Home বিশেষ রচনা শিশুদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) -মুশাররফ আনসারী

শিশুদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) -মুশাররফ আনসারী

পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা)। পনেরো শ’ শতাব্দী পূর্বে গোটা আরব সমাজ যখন জাহেলিয়াতের অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, অসভ্যতার চরম সীমায় পৌঁছেছিল সমাজব্যবস্থা, ঠিক তখন বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ আবির্ভূত হয়েছিলের বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা)। তার আগমনে ধন্য হয়েছিল মানবসভ্যতা, অন্ধকারের ঘনঘটা দূর করে গোটা পৃথিবীকে হেরার আলোয় উদ্ভাসিত করেছিলেন তিনি। সংঘাতপূর্ণ আরবের শান্তির বার্তা নিয়ে এসেছিলেন প্রিয় নবী।

প্রিয় নবী ছিলেন অনুপম চরিত্রের অধিকারী। রাসূলুল্লাহ (সা) এর গোটা জীবনই মানবজাতির জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। সকল বয়সী মানুষের কাছেই রাসূল (সা) ছিলেন অত্যন্ত প্রিয়। জীবনের সব বয়সে তিনি ছিলেন অনন্য, সমাজের সব বয়সের মানুষের মন তিনি জয় করেছিলেন। বিশেষ করে শিশুদের কাছে রাসূল (সা) ছিলেন অত্যন্ত আপনজন। শিশু মুহাম্মাদ থেকে রাসূল মুহাম্মাদ সব বয়সেই তিনি ছিলেন শিশুদের প্রিয় বন্ধু। তিনি শিশুদের ভীষণ ভালোবাসতেন আর শিশুরাও ছিল নবীর পাগল। তারা নবী (সা) কে দেখলে দৌড়ে আসতো, প্রিয় নবীকে জড়িয়ে ধরতো, প্রিয় নবীর স্নেহের পরশ নিতো।
জাহেলি আরবের রীতি ছিল কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়া। তারা কন্যাশিশুকে নিজের জন্য অমঙ্গল মনে করতো, তাই কন্যাশিশুর জন্ম হলে নিজ শিশুকন্যাকে জীবন্ত কবর দিতে দ্বিধা করতো না পিতা। এমন জাহেলিয়াতের তীব্র নখরাঘাত থেকে সমাজকে মুক্ত করেছিলেন প্রিয় নবী (সা)। তিনি মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেই শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, কন্যাশিশু হত্যা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। কন্যাদের মর্যাদার আসনে সমাসীন করেন। শুধু তাই নয়, রাসূলুল্লাহ (সা) কন্যাশিশুর পিতা-মাতাকেও ভাগ্যবান পিতা-মাতা বলে সম্বোধন করেছেন।

শিশুদের সঙ্গে রাসূল (সা) এর ব্যবহার ছিল স্নেহপূর্ণ, কোমল এবং বন্ধুসুলভ। তিনি তাদের হাসি আনন্দে যোগ দিতেন। ছোটোদের চপলতায় তিনি কখনও অসন্তুষ্ট কিংবা বিরক্ত হতেন না। তাদের সঙ্গে সবসময় হাসিমুখে কথা বলতেন তিনি। শিশুরা রাসূল (সা) এর কাছে এলে নিজেদের সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে যেতো।
কোনো এক স্নিগ্ধ সকালে মদিনার অলিগলি শিশুদের প্রাণচাঞ্চল্য ও কোলাহলে মুখরিত ছিল। রাস্তার এক পাশ থেকে অন্য পাশে তারা ছুটোছুটি করছিল। কচিকাঁচা শিশুদের হাসির কলরোল যেন গোটা মদিনা শহরেই ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। শিশু-কিশোরদের কোলাহলের মধ্যেই শোনা গেলো উটের ঘণ্টার শব্দ। এ ঘণ্টার শব্দে তারা বুঝতে পারলো দূর থেকে শহরের দিকে এগিয়ে আসছে একটি কাফেলা। হ্যাঁ, কোনো এক সফর থেকে মদিনায় ফিরছেন বিশ্বনবী ও তাঁর সাহাবীদের একটি দল। মহানবীর কাফেলা শহরের দিকে আসছে এটা দেখতে পেয়ে শিশুরা খেলাধুলা বন্ধ করে দিলো।

প্রিয় নবীর আগমনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলো। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, কোনো কিছুই মদিনার শিশুদের খেলাধুলা থেকে বিরত রাখতে পারতো না কিন্তু প্রিয় নবীজিকে দেখলেই তারা খেলা ভুলে যেতো। রাসূলের কাফেলা যখন শহরে ঢুকে পড়লো তখন শিশুরা আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে রাসূল (সা) এর দিকে ছুটে গেল। ভ্রমণে ক্লান্ত হওয়া সত্ত্বেও নবীজি শিশুদের জন্য থামলেন এবং শিশুদের তাঁর দিকে আসার জন্য সাহাবীদেরকে পথ ছেড়ে দিতে বললেন। ছোট্ট শিশুরা রাসূল (সা) কে জড়িয়ে ধরলো, আর কেউ কেউ খুশিতে মত্ত হয়ে তাঁর চারদিকে পাখির মতো ঘুরতে লাগল। রাসূলের ক্লান্তির কথা চিন্তা করে সাহাবীরা শিশুদেরকে বাধা দিতে চাইলেন কিন্তু রাসূল (সা) তাঁদেরকে তা করতে দিলেন না, বরং তিনি অত্যন্ত দয়ার্দ্রভাবে ওদের সাথে আলিঙ্গন করলেন।

বিশ্বনবীর শিশু সাহাবী আবু নায়ীম (রা.) দূরে থেকে এ দৃশ্য তাকিয়ে দেখছিল, কিন্তু অন্যান্য শিশুদের ভিড়ে তিনি রাসূলুল্লাহর সাথে আলিঙ্গনের সুযোগ পাচ্ছিলেন না। এমন সময় রাসূলুল্লাহ মিষ্টি হাসি হেসে তার দিকে তাকালেন, তিনি এগিয়ে এলেন এবং তাঁর দু’হাত বাড়িয়ে দিলেন, তাকে কোলে তুলে নিলেন, আবু নায়ীমের কপালে চুমু দিলেন এবং পিঠ চাপড়িয়ে দিলেন। এমনিভাবেই রাসূল (সা) সবসময় শিশুদের আপন করে নিতেন।

একদিন প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) খেতে বসেছিলেন। কিন্তু খানা তখনও শুরু করেননি। উম্মে কায়েস বিনতে মুহসিন (রা.) তার শিশুপুত্রটিকে কোলে করে রাসূলের সাথে দেখা করতে আসলেন। শিশুটিকে দেখে রাসূল (সা) তার দিকে এগিয়ে এলেন। পরম আদরে কোলে তুলে নিয়ে খাবারের জায়গায় গিয়ে বসলেন। শিশুটি নবীজির আদর পেয়ে তাঁর কোলেই পেশাব করে ভিজিয়ে দিল। নবীজি একটুও বিরক্ত হলেন না, বরং মুচকি হাসলেন। তিনি পানি আনার জন্য একজনকে বললেন। পানি আনা হলে যে যে জায়গায় পেশাব পড়েছিল সেখানে পানি ঢেলে দিলেন। কখনোই রাসূল (সা) শিশুদের প্রতি বিরক্ত হতেন না। প্রিয় নবী শিশুদের আদর করে কাছে বসাতেন, গল্প, ছড়া, কবিতা শোনাতেন। ছোটোদের দেখলে আনন্দে নবীজির বুক ভরে যেত। তিনি তাদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরতেন।

মহানবী (সা) বলেছেন, ‘‘যারা আমাদের ছোটোদেরকে আদর করে না এবং আমাদের বড়োদেরকে সম্মান করে না, তারা আমাদের আদর্শের অনুসারী নয়।’’ মহানবী (সা) দুনিয়ায় এসেই বন্ধুত্ব করলেন ছোটোদের সাথে। তাঁর বন্ধু হলেন আলী (রা), খালিদ বিন অলিদের মতো ছোট্ট শিশু-কিশোররা, তাদের নিয়ে তিনি কিশোর বয়সে গঠন করেন ‘‘হিলফুল ফুজুল।’’
রাসূল (সা) ছিলেন শিশু-কিশোরদের খেলার সাথী, তিনি শিশুদের খুব আদর করতেন। খাবার তুলে দিতেন তাদের মুখে। কোলে তুলে নিতেন। আদর করে চুমু খেতেন। একবার নবীজি তার নাতি হাসান (রা) কে আদর করে চুমু খাচ্ছিলেন। তা দেখে হযরত আকবা ইবনে হারিস নবীজিকে বললেন, ‘ওগো নবী (সা) আপনি কি এমনিভাবে শিশুদের আনন্দ দান ও আনন্দ উপভোগ করেন? আমি তো আমার ছোটো শিশু-সন্তানদের এত আদর করি না।’ নবীজি তার জবাবে বললেন, ‘‘তোমার অন্তর থেকে আল্লাহ যদি মমতা তুলে নিয়ে থাকেন, তার জন্য তো আমি দায়ী নই।” নবীজি বলেছেন, “যে ব্যক্তি শিশু-কিশোরদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করে না, সে আমার উম্মত নয়।”

একদিন রাসূল (সা) একদল শিশুর সঙ্গে আনন্দ করছেন। শিশুরাও নবীজিকে ঘিরে খুশিতে মেতে ওঠে। এমন সময় সোখানে এক বেদুঈন এসে উপস্থিত হলো। সে বললো, ‘শিশুদের নিয়ে এমন আমোদ-আহলাদ করা আমার পছন্দ নয়।’ রাসূলের হাসি-খুশি-মুখখানি মলিন হয়ে গেল। তিনি শুধু বললেন, “যে ব্যক্তির হৃদয়ে মায়া নেই, আল্লাহ যেন তাকে দয়া করেন।”
প্রিয়নবী শিশুদের সাথে রসিকতাও করতেন। হযরত আনাস (রা)-এর ছোট্ট ভাই আবু উমায়েরের একটি পাখি ছানা ছিল, পাখিটির নাম ছিল নুগায়ের। সে পাখিটি পালন করতো, সবসময় পাখির ছানাটির সাথে খেলা করতো। মাঝে মধ্যে রাসূল (সা) তাকে এ খেলায় সঙ্গ দিতেন। হঠাৎ একদিন পাখির ছানাটি মারা যায়, এতে উমায়েরের খুব মন খারাপ হয়। রাসূল (সা) তখন উমায়েরকে ডেকে সান্ত¡না দেন, তার মন ভালো করে দিতে তার সাথে কৌতুক করে কবিতার ছন্দে বলেন: “হে আবু উমায়ের, কী হলো নুগায়ের?” রাসূল (সা) এর মুখনিঃসৃত এ কথা শুনে উমায়েরের মন ভালো হয়ে যায়।

ঈদের দিন। সবাই ঈদগাহের দিকে চলেছে, রাসূল (সা)ও যাচ্ছেন ঈদগাহে। হঠাৎ তিনি দেখলেন দূরে গাছের নিচে একটি বাচ্চা ছেলে মন খারাপ করে বসে আছে। তিনি বাচ্চাটির কাছে এগিয়ে গিয়ে বললেন: তোমার মন খারাপ কেন? ছেলেটি জানালো তার বাবা-মা নেই, সে এতিম। আজকে ঈদের দিনে সবাই সেজেগুজে ঈদগাহে যাচ্ছে, অন্যসব বাচ্চারা আনন্দ করছে কিন্তু তাকে সাজিয়ে দেওয়ার কেউ নেই! তাই সে ভীষণ মন খারাপ করে আছে। রাসূল (সা) তাকে কোলে তুলে নিলেন, আদর করে তার কপালে চুমু দিলেন, তারপর মা আয়েশার ঘরে তাকে নিয়ে গেলেন। হযরত আয়েশা (রা) তাকে গোসল করিয়ে, নতুন জামা পরিয়ে চোখে সুরমা লাগিয়ে দিলেন। বাচ্চাটি তো খুব খুশি! প্রিয় রাসূলুল্লাহর সাহচর্য পেয়ে সে যেন ফিরে পেলো তার মা-বাবাকে। নিমিষেই ভুলে গেল পিতা-মাতা হারানোর বেদনা। অন্য ছেলেদের সাথে আনন্দে মেতে সেও ছুটে গেল ঈদগাহে।

শিশু হাসান আর হোসেন। হযরত আলী ও ফাতিমা (রা) এর প্রিয় দুই পুত্র। তাদের নানা ছিলেন বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা)। তিনি হাসান হোসেনকে খুব ভালোবাসতেন, তারাও প্রিয় নানাকে অত্যধিক ভালোবাসতো। একদিন দুই ভাই নানার পিঠে চড়ে বসেছে, নানাকে বলছে ঘোড়ার মতো দুলতে। যেই কথা সেই কাজ! প্রিয় নাতিদ্বয়ের ইচ্ছা কি অপূর্ণ রাখা যায়? রাসূল (সা) ঘোড়া সেজে বসলেন আর নাতিরা তার পিঠে বসে হেলে দুলে আনন্দ করছে। এমন সময় হযরত উমর (রা) হাজির। তিনি এ ঘটনা দেখে বিস্মিত হলেন। হাসান হোসেনকে উদ্দেশ করে বললেন: তোমরা সত্যিই ভাগ্যবান, এমন ঘোড়ার পিঠে চড়ার সৌভাগ্য ক’জনের হয়!

নবী (সা) যখন নামাজ পড়তেন, রুকু-সিজদার সময় হাসান হোসেন প্রিয় নানার পিঠে চড়ে বসতো। গলা ধরে ঝুলে পড়তো আর দুষ্টুমি করতো। রাসূল (সা) নামাজের মধ্যে এক হাত দিয়ে তাদের ধরে রাখতেন যেন তারা পড়ে না যায়। তারপর নামাজ শেষে তিনি হাসান হোসেনকে নামাজে দুষ্টুমি না করার পরামর্শ দিয়ে তাদের সাথে নিয়েই আবার নামাজে দাঁড়াতেন। নিজেই তাদেরকে নামাজের প্রশিক্ষণ দিতেন। তিনি শুধু হাসান হোসেনের নানা ছিলেন না, তিনি ছিলেন তাদের শিক্ষকও।

এমনিভাবেই শিশুদের স্নেহ করতেন প্রিয় নবী। তার পরশে শিশুরা নিরাপত্তার চাদরে আবৃত হয়েছিল। শিশুকন্যা হত্যার রীতিকে পরিবর্তন করে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক শিশুবান্ধব সমাজ। শিশুর জন্য হ্যাঁ বলুন- শিশু অধিকার রক্ষার প্রশ্নে দুনিয়াব্যাপী আজ এই স্লোগানটি উচ্চারিত হচ্ছে। রাসূল (সা) আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে শিশুদের প্রতি সেই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে গেছেন।

SHARE

Leave a Reply