Home স্বাস্থ্য কথা কিশোর বয়সে করোনা ভ্যাকসিন দিতে হবে কি না? -ডা. এহসানুল কবীর

কিশোর বয়সে করোনা ভ্যাকসিন দিতে হবে কি না? -ডা. এহসানুল কবীর

প্রথমেই একটু জেনে নেওয়া যাক করোনা ভ্যাকসিন কী? আসলে যেকোনো ভ্যাকসিন আমাদের শরীরে একটি জীবাণুকে (ভাইরাস/ব্যাকটেরিয়া) নিষ্ক্রিয় করার মাধ্যমে ঐ রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করতে সহায়তা করে।
সম্প্রতি ১২ সেপ্টেম্বর ’২১ স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়ার পরই এই চিন্তাটা সবার মাথায় এসেছে। কারণ শিশু-কিশোর-তরুণরাও করোনার বাহক হতে পারে। করোনা ভ্যাকসিনের টিকা দেওয়া কত যে গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবান তা করোনাভাইরাস আমাদেরকে হাড়ে হাড়ে শিখিয়ে দিয়ে গেছে। কারণ বড়োরা যেমন করোনার ঝুঁকিতে আছেন, ছোটোরাও তেমন ঝুঁকিতে থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। কাজেই করোনা ভ্যাকসিন দেওয়াটা সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকদেরও এ ব্যাপারে যথেষ্ট উদ্বেগ বা প্রশ্ন রয়েছে। তবে দেখা গেছে বড়োদের চেয়ে বাচ্চাদের ঝুঁকিটা একটু কম এবং মারাত্মক লেভেলের আক্রমণ কম হতে দেখা গেছে। তারপরও রিস্ক তো রয়েই গেছে। তা ছাড়া সরকারিভাবে হাম, যক্ষ্মা, টিটেনাস ইত্যাদি কঠিন রোগের টিকা দিতে পারলে করোনা ভ্যাকসিন পাওয়াটাও তাদের অধিকার রয়েছে। সুতরাং করোনা ভ্যাকসিন দেওয়াটা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
আমাদের দেশের স্কুল শিক্ষার্থীদেরকে করোনা ভ্যাকসিন দেওয়ার ব্যাপারে সরকারের সক্রিয় সিদ্ধান্ত রয়েছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন যে, স্কুলের শিক্ষার্থীদেরকে করোনা ভ্যাকসিন পর্যায়ক্রমে দেওয়ার ব্যবস্থা চলছে। সেক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন সনদ দেখিয়ে স্কুলভিত্তিক এই ভ্যাকসিন দিতে বলা হচ্ছে। প্রাথমিকভাকে ৩০ লাখ স্কুল-শিক্ষার্থীদেরকে এই ভ্যাকসিন দেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক বলছেন যে, ১৮ বছরের কম বয়সীদের করোনা ভ্যাকসিন দেওয়ার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য-উপাত্ত পাননি বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক কোনো অনুমোদন এখনো পাননি। তবে বাংলাদেশ সরকার যদি কোনো তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নিজস্ব প্রটোকলে এই বয়সীদেরকে ভ্যাকসিন দিতে চায় তাহলে করোনা ভ্যাকসিন দিয়ে দেওয়াটা শ্রেয় হবে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই বয়সে করোনা ভ্যাকসিন না দিলে কোন সমস্যা হবে কি না? বিষয়টা একটু জটিল বটে। আসলে এ ব্যাপারে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। তবে এ ব্যাপারে ব্যাপক গবেষণা ও ভিন্ন কিছু চিন্তাভাবনা চলছে। পৃথিবীর কোনো কোনো দেশে ১৮ বছরের কম বয়সীদের ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে করোনা ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হয়েছে। ব্রিটেনে ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী ৬ লাখের বেশি কিশোরদেরকে করোনার টিকা দেওয়া হয়েছে। ভারত ইতোমধ্যে তাদের উদ্ভাবিত ‘ভারত বায়োটেক’ করোনা ভ্যাকসিন ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের প্রথম ডোজ দিয়েছে। আর ২ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুদের করোনা ভ্যাকসিনের টিকা দেওয়ার ব্যাপারে সক্রিয় বিবেচনায় রেখেছে বলে জানা গেছে।
আমাদের দেশে ১২ বছর বয়স থেকে কিশোর-তরুণদেরকে টিকা দেওয়া যায় কি না সে ব্যাপারে চিন্তাভাবনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
এরপর প্রশ্ন আসতে পারে করোনা ভ্যাকসিন দিলে কোনো পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হবে কি না? বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, করোনা ভ্যাকসিন নিরাপদ ও কার্যকর। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের সমস্যা বা রিঅ্যাকশন দেখা দিতে পারে। তবে মারাত্মক পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার বিরল ঝুঁকিও রয়েছে। করোনা ভ্যাকসিনের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার লক্ষণগুলো সাধারণত টিকার স্থানে ফুলে যাওয়া, ব্যথা হওয়া, জ্বর আসা, গায়ে-পায়ে ব্যথা, ঠাণ্ডা-কাশি ইত্যাদি হতে পারে। এটা ভয়ের কিছু নেই। এটা ৩-৪ দিন পরে স্বাভাবিকভাবেই নিরাময় হয়ে যায়।
করোনা ভ্যাকসিন দেওয়ার পর এর পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার কারণ হলো আমাদের শরীরের যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেম রয়েছে সেটা ভ্যাকসিনের উপকরণের প্রতি সংবেদনশীলতা তৈরি করে। সেজন্য সেটাকে শত্রু ভেবে সংক্রমণ বিরোধী কোষগুলোকে সক্রিয় করতে বার্তা পাঠায়। কোষগুলো তখন শত্রুকে শনাক্ত ও ধ্বংস করতে তৎপর হয়ে ওঠে। ফলে পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যার শরীরে ইমিউন সিস্টেম যত বেশি শক্তিশালী তার পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার মাত্রা তত বেশি। পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হলে বুঝতে হবে টিকাটি কাজ করছে। কার কী পরিমাণ পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হবে তা আগে থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই।
কিছু কিছু মানুষের করোনা ভ্যাকসিনের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি একটু বেশিই থাকে। যেমন- যাদের ইতিপূর্বে যেকোনো টিকা দেওয়ার পর পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার ইতিহাস রয়েছে।
আবার বিভিন্ন রোগের কারণে যাদের অনেক প্রকারের ওষুধ খেতে হয়। যাদের অটো-ইমিউন জাতীয় রোগ আছে। এ ছাড়া বয়স, লিঙ্গ, রোগ, জীবনাচার ও জিন বা বংশগত প্রভাবের কারণেও পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার তারতম্য হতে পারে।
এবার আসি করোনা ভ্যাকসিন দেওয়ার পরে কোনো পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হলে করণীয়টা কী? কোনরূপ সমস্যা দেখা দিলেই তাৎক্ষণিকভাবে নিকটস্থ চিকিৎসক বা হাসপাতালে যোগাযোগ করে দ্রুত পরামর্শ নিতে হবে। ভীত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
করোনা ভ্যাকসিন দেওয়ার পরে করণীয় কী রয়েছে? ভ্যাকসিন দেওয়ার আগে ও পরে প্রচুর বিশ্রাম ও ভালো ঘুম হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি মানসিকভাবে সুস্থ থাকাটা জরুরি। তাতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ভ্যাকসিন দেওয়ার পর ঘণ্টাখানেক ঐস্থানে অবস্থান করা ভালো। এ সময়ের মধ্যে কোনো সমস্যা অনুভব না করলে বাসায় গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রামে থাকা উচিত। এ সময়ে প্রচুর পানি পান করা ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা উচিত। এছাড়া এ সময়ে মনকে প্রফুল্ল রাখা ও ভারী কাজ বা শরীরচর্চা না করাই উত্তম।

SHARE

Leave a Reply