Home সায়েন্স ফিকশন জাল -আহমেদ বায়েজীদ

জাল -আহমেদ বায়েজীদ

সহকর্মীদের এক নাগাড়ে কিছু নির্দেশনা দিয়ে কমিউনিকেশন মডিউলের মনিটরটি অফ করে দিলেন ড. রায়াসাত সাকি। সপ্তাহের শেষ দিনে এই কাজটুকু করে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন তিনি। পরদিন ছুটি। আর আগামী এক সপ্তাহের জন্য সবার কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই সময়টা তিনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন। অবশ্য গবেষকদের নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ আবার কোথায়! সারাক্ষণই মাথার মধ্যে গবেষণার নানান দিক নিয়ে খেলা চলে। নতুন নতুন তথ্য উপাত্ত নিয়ে ভাবনা চলে। তারপরও সাপ্তাহিক ছুটির দিনটা নির্ঝঞ্জাটই কাটাতে চান তিনি। খুব একটা বাধ্য না হলে কাজ নিয়ে মাথা ঘামাতে চান না। পুরো সপ্তাহ কাজের মধ্যে থেকে হাঁপিয়ে ওঠে, এই একদিনে সেটি কাটাতে চেষ্টা করেন। কারণ সপ্তাহের প্রথম দিন থেকে আবার শুরু হবে কাজ।

অবশ্য করার মতোও খুব বেশি কিছু নেই ড. সাকির কাছে। ছুটির দিনে কী করবেন সেটিও যেন তিনি খুঁজে পান না কখনো কখনো। বিয়ে-শাদি করেননি। সংসারের মায়া তাকে আটকাতে পারেনি। কাজের পেছনেই জীবনটাকে ব্যয় করেছেন। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে তাই কখনো রান্না করেন, সেটিতেও অবশ্য এখন বিরক্তি চলে এসেছে তার। রান্না করতে ইচ্ছে হলে বারান্দার গাছগুলো থেকে সবজি তুলে আনেন। বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার এই যুগে সবাই রুটিনবাঁধা জীবনে অভ্যস্ত। নতুন করে করার খুব বেশি কিছু নেই। বছর কয়েক আগেই যেমন নতুন কিছু করতে গিয়ে বারান্দায় টবে কয়েকটি গাছ লাগিয়েছিলেন। এখন সেগুলোও ভালো লাগছে না।

লাগবেই বা কেন? টবে তিন বছর আগে একটি করে গাজর, টমেটো আর শিমের গাছ লাগিয়েছেন। সেগুলো টানা ফল দিয়ে যাচ্ছে। সারা বছর গাছগুলোতে ফল হয়। দশ বছরেরও বেশি এভাবে ফল দেবে প্রতিটি গাছ।
বিজ্ঞান এখন সভ্যতাকে এই পর্যায়ে উন্নীত করেছে। গবেষণা আর উন্নয়নে কৃষির এতটাই উন্নতি হয়েছে যে, বছরের যে কোন সময় যে কোন সবজি ফলছে। একটি গাছ বছরের পর বছর ফল দিয়ে যাচ্ছে। বারান্দায় বা ছাদে কয়েকটি বীজ রোপণ করলেই যেকোনো পরিবারের সবজি বা ফলের চাহিদা মিটছে। ফলে বাজার থেকে আর এসব কিনতে হয় না কাউকে।

কৃষির মতো মানব জীবনের সব সেক্টরই এখন বিজ্ঞাননির্ভর। এখন আর কাউকে চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের কাছে যেতে হয় না। ঘরে থাকা সুপার কম্পিউটারই শরীর পরীক্ষা করে বলে দেবে আপনার ব্লাড সুগার লেভেল কমে গেছে। আবার কী ওষুধ খেতে হবে সেটিও জানিয়ে দেবে। দুর্যোগ, অনিশ্চয়তা, দ্বন্দ্ব-সংঘাত- এসব অনেক কিছু থেকেই মানব জীবনকে দূরে রেখেছেন বিজ্ঞানীরা। ভূমিকম্পেও এখন আর বাড়ি ভেঙে পড়ে না, যখন তখন কারো ওপরে বজ্রপাত হয় না। সড়কে দুর্ঘটনায় কেউ মারা যায় না, প্রতিটি গাড়ি চলে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে চালক ছাড়াই। প্রয়োজনীয় যে কোন কিছুই এখন বাড়িতে চলে আসে সবার, শুধু চাহিদার কথা কর্তৃপক্ষকে জানাতে যতক্ষণ; কিন্তু এই অতিরিক্ত বিজ্ঞান নির্ভরতাটাই কিছুদিন ধরে অসহ্য লাগছে ড. রায়াসাত সাকির কাছে। সব কিছু যান্ত্রিক আর রুটিনবাঁধা- এমন জীবনে তিনি হাঁপিয়ে উঠেছেন।

অথচ আগের দিনের মানুষ এতটা আধুনিক জীবনযাপন না করেও কত সুখী ছিলেন। মাত্র দুইশো বছর আগের পৃথিবীতেই তো মানুষ ফসল ফলাতো, মাছ চাষ করতো। শ্রমিকরা সকালবেলা লাইন ধরে কাজে যেত, ছুটির দিনে দল বেঁধে হইহুল্লোড় করতো। ছেলেমেয়েরা স্কুল পালিয়ে পিটুনি খেত। পৃথিবীর এমন অনেক এলাকা ছিল যেখানে বৈদ্যুতিক বাতি পর্যন্ত ছিল না। বন্যায় ফসল নষ্ট হয়ে গেলে কৃষককে আবার নতুন করে চাষ করতে হতো। একজন কৃষক সারা বছর তার ফসলের পরিচর্যায় কাটিয়ে দিতেন। অথচ এখন এসবের কিছুই নেই।
পেশাগত কারণেই বিংশ শতাব্দীর পৃথিবী সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছেন ড. সাকি। শতাব্দীভিত্তিক মানব ইতিহাস সংরক্ষণের যে প্রজেক্ট চালু করেছেন পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা তাতে বিংশ শতাব্দী নিয়ে গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব পড়েছে ড. সাকি এবং তার টিমের ওপর। ৫০ জন গবেষকের একটি টিমের কো-অর্ডিনেটর তিনি। আর এই কাজটি করতে গিয়েই তিনি জানতে পেরেছেন সেই সময়ের মানুষদের জীবন সম্পর্কে।

যতই বিষয়গুলো সম্পর্কে জেনেছেন ততই অবাক হয়েছেন। সেখানে আজকের মতো আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তি ছিল না; কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকার মতো, বাঁচতে চাওয়ার মতো অনেক কারণ ছিল। কেউ বেঁচে থাকতো প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকরি করবে এই আশায়। কেউ বেঁচে থাকতো রাষ্ট্রপ্রধান বা মিনিস্টার হবে এই আশায়। বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন গবেষণা বা আবিষ্কার করলেই মিলতো অ্যাওয়ার্ড। খাদ্যের জন্য পুরো পৃথিবী নির্ভর ছিল কৃষির ওপর। ফসল ফলানোর জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হতো কৃষকদের। তবে ওই শতাব্দীতেই কম্পিউটার নামক যন্ত্রটার দ্রুত উন্নতি হতে থাকে। এবং এরপর দ্রুত এটির ছোঁয়া লাগতে শুরু করে সব সেক্টরে। সেখান থেকেই মূলত মানব জীবনের এই যান্ত্রিকতার যুগে প্রবেশের সূচনা।
কাজের সূত্রে অতীতের এই জীবন ধারার সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকেই সেই সময়টার প্রতি ভালো লাগা কাজ করে ড. সাকির। নিজের জীবনের যান্ত্রিকতায় হাঁপিয়ে উঠলেই এখন তিনি অতীতের মানুষদের জীবনের সাথে নিজের জীবনের পার্থক্য খুঁজতে চেষ্টা করেন। গত দুই বছর ধরে গবেষণার প্রয়োজনে বিংশ শতাব্দী সম্পর্কে খোঁজখবর করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, অনিশ্চয়তা আর চ্যালেঞ্জ ছিল বলেই তখন মানুষের বেঁচে থাকার মাঝে আনন্দ ছিল।

এখন মানুষ অসুখকে জয় করেছে কিন্তু ৩৫-৪০ বছরের পরেই বেশির ভাগ মানুষকে হতাশা আর বিষণœতায় পেয়ে বসে। জীবনকে উপভোগ করার মন্ত্র খুঁজে পায় না তারা। সব কিছু গুটিকয়েক বিজ্ঞানী আর কম্পিউটারের হাতে ছেড়ে দিয়ে মানুষ একদা যে নিশ্চিন্ত হয়েছিল, আসলে সেটিই ছিল তাদের আজকের পরিণতির সূচনা। যার কারণে মানুষের মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মানসিক অবসাদ। জীবনকে উপভোগ না করতে পেরে আত্মহত্যা করে প্রচুর মানুষ। দুইশো বছর আগের পৃথিবীর সাথে আজকের পৃথিবীর পার্থক্য আর এর কারণগুলো তাই স্পষ্ট ড. সাকির সামনে।

২.
সবুজে ভরা একটি দ্বীপ। চারদিকে গাছপালা, ঘাস, লতাপাতায় ভরা। কিছু গাছে ফল ধরে আছে। আবার কোন গাছ মরে যাচ্ছে। ঘাসে ভরা সবুজ চত্বরগুলোতে চরে বেড়াচ্ছে বন্য পশুরা। চারদিকটা ভালো করে দেখে সত্যি অবাক হলে ড. রায়াসাত সাকি। এ যেন ঠিক বিংশ শতাব্দীর পৃথিবীর কোন গ্রাম। এখনো পৃথিবীতে তাহলে এমন পরিবেশ রয়েছে! যেখানে অতিযান্ত্রিকতার ছোঁয়া লাগেনি, বরং সব কিছু চলছে পুরনো দিনের মতো।
খোঁজ খবর করে কিছুটা নিরিবিলি সময় কাটানোর জন্য এই জায়গাটার সন্ধান পেয়েছিলেন ড. সাকি। ভেবেছিলেন কয়েকটা দিন প্রকৃতির মাঝে কাটিয়ে গেলে অবসাদ দূর হবে। আবার কাজে মনোযোগ দিতে পারবেন; কিন্তু এত সুন্দর জায়গটায় আসার কয়েক মিনিটের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন তিনি। নাহ! আর ফিরে যাবেন না যান্ত্রিক ঐ জীবনে। এখানে প্রকৃতির মাঝে কাটিয়ে দেবেন বাকি জীবনটা। একাকী সংগ্রাম করে বাঁচতে চেষ্টা করবেন বাকি দিনগুলো।

বাম হাতের কব্জি থেকে পারসোনাল কমিউনিকেশন মডিউলটা খুলে ফেললেন ড. সাকি। ছুড়ে ফেলে দিতে যাবেন এমন সময় খেয়াল করলেন ওটার স্ক্রিনে একটা ভিডিও মেসেজ এসেছে। পাঠিয়েছেন বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির পরিচালক। বললেন, ড. সাকি আপনি যেখানে গিয়েছেন সেটি একটি কৃত্রিম দ্বীপ। বিংশ শতাব্দী নিয়ে গবেষণার জন্য ওটা আমরা তৈরি করেছি। তবে দ্বীপটি আমাদের কমিউনিকেশন নেটওয়ার্কের বাইরে নয়। দ্বীপটি এখনো উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে। অনুমতি ছাড়া ওখানে যাওয়ার অপরাধে আপনাকে শাস্তি পেতে হবে, দ্রুত ফিরে আসুন।
হতাশ ড. সাকি ফিরে আসার প্রস্তুতি নিলেন। বুঝলেন বিজ্ঞানের জালে পুরোপুরি আটকে গেছে মানব সভ্যতা। এই জাল থেকে এখন আর মানুষের পক্ষে বের হওয়া সম্ভব নয়।

SHARE

Leave a Reply