Home উপন্যাস গহিন বনের অবাক রাজ্যে -মুহাম্মাদ দারিন

গহিন বনের অবাক রাজ্যে -মুহাম্মাদ দারিন

সামনে গহিন বন। শিল্পীর নিপুণ হাতে আঁকা গাছের সবুজ পাতা। পাতার আছে বিভিন্ন আকার। এক গাছের পাতার সাথে আর এক গাছের পাতার কোন মিল নেই। সবুজেরও রকম ফের আছে। একেক গাছের পাতা একেক রকম সবুজ। কচিপাতা এক রকম সবুজ, পূর্ণাঙ্গ পাতা আর এক রকম। ঝরার আগে পাতার রঙ এক রকম আবার ঝরা পাতার রঙ আর এক রকম। বড়োই বৈচিত্র্যময় সৃষ্টি ¯্রষ্টার।
বনে যেমন আছে আকাশ ছুঁতে চাওয়া গাছের ডাল তেমনি আছে পরম মমতায় গাছে গাছে জড়িয়ে থাকা লতা আর মাটির সাথে মিতালি করা ছোট্ট ছোট্ট গুল্ম জাতীয় গাছ। পরম মিতালি এদের একে ওপরের সাথে। ওরা যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে, ‘এসো এসো।’
সেই ডাকে সাবিত সাড়া না দিয়ে পাারলো না। বারো-তেরো বছরের এক কিশোর ও। যেন মায়াবী জাদুর টানে এগিয়ে গেল বনের দিকে।

পায়ে চলা সরু এক রাস্তা এঁকে বেঁকে বনের ভিতর চলে গেছে। সেই পথ ধরে এগিয়ে চলছে ও। একটা সময় বিরাট এক গাছের নিচে এসে থামলো। যেন ওকে সাদরে অভ্যর্থনা জানাতে একঝাঁক পাখি কিচিরমিচির করতে করতে উড়ে এসে বসলো বিরাট গাছটার বিস্তার করা প্রশাখায়।
সাবিত গাছটার নাম জানে না। ও তাকিয়ে থাকে উড়ে আসা পাখিদের দিকে। আর শুনতে থাকে ওদের গান। মনে মনে ও বলে, আজ থেকে আমি তোমাদের দলে। আমাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য তোমাদের ধন্যবাদ। আমি আর ফিরে যাবো না মানুষ নামের ঐ অমানুষদের সমাজে। ওরা মানুষকে ভালোবাসে ততক্ষণ, যতক্ষণ নিজের স্বার্থ থাকে। আর স্বার্থ ফুরালেই তাকে নিক্ষেপ করে জ্বলন্ত অঙ্গারে।
‘হে গাছ! লতা-পাতা, ফুল, পাখি, ফল তোমরা আমাকে দূরে নিক্ষেপ কর না। আমি তোমাদের এই শান্ত পরিবেশে বাঁচতে চাই। আমাকে তোমাদের মাঝে ঠাঁই দাও।’ শেষের কথাগুলো একটু জোরে জোরে গাছের গোড়ায় বসে পাশের লতা-পাতাগুলো দু’হাতে জড়িয়ে ধরে ও।
উঠে ধীরে ধীরে আবার সেই পথ ধরে এগিয়ে চলে সাবিত। যেদিকে তাকায় শুধু গাছ আর গাছ। যেন এক সবুজের রাজ্য। পায়ে চলা পথের দু’পাশের গাছগুলো তাদের ডাল নিচু করে রেখেছে। যেন বলছে, স্বাগতম হে সাবিত, স্বাগতম।

পাখির গান শুনতে শুনতে, সবুজের রাজ্যটাকে উপভোগ করতে করতে আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলে সাবিত।
এক সময় গাছ-পালার মধ্যে হারিয়ে যায় পথ। এক মুহূর্ত থামেও। আবার দু’হাত দিয়ে গাছপালার ডাল সরাতে সরাতে সামনে এগিয়ে চলে। এভাবে এগিয়ে চলে আর নতুন গাছ দেখে, নতুন নতুন পাখি দেখে আর তাদের নতুন নতুন গান শোনে।
কিন্তু এভাবে আর কতক্ষণ হাঁটা যায়, ক্লান্তি এসে চেপে ধরে সাবিতকে। পা যেন আর উঠতে চায় না। তবুও অনেক কষ্টে পা টেনে টেনে হাঁটে, হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পড়ে কাঁটা ঝোপের ওপর। কনুই ছুলে যায়। কাঁটা ফুটে যায় হাতে পায়ে, তবুও থামে না ও।
এক সময় এক দেবদারু গাছে ঠুকে যায় কপাল। সাথে সাথে কপালে মাঝারি সাইজের একটা আলু গজায়। তবুও সাবিতের মধ্যে থামার কোন লক্ষণ নেই। আজ ও প্রতিজ্ঞায় অটল। কিছুতেই থামবে না। তাই ঢুলতে ঢুলতে চলতে থাকে সামনের দিকে।
এখানে বেশ খানিকটা জায়গা ফাঁকা। পাশের বড়ো গাছগুলোর ছায়া পড়েছে ওখানে। সবুজ ঘাস। গালিচার মতো জন্মে আছে। সাবিত এখানে ধপাস করে বসে পড়লো সবুজ ঘাসের গালিচায়। ধীরে ধীরে এলিয়ে দিলো ক্লান্ত শরীর।

এতক্ষণ পর সাবিতের মনে পড়ে বাড়ির কথা। আজ স্কুলে বিজ্ঞান পড়াটা সে প্রায় ঠিকই বলেছিল। শুধু শেষে অক্সিজেনের জায়গায় হাইড্রোজেন বলে ফেলে। অমনি স্যার তাঁর ত্রিশ বছরের পুরনো বেত নিয়ে সাবিতের দু’হাত লাল করতে থাকে। হাত উঁচু করে দেখে এখনও লাল এবং ব্যথা আছে।
বিজ্ঞান ক্লাস শেষ পিরিয়ডে। কিছুক্ষণ পর ছুটি হয়ে যায় স্কুল।
স্যারের মারের পর বাড়ি এলে আম্মু বলেন, ‘সাবিত তোমার ভাত বেড়ে রেডি করা আছে। জামা-কাপড় ছেড়ে হাত মুখ ধুয়ে খেয়ে নাও। আমার একটু কাজ আছে।’
স্যারের মার খেয়েছে। আম্মু নিজে এসে একটু আদর করে খেতে দেবে, তা না নিজে নিজে খাও। মনে মনে বলে সাবিত। মেজাজটা যায় বিগড়ে। পিতা-মাতার একমাত্র আদরের ধন। রাগতো হবারই কথা। তাই রাগে ফুঁসতে থাকে ও।

স্কুলব্যাগ টেবিলের ওপর ফেলে সাবিত বাড়ি থেকে বের হয়। আম্মু ভাবেন ছেলের রাগ হয়েছে। রাগ কমে গেলেই অন্য দিনের মতো বাড়ি চলে আসবে। তাই তখন তিনি বাধা দেননি।
কিন্তু সাবিত আজ বাড়ি যাবে না। ও পণ করেছে মানুষ নামের ঐ সমাজে সে আর থাকবে না। যাদের মায়া মমতা বলতে কিছু নেই। সারাক্ষণ এটা কর, ওটা কর-না করলে বকুনি। আর সহ্য হয় না এসব। কিন্তু এই গহিন বনে সে একা থাকবে কী করে? আর তার এখন যে অবস্থা তাতে একচুলও নড়তে পারবে না। বাড়িতে এমন হলে আম্মু তার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতেন। কিন্তু এখন …।
আম্মুর মুখটা ওর চোখের সামনে ভেসে উঠলো।
ও চেষ্টা করছে মানব সমাজের কোন কিছুই আর মনে করবে না। কিন্তু হচ্ছে না। বারবার মনে পড়ছে আম্মুর কথা। কেন এমন হয়!
এক সময় ও শোয়া থেকে উঠে বসে চিৎকার করে বলে, ‘না…..না……আ….আ…আমি ও সব মনে করতে চাই না।’ শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে কথাগুলো বলে। তারপর আবার ঢলে পড়ে সবুজ গালিচার ওপর।
ওর চিৎকারের পর পাখিগুলো যেন ওর সাথে একমত হয়ে কিচির মিচির করে বলে, ‘হ্যাঁ….হ্যাঁ তুমি আমাদের সঙ্গে থাকবে। তুমি আমাদের বন্ধু। তুমি আমাদের দলে।’

দুই.
শিয়ালের ‘হুক্কা হুয়া’ ডাকে ঘুম ভাঙে সাবিতের। ধড়মড় করে উঠে বসে। তারপর মনে পড়ে সে এখন বনে রয়েছে।
চারদিক ঘন অন্ধকার। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল তা মনে নেই। কিন্তু এই ঘোর অন্ধকারে ও এখন যাবে কোথায়?
দূরে কতগুলো হলুদ আলো দেখে ওর শরীরটা শিউরে ওঠে। মনে মনে বলে, কী ওগুলো? আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে রয়েছে কেন? আরে ওরাতো এদিকেই এগিয়ে আসছে।
ঘুম ভেঙেছিল হুকা হুয়া ডাক শুনে। আর ঐগুলো হলুদ আলো। দুয়ে মিলে দাঁড়াচ্ছে ঐগুলো শিয়াল। আবার শিয়াল কাঁচা মাংস খায়। তাহলে কী ওরা……। আর ভাবতে পারেনি সাবিত। দৌড় দিল পাশের বড়ো গাছটার দিকে। গাছের গোড়া থেকে একটি শক্ত দেখে লতা ছিঁড়ে নিয়ে তর তর করে উঠলো গাছে।
মামাবাড়িতে ও গাছে ওঠা শিখেছিল। ছোট মামা ওকে গাছে ওঠার ট্রেনিং দিয়েছিল। যাই হোক সেটা এখন কাজে লাগলো। মনে মনে সাবিত ছোট মামাকে ধন্যবাদ দিলো।
তেডালার গাছে ওঠে মোটা ডালটার সাথে নিজেকে লতা দিয়ে আচ্ছা করে বাঁধলো। তাকালো নিচের দিকে। শিয়ালগুলো ওপরের দিকে তাকিয়ে গাছের চারিদিকে কয়েকটা চক্কও দিলো। নাগাল না পাওয়ায় আঙুর ফল টক ভেবে রণে ভঙ্গ দিলো।
চলে গেল যে যার পথে। সাবিত আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলো।
এভাবে বয়ে চলেছে সময়। কিন্তু আর কতক্ষণ! পেটে ছুচোর ডাকা-ডাকি শুরু হয়ে গেছে। মনে পড়লো কোন সকালে ও নাস্তা করে স্কুলে যায়। তারপর এই পর্যন্ত আর কিছুই খাওয়া হয়নি।
এভাবে থাকলে তো আর চলবে না। পেটে তো কিছু দিতে হবে। নিচে নামতে সে সাহস পাচ্ছে না। নরখাদকের দল আশপাশে রয়েছে হয়তো। নামলে চারদিকে থেকে এসে ছিঁড়েকুড়ে খাবে। বেঘোরে প্রাণটা না দিয়ে এভাবে বসে থাকা শতগুণে ভালো। কিন্তু পেটতো মানছে না।
সাবিতের মনে পড়লো আম্মুর কথা। ক্ষুধা লাগলে আম্মু কীভাবে খাওয়াতেন সেই কথা। মন থেকে আবার ঝেড়ে ফেললো বাড়ির কথা।
আকাশের দিকে তাকালো সাবিত। দেখলো আকাশে নক্ষত্রের খই ফুটছে। বড়ো একটা নক্ষত্র, যেটাকে শুকতারা বলে- সেটা আকাশের একদিকে ঢলে পড়েছে। শুকতারা দেখে ও দিক নির্ণয় করতে পারে। এটাও ছোট মামার অবদান। তিনিই শিখিয়েছেন।
পেটকে ও সান্ত¡না দিয়ে মনে মনে বলল, ‘রাত আর বেশি নেই। আর মাত্র কয়টা ঘণ্টা। ভোর হলেই ফল সংগ্রহে বের হবো। পৃথিবীর প্রথম যুগের মানুষেরাতো ফলমূল খেয়ে জীবন-যাপন করতো। তাকেও তাই করতে হবে।

এক সময় সাবিত ঢলে পড়ে ঘুমের কোলে। ঘুম ভাঙে সূর্য যখন পুরোপুরি উঠে কিরণ দিতে শুধু করেছে তখন। জেগে দেখে সে গাছ পাঁজা করে আছে, যেমন করে কোলবালিশকে পাঁজা করে ঘুমায় তেমন করে।
নিচে নামার উদ্যোগ নিতেই মনে পড়লো সে নিজেকে নিজে বেঁধেছিল। বাঁধন খুলতে ঘটলো আর এক বিপত্তি। রাতে অন্ধকারে আচ্ছামত গিঁট দিয়েছিল। সেটা এখন আর খোলা যাচ্ছে না। এদিকে লতাটাও খুব শক্ত। অনেক চেষ্টা করেও ছেঁড়া গেল না। তখন মনে পড়ল পেছনের পকেটে ছুরি আছে। ছুরিটা বের করলো। বাঁটসহ পুরো ফলাটা স্টিলের। বাঁট থেকে ফলা বের করলো। এটা গত জ্যৈষ্ঠ মাসে ছোট মামা দিয়েছিলেন আম খাওয়ার জন্য। ভাগ্যিস বাড়ি থেকে আসার সময় ওটা সঙ্গে নিয়েছিল। নইলে কী দশা হতো?
বাঁধন কেটে নিচে নামলো সাবিত। পেটের ক্ষুধা মরে গেছে। তবে শরীরটা খুবই দুর্বল। পা বাড়াতেই মাথার মধ্যে একটা চক্কর দিয়ে ওঠে। তাড়াতাড়ি ঘাসের ওপর বসে পড়ে। যখন সে বুঝল হাঁটতে পারবে তখন হাঁটা ধরে বামদিকে। যেটা রাতেই স্থির করে রেখেছিলো ও।
সামনে কুচি কুচি পাতাওয়ালা এক গাছে আপেলের মত ফল ঝুলছে। তবে ফলের রং আপেলের মত নয়। সবুজ বর্ণের। সাবিত গিয়ে গাছের নিচে দাঁড়ালো। হাতের নাগালে ফল ঝুলছে। দুটো ছিঁড়ে দু’হাতে নিলো। কিন্তু কামড় বসালো না। নাজানি কোন বিষ ফল, খেয়ে শেষে বেঘোরে জীবনটা দেবে নাকি?
ও যখন এসব ভাবছে তখন একঝাঁক টিয়া উড়ে এসে বসলো গাছটাতে এবং টির টির করে ডাকতে ডাকতে ফলগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। যেন সাবিতকে লক্ষ্য করে বলল, ‘হে বন্ধু! আমরা এই ফল আহার করি। তুমিও খেতে পার।’

সাবিত ভাবলো টিয়া পাখি যদি এই ফল খেয়ে বাঁচতে পারে তবে আমার কোন সমস্য হওয়ার কথা না। যে ফল খেলে প্রাণিদেহে ক্ষতি হতে পারে তা কোন পাখি খায় না। কাজেই এই ফল খেতে কোন অসুবিধা নেই।
ও ডান হাতের ফলটাতে কামড় বসালো। তারপর চোখ-মুখ বন্ধ করে পুরো ত্রিশ সেকেন্ড স্থির হয়ে থাকলো। যেন বেহেস্তি চিজ পেয়েছে। সুন্দর স্বাদ ফলে। পেট পুরে খেল।
ফল খেয়ে ও গাছের নিচে একটু সময় বসলো। ঝিরিঝিরি বাতাস বয়ে চলেছে। ঝিমুনি মত এসেছিলো ওর। একটা কাটঠোকরার ট্রিট ট্রি..ই..ই..ই.. ট্রিট ট্রি..ই..ই..ই.. ট্রিট ট্রি..ই..ই..ই..ডাকে তন্দ্রা ছুটে গেল ওর। গাছের দিকে তাকিয়ে পাখিটাকে দেখলো।
বাতাস বন্ধ হয়ে গেছে। রোদ এসে পড়েছে ওর শরীরে। খুব গরম লাগতে শুরু করেছে। ও গাছের ছায়ায় গিয়ে দাঁড়ালো। গলা শুকিয়ে আসছে। দেখা দিল আর এক বিপত্তি। খুব তৃষ্ণা পেল ওর।
এই বন বাদাড়ে পানি পাবে কোথায়? চারিদিকে একবার চোখ বুলালো। বন ছাড়া চোখে কিছুই পড়লো না।
সাবিত ফিরে এলো রাতের সেই গাছটার কাছে। উঠতে আরম্ভ করল তরতর করে। মগডালে গিয়ে থামল। তাকালো বাঁয়ে তারপর ডানে। ডানে তাকিয়ে চোখ চকচক করে উঠলো ওর। ওপরে তাকালো। দেখলো সূর্যটা বামে আছে। অর্থাৎ ওকে যেতে হবে পশ্চিমে। যেহেতু সকাল। নিচে নেমে হাঁটা ধরলো পশ্চিম দিকে। অনেক কষ্টে ডাল-পালা ভেঙে পৌঁছালো ছোট একটা ডোবার কাছে।
ডোবার পানি কাচের মতো পরিষ্কার। ডোবাটার উত্তর দিকে একটা সরু নালার মতো চলে গেছে বহু দূরে। হয়তো কোন নদী, খাল বা পাহাড় হতে নেমে আসছে পানি।
ডোবার চারধার একবার দেখে নিলো সাবিত। সব পাশে উঁচু উঁচু ঘাস। শুধু দক্ষিণ দিকে চার ফুটের মতো জায়গা ছাড়া, ওখানে ঘাস নেই। বোঝা যাচ্ছে এটা ঘাট। আর এখানে নিয়মিত যাতায়াত আছে।
ঘাটে ছাগলের খুরের মতো দাগ দেখলো সাবিত। বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, এগুলো হরিণের পায়ের দাগ। আর তারা নিয়মিত এখানে পানি পান করে আসে।
ও দু’হাতের কোষ পুরো পানি খেয়ে তীরে ছায়া দেখে নরম ঘাসের ওপর বসলো। তৃষ্ণা ও ক্ষুধা দুই-ই এখন মোটামুটিভাবে মিটেছে।
উঠে দাঁড়ালো ও। নিজেকে এখন পুরোপুরি সুস্থবোধ করছে। এবার হাঁটা শুরু করল পূর্বদিকে সূর্যকে সামনে রেখে।

তিন.

ক্রমে বন আরো গভীর হাতে লাগলো। সূর্যটা এখন আর ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না। তবে যেটুকু বোঝা যায় তাতে করে ওটা এখন পশ্চিম দিকে কিছুটা ঢলে পড়েছে। সাবিত একটু জিরিয়ে নেবে বলে একটা গাছে হেলান দিয়ে বসলো। গাছের ডালে একটা হলুদ পাখি বসে আছে। পাখিটা দেখতে খুব সুন্দর। মহান শিল্পীর তুলিতে আঁকা যেন ওটা। ট্রি-ই-ই-ই-ই, ট্রি-ই-ই-ই-ই করে ডেকে চলেছে পাখিটা।
গাছটা গরান গাছ। সাবিতের কাছে পরিচিত না হলেও সে বইতে এর বর্ণনা পড়েছে। তাই চিনতে অসুবিধা হলো না।
সাবিত উঠে দাঁড়ালো। উদ্দেশ্য গাছ থেকে একটা ডাল কেটে সেটাকে লাঠি বানাবে। ও গাছের পাঁচ/ছয় ফুট মতো উঠেছে। অমনি পাখিটা উড়ে গেল।
সাইজ মতো একটা ডাল দেখে কাটতে বসল সাবিত ছুরি দিয়ে। কিন্তু দায়ের কাজ কি ছুরি দিয়ে হয়?
একটু একটু করে কাটতে লাগলো সাবিত। ওর হাত ব্যথা হয়ে গেছে। ছুরিতেও ধার কমে আসছে। কিন্তু দমল না সাবিত। ও জানে অসম্ভবকে মানুষই সম্ভব করতে পারে। এই বনে থাকতে হলে হাতিয়ার একটা থাকতেই হবে। আর আপাতত লাঠি হলো সেই হাতিয়ার।
লাঠি যখন পুরোপুরি তৈরি হয়ে গেছে তখন সূর্য পশ্চিম আকাশে ডুবতে চলেছে। ইতোমধ্যে পেটের সবকিছু হজম হয়ে গেছে ওর।
সাবিত আবার সামনে অর্থাৎ পূর্ব দিকে হাঁটা ধরলো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে তাকে খাদ্য এবং একটা ভালো গাছ খুঁজে বের করতে হবে। যাতে গাছের ডালে ভালোভাবে রাত কাটানো যায়।
তবে পিছনের কোন খাদ্যের উৎসে ফিরবে না সে।
সাবিত হেড়ে গলায় গেয়ে উঠলো: ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে
তবে একলা চলোরে …….।’
সাবিতের গান শুনে একটা কাঠঠোকরা ট্রি-ই-ই-ই-ই-ই করে উড়ে গেল। যেন বলল, ‘তোমার গানের গলা ভালো নয়।’
তবুও হেড়ে গলায় গান গেয়ে চলল ও।
বেশ কিছুক্ষণ সাবিত লক্ষ করলো তার সাথে সাথে একঝাঁক নানান জাতের পাখিও সুর মিলাচ্ছে। ও মনে মনে পাখিদের আর একবার ধন্যবাদ দিলো।
পাখিগুলো এখন সামনের এক আঙ্গুর ঝোপে আঙ্গুর খেতে বসলো।
সাবিত এগুলো গাছটার দিকে। হাতের নাগালে অনেক আঙ্গুর ঝুলছে। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে পেট ভরে পেড়ে খেলো আর কিছু থোকা একটা লতায় বেঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে চলল।
সূর্যটা ডুবে গেছে। চারদিক থেকে ঘনকালো অন্ধকার সাবিতকে গ্রাস করতে এগিয়ে আসছে। সাবিত আরো জোরে চলার চেষ্টা করছে। কিন্তু ক্রমে তার গতি কমে আসছে জঙ্গল ঘন হওয়ার কারণে।
এক জারুল গাছ তলে এসে থামলো সাবিত। ওপরের দিকে একবার তাকিয়ে তরতর করে উঠলো গাছে। ইতোমধ্যে অন্ধকার গাঢ় হয়ে গেছে।
একটা জুতসই ডালে বসে আঙুরের লতা ডালে বাঁধলো। আর পূর্বের নিয়মে নিজেকে গাছের ডালে বেঁধে আকাশের দিকে তাকালো। কিন্তু কোথায় আকাশ? যেন কাল কাল শামিয়ানা দিয়ে ঢেকে দিয়েছে কেউ। পাশের গাছগুলো আরো বড়ো। সেগুলোর ডাল-পালার কারণে সাবিত আকাশ দেখতে পাচ্ছে না।
আঙ্গুর গাছ থেকে এ পর্যন্ত সাবিত বহু দূর হেঁটে এসেছে। ক্ষুধা যে লাগেনি তা নয়। একটা একটা করে আঙ্গুর খেতে লাগলো ও। আঙ্গুরগুলো মোটেই টক নয়। দারুণ সুস্বাদু, তবে আঙ্গুর খেয়ে একটা লাভ হচ্ছে সেটা হলো তৃষ্ণা লাগছে না।
চারদিকে মিটমিট করে জোনাকি জ্বলছে। এতে পরিবেশটা আরো ভুতুড়ে লাগছে। সাবিতের যে ভয় করছে না তা কিন্তু না। কিন্তু ভয় করলে কী হবে। সে যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
একসময় ঘুমিয়ে পড়ে ও। মাঝ রাতের দিকে একটা পাখির করুণ আর্তনাদে ঘুম ভেঙে যায় ওর। ডাকটা তার মাথার ওপর থেকেই আসছে। অর্থাৎ পাশের গাছের যে ডালটা এই গাছের ওপর রয়েছে সেটা থেকে। করুণ সুরে ডেকে চলেছে পাখিটা। যেন প্রিয় হারাবার ব্যথা ওর সুরে।
হঠাৎ সাবিতের দু’হাত ওপরের ডালে তিন চার হাত লম্বা কালো কী যেন ঝপাৎ করে পড়ে। ও লাফিয়ে ওঠে। কয়েক মুহূর্ত অতিবাহিত হবার পর সে অনুভব করে পায়ের ওপর দিয়ে ঠাণ্ডা কী যেন চলে যাচ্ছে। [চলবে]

SHARE

Leave a Reply