Home গল্প অনুতপ্ত -ফজলে রাব্বী দ্বীন

অনুতপ্ত -ফজলে রাব্বী দ্বীন

মাহিম স্কুল থেকে ফিরছে। তার মুখটা দেখলেই বুঝা যায় কতটা কষ্ট সে পেয়েছে আজ! হাস্যোজ্জ্বল বদনখানিতে রাজ্যের ক্ষোভ স্পষ্ট। অসহায় তার মলিন মুখ। যে মিষ্টি কণ্ঠস্বর দিয়ে কোরআন তেলাওয়াত করলে গাছের পাখিরাও কিচিরমিচির বন্ধ করে দেয়, শক্ত মানুষের হৃদয় গলে যায় কঠিন মোমের মতো- সেই কণ্ঠ আজ নিস্তব্ধ, অসাড়। তার স্কুলের শহীদ স্যার তাকে দেখলেই রেগে যায়। ইংরেজি ক্লাসের সময় ধমক দিয়ে আজ বলেছে তার চেহারা যেন উনার সামনে আর কখনও না পড়ে। অন্ধকারে অসহায় পাখিরা যেমন ভোরের অপেক্ষায় বসে থাকে মাহিম তেমনি একটি স্বাধীনতার জন্য প্রতিদিন আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে। যে স্বাধীনতা পারে অন্যায়কে দুমড়ে-মুচড়ে ছিঁড়ে ফেলতে, মুক্ত করতে পারে পৃথিবীর শিকলবন্দি সকল শিশুদের। চা বাগানের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় মাহিম দেখলো, একটা বিড়াল জীবন বাঁচানোর প্রচেষ্টায় কাঁঠাল গাছে লাফিয়ে উঠছে। আর তাকে পেছন থেকে তাড়া করেছে একটি বন্য ইঁদুর। এ দৃশ্য দেখে আড়াল থেকে কয়েকটি দুরন্ত ছেলে হেসেই খুন। গড়াগড়ি দিচ্ছে সবুজ গাছের ওপর। কিন্তু মাহিমের মুখে কোনো হাসি ফুটে উঠলো না বরং সে আরো বেশি দুঃখিত হলো। বাস্তবতা কি এটা বলছে না যে তার অবস্থা এই বিড়ালটির মতই!
কাশবনের পাশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে মায়ের কবরের কাছে এসে দাঁড়ালো মাহিম। সকল দুঃখ, হাসি, কান্নার গল্পগুলো মায়ের কাছে এসে বললেই মনটা হালকা হয়ে যায়। অশান্ত হৃদয়টা খুঁজে পায় এক টুকরো শান্তি। খুব অল্প বয়সে অল্প সময়ের মধ্যেই কুরআন মুখস্থ করেছিল সে। সবাই তার জ্ঞানের তারিফ না করে পারে না।

সেই দিনটির কথা খুব মনে পড়ে যখন মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বলেছিল, ‘তোমার মত কোরআনের পাখিগুলো এই পৃথিবীতে সুভাস ছড়ায় বলেই আকাশে এখনো রামধনু ওঠে, সবুজের বনে খেলা করে পাখিরা, ফুলেরা সুঘ্রাণ ছড়ায় আজানের ধ্বনি শুনে।’ মা তাকে আরও বলেছিল, ‘বিশৃঙ্খলা, হানাহানি, রক্ত দিয়ে হোলি খেলা এগুলো কখনো শান্তির ধর্ম শিক্ষা দেয় না। যারা এসবে মেতে থাকে তারা তো ধর্মকে কাজে লাগিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে চায়। তোমাকে অনেক বড় হতে হবে খোকন। সত্য জানতে হবে এবং তার ওপরে অটুট থাকতে হবে আজীবন।’ মায়ের কথাগুলো খুব মনে পড়ছে মাহিমের।
গত সপ্তাহে শহীদ স্যার বলছিলেন, এখন থেকে সালাম দেওয়া চলবে না। বলতে হবে গুড মর্নিং। যেখানে দেখা হবে সেখানেই বলতে হবে হাই অথবা হ্যালো। এ কথা শুনে আনিকা দেবী সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে বলেছিল, ‘স্যার, আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক এটা বলাতে তো কোন দোষের কিছু নেই। তাহলে কেন নিষেধ করছেন?’
স্যার চোখ রাঙিয়ে তৎক্ষণাৎ বলেছিলেন, ‘তোমার মত অল্প শিক্ষিত নই আমি। এই মডার্ন যুগে এসে এসব শব্দ ব্যবহার করা কি বেমানান নয়? তোমরা এখনো সেই আদিম যুগেই পড়ে আছো। একটু মডার্ন হও। তাকিয়ে দেখো পৃথিবী কত বদলে গেছে।’

মাহিম চুপ করে সব শুনেছিল। সে জানে না ইংলিশ স্যার এসব বিষয়ে কেন এত রাগ দেখায়। কিসের এত জিদ মনে! আজ ক্লাসে এসেই বললেন, ‘মাহিম, পুরো ক্লাস জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকবি তুই। বসতে পারবি না। তোকে কতবার বলেছি সালাম না দিতে। সবাই গুডমর্নিং বললো আর তুই ওইটা বললি কেন?’
‘এটা আমাদের নবীর সুন্নত স্যার। সালাম দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করতে হয়। তাই আমি সবাইকেই সালাম দিই‌।’
মাহিমের কথা শুনে স্যার আরো ক্ষেপে গেলেন। তারপর যে কথাটি বললেন তা শোনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না কেউ। সরাসরি নবীকে নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। রাগে অভিমানে কেঁদে ফেললো ছোট্ট মাহিম। আর এক সেকেন্ডের জন্যও ক্লাসে বসে থাকতে ইচ্ছে হলো না তার। ঘৃণায় হৃদয়টা ভারী হয়ে গেল। ব্যাগটা হাতে নিয়ে সোজা ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলো।
মায়ের কবরের মাটি হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর বলছে, ‘আমি আর ঐ স্কুলে কখনোই যাবো না মা। শহীদ স্যার সবসময় বিভিন্ন কথা বলে খোঁচা দেয়। আমার প্রতি উনার এত অভিমান তো উনি আমাকে গালি দিক, আঘাত করুক, দাঁড়িয়ে রাখুক পুরো ক্লাস। কিন্তু উনি এসব না করে ধর্মকে কটূক্তি করে আঘাত দেয়। প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে গিয়ে অভিযোগ করেছিলাম কিন্তু উনি কিছুই করেননি। আমরা কেবল ক্লাস ফাইভে পড়ি বলে ছোট হিসাবে উড়িয়ে দেয়। অন্য এক শিক্ষক বলেছিলেন, এত ছোট বয়সে এগুলো নিয়ে মাথা ঘামাও কেন? সব কিছু বোঝার বয়স এখনও তোমাদের হয়নি। শিক্ষক যা বলবে তাই শুনতে হবে। ভালো অথবা মন্দ হোক যা বলবে তাই। এমন একটা স্কুলে কী শিখার জন্য তাহলে সে যাচ্ছিল? ছাত্র-ছাত্রীরাও খুব একটা সম্মান করে না শিক্ষকদের। যে স্কুলে আদব-কায়দা, রীতিনীতি এসব শেখানোর বালাই নেই বরং ভয় দেখিয়ে অসুস্থ সংস্কৃতির দিকে আহ্বান জানায় সেখানে গিয়ে কী লাভ?

মাহিম চোখের জল মুছে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নেয়। বাড়িতে যেতে ইচ্ছে করছে না তার। লিচু বাগানের পাশে যে দীঘিটা আছে সেখানে যেতে মন চাইছে। কিন্তু দীঘির ওপারেই শহীদ স্যারের বাড়ি। যদি দেখে ফেলে! স্যার তো স্কুল থেকে ফিরবে বিকালে। মনে মনে সান্ত¡না পায় মাহিম। স্যারের ছোট ছেলে শান্তর কথা মনে পড়ছে। যদি আরেকবার দেখা পায় গাল দুটো টিপে দিবে আলতো করে। খুব মিষ্টি একটা ছেলে। কতবার যে মাহিমের কাছে আবদার করেছে পানিতে নামবে, সাঁতার শিখবে। শুধু তার বাবার কারণে মাহিম আগ বাড়ায়নি। একজন শিক্ষকের ব্যবহার তাকে এতটাই কষ্ট দিয়েছে যে ইচ্ছে করছে যদি সামনে থাকতো তাহলে ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে দিত অথবা ব্রিজের ওপর থেকে ফেলে দিত একদম নিচে। এর আগে বারবার সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও তার সুস্থ বিবেক এটি করতে দেয়নি।

শান্তর মতো তারও একটি ছোট ভাই আছে। নাম জিসান। বয়স মাত্র সাড়ে চার। তাদেরকে রেখেই মা পরপারে পাড়ি জমিয়েছে। ব্রেন ক্যান্সার মাকে বাঁচতে দেয়নি। যাওয়ার আগে মাহিমকে মা বলে গিয়েছিল, ‘জিসানকে তোর হাতে দিয়ে গেলাম বাবা। তোকে যেভাবে বড় করেছি, কুরআন শিক্ষা দিয়েছি, ভালো মানুষ হতে শিখিয়েছি সেই ভাবেই তোর ছোট ভাইটিকেও মানুষ করবি।’
মায়ের কথা মতো জিসানকে সে বড় করার চেষ্টা করছে। স্নেহের কোনো ত্রুটি রাখছে না। মা বিয়োগের কষ্ট যেন কোনোদিন সে অনুভব করতে না পারে সেই প্রচেষ্টা করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
মাহিম দীঘির পাড়ে এসে বসামাত্রই সজনে ডালে ঘুঘু পাখিরা কিচিরমিচির করে ডেকে উঠলো। কোথা থেকে যেন স্নিগ্ধ ঠাণ্ডা বাতাস উড়ে এসে এলোমেলো করে দিল তার চুল। এভাবে বেশ খানিকটা সময় পর হঠাৎ সবকিছু স্তব্ধ হয়ে গেল। মনে হচ্ছে কোথাও কিছু একটা গণ্ডগোল বাধছে। দীঘির পানিতে বেড়ে গেলো বৈষম্যতা। মাহিম পারিপার্শ্বিক ধ্যান ভুলে দীঘির ওই পাশটায় চোখ মেললো। একটা ছোট ছেলে পানিতে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে। যে করেই হোক ছেলেটিকে বাঁচাতে হবে। মাহিম এক দৌড়ে গিয়ে পানিতে ঝাঁপ দিলো। উদ্ধার করতে গিয়ে দেখে ছেলেটি শান্ত। তার বাবার প্রতি ক্ষোভ শান্তকে আরো ধাক্কা দিয়ে পানির অতল গভীরে ফেলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু শান্তির ধর্ম ইসলাম কি তাকে এটা শিক্ষা দিয়েছে? মনের দুঃখগুলো আড়াল করে হাসি মুখে শান্তকে পানি থেকে তুলে এনে তার মায়ের কাছে পৌঁছে দিলো মাহিম। মৃত্যুর মুখ থেকে সন্তান ফিরে এসেছে বলে মায়ের সেই আনন্দাশ্রু, আহাজারি নিজের চোখে না দেখলে কখনও বিশ্বাস হতো না।

পরদিন সকালে মাহিম বটগাছের নিচে বসে জিসানকে নবীজি (সা:)-এর জীবনী শুনাচ্ছিল। এমন সময় কে যেন পেছন থেকে ডাক দিলো- ‘মাহিম’। মাহিম মাথা ঘুরিয়ে দেখে শহীদ স্যার এবং উনার ছেলে শান্ত। অমনি থতমত খেয়ে যায় সে। ভয় পায় হয়তো আবার এসে ধমক দিয়ে বলবে, এসব কি শেখাচ্ছিস বাচ্চাটাকে? নিজেতো আধুনিক হতে পারলিই না বরং অন্যকেও অন্ধকারে টেনে নিচ্ছিস। তারপর হয়তো গালে কষে একটা চড় বসিয়ে দিয়ে বলবে আজকে স্কুলে যাসনি কেনো শয়তান? নিজেকে সবার চেয়ে বড় ভাবতে শুরু করেছিস তাই না? শিক্ষকের কথা না শোনা এটা কি তোর ধর্ম শিক্ষা দিয়েছে?’
শহীদ স্যার কিন্তু এসবের কিছুই বললেন না। উনার চোখে মুখে অনুতপ্তের ছাপ। শান্ত দৌড়ে এসে মাহিমকে জড়িয়ে ধরেছে। মাহিম দেখলো, স্যারের চোখে পানি। চোখের জল মুছে স্যার শুধু এইটুকু বললেন, ‘আমি ভুল করে ফেলেছি মাহিম। তুই আমার চোখ খুলে দিয়েছিস রে..!’

SHARE

Leave a Reply