্রতিশোধ চাই’। কেউ কেউ মজা করে বললেন, সেই ছাই ফিরিয়ে আনা হোক।
সেবার তিন ম্যাচের সিরিজে ২-১ ব্যবধানে জিতে সমর্থকদের ‘ইজ্জত রক্ষা’ করেছিল ইংল্যান্ড। সিরিজ শেষ হওয়ার পরে অস্ট্রেলিয়ার এক ক্যাসিনোতে আনন্দ করতে যায় ইংল্যান্ড দল, সেখানে ইংলিশ অধিনায়ক ইভো ব্লাইকে একটা ছাইভর্তি ছোট্ট কৌটা উপহার দেন ফ্লোরেন্স মার্ফি নামে এক নারী আর তার কয়েকজন বান্ধবী। এই ছাইয়ের ঘটনা থেকেই সিরিজটি লোকমুখে অ্যাশেজ নাম পায়। আনুষ্ঠানিকভাবে যার নামকরণ করা হয় ১৯০৫ সালে। ইভো ব্লাইকে দেওয়া সেই ছাইয়ের কৌটাটি এখনো সংরক্ষিত আছে লর্ডস স্টেডিয়ামের এমসিসির জাদুঘরে। সেই থেকে এই ছাইদানীই হয়ে গেছে দুই দেশের ক্রিকেটের মর্যাদার লড়াইয়ের প্রতীক। সেটির আদলেই তৈরি করা হয় অ্যাশেজ ট্রফি।

SHARE

Leave a Reply