Home ভ্রমণ ঐতিহাসিক সাতৈর শাহি জামে মসজিদ আরাফাত শাহীন

ঐতিহাসিক সাতৈর শাহি জামে মসজিদ আরাফাত শাহীন

লকডাউনে ঘরে বসে থাকতে থাকতে শরীর ও মনে এক অদ্ভুত অবসাদ এসে ভর করেছিল। আমি উপলব্ধি করতে পারছিলাম- কোথাও গিয়ে একটু ঘুরে আসা দরকার। এভাবে গৃহবন্দী হয়ে বেশিদিন থাকা কোনোমতেই ঠিক নয়। আবার দূরে কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। কাছে পিঠে কোথায় যাওয়া যায়- এটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ সাতৈরের কথা মনে পড়লো। বাড়ি থেকে জায়গাটা বিশ কিলোমিটার মতো দূরে। সাতৈরে একটি বিখ্যাত মসজিদ রয়েছে বলে জানি। কিন্তু কখনো সেখানে যাওয়া হয়নি। মধুমতি নদী পার হয়ে কিছুদূর গেলেই তো সাতৈর! মামাতো ভাই আবদুর রহমানকে বলতেই রাজি হয়ে গেল। ও আবার ঘোরাঘুরিতে বেশ পটু; আবার ওদিকের রাস্তাঘাট সম্পর্কেও ভালো জানাশোনা আছে।

১২ জুলাই, সোমবার আমাদের যাত্রার তারিখ নির্ধারিত হলো। খুব সকালেই বেরিয়ে পড়লাম বাড়ি থেকে। এ সময় যেহেতু গাড়িঘোড়া চলছিল না, তাই সিদ্ধান্ত হলো সাইকেলে ভ্রমণ করতে হবে। এতে কোনো ঝামেলা ছাড়াই যাওয়া যাবে। তা ছাড়া সাইকেল-ভ্রমণে আশপাশের পরিবেশের সঙ্গেও বেশ ভালো সখ্য গড়ে তোলা যায়। আব্বার একটা সাইকেল আছে বেশ পুরনো ধাঁচের। আমি বাড়িতে এলে চলাচলের জন্য এটি ব্যবহার করি। আব্বাকে মাঝে মধ্যে বলি, আপনি এই পুরনো সাইকেলটা ফেলে দিয়ে নতুন একটা কিনতে পারেন না! এরকম সাইকেল এখন কেউ চালায় নাকি! আব্বা একগাল হেসে বলেন, আমার এ সাইকেল নিয়ে লন্ডন পর্যন্ত চলে যাওয়া যাবে। আমি আব্বার নিষ্কলুষ কথা শুনে হাসতে থাকি।

আব্বার ‘লন্ডন যাওয়া যাবে’ সাইকেলটি নিয়ে বের হয়ে পড়লাম। প্রথমে যেতে হবে মহম্মদপুর উপজেলা সদরে। এটা আমার নিজের উপজেলা। তারপর নয়নাভিরাম মধুমতি নদী পার হতে হবে ব্রিজের ওপর দিয়ে। এই ব্রিজ এবং তৎসংশ্লিষ্ট এলাকাও বেশ সুন্দর। নদীর ওপারে গিয়ে পুরাতন ফেরিঘাটে এসে আব্দুর রহমান বলল, এখন একেবারে সোজা রাস্তা। আমরা সরাসরি সাতৈর বাজারে গিয়ে উঠবো। এই অঞ্চলে আমার আগে আসা হয়নি। সোজা যে সড়কটা দিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম- সেটা ইতিহাসের বিখ্যাত গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড; যে রোডের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতবর্ষের সম্রাট শের শাহ শূরীর নাম। রাস্তাটি মৌর্য শাসনামলে নির্মাণ করা হয়েছিল। শের শাহ এটিরই সংস্কার সাধন করে চলাচলের জন্য উপযোগী করে তুলেছিলেন।
আট কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথটাতে কোনোই বাঁক নেই! ফলে রাস্তাটুকু পেরিয়ে সাতৈর বাজারে গিয়ে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগলো না। সোমবার হলো ওখানকার হাটের দিন। একসময় এই এলাকা ছিল ভূষণা রাজ্যের অধীনে। সেই সময় থেকেই সাতৈর একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর এবং প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত ছিল। আমাদের সোনালি আঁশ হিসেবে পরিচিত পাট এই অঞ্চলে অত্যন্ত ভালো জন্মে। এখন যেহেতু পাটের মৌসুম, তাই হাটে বেশ ভালোমতোই বেচাকেনা চলছে। আশপাশের কয়েকটি উপজেলা থেকে এখনও এখানে বিক্রির জন্য পাট আসে। অবশ্য সাতৈর হাটের এখন সে পুরনো জৌলুশ আর নেই; যেমনটা আমরা অনেক আগে থেকেই শুনে আসছি।

বাজারের সঙ্গেই লাগোয়া মসজিদ। একটি ঐতিহাসিক রোডের পাশে একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। সাতৈর মসজিদের নির্মাণকাল ও নির্মাতা নিয়ে বেশ মতভেদ রয়েছে। তবে গবেষকগণ এর গঠন কাঠামো এবং উপাদান পর্যালোচনা করে চতুর্দশ শতকে নির্মিত বলে মত দিয়েছেন। মসজিদের নির্মাতা হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এবং শের শাহ শূরীর নাম। তবে ‘ভূষণা রাজ্যের ইতিহাস’ গ্রন্থের লেখক সমর চক্রবর্তীর মতে এই মসজিদের নির্মাতা সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহ। তিনি অনেক তথ্যপ্রমাণও হাজির করেছেন। মসজিদ কে নির্মাণ করেছেন এটা নিয়ে ঐতিহাসিকরা তর্কবিতর্ক করুন; তাদের কাজই তো এটা। তবে আমাদের ওসব বিষয় নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই। আমরা তো এসেছি মসজিদ দেখার উদ্দেশ্যে।

মসজিদের মূল কক্ষে প্রবেশ করার আগে আমরা আরেকটু ইতিহাস ঘেঁটে নিই। মুসলিমদের বাংলা বিজয়ের আগে থেকেই অনেক আরবদেশীয় বণিক এবং সুফি-সাধক এখানে এসে ইসলাম প্রচার করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় সাতৈরেও বেশ কয়েকজন সুফি এসে পৌঁছেছিলেন। শায়খ শাহ আলি ছাতরি (রহ.) চতুর্দশ শতকে এখানে এসেছিলেন ইসলাম প্রচার করতে। সাতৈর নামটার সঙ্গে তাঁর নামের একটা মিল পাওয়া যাচ্ছে না? হ্যাঁ, বাংলাদেশের অনেক জায়গার নামকরণই হয়েছে সে এলাকায় যিনি ইসলাম প্রচার করতে এসেছেন, তাঁর নামানুসারে। সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ শায়খ শাহ আলি ছাতরি (রহ.)-এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন বলে জানা যায়। মসজিদ থেকে সামান্য দক্ষিণে একটি ভিটা রয়েছে যা ‘মৌলভি বাড়ির ভিটা’ নামে পরিচিত। এই জায়গায় বেশ কয়েকজন সুফি-সাধকের কবর রয়েছে।

মসজিদের মূল কাঠামো ছিল বর্গাকার। পরে এর বহু সংস্কার সাধন করা হয়েছে। ফলে বাড়তি অংশের কারণে মূল মসজিদ খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর! নতুনভাবে বানানো অংশ পেরিয়ে আমরা মূল মসজিদে প্রবেশ করলাম। মসজিদে ঢুকে প্রথমেই দুই রাকাআত নামাজ আদায় করলাম। তারপর নজর দিলাম চারপাশে। মসজিদে নয়টি কন্দাকৃতির গম্বুজ দেখতে পেলাম। গম্বুজগুলো তৈরিতে ‘পেনদানতিভ’ পদ্ধতির ব্যবহার করা হয়েছে। ভারতবর্ষের মসজিদ স্থাপত্য নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কোর্স ছিল। সেখান থেকে এরকম অনেক শব্দ শিখেছি। স্যার যখন এই কোর্সটা পড়াতেন, তখন যে কত কঠিন লাগতো! মসজিদের ভেতরে পাথরের তৈরি চারটি পিলার রয়েছে। আর দেয়াল ও দেয়াল সংলগ্ন বারোটি পিলার চোখে পড়বে। সুলতানি আমলে তৈরি অনেক মসজিদেই পাথরের পিলার চোখে পড়ে। আপনারা যদি কখনো চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনা মসজিদ দেখে থাকেন, তাহলে বিশাল বিশাল পাথরের পিলার দেখে চমকে উঠবেন। আমি তো ভাবি- এগুলো এখানে বহন করে আনলো কীভাবে!

আমাদের দেশের মসজিদগুলোতে এখন একটি মিহরাব দেখা যায়। কিন্তু প্রাচীন মসজিদগুলোতে মিহরাব থাকতো একাধিক। সাতৈর মসজিদে তিনটি মিহরাব চোখে পড়বে। মাঝের মিহরাবটি তুলনামূলক বড়ো। মিহরাবের চারপাশে নজর বুলালে বোঝা যায়, একসময় চমৎকার নকশায় সজ্জিত ছিল। আবার দেয়ালের কয়েক জায়গাতেও পুরনো সেই নকশা চোখে পড়ে। কিন্তু বারবার সংস্কার করার ফলে নকশা নিচে চাপা পড়ে গেছে; যা মসজিদের সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে।
ভালোমতো খেয়াল করলে বোঝা যায়, দেয়ালগুলো অনেক পুরু করে তৈরি। এখনকার দিনের দেয়াল তো সামান্য পুরু। কিন্তু সে-সময় এরকম পুরু দেয়ালের ইমারত তৈরি করা হতো। এগুলো নির্মাণে যেমন পরিশ্রম হতো অনেক, তেমনি সময়ও লাগতো প্রচুর। সাতৈর মসজিদ নির্মাণে কতদিন সময় লেগেছে এটা অবশ্য জানার কোনো উপায় নেই। মূলত এই মসজিদটি নিয়ে তেমন কোনো পর্যালোচনা ও গবেষণা চোখে পড়ে না। বরং বাহ্যিক সংস্কার করা হলেও এই ঐতিহাসিক স্থাপনাকে দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করার কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না।

আমি সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছি এবং কষ্ট পেয়েছি এই মসজিদকে ঘিরে কিছু জনশ্রুতি এবং কুসংস্কারের কথা জেনে। আল্লাহর পবিত্র ঘর মসজিদে তাঁর ইবাদত চলবে। কিন্তু এখানে যা হয় তা কোনো মসজিদের সঙ্গে যায় না। এলাকার অনেক মানুষ মনে করে, এ মসজিদের রোগ সারার এবং নিঃসন্তানকে সন্তান দেওয়ার ক্ষমতা আছে। তাই তারা এখানে মানত করে থাকে। এরকম একটি বিষয় আমাদেরও নজরে পড়লো। একজন নারী তার মানতের মুরগি দিতে এসেছেন। বিষয়টা দৃষ্টিকটু এবং ইসলামের বিশ্বাসের সঙ্গে মানানসই নয়। এদেশে মাজারকে ঘিরে এরকম কুসংস্কার প্রচলিত আছে। আমরা যারা নিজেদের শিক্ষিত এবং বিবেকবান বলে মনে করি, তাদের উচিত মানুষকে এসব কুসংস্কার ও অনৈসলামিক কার্যকলাপ থেকে সচেতন করা।
মসজিদের আশপাশে খানিকটা ঘুরে আমরা দু’জন বাড়ির পথ ধরলাম। আমাকে আবার বিশ কিলোমিটার পথ সাইকেল চালিয়ে আসতে হবে। এই ভ্রমণটা সংক্ষিপ্ত হলেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আসলে পথে বের না হলে শিক্ষার অনেক ঘাটতি থেকে যায়। আমাদের শিখতে হবে নানান জায়গা থেকে; নানান মানুষ থেকে। প্রয়োজনে সফর করার জন্য বের হতে হবে। আমাদের দেশে বহু ইসলামী নিদর্শন এবং প্রাচীন মসজিদ রয়েছে। সুযোগ পেলে সেগুলো ঘুরে দেখে আসুন; আর আল্লাহ পাকের নিয়ামতের প্রশংসা করুন।

SHARE

Leave a Reply