Home নিবন্ধ অভিযান -দেলোয়ার হোসেন

অভিযান -দেলোয়ার হোসেন

[গত সংখ্যার পর]

– যায়। আমার কাছে প্রকাশ করলে আপনার ভালোই হবে।
– না, তা হয় না।
– ভেবে দেখুন আপনিও চরম বিপদে পড়তে পারেন।
– আমি বুঝতে পারছি আমিও নূরুল হুদার কাছে চলে যাবো- তবুও বলবো না।
শহীদ আলমের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করলো বাদ্শাখান। আপনি আমার নুন খেয়ে আমার কপালে পিস্তল ধরেননি। কিন্তু যারা সাধু সেজে আমাদের সব খবর পাচার করেছে তারা হলো বিশ্বাসঘাতক। অথচ তাদের আমি মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েছি প্রতি মাসে। আপনি বলুন বেঈমান কে?
– আপনি ঠিকই বলেছেন। তবে তাদের নাম প্রকাশ করা আমাকে দিয়ে হবে না।
– আপনি তো অদ্ভুত লোক! আমার যুক্তি মানছেন অথচ…
– যুক্তি সকলেরই থাকে বাদ্শাখান। ভালো কাজ আর মন্দ কাজ বলে কথা।
ঠিক এই সময় একটা পায়ের আওয়াজে কাশেম মুখ ফেরাতেই দেখল, একটা লম্বা লোক তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। ভালো করে দেখার আগেই প্রচণ্ড একটা আঘাত এসে পড়লো কাশেমের ঘাড়ে। তার চেতনাকে আচ্ছন্ন করে দিলো।
কাশেম যখন চোখ খুলল তখন সকালের আলোয় ঝলমল করছে ঘর। তবে এ ঘরটা তার অচেনা নয়। পরে সব মনে পড়লো কাশেমের। মাথাটা যেন ঝিমঝিম করছে। ঘাড়ের ওপর হাত বুলায়ে মেঝের ওপর দাঁড়াল কাশেম। শরীরটাকে টান-টান করলো। তারপর দরজা খুলতে গিয়ে দেখল বাইরে থেকে বন্ধ।
ফিরে এসে বসলো লোহার খাটে। দেখল তার ব্যাগটা নেই। নিশ্চয়ই সরকার সাহেব নিয়ে গেছে সেটা। হাসলো কাশেম। ডায়েরিটা কি সে সাথে নিয়ে ঘুরছে? অবস্থা যাই হোক; কারো নাম প্রকাশ করা শহীদ আলমের ঠিক হতো না। পেট থেকে কথা বের করতে না পেরে তাকে হয়তো কোথাও আটকে রেখেছে। নাকি…
মনে মনে অস্থির হলো কাশেম। ছোটো ঘরের মধ্যে পায়চারি শুরু করল সে। ঘরটা বাইরে থেকে বন্ধ। হাত-মুখ ধোয়ার পানি কে দেবে? বক্কর কোথায় সে কেন আসছে না। দরজায় আঘাত করতে লাগলো কাশেম। অনেকক্ষণ পর জানালায় একটা মুখ দেখা গেল। নতুন মুখ। সে বললো, দুম্দাম আওয়াজ করছিস কেন? কী দরকার বল।
– বাথরুম…
কিছুক্ষণ পরেই দরজার তালা খুলে কাশেমের হাত ধরে বললো, চল আমার সঙ্গে। কিন্তু বেয়াদবি করবি না। এটা মামা বাড়ি নয়।
দোতলার এক কোণে বাথরুম। ওকে ভেতরে ঠেলে দিয়ে দরজা টেনে দিলো লোকটি। বালতি ভরা পানি- ভালো করে মুখ-হাত ধুয়ে নিলো কাশেম। সরকারের গলা শুনা গেল- কী-রে কেমন বুঝলি ছোড়াটাকে? বাইরে বেরিয়ে এলো কাশেম। মুখ তুলে তাকালো সরকারের দিকে।
– কেমন লাগছে আবুল কাশেম?
কোনো জবাব নেই কাশেমের। সরকার আগের লোকটিকে বললো, খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা কর। তাড়াতাড়ি নিয়ে আসবি। একটু পরেই বাদশাখান আসবে ওর সাথে কথা বলতে। সরকার বললো, তোমার মতো ছেলে কম দেখেছি- জেনে-শুনে কেউ বাঘের খাঁচায় পা দেয়।
কাশেম চুপ। সরকার বলেই চলেছে- আমি তারিফ করি তোমার অভিনয়ের। শুনেছি রিপোর্টার তোমাকে খুব ¯েœহ করতেন। এই সময় খাবার হাতে ঢুকলো সেই লোকটি। প্লেট ভর্তি খাবার। কাশেম মনে মনে ভাবলো, এর পেছনে বেটাদের মতলব আছে।
– জানি উপদেশ কানে তুলবার মতো ছেলে তুমি নও। তবে বাদশাখানের সাথে উল্টাপাল্টা কথা বলো না। বললো সরকার।
– আমার ব্যাগটা কি আমি ফেরত পেতে পারি?
– ওটা আমার হাতে নেই। বাদশাখানের কাছে।
– ওটা তো আমার দরকার। জামা প্যান্ট চেঞ্জ করতে হবে।
– বেশ তো উনি এখনি আসবেন।
বাদশাখান এসে দাঁড়াল দরজায়। মুখ তুললো কাশেম। সরকার বললো, ব্যাগটা ফেরত চাইছে। জামা প্যান্ট বদল করবে।
– তাতে কী আছে। নিয়ে এসো আমার ঘর থেকে।
সরকার চলে গেলে বাদশাখান বলল, কেন নোংরা ব্যাপারে মাথা ঘামাচ্ছ। এসব তোমার মানায়?
কাশেম নিরুত্তর। কী বলতে চায় বাদশাখান!
– দেখ বাপু, তুমি যার জন্য এসেছো, তাকেই বা কেন এখানে আনা হয়েছে তাও তোমার অজানা নয়। আমার সাথে ভালো ব্যবহার করো তা’হলে তোমার কোনো ক্ষতি হবে না। ট্রেনে তুলে দেবো ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাবে। বলো রিপোর্টারের ডায়েরিটা কোথায়?
এতক্ষণে মিঠা বুলির কারণ বুঝলো কাশেম। বললো, মুন্সী সাহেবের ডায়রির কথা বলছেন?
ঘাড় হেলিয়ে বাদ্শাখান বুঝিয়ে দিলেন ঠিক তাই।
– সে খবর আমি জানব কী করে! যার ডায়েরি তার কাছেই আছে।
– মিথ্যা কথা বলো না।
– মিথ্যা নয়।
– চুপ করো। চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠলেন বাদশাখান।
কাশেমকে যেন ভূতে পেয়েছে। তার গলাও চড়লো- আমি আদার ব্যাপারী ওসব জাহাজের খবর আমার কাছে পাবেন না। থম্কে গেল বাদশাখান। এমন জবাব সে আশা করেনি। সহজ গলায় সে বললো, মিথ্যে অশান্তি বাড়াচ্ছ আবুল কাশেম। আমি জানি সেটা এখন তোমার কাছে। মাথা নিচু করল কাশেম। হঠাৎ বললো, তার আগে মুন্সীর সাথে আমার কথা বলা দরকার।
– কিন্তু এখন সে সুযোগ দেওয়া সম্ভব নয়। তোমার শহীদ আলম…
বিদ্যুতের মতো সরকারের কথাটা মনে পড়লো কাশেমের। মুখটা সাদা হয়ে গেল। ভয়ে ভয়ে বললো, তিনি কি এখানে নেই?
– ঠিক তা নয়।
– তবে?
জেরার কৌশলটা ভালো লাগলো না বাদশাখানের। সে চিৎকার দিয়ে উঠলো, অত খোঁজে তোমার কী কাজ হে। যা জানতে চাই তার জবাব দাও। কাশেমও বলে উঠলো, ডায়েরির খোঁজ কাউকে দিতে আমি বাধ্য নই।
কথাটা শেষ হওয়া মাত্রই একটা থাপ্পড় এসে পড়লো কাশেমের গালে। ঢলে পড়লো সে। বাদশাখান তুঙ্গে উঠল- সরকার সাহেব পিকলু ও পিয়ারী লাল কোথায়? ওরা ঘরের বাইরে ছিল এবার ছুটে এলো।
– ছুড়াটাকে বেঁধে চাবুক লাগা। দেখ কথা বের হয় কি না।
দড়া-দড়ি নিয়ে ঢুকলো ওরা। কাশেমের হাত দুটো পিঠমোড়া করে বাঁধলো। অনড় হয়ে পড়ে থাকল কাশেম। যেন তার জ্ঞান নেই। সরকার বলল, কাকে বাঁধছো ওতো সেন্সলেস হয়ে পড়েছে। দাঁত লেগে গেছে।
– তা’হলে ওভাবেই থাক। কাল দুপুরে আমাকে জানাবে।
জুতোয় আওয়াজ তুলে বেরিয়ে গেল বাদশাখান। পিয়ারী আর কালা জোর করে তাকে কথা আদায় করতে আর সরকার চায় বুঝিয়ে সুঝিয়ে কথা বের করতে।
কাশেম এক সময় নড়েচড়ে উঠে বললো, একটু পানি! আহ্্ বড়ো পিপাসা। পিয়ারী লাল চিৎকার করে বলল, এই বক্কর এক গ্লাস পানি নিয়ে আয়। কালা বললো, না না বক্করের আসতে মানা আছে। আমিই যাচ্ছি।
এসব কাশেমের ভং। ও সময় নিচ্ছে। তারপর পানি খেয়ে তাকাল সরকারের দিকে।
– কেমন বুঝতাছ? মিথ্যা কথা বলে লাভ নাই। সত্যটা বলে দাও।
– সেটা আমার হাতছাড়া হয়ে গেছে। কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছি।
– তা’হলে আর কি- কর্তাকে বলি গিয়ে।
তারপর ওরা দরজায় তালা লাগিয়ে বেরিয়ে গেল। সমস্ত দিন আর কারো দেখা মিললো না। লোহার খাট্টার ওপর পড়ে থাকলো কাশেম। সূর্য মিলিয়ে গেল পশ্চিম আকাশে। অন্ধকার ঘর, ইচ্ছে করলে উঠে গিয়ে সুইচ্টা অন করতে পারতো কাশেম কিন্তু করেনি। এক সময় সে ঘুমিয়ে পড়লো। হঠাৎ কয়েকজনের পায়ের শব্দে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলো। তালা খুলে পিয়ারী লাল আর কালা এসে দাঁড়ালো ঘরের মধ্যে। হঠাৎ দু’জন ঝাঁপিয়ে পড়লো কাশেমের ওপর।

নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলো কাশেম। চিৎকার করলো। তারপর তারা কাশেমের হাত-পা বেঁধে কাঁধে করে নিয়ে চললো কোথাও। হাত-পা ছুড়েও কাজ হলো না। গড়িয়ে পড়তেও পারলো না। চৌকাঠ পেরিয়ে বাইরের চত্বরে এসে পৌঁছালো তারা। এখানটায় অন্ধকার আরো জমজমাট। দ্রুত হেঁটে চলেছে পিয়ারী লাল, তার পেছনে কালা। বল প্রয়োগ করে লাভ নেই, তাই শান্ত হয়ে থাকলো কাশেম। সে দেখলো সামনেই একটা ভ্যানগাড়ি। গাড়ির পেছনের পাল্লাটা ওপরে টেনে তুললো কালা। সঙ্গে-সঙ্গে কাশেমকে কোলপাঁজা করে তুলে ছুঁড়ে ফেলে দিলো ভেতরে। ধপ্ করে পড়লো কাশেম। ‘উহু’ বলে একটা আওয়াজ বেরিয়ে এলো তার মুখ থেকে।

কালা গাড়ির পাল্লাটা লক্ করে দিয়ে বললো যাক; একটা আপদ ঢুকলো। ড্রাইভারের সিটে বসলো পিয়ারী লাল পাশে কালা। গাড়িটা চলতে শুরু করলো। গাড়ির ভেতরে মাথা ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে কিছু দেখার চেষ্টা করলো কাশেম। একপাশে মালপত্র রাখা, অন্যদিকটা যেমন নোংরা তেমনি দুর্গন্ধ। কোনায় চটের বস্তা জড়ো করে রাখা। তার পাশে মোটা-সোটা একটা খড়ের আঁটি। কাশেমের গা ঘেঁষে একটা কাঠের বাক্স। মনে হয় হাতুড়ি, পেরেক করাত রাখা আছে।
কালা বললো, হ্যা-রে কর্তা ও বাড়িতে পৌঁছেছে তো?
– অনেক আগেই পৌঁছে গেছে। ঝামেলা খতম- করতে হবে সে আসবে না।
– ঝামেলা কি আর সহজে শেষ হবে?
কালার মুখে আর কথা নেই। কান খাড়া রেখেও কাশেম আর কিছু শুনতে পেলো না। হালকাচালে গাড়ি চলছিলো। এক বাঁকে গাড়িটা দাঁড়িয়ে পড়লো।
– কিরে এত দেরি কেন?
চম্কে উঠলো কাশেম- বাদ্শাখানের গলাশুনে।
– গড়-বড় কিছু হয়নি তো?
পিয়ারী লাল আর কালা গাড়ি থেকে নামলো। বললো, সব ঠিক আছে। রিপোর্টারকে উঠিয়ে নেই।
– হ্যাঁ। বলেই গাড়ির পেছন দিকে নজর করলো বাদ্শাখান। হ্যা-রে গানির ব্যাগগুলো নামিয়ে রাখিসনি? খড়ের বোঝাটাও দেখছি তেমনি আছে।
– কাজ খতম করার পর সব ঠিক করা হবে।
বাদ্শাখান আর কিছু বললো না। ওরা সরে গেল সেখান থেকে। এবার বাদ্শাখান ড্রাইভারের সিটে উঠে বসলো। কাশেম বুঝলো, রাতের অন্ধকারে তাদের অন্য কোথাও পাচার করে দেবে। নিশ্চয়ই পুলিশের কড়া নজর আছে ওদের দিকে। গতকাল রাত্রে ঢাকি-ঢুলি বিসর্জন দেওয়ার কথা মনে পড়লো। কাশেমের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। দেহ-মন অবশ হয়ে আসতে লাগলো দুশ্চিন্তায়।
গাড়ির পেছনের পাল্লাটা আবার ওপরে উঠে গেল। ধপ্ করে কী একটা এসে পড়লো কাশেমের ডান পাশে। আহ্-আহ্ একটা আওয়াজ শোনা গেল।
শহীদ আলম! উঠে বসতে গেল কাশেম, পারলো না। দু’পা গড়িয়ে আরও কাছে এগিয়ে গেল সে। ওদিকে পিয়ারী লাল বসেছে বাদ্শাখানের বাঁয়ে। ইঞ্জিন আওয়াজ করে উঠতেই বাদ্শাখানের দিকে চেপে বসলো পিয়ারী লাল।
বাদ্শাখান বললো, কালা তুই বরং ফিরে যা ও বাড়িতে। সরকারকে বলবি চোখ-কান খোলা রাখতে।
গাড়ি চলতে লাগলো। এবার কাশেম ফিস্ফিস করে ডাকলো শহীদ ভাই; বলার সঙ্গে-সঙ্গে পাশের দেহটা নড়েচড়ে উঠলো। তা’হলে শহীদ আলম বেহুঁশ হয়নি। কাশেম আর একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে ফিস্ফিস করে বললো, আলম ভাই আমি কাশেম।
কাশেম? বাঁদিকে মাথা ঘুরালো মানুষটি। অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শহীদ আলম বললেন, তুই এখানে?
চাপা গলায় বললো কাশেম, সে অনেক কথা। তুমি কেমন আছো? এরা কি খুব অত্যাচার করেছে?
– না। তা- তুই এখানে এলি কী করে?
গাড়ি ছুটছে। ইঞ্জিনের একটানা গর্জন। বেটারা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। কাশেম কাঁপা গলায় বললো, শুনছো, ওরা কী বলাবলি করছে?
– শুনেছি।
– আমাদের কি শেষ পর্যন্ত —।
কথা শেষ হওয়ার আগেই শহীদ আলম বললেন, মুন্সী সাহেবের কথা ভুলে গেলি? কী বলবে কাশেম। অক্ষম আক্রোশে দমবন্ধ করে শরীরে বাঁধা রশিগুলোর ওপর চাপ দেয় কাশেম। একটু আলগা করতে চায় কিন্তু চেষ্টাই সার। ক্লান্ত হয়ে এলিয়ে পড়ে গাড়ির মেঝেয়। অনেক পরে হঠাৎ একটা মৃদু খস্্খস আওয়াজে বাঁদিকে মুখ ফেরালো সে। দেখলো খড়ের আঁটিটা তার আরও কাছে সরে এসেছে। চোখ দুটো বড়ো-বড়ো হয়ে উঠলো কাশেমের।

বক্কর খুব সন্তর্পণে খড়ের আঁটির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। সতর্ক ভঙ্গিতে সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো বাদ্্শাখান আর পিয়ারী লালের দিকে। একহাতে মুখবাঁকা চক্্চকে ছুরি। আতঙ্কে চিৎকার করতে যাচ্ছিল কাশেম, তার আগেই দুই ঠোঁটের ওপর তর্জনী রেখে তাকে চুপ থাকার ইশারা করলো বক্কর। কাশেম অবাক! হামাগুড়ি দিয়ে আরও কাছে এগিয়ে এলো সে। কাশেম লক্ষ করলো অন্ধকার হাতড়ে-হাতড়ে বক্কর তার হাত-পায়ের বাঁধনগুলো কেটে দিচ্ছে। অসহ্য উত্তেজনায় দেহের রক্ত চন্মনে হয়ে উঠলো কাশেমের। হাত-পায়ের বাঁধন খোলা পেয়েও সে একইভাবে পড়ে রইল। বক্কর তখন এগিয়ে গেছে শহীদ আলমের কাছে। কাশেম একবারে শহীদ আলমের কানের ওপর মুখ নিয়ে বললো, ভাই আল্লাহ্ আমাদের সহায়। বাঁধনমুক্ত অবস্থায় পড়ে থাকবেন। লড়াই বাধলে তখন কী করা যায়; সেটা তখন ভাবতে হবে।
– ব্যাপারটা কী?
– একটু পরেই টের পাবেন।
ওদিকে বক্কর ফিরে গেল চটের বস্তার কাছে। হাত চালিয়ে ভেতর থেকে বের করে আনলো কী যেন! কাছে আনতেই চোখ দুটো চক্্চক করে উঠলো কাশেমের। অসময়ে দু’দুটো রিভলবার হাতে পাওয়া কম কথা নয়; কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো, ভয় দেখিয়ে কাজ সারতে হবে। গুলি নেই এর ভেতর।
কিছু না বলে শুধু তার হাত দুটো ধরে একটু চাপ দিলো কাশেম। একটা অস্ত্র তুলে দিলো শহীদ আলমের হাতে। বক্কর ছুরিটা নিয়ে সতর্ক হয়ে থাকলো। গাড়ি ছুটছে। পাশাপাশি দু’জন- বাদ্্শাখান আর পিয়ারী লাল। চারপাশে জমাট অন্ধকার। পিচ্ঢালা চক্চকে সড়ক ক্রমাগত পিছিয়ে যাচ্ছে। বাদ্্শাখানের নজর সামনের দিকে। ওরা সিগারেট ধরালো।
– হ্যান্ডস আপ।
চকিতে ব্রেক করলো বাদ্্শাখান। দু’জনে মুখ ঘুরিয়ে দেখলো, দু’দুটো রিভলবার তাক করিয়ে আছে তাদের দিকে। বিস্ময়ে হত্বাক বাদ্্শাখান।
– হাত উ-ঠাও।
ধমক দিলো কাশেম। বাদ্্শাখানের দিকে তাকালো পিয়ারী লাল।
– হাত উঠাও জলদি; তা-না’হলে—
রিভলবারের মুখটা গিয়ে ঠেকলো পিয়ারী লালের ঘাড়ে। ইলেকট্রিক শক্ খাওয়ার মতো হাত দুটো ওপরে উঠে গেল তার।
বাদ্্শাখান তোমাকে হাত তুলতে হবে না, তুমি গাড়ি চালাও। শহীদ আলমের কথামতো গাড়ি ঘুরালো বাদ্্শাখান। ওরা তিনজন পাশাপাশি। বক্করের ওপর চোখ পড়তেই মুখটা বিকৃত হয়ে উঠলো বাদ্্শাখানের। দাঁতে দাঁত ঘস্লো সে। বললো, এবার বোঝা গেল- শুয়োরের বাচ্চা কোথাকার।

চুপ! শহীদ আলমের হাতটা আরও নেমে এলো। কাশেম বললো, গাড়ির স্পিড কমাও। আলম ভাই এখনই ওকে শেষ করে দেই; আপনি স্ট্রিয়ারিং হাতে নিন। গাড়ি চলছে দু’পাশে মাঠ আর মাঠ। বক্কর বললো, সামনে গিয়ে বাঁদিকে বাঁক নিতে হবে। বক্করের নির্দেশমতো গাড়ি গিয়ে থামলো থানা কম্পাউন্ডের মধ্যে।
অসময়ে এমন একটা গাড়ি ঢুকতেই ডিউটি ইন্সপেক্টর আর সিপাহিরা বাইরের বারান্দায় বেরিয়ে এলো। কাশেম চিৎকার করে বললো, ইমিডিয়্টেলি এদের অ্যারেস্ট করুন। ঐ হলো বাদ্্শাখান আর পাশে পিয়ারী লাল। এরাই নুরুল হুদার হত্যাকারী।
সঙ্গে সঙ্গে বন্দুক হাতে পুলিশ ঘিরে ফেললো গাড়িটাকে। কাশেম, বক্কর আর শহীদ আলম নেমে এলো গাড়ি থেকে। কাশেম জানতে চাইলো বিজন বাবু কি থানাতে আছেন?
– উনি পুলিশ কোয়ার্টারে রেস্টে আছেন। বললো একজন।
– এখনই খবর পাঠান। বলুন শহীদ আলমকে নিয়ে কাশেম এখনই থানায় পৌঁছেছে।
রাত তখন ভোরের অপেক্ষায়। ওদের লকাপে ঢুকানো হলো। আজকের অপারেশনে বাহাদুর হলো বক্কর। ‘ও’ যদি বাদ্্শাখানের বিপক্ষে বেঁকে না দাঁড়াতো- তা’হলে আমাদের ক্ষমতা কি ওদের পাকড়াও করা।
তখন বক্করকে খোঁজা শুরু হলো। বক্কর চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। কাশেম হাত রাখলো তার কাঁধে। কী-রে এ কথা শুনে তুই খুশি নোস?
– আমার একটা কথা রাখবে?
– কী কথা বল।
– ওই যারা ভেতরে বসে কথা বলছে, তাদের বলে আমার বাবাকে ছাড়িয়ে দিতে পারো?
– কে তোর বাবা?
– তুমি বিশ্বাস করো, আমার বাবা কোনোদিন ওসব কাজে মাথা দেয়নি। আমি আর বাবা বাদ্্শাখানের বাড়িতে ঘর পরিষ্কার করা বাসন মাজার কাজ করি। ওই একটা লোককে মেরে রেললাইনে ফেলে দেওয়ার পর আমার বাবাকে হঠাৎ পুলিশে ধরে। বাবা তখন বাজার করে ফিরছিল। পাছে পুলিশকে বেফাঁস কিছু বলে বসে সেই ভয়ে বাদ্্শাখান লোক পাঠিয়ে বাবাকে হুঁশিয়ার করে দেয়। কোনো কথা ফাঁস হয়ে গেলেই বাদ্্শাখান আমাকে গুলি করে মারবে। পুলিশ আমার বাবাকে অত্যাচার করেছে, মারধর করেছে। শুধু আমার কথা ভেবে চুপ থেকেছে বাবা। এখন তো আমি বাইরে। আর বাদ্্শাখানও হাজতে। ওদের বুঝিয়ে বলো বাবাকে ছেড়ে দিতে।
দাঁড়া-দাঁড়া বলে মাথা নিচু করলো কাশেম। বললো, বাহ খুব ভালো। আমি বিজন বাবুকে গিয়ে বলছি- তোর বাবার নাম কী?
– শমসের ঢালী।
– ঠিক আছে।
কাশেম গিয়ে ঢুকলো বিজন বাবুর ঘরে। সব শুনে বিজন বাবু বললেন, এ আর বেশি কথা কী; কাল সকালেই ওর বাবাকে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। আরে একদিকে এটা আমাদের ভালোই হলো। শমসের ঢালীকে আমি রাজসাক্ষী করে নেবো। ডাকো বক্করকে।
সব শুনে বক্করের দুচোখ ভরে উঠলো আনন্দে-অশ্রুতে।

SHARE

Leave a Reply