Home আইটি কর্নার কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম কারণ, লক্ষণ ও প্রতিরোধ -তাহের ফারুক

কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম কারণ, লক্ষণ ও প্রতিরোধ -তাহের ফারুক

কম্পিউটার, মোবাইল, ট্যাবলেট বা আইপ্যাড। এগুলো চেনে না এমন মানুষ বোধ হয় বর্তমান দুনিয়ায় নেই। কোনো না কোনোটি আছে প্রত্যেকেরই। প্রয়োজন থেকে বিনোদন সবকিছুই এখন এগুলোতে। তবে সুবিধার পাশাপাশি অসুবিধাও একদম কম না। এগুলোর মাধ্যমে অনেক শারীরিক ও সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তেমনই এক শারীরিক সমস্যার নাম কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম। দীর্ঘক্ষণ ধরে কম্পিউটার বা অন্যান্য এ জাতীয় ডিসপ্লে ডিভাইসে কাজ করলে ভিশনে বা চোখে যে সমস্যাগুলো দেখা দেয় তার সমষ্টিকে কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম বলে।

কম্পিউটারের বহুমাত্রিক ও অতি ব্যবহারের ফলে এই সমস্যা তৈরি হয়। একজন মানুষ সাধারণত প্রতি মিনিটে ১৫ থেকে ২০ বার চোখের পলক ফেলে। তবে কম্পিউটার ব্যবহারের সময় এটা ৬৬ শতাংশ পর্যন্ত কম হয়। এ সময় সচরাচর মনিটরে টানা তাকিয়ে থাকায় পলক কম পড়ে। কিন্তু চোখের পলক পড়া খুবই জরুরি। কারণ, এতে চোখ আর্দ্র ও পরিষ্কার থাকে এবং অক্সিজেনের সরবরাহ চালু থাকে। তা ছাড়া অল্পের জন্য হলেও চোখ ও মস্তিষ্ক বিরতি পায়। অত্যন্ত উজ্জ্বল মনিটরের কারণেও চোখের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। সাধারণভাবে আমরা যখন আমাদের চোখটা কুঁচকে কম্পিউটারের স্ক্রিনে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করি তখন চোখের পেশি ও স্নায়ুর ওপর ভীষণ চাপ পড়ে। এর ফলে আমাদের চোখ খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এছাড়া এ সমস্যার অন্যতম কারণ হলো- একটানা এক দিকে ঘাড় কাত করে বা সোজা করে রাখা। এ জন্য ঘাড়ের পেশিতে রক্ত চলাচল কমে যায় এবং ঘাড় শক্ত হয়ে যায়। তাই ঘাড়ে-মাথায় ব্যথা করে। তবে শুধু ঘাড় মাথা আর চোখেই সমস্যা আটকে থাকে না, পিঠে, কাঁধে আর হাতেও ব্যথা করে। ‘কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম’ হলে চোখে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হতে পারে। যেমন- চোখ জ্বালাপোড়া, চোখের শুষ্কতা, চোখে ঝাপসা দেখা ও মাথা ব্যথা। কখনো কখনো চোখ লাল হয়ে পানি পড়ে, চোখে চুলকানি হয় ও চোখে করকর করছে কিছু একটা, এমন ভাব দেখা দেয়। কম্পিউটার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের কাছাকাছি থাকলে এর ঠান্ডা বাতাসে চোখ আরও শুকিয়ে যায়।

কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম কোনো স্থায়ী রোগ নয়। একটু সচেতন হলেই এ সমস্যা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। এ থেকে মুক্তি পেতে করণীয় বিষয়গুলো হলো-
– চোখ থেকে স্ক্রিনের দূরত্ব অন্তত ২ ফুট রাখা।
– মনিটর ৪-৮ ইঞ্চি চক্ষু লেভেলের নিচে রাখা।
– চোখের আরামকে প্রাধান্য দিয়ে স্ক্রিনের ব্রাইটনেস ও কনট্রাস্ট পরিবর্তন করে সহনীয় মাত্রায় রাখা।
– অক্ষরের বড়ো ফন্ট ব্যবহার করা।
– চোখের পলক নিয়মিত ফেলা। এজন্য মনিটরের আশপাশে কোথাও লিখে রাখা যায়।
– বসার স্থান আরামদায়ক হওয়া।
– মাজা ও ডরসাল স্পাইন সোজা করে বসা।
– প্রায়ই বিরতি নেওয়া। এক্ষেত্রে ২০ : ২০ : ২০ নিয়ম মেনে চলা যায়। অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট পরপর ডিসপ্লে থেকে অন্তত ২০ ফুট দূরে কোথাও ২০ সেকেন্ডের জন্য তাকিয়ে থাকতে হবে।
– খুব ভালো হয় উঠে দাঁড়িয়ে সামান্য হাঁটাহাঁটি করলে।
– সবুজের দিকে তাকালে চোখের আরাম হয়। এ ক্ষেত্রে কম্পিউটারের পিছনের দেওয়াল বা পর্দা যদি সবুজ রঙের হয় তা হলে খুবই ভালো হয়।
– কিছুক্ষণ কাজ করার পর উঠে গিয়ে চোখে পানি দেওয়া।
– মাঝে মাঝে ঘাড় ও কাঁধের ব্যায়াম করা।
– ঘরে পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত করা কিংবা কম্পিউটারের অবস্থান এমন স্থানে করা যাতে মনিটরে আলোর প্রতিফলন কমানো যায়।
– ঘুমানোর আগে কম্পিউটারসহ অন্যান্য ডিসপ্লে ডিভাইস ব্যবহার না করা।
– চল্লিশোর্ধ্ব বছর বয়সীরা কম্পিউটারে কাজ করার সময় প্রোগ্রেসিভ বাইফোকাল চশমা ব্যবহার করা উচিত।
– শুষ্ক হলে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে
কৃত্রিম চোখের পানি ব্যবহার করা।
– বেশি সমস্যা হলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া।
যারা দিনে গড়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা কম্পিউটারে কাজ করে, তাদের মধ্যে প্রায় ৯০% এই সমস্যায় ভুগছে। এদের মধ্যে আবার বেশির ভাগের বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছর। এই ব্যাপারটা খুব গুরুতর নয় ঠিকই কিন্তু লাগাতার সমস্যায় দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে যদি সময় থাকতে অভিভাবক সচেতন না হন তাহলে বাচ্চাদের টেরা হয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা থাকে। তা ছাড়া বাচ্চারা বারবার চোখে হাত দিয়ে ফেলে বলে সংক্রমণের আশঙ্কা আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই বাবা-মায়েদের এই বিষয় সচেতন থাকতে হবে। দেখতে হবে বাচ্চারা যেন অকারণে দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটারের সামনে বসে না থাকে। আর যদি মনে হয় শিশুর চোখের সমস্যা হচ্ছে, তাহলে সময় নষ্ট না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

SHARE

Leave a Reply