Home গল্প সৎ পথের রোজগার -আবুল হোসেন আজাদ

সৎ পথের রোজগার -আবুল হোসেন আজাদ

আরবে বাস করত অনেক আগে এক লোক। নাম তার শেখ ইবনে হারেস। লোকটি ছিল যথেষ্ট ধনী। তার ছিল একটি বড়সড় খেজুরের বাগান। প্রতি বছর তার বাগানে প্রচুর খেজুর হতো। সেই খেজুর বাজারে বিক্রি করে কয়েক বছরের মধ্যে সে ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হলো। কিন্তু এত বড়ো ধনী হওয়া সত্ত্বেও তার অর্থ রোজগার ও ধন সম্পত্তি বাড়ানোর লোভ সংবরণ করতে পারল না। নিজেকে আরো ধনাঢ্য ব্যক্তিতে পরিণত করার জন্য অসৎ পন্থা অনুসরণ করল।

শেখ ইবনে হারেস রাতের আঁধারে প্রতিবেশীদের বাগান থেকে খেজুর চুরি করতে লাগল। সেই খেজুর নিজের খেজুরের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করতে লাগল। এতে করে সে তাড়াতাড়ি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে উঠল। এছাড়াও সে তার আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব বা প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুযোগ পেলেই সম্পদ প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করত। তবে এত কিছুর পরেও সে কারো কাছে কোনদিন ধরাও পড়েনি। ফলে তার পাপের শাস্তিও ভোগ করতে হয়নি কোনদিন। তার এই কুকর্মের জন্য কোনদিন সে নিজেও অনুতপ্ত বা লজ্জিত হয়নি। একবারও চিন্তা করেনি। সে ভেবে বসেছিল যে তার মৃত্যুর পর এই ধনসম্পত্তি তার উত্তরাধিকারী স্ত্রী ছেলে মেয়েরা ভোগ করবে। তারা সুখে শান্তিতে দিন কাটাবে।
এক দিনের ঘটনা। ইবনে হারেসের বাড়িতে একজন ফকির এসে হাজির হলো। সে তার কাছে কিছু সাহায্য চাইল এবং বলল : শেখ হারেস আপনি আমাকে কিছু দান করুন। ফকির আরও বলল : আমি শুনেছি আপনার এই অঢেল ধন সম্পদ সবই অসৎ পথে অর্জন করা। ফকিরের কথায় ইবনে হারেস অসন্তুষ্ট হলো। ফকিরকে সাহায্য না দিয়ে বিদায় করে দিল।

সম্পদের মোহে শেখ ইবনে হারেস এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিল যে তার অন্তর থেকে সকল মানবিক গুণ বিদায় নিয়েছিল। তার অন্তরে ছিল না কোন মানুষের প্রতি দয়া-মায়া-প্রেম-প্রীতি ভালোবাসা।
দিন যায়। এমনি করে যেতে যেতে একবার ইবনে হারেস কঠিন এক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ল। মোটা তাজা সুন্দর শরীর স্বাস্থ্য দিন দিন শুকিয়ে যেতে লাগল। কিছু খেতে পারে না। হেকিম কবিরাজের কোন ঔষধই তার রোগ সারাতে পারল না। যতদিন যায় তত শরীরে অবস্থা খারাপের দিকে যেতে লাগল। স্ত্রী ছেলে মেয়েরা এবার দান খয়রাত শুরু করল। যাতে মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়। আখেরাতে সে যেন ভালো থাকতে পারে। তার এই সব অসৎ পথে উপার্জিত ধন সম্পদের জন্য শাস্তি পেতে না হয়।
ঠিক সেই সময় আগের সেই ফকির আবার ইবনে হারিসের ছেলে মেয়েদের কাছে এসে হাজির হলো এবং বলল : তোমরা আমাকে কিছু দান খয়রাত করো। ফকিরের কথামত স্ত্রী ছেলে-মেয়েরা অনেক দান খয়রাত করতে চাইল। কিন্তু ফকির বলল : আমি এসব দান নিতে পারবো না। তার কারণ এসব ধন সম্পদ সব অসৎপথে অবৈধভাবে অর্জিত। তবে নিতে পারি যদি তোমাদের নিজেদের খেজুর বাগানের খেজুর বিক্রি করা অর্থকড়ি থাকে । অন্য কিছু না। শুনে ছেলে-মেয়েরা অবাক হলো। তারা তাদের পিতার কাছে গিয়ে ফকিরের কথা বলল।

শেখ ইবনে হারেস অতি ধীরে ক্ষীণ কণ্ঠে বলল : সব ধন সম্পদ তো এক সাথে মিশানো। কোনটা সৎ পথের আর কোনটা অসৎপথের তা এখন আলাদা করে তাকে কীভাবে দেবে? তার তো এখন জানা নেই এসব। ছেলে-মেয়েরা ফিরে এসে তার পিতার কথাগুলো ফকিরকে বলল। ফকির বলল : বেশ তাহলে আমি ফিরে যাচ্ছি। এই বলে ফকির ফিরে যেতে উদ্যত হলো। কিন্তু ফকির আবার ঘুরে দাঁড়াল এবং বলল হারেসের হাতে সৎপথে উপার্জিত একটি ধন আছে। সেটি যদি দান করে তাহলে আমি নিতে রাজি আছি। কী সেই ধন? ছেলে-মেয়েরা ফকিরকে বলল। ফকির বলল : তোমাদের পিতার বাঁ হাতের বাজুতে একটি সোনার তাগা বাঁধা আছে। এটিই দিলে আমি নেব।

হারেসের স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েরা গিয়ে ফকিরকে অভিপ্রায়ের কথা জানাল। হারেস তাগাটা খুলে দিয়ে বলল : ফকির সাহেব যদি ওটা নিয়ে খুশি হয় দিয়ে দাও। ছেলে-মেয়েরা তাই করল। ফকির সাহেব খুব খুশি হলো এবং বলল : শেখ ইবনে হারেসের সব অর্থই অবৈধ্য পথে অসৎ পন্থায় অর্জিত। তার একমাত্র বৈধ সম্পত্তি এই তাগাটা নিয়ে আমি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে এর জন্য প্রার্থনা করছি। হে রাহমানুর রহিম, দয়ার সাগর করুণাময়, আপনি হারেসকে রোগ থেকে পরিত্রাণ দিন এবং তাকে সৎপথে থেকে জীবনের বাকি দিনগুলো চলার তাওফিক দান করুন, আমিন। দোয়া করে ফকির চলে গেল তার গন্তব্যে।
ইবনে হারিস ফকিরের দোয়ায় আল্লাহর অনুগ্রহে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠল। আগের মতো শরীর স্বাস্থ্য ফিরে পেল। ইবনে হারেস আর মোটেই দেরি করল না। সে তার অসৎপথের সমস্ত ধন সম্পত্তি গরিব দুঃখী এতিমদের মধ্যে দান করে দিল এবং তওবা করল জীবনে আর কোনদিন অসৎপথে থেকে ইহকাল ও আখেরাতের সুখ শান্তি নষ্ট করবে না। সে বুঝলো আল্লাহর ভয়ানক শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়ার একটি মাত্র পথ সৎপথে থেকে রোজগার করে জীবন যাপন করা।

SHARE

Leave a Reply