Home উপন্যাস ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস অভিযান -দেলোয়ার হোসেন

অভিযান -দেলোয়ার হোসেন

কৃষ্ণপক্ষের চাপ-চাপ অন্ধকার চারিদিকে। তার ওপর নির্জন রাস্তা। বাস থেকে নেমে একটু থমকে দাঁড়াল ছেলেটি। এটাই কি মজমপুরের নির্জন রাস্তা? ঠিক পথেই নেমেছে হয়তো। অনেক দূরে-দূরে মিটিমিটি আলো জ্বলছে। হাঁটা শুরু করল ছেলেটি। একটু এগিয়ে মুন্সী সাহেবের কথা মনে পড়ল। বাঁ দিকে একটি ছোটো খাল। খালটা পার হলেই বিরানভূমি। বড়ো মাঠটা পার হলেই বাগানবাড়ি। পুরনো তিনতলা বাড়ি। বুকভরা সাহস নিয়ে এগিয়ে চললো সে। তারা ভরা আকাশ। মৃদু আলোয় পথ চলতে একটুও অসুবিধা হচ্ছিল না। রাত ১২টায় গিয়ে পৌঁছাল সেই বাড়ির সামনে।
ছেলেটার নাম আবুল কাশেম। হঠাৎ বুকের মধ্যে একটু কেঁপে উঠলো। বাড়িটা দেখলে মনে হয় ভ’তুড়ে। বাড়ির আনাচে-কানাচে অন্ধকারে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে লম্বা-লম্বা গাছ। সেখান থেকে কোয়ার্টার মাইল দূরেই রেলস্টেশন। লোকজন খুব একটা আসে না এদিকে। সবাই জানে ওটা ভূতের বাড়ি। বাড়ির সামনে লোহার গেট। কেউ কোথাও নেই। হঠাৎ দোত্লায় ক্ষীণ একটা আলো দেখতে পেল কাশেম। কাউকে ডাকবে কি না ভাবল। লোহার গেটটায় আলতো করে ধাক্কা দিতেই ক্যাচ করে একটা শব্দ হলো। শব্দটা যেন তার বুকের মধ্যেও বেজে উঠল।

কাশেম খুব সাহসী ছেলে। গোয়েন্দা বিভাগের সবচেয়ে জুনিয়র সে। সম্প্রতি একজন সাংবাদিক ও গোয়েন্দা বিভাগের একজন সিনিয়র অফিসার শহীদ আলমকে সন্ত্রাসীরা গুম করেছে। তবে গুম হওয়ার সাতদিন পর সাংবাদিক নুরুল হুদার লাশ পাওয়া গেছে রেললাইনে- দু’টুকরো অবস্থায়। আসলে তাকে টর্চার করার পর মেরে রাতের অন্ধকারে রেললাইনে ফেলে গেছে। আর শহীদ আলম বেঁচে আছেন না- মারা গেছেন ঠিক বুঝা যাচ্ছে না। সেই খবর জানা এবং সন্ত্রাসীদের আস্তানার সবকিছু নিজের চোখে দেখার জন্য এখানে এসেছে আবুল কাশেম। ছেলেটার বুকের পাটা আছে বলতে হবে। একটা ছুরিও নেই তার সাথে। অথচ সে এসেছে বাঘের খাঁচায় বাঘের সাথে লড়াই করতে। পিঠে ঝোলানো ব্যাগের মধ্যে রয়েছে কিছু জামা-কাপড়।
কাউকে না দেখতে পেয়ে সে বিড়ালের মতো পা ফেলে উঠে গেল দোতলায়। সেখানে অনেকগুলো ঘর। সামনের ঘরের দরজায় ধাক্কা দিলো। ভেতর থেকে বন্ধ। জানালা পথে কাশেম দেখল সে ঘরে আলো জ্বলছে।
– ভেতরে কেউ আছেন?
– একটা যুবক বেরিয়ে এসে সামনে দাঁড়াল। কে তুমি, এখানে কী চাই?
– আমি একজন পথিক। পথ ভুল করে অনেকটা পথ এলোমেলো ঘুরে শেষে এখানে আসা। খুব ক্ষুধা পেয়েছে। তাছাড়া রাতও হয়েছে, একটু বিশ্রাম নেওয়া দরকার।
– এখানে থাকা চলবে না। এতো রাতে তোমার জন্য খাবার আনব কোথা থেকে? তুমি অন্য কোথাও যাও। আধা মাইল হাঁটলে রেললাইন- তুমি বরং সেখানেই যাও।
– অনেক পথ হেঁটেছি, একটু বিশ্রাম চাই।
যুবক ছেলেটি কাশেমের আপাদমস্তক ভালোভাবে নিরীক্ষণ করে শেষে বললো, ঠিক আছে আমার সঙ্গে এসো। পাশের দুটো ঘরের পর একটি ঘর দেখিয়ে বললো, এখানে একটু বিশ্রাম নিতে পার।
লোহার খাট। তার ওপর একটা কালো কম্বল বিছানো। কাশেম তার ক্লান্ত দেহটা এলিয়ে দিলো সেই খাটের ওপর। সে আপন মনেই বললো, এতো বড়ো বাড়ি, চারদিকে জঙ্গল- আর কোনো লোকের সাড়া নেই। এটা কি ভূতের বাড়ি! কাশেম প্রশ্ন করল এ বাড়িতে আর কোনো লোক থাকে না?
– সে সব জেনে তোমার কী লাভ? বিশ্রাম নাও, দেখি তোমার খাবারের কী ব্যবস্থা করা যায়।
যুবকটি দরজার আড়ালে দাঁড়াল। কিছু একটা ভাবল তারপর সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে গেল। এই ফাঁকে কাশেম ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে চারদিকে চোখ বুলাল। তারপর দোতলার অন্য ঘরেও উঁকি দিল। একটা ঘরে একটা টেবিল। তার চারপাশে চারটি চেয়ার। টেবিলের ওপর দুটো সিগারেটের প্যাকেট পড়ে আছে। বুঝে নিলো এখানে আরো অনেকেই আছে। যারা হয়তো লোকচক্ষুর আড়ালে থাকতেই পছন্দ করে। সেখান থেকে দ্রুত ফিরে এলো ঘরে। যুবকটি একটা প্লেটে একটা রুটি আর এক টুকরা মাংস এনে টেবিলে রাখল।
– তোমার নামটা তো জানা হলো না।
– আমার নাম বক্কর। তোমার নাম?
– আমার নাম কাশেম। আবুল কাশেম। কাজের সন্ধানে বেরিয়েছি। একটা যেমন-তেমন কাজ না পাওয়া পর্যন্ত আমার আর বাড়ি ফেরা হবে না। একটা সত্যি কথা বলবে? এখানে আমার কোনো বিপদ হবে নাতো? গত পরশু কাগজে দেখলাম সন্ত্রাসীরা একজন সাংবাদিককে মেরে রেললাইনে ফেলে রেখেছে। আর একজন গোয়েন্দাকে গুম করে রেখেছে। এসব কাজ কেন করছে তারা- টাকার জন্য? আমার কাছে বাবা দুশো টাকার বেশি নেই। এই আমার সম্বল।

এটাই যে সন্ত্রাসীদের আস্তানা সেটা বুঝে গেছে আবুল কাশেম। এখন শহীদ আলম সাহেবের সন্ধান নেওয়ার জন্যই অপেক্ষা। কতদিনে একটা ক্লু পাওয়া যাবে তা নিয়েই ভাবছে সে। মুন্সী সাহেবের বিরাট এক প্রবন্ধ পড়ে এটাই মনে হচ্ছে শহীদ আলম বেঁচে আছেন। তবে কোথায় কীভাবে আছেন তা এক আল্লাহ্ই জানেন। আবার এদেশের পুলিশ এমনই যে, আসল অপরাধীদের ধরতে না পেরে ভালো মানুষদের নাজেহাল করছে। সরকারের কাছ থেকে বাহাদুরিও পাচ্ছে।
– বক্কর এতবড়ো বাড়িতে তুমি একা থাকো- ভয় করে না?
– ভয় করলে ভয়, ভয় না করলে কীসের ভয়। তোমার মতো অনেক মেহমান আসে আবার চলেও যায়। তাদের জন্য রান্না করি। খাবারের মূল্য পাই আবার বক্শিশও পাই।
– তারা কি সবাই ভালো মানুষ? নাকি পলাতক আসামি।
– এতো কথায় তোমার দরকার কী। রাতটা থেকে সকালেই বিদায় হবে।
– যেতে তো হবেই। তুমি চিন্তা করো না। এখানে যে সাহেবরা আসেন তাদের ধরে একটা চাকরির ব্যবস্থা করা যায় না? বলছিলাম তুমি তো অনেকদিন ধরে আছো, তুমি কাউকে কথাটা বললে মনে হয় কাজ হতে পারে।
বক্কর চোখ বড়ো বড়ো করে চেয়ে থাকল। এই সময় বাইরে একটা আওয়াজ হলো। কাশেম কিছু বলার আগেই দরজার কাছ থেকে সরে গেল বক্কর। বাইরে মুখ বাড়িয়ে কাউকে দেখল না কাশেম। পরক্ষণেই তার মনে হলো এ বাড়িতে ঢোকার পর এক বক্কর ছাড়া আর কাউকে তার নজরে পড়েনি। তা’হলে কি এখানে আর কেউ নেই? তা কী করে হয়? একটু আগেই হল ঘরের ছবি তার মনে পড়ল। হয়তো তাকে দোতলায় আনার সময় সবাইকে চোখের আড়াল করে দেওয়া হয়েছে।

চোখে মুখে পানি দিয়ে কাশেম ভালোভাবে লক্ষ করে বুঝলো বক্করের ভাবগতি যেন অন্যরকম। মুখের ওপর একটা ভয় ভয় কৌতূহল। দরজার পাশে দাঁড়াল কাশেম। তারপর খেতে বসল। খাটের নিচে একটা খবরের কাগজ পড়ে ছিল। সে বললো, বক্কর ঐ কাগজটা দেবে? খুব গরম পড়ছে বাতাস করব।
কাগজটা এনে দিলো বক্কর। কয়েকদিন আগের কাগজ। একটা বক্স নিউজের ওপর চোখ পড়লো কাশেমের। খ্যাতনামা গোয়েন্দা নুরুল হুদা অজ্ঞাত আততায়ীর গুলিতে আহত হয়ে রেলওয়ে হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সঙ্গে ছিলেন তার বাল্যবন্ধু শহীদ আলম। তিনিও রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ। পুলিশের ধারণা এই ঘটনার পেছনে স্থানীয় সমাজ বিরোধীদের হাত রয়েছে। কারণ একটা ইংরেজি পত্রিকায় একটি সমীক্ষা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। তার জন্যই হয়তো কোথাও তাকে গুম করে রাখা হয়েছে।
পড়া শেষে বক্করের দিকে তাকাল কাশেম। আপন মনেই বললো, যা দিনকাল পড়েছে- সবখানেই গুম, ডাকাতি, খুন।
– তুমি নিশ্চয়ই কাগজ পড়তে পার না। এখানে লিখেছে একজন গোয়েন্দা অফিসার গুম হয়েছে আর একজন রিপোর্টারকে নাকি মেরে ফেলা হয়েছে।
সেই মুহূর্তে বক্করের মুখটা সাদা হয়ে গেল। কাশেম খেতে খেতে আবার তাকাল বক্করের দিকে। বললো, যে মরেছে তাকে নিয়ে কিছু বলার নেই কিন্তু জলজ্যান্ত একটা লোককে গুম করে রাখা ঠিক নয়।
কাশেমের কথার ভঙ্গিতে একটা জোর ছিল। বক্কর কী জবাব দেবে। সে দরজা ধরে মনের উত্তেজনা চেপে রাখার চেষ্টা করছিল। খুশি হলো কাশেম। সে জানে কারো পেটের কথা বের করে আনতে গেলে প্রথম কাজ হবে সেই মানুষটাকে উত্তেজিত করে তোলা। সে বললো, আমার ভাগ্য ভালো যে তোমাদের মতো ভালো মানুষের কাছে আশ্রয় পেয়েছি।
ধড়াস করে একটা আওয়াজ হলো। কাশেম মুখ ফিরিয়ে দেখল বক্কর জবুথবু হয়ে বসে পড়েছে দরজার গোড়ায়।

কী ব্যাপার কী হয়েছে? এগিয়ে গেল কাশেম। বললো, বক্কর তোমার শরীরটা কি খারাপ? কোনো জবাব নেই বক্করের। কাশেম ভাবল কিছু খারাপ কথা বলেছি কি! বক্কর চুপ। কাশেম অনুতপ্ত গলায় বললো, মনের অজান্তে তোমাকে ব্যথা দিয়েছি কি? ঠিক আছে, আর কিছু বলবো না। মুখ তুললো বক্কর। কাশেম দেখল, তার দু’চোখ জলে মাখামাখি- দৃষ্টিতে যেন আগুন ঝরছে। সে বললো, কে তুমি? কেন এসেছো এখানে?
– আমি তো সব খুলেই বলেছি।
– বাজে ধাপ্পা দিয়েছো সরকার সাহেবকে।
বলেই চাবুকের মত সোজা হয়ে দাঁড়াল বক্কর। তুমি কি ভেবেছো তোমার কথা সবাই বিশ্বাস করেছে?
– সে কি কথা। আমি-
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ঝড়ের গতিতে বের হয়ে গেল বক্কর। কাশেম ভাবল চালটা মনে হয় ভুল হয়ে গেল। লোহার খাটে শুয়ে ভাবতে লাগল কাশেম। তার ধারণা শহীদ আলমকে এ বাড়ির কোথাও আটকে রাখা হয়েছে। আজ রাতের মধ্যে সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে এখান থেকে বেরতে না পারলে ওনাকে আর বাঁচানো যাবে না।

মনটা চঞ্চল হয়ে উঠল। ধড়মড়িয়ে উঠে বসল কাশেম। ভাবল, সলেমান ভাইকে মানা করেছিলাম ওসব চোর ডাকাতদের বিরুদ্ধে কলম না ধরতে। শুনল না আমার কথা। সে বললো, সবার মূলে রয়েছে বাদ্শাখান। সেই চালনা করছে এলাকার চোর গুণ্ডাদের।
– বাদ্শাখান?
– হ্যাঁ বাদ্শাখান। তার একটু অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য ওরা লালায়িত।
– আশ্চর্য! কিন্তু কেন?
– কেন? কারণ তাদের সকল ক্ষমতার জোগানদার এই বাদ্শাখান।
মুন্সী সাহেবও অনেক তথ্য পড়ে শুনিয়ে ছিলেন। কাশেম বলেছিল, দেখছি তুমিও খুব সিরিয়াস হয়ে পড়েছ।
– যা বলছি শোন, আমাদের দেশে বাইরে থেকে অস্ত্রের চালান আসে। সেগুলো রেলওয়ের লোকদের সাহায্য-সহযোগিতায় আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়।
– বলো কী!
হাসলেন মুন্সী সাহেব। চুপ করে ছিল কাশেম। মুন্সী সাহেব বললেন, পুলিশের রিপোর্টে অনেক কিছুই উঠে আসে না। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই সব বুঝতে পারবি। পেঁয়াজ দেখেছিস তো? একটা পেঁয়াজের পক্ষে একগুচ্ছ ঝুরিই স্বাভাবিক।
হঠাৎ ক্যাঁচ করে একটা শব্দ হলো দরজায়। চম্কে উঠে সেদিকে তাকাল কাশেম। দেখল অন্ধকারে নিঃসাড়ে কে যেন ঘরের ভেতর ঢুকল। লোকটা ঘরের মেঝেয় এসে দাঁড়াল। অনেকক্ষণ চেয়ে থাকলো কাশেমের দিকে। তারপর টেবিল থেকে থালা-বাটি গুছিয়ে নিয়ে চলে গেল।

ধড়মড়িয়ে উঠে বসল কাশেম। আলতো পায়ে দরজার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। একরাশ খুশির সঙ্গে একটা ভয় তাকে অনেকক্ষণ অনড় করে রাখল সেখানে। না আর কোনো আওয়াজ আসছে না। আজকের রাতের মতো এখান থেকে সবাই চলে গেছে হয়তো। পা বাড়িয়ে বাইরের বাড়ান্দায় এসে দাঁড়াল কাশেম।
চারদিকে ঘন গাছপালা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। একটা রাতজাগা পাখি কর্কশ গলায় হুমকি ছেড়ে চলেছে বারবার। মুখ তুলল কাশেম। মাথার ওপর কালো আকাশ।
ভাবল এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না। একটু ঘুরে-ফিরে দেখা দরকার। যদি কোনো হদিস পাওয়া যায়। অন্ধকারে দেয়াল ঘেঁষে এগিয়ে চলল সে। পর পর দুটো ঘরে তালা লাগানো। শেষের ঘর থেকে নাসিকা গর্জনের শব্দ কানে এলো। সেখান থেকে সরে এসে একটু এগিয়ে নিচে নামার সিঁড়ি দেখল। পা টিপে-টিপে এগিয়ে চলল কাশেম। একটা হল ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল সে। ঠিক তার পাশের ঘরেই কারা যেন কথা বলছে।
– আমার কাছে এ কাজের কোনো এক্সকিউজ নেই। কী অবস্থায় আমরা আছি তা তোমার অজানা নয়। তাকে তুমি বাড়ির ভেতরে আনলে কী করে?
– এখন বুঝছি আপনার কথাই ঠিক। কিন্তু ছেলেটার হাবভাব দেখে ওসব কথা আমার মনে হয়নি।
– তা হবে কেন। এই বুদ্ধি নিয়ে তুমি টিম কন্ট্রোল করবে?
সেখান থেকে দ্রুত সরে গিয়ে জানালার পাশে অন্ধকারে দাঁড়াল কাশেম। প্রথম গলাটা না চিনলেও দ্বিতীয় গলাটা সরকার সাহেবের এটা ভুল হওয়ার নয়। সরকার বলছে এই ছোড়াটা যে সেই ছোড়াটা এ আপনি ঠিক জানেন? অপর ব্যক্তি বিরক্ত হয়ে বললো, তা কী করে জানব। রিপোর্টারের খুদে চেলা ছিল খবর পেয়েছি সে দু’দিন ধরে নিখোঁজ।
লোকটা গলা চড়াল- তুমি কি জানো সেই ছোকড়ার হাতে আমাদের নাড়ি-নক্ষত্র সব লেখা আছে। সে কি! সরকারের গলায় বিস¥য়! এত কথা আপনি কী করে জানলেন?
উৎকর্ণ কাশেম। উত্তেজনায়।
– বাদ্শাখান না জেনে কোনো কথা বলে না।
– ঠিক আছে, আমি দেখছি ছোড়ার ব্যাগ হাতড়ে।
– থাক, আর কেরামতি করতে হবে না। রিপোর্টটা হাতে এলেই দুটোর সদগতি এক সাথেই করে দেবো।
জানালার পাশ থেকে সরে গেল কাশেম। পরক্ষণেই এক রাশ আলো এসে পড়ল ঘরটার মধ্যে। বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিল সরকার। একটু এগিয়ে যেতেই কয়েকজনের পায়ের শব্দ শুনতে পেল সে। সিঁড়ির তলায় ঘুপচি থেকে মুখ বাড়াতেই দেখতে পেল শহীদ আলমকে। দুটো হাত পিঠমোড়া করে বাঁধা। মাথার এলোমেলো চুল এসে পড়েছে মুখের ওপর। দুটো লোক তাকে হিড়-হিড় করে টেনে নিয়ে আসছে। আক্রোশে ভেতরে-ভেতরে জ্বলতে লাগল কাশেম। সরকার দরজার বাইরে থেকে বললো, কানাই এসে গেছে।
– ঠিক আছে ভেতরে আসতে বলো।
ওরা একদম কাছাকাছি এসে গেছে। কাশেম উবু হয়ে বসে পড়লো সিঁড়ির নিচে। পায়ের দুমদাম আওয়্াজ তুলে শহীদ আলমকে নিয়ে ওরা ভেতরে ঢুকলো। দরজা বন্ধ হয়ে গেল। বাদ্্শাখানের গলা শুনতে পেল কাশেম। সংবাদ পরিবেশনের সাধ মিটেছে নিশ্চয়ই? ভবিষ্যতে আশা করি এমন আগুন নিয়ে আর খেলবেন না।
এ আবার কী কথা বাদ্শাখান। এখনও কি ভবিষ্যৎ আছে লোকটার? কে একজন ভারী গলায় বললো, আজই ওকে নূরুল হুদার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
নূরুল হুদা কোথায়? প্রশ্ন করল শহীদ আলম।
সবাই হেসে উঠল। তারপরই ধমক শোনা গেল বাদ্শাখানের। চুপ কর, বাঁদর কোথাকার।
এর মধ্যেই সিঁড়ির নিচ থেকে বেরিয়ে এসেছে কাশেম। চুপি-চুপি আবার গিয়ে দাঁড়াল জানালার পাশে। একটু ফাঁকে চোখ রাখল। দেখতে পেল বাদ্শাখানকে।
– আর বলবেন না- ঢাকা থেকে দু’জনকে সেফলিই আনা হয়েছিল। কিন্তু আমাদের একটু অসতর্কতার সুযোগে পালিয়ে গিয়েই ট্রেনের তলায় একেবারে দু’ভাগ হয়ে গেল দেহটা।
– কী বললেন?
কাশেম দেখলো, শহীদ আলমের দেহটা থর থর করে কাঁপছে। সে ধপ্ করে বসে পড়লো মাটিতে। রহস্যময় হাসি হাসল সবাই।
– মিথ্যে কথা সে এভাবে মরতে পারে না। তাকে মেরে ফেলা হয়েছে।
বাদশাখান তাকাল অন্য দু’জনের দিকে। মানুষটা বলে কীরে? শুনুন সাহেব নূরুল হুদার মারার কিচ্ছা শুনাতে আপনাকে এখানে আনা হয়নি। গোটা কতক খবর জানার জন্য আপনাকে এখানে আনা হয়েছে।
ভালোয়-ভালোয় বলে দেবেন তা না’হলে …
ধীরে-ধীরে মুখ তুললো শহীদ আলম।
– আপনার আর্টিকেল বের হওয়ার পর আমাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। আমাদের প্রকৃত আসামি কে তার নাম বলুন।
– আমি?
– হ্যাঁ আপনি। যাদের কাছ থেকে আপনি খবর সংগ্রহ করেছেন।
– অসম্ভব। বাদ্শাখানের দিকে তাকালেন শহীদ আলম। তারা আমাকে বিশ্বাস করে মুখ খুলেছে। তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা যায় না।[চলবে]

SHARE

Leave a Reply