Home গল্প তোমাদের গল্প টান -সা’দ সাইফ

টান -সা’দ সাইফ

রাত তখনো গভীর।
ভোর হয়নি।
চারপাশ তখনো ঘুমে বিভোর।
ঘুম ভাঙানো সুর বেজে ওঠেনি মিনার থেকে।
রাস্তার পাশে গাড়ির পুঁ পুঁ শব্দ।
ইট দিয়ে মোড়ানো সলিংয়ের রাস্তায় গাড়িটা হঠাৎই থেমে গেল।
ক্র্যাং করে গাড়ির দরজা খুলে রাজু বাইরে বের হয়ে হন্তদন্ত হয়ে উত্তরমুখী বাড়িটার দিকে হাঁটতে লাগল।
সোডিয়াম আলোর বাতি জ্বলছে তখনো বাড়িটায়। বাইরে থেকে মনে হচ্ছে জোনাকিরা আলোর মতো বিচ্ছুরণ ছড়াচ্ছে।
থমথমে একটা ভাব প্রকৃতিই যেন জানান দিচ্ছে।
বাড়িটার কাছে আসতেই চোখ আটকে গেল বারান্দার পাশে লাগোয়া খাটে। সটান শুয়ে আছে কেউ। মাথা ও পায়ের কাছে চিন্তামগ্ন বসে আছেন অয়নের মা-বাবা। রাজুদের দিকে নজর যেতেই ‘বাবা, তুমি এসেছ’ বলে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল অয়নের মা।
দেখো বাবা, অয়ন কখন থেকে বলছিল, রাজু ভাইয়া কই, রাজু ভাইয়া কই। না পেরে সেই সন্ধ্যায় তোমাকে ফোন দিয়েছি বাবা।

দেখো না বাবা, ছেলেটা আমার চুপ হয়ে আছে, কোন কথা বলছে না। প্রচণ্ড বিমূর্ত আর বিমর্ষতায় কথাগুলো বলে ফেলল অয়নের মা।
পায়ের কাছে বসা অয়নের বাবা একদম চুপ; যেন নির্বাক হয়ে আছে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে।
অয়নের শরীরে মরণব্যাধি ক্যান্সার। মাঝে মাঝেই অতীতের কোন স্মৃতি স্মরণ করতে গেলে বেহুঁশ হয়ে যায় সে। সন্ধ্যার দিকে যখন প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছিল তখন রাজু ভাইয়ার কথা চেতনে-অবচেতনে বারবারই বলে যাচ্ছিল।
রাজু ঢাকায় একটি এনজিওতে চাকরি করে। অয়নের বাবা বললেন তোমার ছোট ভাই ছটফট করছে আর বারবারই তোমাকে ডাকছে।
তখনই ঢাকা থেকে রওনা হয়ে যায় সে।
নিজের ভেতরে এক ধরনের অপরাধবোধ কাজ করছে তার এখন। অয়নের জন্য সে তেমন কিছুই করতে পারছে না।

অথচ প্রথম দিন যখন অয়নের সাথে বাঁকড়া বাজারে পরিচয় হয়েছিল। কী এক ভালোবাসায় গেঁথে নিয়েছিল তার হৃদয়কে। জয় করে নিয়েছিল তার মন-মস্তিষ্ক।
অয়নের ভালোবাসার কাছে বারবারই পরাজিত হতে হয় রাজুকে। প্রতিবারই যখন সে ঢাকা থেকে বাড়িতে আসে তখন তাদের ভেতরে আর খেয়াল থাকে না যে তারা রক্ত-সম্পর্ক ছাড়া ভাই। বয়সের ব্যবধান থাকলেও কী এক মুগ্ধতায় কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারে না যেন।
তাদের দেখলেই মনে হয় এইতো আপন দু’ভাই যাচ্ছে। অথচ সেই ভালোবাসার মূল্য দিতে ব্যর্থ যেন সে। অয়নের অসমর্থ পিতার মতো সেও যেন অসহায়।
অয়নের মায়াবী মুখটা মলিনতায় ঢাকা পড়ে গেছে। সেই প্রাণবন্ত হাসিটা আর নেই মুখে।
অয়নের ডান দিকে বসে রাজু আস্তে করে ডাক দিল, ‘ভাইয়া, ওঠো। আমি এসে গেছি ভাইয়া।’
কোন সাড়া পাওয়া গেল না।

মিনিট দুয়েক পরেই পিট পিট করতে লাগল অয়নের চোখ জোড়া। আস্তে আস্তেই খুলে গেল চোখ দুটো।
শিয়রেই রাজু ভাইয়াকে দেখে দুর্বল শরীর নিয়েই তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল অয়ন।
অস্ফুট স্বরেই বের হলো ভাইয়া!
আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমাকে রেখে যেও না আর। ভাইয়া, আমার পাশে থেকো প্লিজ।
রাজুদের তখন কথা বলার শক্তি নেই যেন। বাকরুদ্ধ মানুষ একটা সে। চোখ আর বাধা মানলো না কোন।
নিজের অজান্তেই অশ্রুধারা ঝরে পড়তে লাগল অয়নের পিঠ বরাবর। বুকটা যেন ফেটে যেতে চাইলো তীব্র বেদনায়।
রাজু-অয়নের এমন ভালোবাসার কাছে ভেঙে পড়ে যেন সকল দুঃখ, হতাশা আর রোগ-শোকের পিরামিড।

SHARE

Leave a Reply