Home নিয়মিত ক্যালিগ্রাফির অ আ ক খ -মোহাম্মদ আবদুর রহীম

ক্যালিগ্রাফির অ আ ক খ -মোহাম্মদ আবদুর রহীম

রাফি তার বড়ো চাচ্চুর বাসায় বেড়াতে এসেছে। খাওয়া-দাওয়া হইহুল্লোড়ের মধ্যে হঠাৎ খেয়াল হলো দেয়ালে কী সুন্দর আরবি হরফের ছবি ঝোলানো! চাচ্চুর বাসায় সে আগেও এসেছে কিন্তু এগুলো তখন এভাবে নজরে পড়েনি। চাচাতো ভাই রায়হানকে জিজ্ঞেস করল, ভাইয়া, এগুলো কীসের ছবি? ভাইয়া বলল, এগুলো ক্যালিগ্রাফি। রাফির কৌতূহল আরো বেড়ে গেল, ভাইয়া ক্যালিগ্রাফি কী? রায়হান বলল, শোনো, হরফ দিয়ে যে আর্ট করা হয় তাই ক্যালিগ্রাফি। তবে আসল ক্যালিগ্রাফি হলো, নিয়ম মেনে বিশেষ ধরনের কলম দিয়ে যে শিল্পকর্ম তৈরি করা হয়। রাফি মাথা দুলিয়ে বলল, আব্বুওতো ক্যানভাসে ছবি আঁকে, স্টিল লাইফ, ল্যান্ডস্কেপ, প্যাটার্ন ডিজাইন আরো কী কী যেন। রাফির কথায় রায়হান সায় দিয়ে বলল, বিভিন্ন ধরনের আর্ট আছে। প্রাচীন কাল থেকে মানুষেরা মনীষীদের বাণী, ধর্মের কথা, এমনকি “মন ভালো হয়” এ ধরনের কথা কিংবা কাউকে স্মরণে রাখার কথা দিয়ে সুন্দর ক্যালিগ্রাফি করেছে। আর মুসলমানেরা কুরআন হাদিসের বাণী দিয়ে এমন এক হরফের শিল্পকলা করেছে, যা অতুলনীয় আর সবার কাছে খুব প্রিয় হয়েছে। রাফি বিজ্ঞের মতো ভাব নিয়ে বলল, বড়ো চাচ্চুর এ ক্যালিগ্রাফিও অনেক সুন্দর! আচ্ছা, ভাইয়া এই ছবিটাতে রঙ দিয়ে যে সুন্দর ক্যালিগ্রাফি করা হয়েছে, এখানে কী লেখা? ভাইয়া বলল, এখানে বিসমিল্লাহ লেখা। আমাদের দেশে প্রাচীন কালে সুলতানি আমলে এক ধরনের শৈলীতে কুরআন লেখা ও অন্যান্য ক্যালিগ্রাফি করা হতো তার নাম- বাহরি আল বাঙ্গালি। এটা সেই শৈলীতে করা হয়েছে, এটা আমাদের ক্যালিগ্রাফির ঐতিহ্য ও গৌরব। রাফি বলল- আলহামদুলিল্লাহ! তাহলে আমাদের দেশীয় ক্যালিগ্রাফি আছে জেনে খুব আনন্দ হচ্ছে। আচ্ছা ভাইয়া, এই ক্যালিগ্রাফির কি আলাদা কোনো ধরন আছে? আছে তো! এই যে এটা কুফি, ওইটা দিওয়ানি। দাঁড়াও তোমাকে কয়েকটি শৈলীর আলিফ দেখাচ্ছি। রায়হান আলমিরা থেকে একটা খাতা বের করে দেখালো, সেখানে অনেকগুলো আলিফ লেখা ভিন্ন আকার ও আকৃতির।

আলিফগুলো দেখে কোনটা কোন শৈলীর আর তা কোথা থেকে এলো সেটা জানতে চাইল রাফি। রায়হানেরও ক্যালিগ্রাফি নিয়ে বেশ কৌতূহল, সে আব্বুর কাছে প্রায়ই বিভিন্ন শৈলী নিয়ে আলোচনা করে। ঘরে কয়েকটা আলমিরা ভর্তি ক্যালিগ্রাফির বই, ক্যাটালগ আছে। এগুলো তার আব্বু বিদেশের প্রদর্শনী ও লাইব্রেরি থেকে সংগ্রহ করেছেন। সে এসব বই পড়ে অনেক কিছু জানতে পেরেছে। রাফিকে সে বলল, এখানে দশটি আলিফ আছে। আমরা বাংলাদেশে অনেক সুন্দর ক্যালিগ্রাফি দেখছি। এর ভেতর সুলুস শৈলীর শিল্পকর্ম সবচেয়ে বেশি। এখানে ডান থেকে বামের আলিফগুলোর প্রথমটি সুলুস শৈলীর। আরবিতে ক্যালিগ্রাফিকে বলে “আল খত্ আল আরাবি”। সুলুস শৈলীর নাম আরবিতে “আল খত্ আল সুলুস”। আর ক্যালিগ্রাফি করতে যে বিশেষ ধরনের কলম ব্যবহার করা হয়, তার নাম “কলম আল খত্”। এই কলম বাঁশের কঞ্চি, নল খাগড়া, কাঠ, প্লাস্টিক কিংবা ধাতব নিবের হয়ে থাকে। এজন্য এদের নামও আলাদা আর লেখার চরিত্রও আলাদা। এখানে আলিফগুলো “কলম তুমার” দিয়ে লেখা হয়েছে। কলম তুমার সাধারণত কাঠ দিয়ে বানানো হয়। এছাড়া কলম বুস বা বাঁশের কঞ্চির কলম দিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্যালিগ্রাফি করা হয় ও মশ্ক বা অনুশীলনী করা হয়। সুলুস শৈলী দশম শতকে ক্যালিগ্রাফির গ্র্যান্ড উস্তাদ ইবনে মুকলার হাতে প্রতিষ্ঠা ও জনপ্রিয়তা অর্জন করে, পৃথিবীর অধিকাংশ জনপ্রিয় ক্যালিগ্রাফি সুলুস শৈলীতে করা হয়েছে। আর এ শৈলীকে “সুলতানুল খুতুত” ক্যালিগ্রাফির বাদশা বলা হয়।

রাফি বলল, ভাইয়া, সুলুস আলিফের পরে লম্বা ও দেখতে একই রকম এটাও কি সুলুস শৈলীর আলিফ। রায়হান বলল, না এটা মুহাক্কাক শৈলীর আলিফ। এই শৈলীটি দেখতে সুলুসের মতো হলেও এর কিছু চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য আলাদা আছে। বারো শতকের দিকে মুহাক্কাক শৈলীতে প্রচুর সংখ্যক ক্যালিগ্রাফি কুরআন লেখা হয়। এরপর এখানে যে আলিফটি রয়েছে, এটা নাসখি শৈলীর আলিফ। ষোলো শতক থেকে এই শৈলীতে সারা পৃথিবীতে কুরআন লেখা হয়েছে, এখনো দুনিয়ার অধিকাংশ কুরআন নাসখিতে লেখা হয়। তারপর ধনুকের মতো বাঁকা যে আলিফটি দেখা যাচ্ছে, এটা দিওয়ানি শৈলীর আলিফ। তুরস্কের ওসমানীয় সুলতানগণ সরকারি কাগজপত্রে লেখার জন্য এ শৈলীটি ব্যবহার করেন। তুর্কি ক্যালিগ্রাফার মুহাম্মদ মুনিফ এই শৈলীটি জনপ্রিয় করেন। এরপর ডানদিকে একটু হেলানো আলিফটি ফারেসি শৈলীর, এর আরেক নাম তালিক শৈলী। ইরানে একে নাস্তালিক বলে। তবে তালিক ও নাস্তালিক শৈলীর মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। এরপরের আলিফটি মুয়াল্লা শৈলীর। ইরানের বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার হামিদ আল আযামি একে জনপ্রিয় করেন। বাংলাদেশে এই শৈলীতে সুন্দর ক্যালিগ্রাফি অনেকে করেছেন। তারপর যে আলিফটি দেখা যাচ্ছে, সেটা বাহরি আল বাঙ্গালি শৈলীর আলিফ। এ সম্পর্কে আগেই বলা হয়েছে। তারপরের আলিফটি মাগরেবি মাবসুত শৈলীর, আর এটা মরক্কো ও এর আশপাশের দেশগুলোতে খুব ব্যবহার হয়। এরপর কুফি মাশরেকি শৈলীর আলিফ। মিসর থেকে ইন্দোনেশিয়ার দেশগুলোতে এই শৈলীতে ক্যালিগ্রাফি করা হয়। সবশেষে যে আলিফটি রয়েছে, এটা কুফি কারামাতি শৈলীর আলিফ। ইরাকের কারামাত অঞ্চলে দশম শতকে এই শৈলীতে বহু কুরআন লেখা হয়েছে।
এছাড়াও আরো অনেক শৈলী আছে, আরেকদিন সেগুলো নিয়ে আলাপ করা যাবে। রাফি এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে ভাইয়ার কথা শুনছিল, সে বলল, আমি বড়ো চাচ্চুর মতো ক্যালিগ্রাফি করবো ইনশাআল্লাহ। ক্যালিগ্রাফি দেখতে আমার খুব ভালো লাগছে। ভাইয়া, পরের বার এসে আরো অনেক কিছু জানবো, শিখবো। আজকে চলি, আল্লাহ হাফেজ।
ব্যবহৃত ক্যালিগ্রাফি দুটি এঁকেছেন বাংলাদেশের
ক্যালিগ্রাফার উস্তাদ মোহাম্মদ আবদুর রহীম।

SHARE

Leave a Reply