Home নিয়মিত ক্যালিগ্রাফির মজা -মোহাম্মদ আবদুর রহীম

ক্যালিগ্রাফির মজা -মোহাম্মদ আবদুর রহীম

সেদিন ছিল জুমাবার। মারইয়াম তার মায়ের সাথে ঢাকায় মেজো চাচ্চুর বাসায় বেড়াতে এসেছে। সকাল এগারোটার দিকে কয়েকজন ছাত্র এলো বাসায়। চাচ্চু তাদেরকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে বসলেন ছবি আঁকার ক্লাস করতে। এটা মানুষের বা কোনো প্রাণী আঁকার ক্লাস ছিল না। মারইয়াম অবাক হয়ে দেখল, ছাত্ররা কী সুন্দর আরবি হরফ দিয়ে মনের মতো ছবি আঁকছে। আসলে সেটা ছিল বাঁশের কঞ্চির কলম দিয়ে হরফ তৈরি আর তার জমিনে রঙ করা। এমনভাবে তারা সেই বিশেষ কলম চালাচ্ছে, যাতে হরফের বাঁকে বাঁকে মোটা চিকন লেখা হচ্ছে। এটা তাকে খুব মোহিত করল। মারইয়াম চিন্তা করল সে যে কলমে লিখে সেটাতে এমন মোটা-চিকন লেখা যায় না। তাহলে এই কলম আলাদা ধরনের নিশ্চয়! বিষয়টি নিয়ে সে চাচ্চুকে জিজ্ঞেস করবে ঠিক করল।

ক্লাসের মধ্যেই জুমার আজান শোনা গেল মহল্লার মসজিদ থেকে। চাচ্চু ক্লাস ছুটি দিয়ে সালাতের তাহদির বা প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। জুমার পরে খাবার টেবিলে বিষয়টি তুলল সে। চাচ্চু হেসে দিয়ে বললেন, মামণি কি ক্যালিগ্রাফির কথা জানতে চাইছো? মারইয়াম বুঝল হরফ দিয়ে ছবি আঁকার ক্লাসটার নাম ক্যালিগ্রাফি। সে মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিলো। চাচ্চু বললেন, মুসলমানদের এক বিশেষ শিল্পকলা আছে, যাকে ক্যালিগ্রাফি বলে। আরবিতে অবশ্য এর নাম ‘খত আল আরাবি’। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিল্পীদেরকে মূর্তি আঁকা ও গড়নে বারণ করেন। শিল্পীরা তখন বেকায়দায় পড়লেন, তারাতো এগুলো করে জীবিকা চালায়! রাসূলুল্লাহ (সা) তখন তাদেরকে মন দিয়ে ক্যালিগ্রাফি করতে বললেন। সেই থেকে মুসলমান শিল্পীরা ক্যালিগ্রাফিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করলেন আর এই শিল্পকলা সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ল। কালের বিবর্তনে বহু অমুসলিম শিল্পীও আরবি ক্যালিগ্রাফি করেছেন। কারণ এই লেখার শিল্প মানুষকে খুব আকর্ষণ করে।
মারইয়াম বলল, চাচ্চু তুমি ঠিকই বলেছো। এই দেখো না, তোমাদের ক্যালিগ্রাফির ক্লাস দেখে আমার খুব আঁকতে ইচ্ছে হচ্ছে। আর আমি কিন্তু এটা খুব মজা করে আঁকতে চাই।

চাচ্চু বললেন, ক্যালিগ্রাফির মজা পেতে হলে মনোযোগ দিয়ে তোমাকে লেখার কৌশলটা রপ্ত করতে হবে। আর লেখার অনেক ধরন আছে, যেমন বাংলাদেশের সুলতানি আমলে ‘বাহরি আল বাঙালি’ নামে একটা শৈলী আছে। যাতে অনেক সুন্দর ক্যালিগ্রাফি আছে শিলালিপি, কুরআন আর মুদ্রায়। এখন এটা আমরা আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি।
মারইয়াম বলল, আরো খোলাশা করে বলো কীভাবে ক্যালিগ্রাফির মজাটা পাওয়া যায়।
চাচ্চু বলল, তুমি যে শৈলীতে ক্যালিগ্রাফি করবে, সেটা ঠিক করে নাও। যে কাগজে সেটা করবে সেখানে ক্যালিগ্রাফির হরফ শব্দ বাক্য সাজানোর বিষয়টাও ঠিক করে নিতে হবে। ক্যালিগ্রাফির চারপাশে কিন্তু তোমাকে হাশিয়া রাখতে হবে।

মারইয়াম বলল, দাঁড়াও দাঁড়াও! হাশিয়া কী?
চাচ্চু মুচকি হেসে বললেন, স্যরি! হাশিয়া মানে মার্জিন। তোমরা লেখার সময় খাতার চারপাশে যে জায়গা রাখো সেটাকে আরবিতে হাশিয়া বলে। আমাদের বাপ-দাদারা কিন্তু হাশিয়া বলতেন। এটা পুরান বাংলায় ব্যবহার হতো, এখন তেমন কেউ বলে না। যাহোক, লেখাটাকে সাজানোর কাজটাই আসল। এমনভাবে করতে হবে যেন হরফের রেখাগুলো একটা ছন্দবদ্ধ হয়ে ভেসে ওঠে। আর এসব তোমাকে গোড়া থেকে একক হরফ, যৌগিক হরফ ও শব্দ বাক্য রপ্ত করার পরে সাজানোতে আসতে হবে।

আরো অনেক কথা আছে। সঠিক বিষয় হলো মজা করে ক্যালিগ্রাফি করতে হলে, মনোযোগ দিয়ে লেখার কৌশল, কলম ধরা ও চালানোর কারিগরি রপ্ত করতে হবে। ক্লাসে ওস্তাদ যেভাবে দেখাবেন, তোমাকে সেটা খুব খেয়াল করে অনুসরণ করতে হবে। প্রতিবার উস্তাদের লেখা দেখে হুবহু লিখতে হবে। এভাবে তোমার কলম দিয়ে লেখাটা সুন্দর ফুটে উঠবে। তখনই তুমি ক্যালিগ্রাফির মজা পেতে শুরু করবে।
মারইয়াম চাচ্চুকে ধন্যবাদ জানাল এমন চমৎকার একটি শিল্পকলার কথা বলার জন্য। সে খুলনায় ফিরে গিয়ে এটা শেখা শুরু করবে বলে ইচ্ছা প্রকাশ করল।

– চিত্রদ্বয় বাংলাদেশের ক্যালিগ্রাফার উস্তাদ মোহাম্মদ আবদুর রহীম এঁকেছেন

SHARE

Leave a Reply