Home খেলার চমক রেকর্ডের বরপুত্র ব্রায়ান লারা -আবু আবদুল্লাহ

রেকর্ডের বরপুত্র ব্রায়ান লারা -আবু আবদুল্লাহ

গত কয়েক সংখ্যা ধরে তোমাদের জানাচ্ছি নব্বই দশকের সেরা খেলোয়াড়দের গল্প। তারই ধারাবাহিকতায় আজ জানাবো প্রিন্স অব ত্রিনিদাদ খ্যাত ক্রিকেটার ব্রায়ান লারার গল্প। লারাকে বলা হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের সোনালি যুগের শেষ তারকা। এক সময়ে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজ যখন ক্রমশ জৌলুশ হারিয়ে নিজেদের ছায়া হতে শুরু করে সে সময়টাতেই এই দলে খেলেছেন লারা। তাই অনেক সময় তাকে একাই লড়তে হয়েছে প্রতিপক্ষের বিপক্ষে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের হয়ে ব্রায়ান লারার ওয়ানডে অভিষেক ১৯৯০ সালের নভেম্বরে পাকিস্তান সফরে। একই সফরে টেস্ট ক্রিকেটেও অভিষেক হয় তার। শুরুতে বছর দুয়েক তিনি খুব একটা সুবিচার করতে পারেননি প্রতিভার প্রতি। প্রথম আলোচনায় আসেন ১৯৯৩ সালের জানুয়ারিতে সিডনিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২৭৭ রানের ইনিংস খেলে। ১-০ তে পিছিয়ে থেকে সিডনি টেস্ট শুরু করেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। প্রথমে ব্যাট করে অস্ট্রেলিয়া সংগ্রহ করে ৫০৩ রান। জবাব দিতে নেমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ যখন ফলোঅনের শঙ্কায় তখন ব্যাট করতে নামেন মাত্র পাঁচ টেস্ট খেলা লারা। সেদিন সবাইকে অবাক করে লারা ২৭৭ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস উপহার দেন। ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরিটিকেই রূপ দেন ডাবল সেঞ্চুরিতে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে রানআউট না হলে হয়তো ট্রিপলও হয়ে যেতে পারতো। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের বিরুদ্ধে বুক চেতিয়ে এমন এক ইনিংস খেলার পর বিশ^ ক্রিকেট পেয়ে যায় নতুন এক তারকার আগমনী।

ব্রায়ান লারার ক্যারিয়ারে এমন ঝলমলে ইনিংসের অভাব নেই। ১৯৯৩ এর এপ্রিলে এন্টিগা টেস্টে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেন ৩৭৫ রানের বিশ^রেকর্ড গড়া ইনিংস। এর আগে টেস্টের এক ইনিংসে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রান ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজেরই ব্যাটসম্যান গ্যারি সোবার্সের (৩৬৫)। ২৬ বছর পর সেটি কেড়ে নেন লারা। সেদিন ৭৬৬ মিনিট ক্রিজে থেকে ৫৩৮ বল খেলেছেন ইনিংসটিতে। ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ড্র হয়েছিল।
এটি ছিল এপ্রিলের ঘটনা। এই সিরিজ শেষ করেই ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটে খেলতে যান ওয়ারউইকশায়ারের হয়ে। জুনে ডারহামের বিপক্ষে ম্যাচে খেলেন অপরাজিত ৫০১ রানের ইতিহাস গড়া ইনিংস। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট অর্থাৎ ঘরোয়া চার দিনের ম্যাচে সেই বিশ্ব রেকর্ড আজো কেউ ভাঙতে পারেননি। ৪৭৪ মিনিট ক্রিজে থেকে ৪২৭ বল খেলে ওই রান করেছিলেন সেদিন রেকর্ডের বরপুত্র।
টেস্টে লারার ৩৭৫ রানের রেকর্ডটি ৯ বছর পর ভাঙেন অস্ট্রেলিয়ার ওপেনার ম্যাথু হেইডেন (৩৮০); কিন্তু হারানো রেকর্ড উদ্ধার করতে লারা সময় নিয়েছেন মাত্র ৬ মাস। ২০০৪ সালের এপ্রিলে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আবার খেলেন অপরাজিত ৪০০ রানের ইনিংস। টেস্টে আজ পর্যন্ত আর কেউ চারশো রানের ইনিংস খেলতে পারেননি।

ব্রায়ান লারার ক্যারিয়ারে এমন ইনিংস আরো অনেক আছে। তবে সেসব ছাপিয়ে তার সেরা ইনিংস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ১৯৯৯ সালে ব্রিজটাউনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অপরাজিত ১৫৩ রানের ইনিংসটি। সেটি ক্রিকেট ইতিহাসেরই সেরা ইনিংসগুলোর একটি। সেই টেস্টের চতুর্থ ইনিংসে জয়ের জন্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের টার্গেট ছিল ৩০৮ রান। জয়ের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ১০৫ রানেই চলে যায় ৫ উইকেট। স্কোর বোর্ডে আড়াই শ’ রান ওঠার আগেই নেই ৮ উইকেট। বাউন্সি পিচে ভয়ঙ্কর রূপে তখন গ্লেন ম্যাকগ্রা আর জেসন গিলেস্পি। দলের সবাই একে একে ফিরে গেলেও লারা ছিলেন অবিচল। শেষ পর্যন্ত লারা অপরাজিত ছিলেন ১৫৩ রানে। এক উইকেটের জয় পায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

এই যে চরম প্রতিকূলতার মাঝে একা লড়াই করে ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা, সেটিই লারাকে তার সময়ের অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে। এমন অনেক ম্যাচ আছে যেখানে প্রতিপক্ষের কোনো বোলারকে হয়তো খেলাই যাচ্ছে না; কিন্তু লারা ঠিকই দাঁড়িয়ে যেতেন স্রােতের বিপরীতে। এই জায়গাটিতেই তাকে শচীন টেন্ডুলকারের চেয়ে এগিয়ে রাখতেন বিশ্লেষকরা। শচীন হয়তো অনেক বেশি রান করেছেন, কিন্তু লারা দলের অন্যদের ভরাডুবির দিনেও ম্যাচ জিতিয়ে ফিরতেন।
একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ২০০১ সালের নভেম্বরে শ্রীলঙ্কার মাটিতে টেস্ট সিরিজে মুত্তিয়া মুরালিধরন আর চামিন্দা ভাস হয়ে উঠেছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যানদের জন্য আতঙ্ক। মুরালিধরন প্রথম টেস্টে ১১ উইকেট, দ্বিতীয় টেস্টে নিলেন ১০ উইকেট। তৃতীয় টেস্টে চামিন্দা ভাস নেন ১৪ উইকেট; কিন্তু সেই সিরিজে লারা একাই করেন ৬৮৮ রান। যে ম্যাচে ভাসকে খেলতেই পারেনি অন্য ব্যাটসম্যানরা, সেটির দুই ইনিংসে লারা করেন যথাক্রমে ২২১ ও ১৩০ রান। এই কারণেই গত শতাব্দীর সেরা ১০০টি টেস্ট ইনিংসের তালিকায় লারার ৩টি ইনিংস জায়গা পেয়েছে যথাক্রমে ২, ১০ আর ১৪ নম্বরে; কিন্তু শচীনের একটিও নেই।

ওয়ানডের লারা কেমন ছিলেন তার চিত্র পাওয়া যায় বেশ কিছু ইনিংস থেকে। ১৯৯৬ বিশ^কাপে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৬০, কোয়ার্টার ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৯৪ বলে ১১১ কিংবা ২০০৫ সালে এডিলেডে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৩৮ বলে ১৫৬ রানের ইনিংসগুলো ছিল মহামূল্যবান। ২০০১ সালের জানুয়ারিতে সিডনিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১০৬ বলে ১১৬ রানের ইনিংস কিংবা ১৯৯৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পরপর তিন ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া-পাকিস্তান-অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলেছেন ১০২-১০৩*-৯০ রানের তিনটি ইনিংস। টেস্টে বড়ো বড়ো ধৈর্যশীল ইনিংস যেমন খেলেছেন তেমনি ওয়ানডেতে ৪৫ বলে ১১৭ রানের টর্নেডো ইনিংসও খেলেছেন। মোট কথা পরিস্থিতির দাবি মিটিয়ে ব্যাট করতেন।

এসব কারণেই লারা ছিলেন ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে ব্যাটিংয়ের অমর এক শিল্পী। তার ব্যাটিং চোখে প্রশান্তি এনে দিতে কঠিনসব বলকেও অবলীলায় বাউন্ডারিতে পাঠাতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য লারার, যে সময়টায় খেলেছেন তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলটি সেরা সময় পেছনে ফেলে এসেছে। দলে ছিল না আর কোন সেরা পারফরমার। যে কারণে লারার এমন দুর্দান্ত সব ফর্মের পরও দল বড়ো কোনো সাফল্য পায়নি। ১৯৯৮ মিনি বিশ^কাপ ও ১৯৯৯ বিশ^কাপে তার নেতৃত্বে খেলেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ২০০৭ বিশ^কাপের পর অবসর নেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে।
১৯৬৯ সালে ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর সান্তাক্রুজে জন্ম লারার। ১৪ বছর বয়সে স্থানীয় এক টুর্নামেন্টে ১২৬ গড়ে ৭৪৫ রান করে জায়গা করে প্রতিভার জানান দেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে নেতৃত্ব দেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ অনূর্ধ্ব-১৯ দলকে। এরপর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে রানের পর রান করে জায়গা করে নেন জাতীয় দলে।

SHARE

Leave a Reply