Home বিজ্ঞান ও বিশ্ব চকোলেট পাহাড় -নাসিম আলম

চকোলেট পাহাড় -নাসিম আলম

ফিলিপাইনের বহোল রাজ্য মূলত সাদা বালুর বিচের জন্য পরিচিত। এই রাজ্যের চকোলেট পাহাড় ইদানীং নজর কেড়েছে পর্যটক ও প্রকৃতিপ্রেমীদের। যতই ভিন্ন আকৃতির এই পাহাড়ের তথ্য সামনে আসছে, ততই ভ্রমণপিপাসু আর প্রকৃতি ভালোবাসা মানুষের অন্তরে জায়গা করে নিচ্ছে চকোলেট পাহাড়।
পাহাড়গুলোর উৎপত্তি হয়েছে প্লাইয়োসিন সময়ের শেষ থেকে প্লাইস্টোসিন পিরিয়ডে। নিখুঁত কোণ আকৃতির বা ডোম আকৃতির প্রায় ১২৬৮টি পাহাড়কে একত্রে বলা হয় চকোলেট হিল। এগুলোর বিস্তৃতি ৫০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে।

ফিলিপাইনের বহোলের পাহাড়গুলো সব একই আকৃতির। দেখতে একদম কোণের মতো। এই পাহাড়ি এলাকার ভূ-তাত্ত্বিক গঠন অন্যান্য এলাকার চেয়ে বেশ আলাদা, যে কারণে একই আকৃতির পাহাড় গড়ে উঠেছে।
বহোলের চকোলেট পাহাড় কারমেন, সাগবায়ান, বাতুয়ান, বিলার, সিয়েরা বুলোনেস ও ভ্যালেন্সিয়া শহরের মোট ৫০ স্কয়ার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে অবস্থিত। উচ্চতায় এই পাহাড়গুলো ৩০ মিটার থেকে ১২০ মিটার পর্যন্ত হয়। এগুলো আসলে ঘাস আবৃত চুনাপাথরের পাহাড়। শুষ্ক মৌসুমে ঘাস আবৃত পাহাড়গুলোর ঘাস আবরণ শুকিয়ে বাদামি চকোলেট রঙ ধারণ করে। এ কারণেই পাহাড়গুলোর নাম চকোলিট হিল হয়েছে।
সাধারণত পাহাড়ের গায়ে গাছ বা ঘাস সেভাবে থাকে না। পাহাড়ের আলাদা একটি রঙ স্পষ্ট থাকে। কিন্তু এই চকোলেট পাহাড় সেদিক থেকে ভিন্ন। পাহাড় পুরো ঢেকে আছে সবুজ ঘাসে।
গ্রীষ্মকালে বহোলে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয় না। সবুজ ঘাস শুকিয়ে বাদামি বর্ণের হয়ে যায়। পাহাড়ে ঘাস হয় সাধারণত দুই জাতের, ইমপেরাটা সিলিনড্রিকা ও স্যাকারাম স্পনটেনিয়াম। ঘাস ছাড়াও পাহাড়ের কোলে বেড়ে ওঠে অ্যাস্টার, ডেইজিসহ বিভিন্ন জাতের ফুল আর ফার্নগাছ। পাহাড়ের গায়ে বড়ো উদ্ভিদ জন্মাতে পারে না। এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড় পর্যন্ত খালি জায়গায় আখ, গম, ধানসহ বিভিন্ন ধরনের ফসলের চাষ হয়। তবে সাধারণত বর্ষাকালে যখন বৃষ্টি হয়, তখনই শুধু এই চাষ করা সম্ভব।
পাহাড়গুলো সরু থেকে মধ্যম স্তরের বালুসমৃদ্ধ সামুদ্রিক চুনাপাথর দিয়ে তৈরি। চুনাপাথরগুলোতে প্রচুর অগভীর সামুদ্রিক ফোরামেনিফেরা, কোরাল, শামুক এবং এলজি ধরনের জীবাশ্ম পাওয়া যায়।
কনিকাল আকৃতির পাহাড়গুলোকে ককপিট কারস্ট বলা হয়। এগুলো বৃষ্টির পানিতে ক্ষয় হয়ে কিছুটা দ্রবীভূত হয়ে ভেসে গিয়ে এরকম আকার ধারণ করেছে। পাহড়গুলো সমভূমি দিয়ে একটি থেকে আরেকটি পৃথক হয়েছে। এগুলোতে অনেক গহ্বর ও ঝরনা দেখা যায়।

এই পাহাড়গুলো বছরের পর বছর ধরে ঘাসসহ বিভিন্ন উদ্ভিদের বেঁচে থাকার উৎস হয়ে উঠেছে। প্রথম দেখায় প্রাকৃতিকভাবে এমনভাবে গড়ে ওঠা পাহাড় দেখে বেশ অবিশ্বাস্যই লাগে।
গ্রীষ্মকালের শেষের দিকে পাহাড়ের গায়ে জন্মানো ঘাসগুলো ধীরে ধীরে যখন বাদামি বর্ণের হয়ে আসে, তখন দূর থেকে দেখতে এগুলোকে একদম চকোলেট বারের মতো মনে হয়।
বহোলের এই চকোলেট পাহাড়কে ফিলিপাইনের জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে মানা হয়। চমৎকার এই পাহাড় কীভাবে গড়ে উঠল অথবা এর ইতিহাসই-বা কী, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বেশ কিছু মতভেদ আছে।
অনেকের মতে, সাগরের পানির নিচ থেকে উঠে আসা প্রবাল থেকে, উপ-মহাসাগরের আগ্নেয়গিরি থেকে অথবা চুনাপাথর জমতে জমতে এই পাহাড় গড়ে উঠেছে।
তবে এই মতামতের বিরোধিতাও করেন বেশ কয়েকজন ভূ-তাত্ত্বিক। তাদের মতে, শত শত বছর আগে সমুদ্র থেকে বিস্ফোরিত হয়ে অনেক কোরাল বাইরে চলে আসে। বাতাস, বৃষ্টির পানি আর ক্ষয় হতে হতে হাজার বছর ধরে সেগুলোই জমতে জমতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই পাহাড় গড়ে উঠতে সহায়তা করেছে। মতভেদ থাকায় নির্দিষ্ট করে এখনো এর গঠন নিয়ে খুব বেশি তথ্য জানা যায়নি।
বিজ্ঞানীদের মতে পাহাড় যদি চুনাপাথর থেকে তৈরি হয়, তবে এই চুনাপাথরই-বা কোথা থেকে এলো! এই প্রশ্নের সম্ভাবনাময় একটি উত্তর হচ্ছে, এই এলাকায় আগ্নেয়গিরি হয়েছিল কোনো একসময়। আর সেখান থেকেই চুনাপাথর বিস্ফোরিত হয়েছে। আবার এমনও হতে পারে যে, সামুদ্রিক আগ্নেয়গিরি থেকে প্রবালের সঙ্গে চুনাপাথরও উঠে এসেছে।

পাহাড়ের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখার জন্য তৈরি করা হয়েছে ভিউয়িং ডেক। সেখানে দাঁড়িয়ে যে কেউ পাহাড় দেখতে পারবেন, ছবি তুলতে পারবেন।
ফিলিপাইনের হোক অথবা বাইরের, দর্শনার্থীরা যেন চকোলেট পাহাড়ের দারুণ এই অভিজ্ঞতা নিতে পারেন, সেজন্য ১২৬৮টি পাহাড় নিয়ে দুই শহরে দুটো রিসোর্ট তৈরি করা হয়েছে।
এদের মধ্যে একটি হচ্ছে কারমেন শহরের চকোলেট হিলস কমপ্লেক্স। এটি বেশ পুরনো। পরিচালনা করছে দেশটির সরকার। তাদের একটি হোটেল, রেস্টুরেন্ট, গিফট শপ, সুইমিং পুল আর পাহাড় দেখার জন্য মাটি থেকে ২১০ ফুট উচ্চতার একটি ডেক রয়েছে।
এই ভিউয়িং ডেক পাহাড়ি এই এলাকায় সবচেয়ে উঁচু। ২১৪ সিঁড়ি ওপরে উঠে এখানে দাঁড়িয়ে পুরো চকোলেট পাহাড়ের এলাকা বেশ ভালোভাবে দেখা যায়। দর্শনার্থীরা এই সিঁড়ির নাম দিয়েছেন ‘স্বর্গের সিঁড়ি’।
সাগবায়ান শহরে অবস্থিত অন্য রিসোর্টটির নাম সাগবায়ান পিক। এই রিসোর্ট থেকে শুধু চকোলেট পাহাড় নয়, দেখা যাবে চিবু ও বহোলকে আলাদা করা নীল সাগরও।
সাগবায়ানেও রয়েছে রেস্টুরেন্ট, সুইমিং পুল, শিশুপার্ক। পাহাড় দেখানোর জন্য শুধু রেস্টুরেন্ট বা ডেকই তৈরি করেনি সাগবায়ান। তৈরি করেছে টারসিয়ারদের অভয়ারণ্য। দেখতে খুব আদুরে হলেও এই প্রাণীদের সহজে ধরার কোনো উপায় নেই। বনের নির্দিষ্ট জায়গা ছেড়ে অন্য কোথাও নিলেই তারা আত্মহত্যা করে, মাথা ঠুকরে অথবা সারা দিন না খেয়ে মারা যাবে।

বিশ্বের মাত্র চার-পাঁচটি দেশে এদের দেখা পাওয়া যায়। সেজন্য এই পাহাড়ের অভয়ারণ্য তাদের বেঁচে থাকার জন্য ভীষণ দরকারি একটি জায়গা। এখানে আরো আছে বাটারফ্লাই ডোম, গলফ কোর্স ও ড্রাইভিং রেঞ্জ।
১৯৮৮ সালের ১৮ জুন, ন্যাশনাল কমিটি অন জিওলজিক্যাল সায়েন্স ভিন্নতা, বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব এবং আকর্ষণীয় দৃশ্যের জন্য এই পাহাড়কে ফিলিপাইনের তৃতীয় জাতীয় ভূ-তাত্ত্বিক স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে ঘোষণা দেয়। এ ছাড়া এটি পর্যটকদের গন্তব্য হিসেবে যুক্ত হয়েছে ফিলিপাইনের ট্যুরিজম অথরিটির সঙ্গেও। ২০০৬ সালের ১৬ মে ইউনেসকো একে প্রাকৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা দেয়।

SHARE

Leave a Reply