Home গল্প অজানা বাড়ি -হাসান রুহুল

অজানা বাড়ি -হাসান রুহুল

মারুফকে উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। শীতের সকালে দূর্বাঘাসের ওপর শিশির কণার মতো চিপ থেকে চোয়াল বেয়ে ঘাম ঝরছে। সামনের দিকে দুই পা লম্বা করে মেলে দিয়ে বসে আছে সে। চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ। শরীরটা শিকড় কাটা লাউ গাছের ডগার মতো নেতিয়ে পড়ছে। তিনমাথার মোড়ের আমগাছের সাথে পিঠ হেলান দিয়ে কী যেন ভাবছে। হাত দুটো ঊরুর ওপর রেখে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে অপলক দৃষ্টিতে। দুই চোখের চাহনি যত দূর যায় ধু ধু পাথার। গ্রীষ্মের খর রোদের তাপ চিক চিক করে ঢেউ খেলছে বাতাসের তালে তালে। চারদিকে সবুজে ঘেরা প্রকৃতি আর বিরান ধানক্ষেত। বাতাসে ভাসে কৃষকের মাড়াই করা ধানের ঘ্রাণ। আঁকাবাঁকা রাস্তার পরতে পরতে অপার ভালোবাসার ছোঁয়া লেগে আছে। বেশ কিছুক্ষণ পরে আড়মোড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালো মারুফ। তারপর আবার গ্রামের রাস্তা ধরে হাঁটা শুরু করলো সে।

অজানা-অচেনা একটা গ্রাম। মাঝে মাঝে কিছু চেনা মানুষ ও আত্মীয়দের সাথে দেখা হয় মারুফের। মারুফের কাছে সব যেন তালগোল লাগছে। কোন কিছুর সাথে কোন ধারাবাহিকতা খুঁজে পায় না সে। আরো কিছু দূর যাওয়ার পর একটা মাটির বাড়ি দেখতে পেল। কাছে গিয়ে একটা ছেলেকে জিজ্ঞেস করলো, ‘এই তুমি আসিফের ভাই না?’ ‘ছেলেটি খুশি হয়ে হাসি মুখে উত্তর দিলো, হ্যাঁ, আমি আসিফের ছোটো ভাই। ভাইয়া তো বাজারে স্টুডিও দিয়েছে।’ ‘আরে ও তো একটা স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের ক্রাইম রিপোর্টার ছিল। সাংবাদিকতা ছেড়ে দিয়ে আসিফ তাহলে এই কাজ করছে।’ বিড়বিড় করে মনে মনে বলছে সে।

মারুফ তাকে বলল, আমি বাড়ি ফিরে যাওয়ার পথ খুঁজতেছি। পথ দেখিয়ে দেবে? ছেলেটি তাকে হাত দিয়ে ইশারা করে দূরের একটি পথ দেখিয়ে দিলো। সেই পথ ধরে কিছু দূর যাওয়ার পর মারুফ একটু দাঁড়ালো। তার কাছে এলোমেলো লাগছে ছেলেটির দেখানো রাস্তাটি। এটাই কি সঠিক পথ? মারুফ দোদুল্যমানতায় ভুগছে। অগত্যা ছেলেটির সেই দেখানো পথ দিয়ে সামনের দিকে আবার হাঁটা শুরু করলো সে। কিন্তু তার বাড়ির পথ খুঁজে পেল না। আরো কিছুক্ষণ সামনে এগোনোর পরেই সে একটা গ্রামের ভেতর ঢুকে গেল। ছোটো ছোটো পাড়ার সমন্বয়ে একটি বড়ো গ্রাম। সাজানো গোছানো একটি গ্রাম। গাছগাছালি দিয়ে ঘেরা সবুজ গ্রাম। মেঠোপথ দিয়ে গ্রামের ভেতর হাঁটতে লাগলো মারুফ।
তার আপনজনদের সাথে দেখা হলো। একে একে অনেক পরিচিত মানুষের সাথে দেখা হলো। কিছুক্ষণ পরে মারুফ বুঝতে পারলো এটা তার আত্মীয়দের গ্রাম। সে দেখতে পেলো, রাস্তার পাশে তার ছোটো মামা মুখ ভার করে বসে আছে। কথা বলছে না। মারুফ ভাবছে, ‘এই পথ দিয়েই তো আমার বাড়ি ফেরার রাস্তা কিন্তু কেন বাড়ি ফেরতে পারছি না।’

গ্রামের সামনে ধানের ক্ষেত। পাশে একটি জমিতে কোনো ফসল লাগানো হয়নি। ফাঁকা পড়ে রয়েছে। ঐ জমির পাশ দিয়েই একটি রাস্তা গ্রাম থেকে বাহির হয়ে চলে গেছে অন্য গ্রামে। মারুফ তার ছোটো মামাকে সাথে নিয়ে জমির আল পথ দিয়ে হেঁটে হেঁটে ঐ পতিত জমিতে গেল। সাথে কিছু জিনিসপত্র ও সরঞ্জামাদি সংগ্রহ করে নিলো। জমির চার পাশে বাঁশের খুঁটি গেড়ে দিলো। বাঁশ আর এক টুকরো কাপড় দিয়ে মেহরাফ তৈরি করলো। উৎফুল্ল দুটি প্রাণ আন্তরিকতার সাথে নিরলসভাবে কাজ করছে। একটি মহৎ কাজ। যে কাজের শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। মারুফ যতই কাজ করছে আনন্দে তার বুক ততই ভরে উঠছে। মারুফের কপাল বেয়ে ঝরে পড়া চিকচিক ঘামের বিন্দু দিয়ে প্রকাশ পায় সেই অন্তহীন আনন্দ।

কিছুক্ষণ পরে আসরের আজান দিল মারুফ। কোথা থেকে যেন একজন হুজুর চলে এলো। পরনে তার সাদা কাপড়ের জোব্বা। মাথায় কালো কাপড়ের পাগড়ি। গাল ভর্তি কাশফুলের মতো শুভ্র দাড়ি। দাড়ি ঝুলে বুক পর্যন্ত এসেছে। পরিষ্কার ও পরিপাটি একটি মানুষ। মনে হলো তিনি দূরে কোথা থেকে আসলেন। কিন্তু তাঁকে দেখে ক্লান্ত মনে হচ্ছে না। সতেজ একটি চেহারা। তার মুচকি হাসিতে ঝরে পড়ছে পবিত্রতার দ্যুতি। তাঁর চাহনিতে ঝরে পড়ছে প্রশান্তির আমেজ।
এই হুজুরের ইমামতিতে মারুফ ও তার ছোট মামা আসরের নামাজ আদায় করলো। পাশে একজন লোক জামায়াতে শরিক না হয়ে একাকী নামাজ পড়লো এবং বের হয়ে গেল। কেন সেই লোক জামায়াতে শরিক হলো না তা মারুফের অজানাই রয়ে গেলো। আসরের নামাজ দিয়েই মারুফ মসজিদটির উদ্বোধন করলো।

এক-দুই জন করে সেখানে মানুষ জমায়েত হতে শুরু করলো। সবাই উৎসাহ দিতে লাগলো। দেখতে দেখতে সেখানে তার মা-বাবা, বোনসহ আরো অনেক পড়শি চলে এলো। সবাই মারুফের কাজে খুশি। মারুফের মা তাকে বুকে টেনে নিলো। সময়ের ব্যবধানে সেখানে একটা উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হলো।
মারুফ বাড়ি ফেরার জন্য পেরেশান। কোন বাড়িতে ফিরে যাবে সে নিজেও জানে না। কিন্তু তাকে বাড়ি ফিরে যেতে হবে। মারুফের মা-বাবা এবং আত্মীয়-স্বজন সবাই এখন উদ্বিগ্ন মারুফকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য।

সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ধোঁয়াশা অন্ধকার চারদিকে ছেয়ে পড়ছে। মারুফ হুজুরকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না তাঁকে। অগত্যা মারুফ চিল্লায়া হুজুর হুজুর করে ডাকছে। কিছুক্ষণ ডাকার পর দূর থেকে হুজুরের কণ্ঠের আওয়াজ ভেসে এলো মধুর সুর হয়ে। হুজুর বলছেন, ‘আমার নাম হুজুর নয়, আমার নাম সোনালি ডানার চিল।’ এই নাম শুনে সবাই আশ্চর্য হয়ে গেল। তবুও মারুফ জোরে আওয়াজ করে বলছে, হুজুর আমাকে আপনার সাথে নিয়ে চলেন, আমি বাড়ি ফিরে যাবো।

হুজুর ফিরে এলেন মারুফদের কাছে। মারুফের মা-বাবাসহ সবাই তাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হুজুরের সাথে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য বিদায় দিলো। মারুফ আর পিছন ফিরে তাকালো না। সে শুধু সামনের দিকে হেঁটে চলছে।
মাঠের পর মাঠ, দিগন্ত জোড়া মরুভূমি, চারপাশে শুধু বালি আর বালি। তিন পা এগোলে এক পা পেছনে যেতে হয়। বালির মধ্যে হেঁটে চলা কষ্টের। পথ এগোয় না। বালির পথ শেষ হলে বাঁশঝাড়। তারপর বিশাল বন-জঙ্গল। তখন সকাল পেরিয়ে দুপুর। মারুফ হুজুরের সাথে চলছে আর চলছে বাড়ি ফেরার অদম্য আগ্রহ নিয়ে। হুজুরের সাথে পথিমধ্যে কিছু কথা হলো মারুফের।

অবশেষে হুজুর একটি বাড়ির উঠানে গিয়ে থামলো। মারুফকে বললো, ‘আমার বাড়ি আমি পেয়েছি। এটাই আমার বাড়ি। তুমি তোমার বাড়ির দিকে এগিয়ে চলো।’ মারুফ বিপদে পড়ে গেল। দুশ্চিন্তায় তার কপাল কুঁচকে গেল। পুশ করা স্যালাইনের ফোঁটার মতো টিপ টিপ করে মারুফের পিঠ বেয়ে ঘাম ঝরতে লাগলো। মারুফের বেগতিক অবস্থা দেখে হুজুর তাকে পথ দেখে দিলো। সেই পথ বন্ধুর। মারুফ তবুও সামনে এগিয়ে চলল তার অজানা বাড়ি ফেরার জন্য।

SHARE

Leave a Reply