Home দেশ-মহাদেশ গণতন্ত্রের সূতিকাগার গ্রিস -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

গণতন্ত্রের সূতিকাগার গ্রিস -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

গ্রিসের সরকারি নাম হেলেনিক প্রজাতন্ত্র। তবে দেশটি হেলাস নামেও পরিচিত। ইউরোপ মহাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশের এই রাষ্ট্রটি বলকান উপদ্বীপের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। এর সীমান্তবর্তী রাষ্ট্রগুলো হচ্ছে উত্তরে বুলগেরিয়া, প্রাক্তন যুগোশ্লাভিয়া প্রজাতন্ত্রী মেসিডোনিয়া ও আলবেনিয়া; পূর্বে তুরস্ক। গ্রিসের মূল ভূমির পূর্বে ও দক্ষিণে এজিয়ান সাগর অবস্থিত, আর পশ্চিমে রয়েছে আয়োনিয়ান সাগর। পূর্ব ভূমধ্যসাগরের উভয় অংশে গ্রিসের অনেকগুলো দ্বীপ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ২২৭টিতে মানববসতি রয়েছে। গ্রিস ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকার মিলন স্থলে অবস্থিত। এথেন্স এদেশের রাজধানী ও বৃহত্তম নগরী।
গ্রিসের শতকরা ৮০ ভাগ পর্বতময়। এর ফলে দেশটি ইউরোপের সবচেয়ে পর্বতময় দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। মাউন্ট অলিম্পাস এদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ, যার উচ্চতা ২ হাজার ৯১৮ মিটার (৯,৫৭৩ ফুট)। দেশটি ৯টি ঐতিহ্যবাহী ভৌগোলিক অঞ্চল নিয়ে গঠিত। সেগুলো হলো মেসিডোনিয়া, সেন্ট্রাল গ্রিস, পেলোপোন্নেজ, থেসালি, ইপিরাস, এজিয়ান দ্বীপপুঞ্জ (ডোডেকানিজ ও সাইকেলডাস সহ), থ্রেস, ক্রিট ও আয়োনিয়ান দ্বীপপুঞ্জ।
গ্রিসের আয়তন ১ লাখ ৩১ হাজার ৯৫৭ বর্গকিলোমিটার (৫০ হাজার ৯৪৯ বর্গমাইল)। জনসংখ্যা ১ কোটি ৭ লাখ ২৪ হাজার ৫৯৯ জন। জাতিগত গ্রুপের মধ্যে রয়েছে গ্রিক ৯১.৬ শতাংশ, আলবেনীয় ৪.৪ শতাংশ এবং অন্যান্য ৪ শতাংশ। প্রধান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রয়েছে গ্রিক অর্থোডক্স খ্রিষ্টান (রাষ্ট্রধর্ম) ৮১-৯০ শতাংশ, মুসলিম ২ শতাংশ, অন্যান্য ৩ শতাংশ, অধার্মিক ৪-১৫ শতাংশ এবং অনির্দিষ্ট ১ শতাংশ। এদেশের সরকারি ও জাতীয় ভাষা গ্রিক। জনগণের শতকরা ৯৯ শতাংশ গ্রিক ভাষায় এবং ১ শতাংশ অন্যান্য (ইংরেজি ও ফরাসিসহ) ভাষায় কথা বলে। এদেশের মানুষের গড় আয়ু ৮১.১ বছর। গ্রিকদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বর্তমানে নেতিবাচক (-০.৩১%)। এ কারণে জনসংখ্যা প্রতি বছরই হ্রাস পাচ্ছে।
বর্তমান গ্রিকদের পূর্বপুরুষ হচ্ছে এক সময়ের পৃথিবী বিজয়ী প্রাচীন গ্রিক সভ্যতা, বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য এবং প্রায় ৪ শতাব্দীর উসমানীয় সাম্রাজ্য। এই দেশটি পশ্চিমা বিশ্বের জ্ঞান বিজ্ঞানের সূতিকাগার এবং গণতন্ত্রের জন্মস্থান হিসেবে সুপরিচিত। গ্রিসের আরও কিছু বৃহৎ অবদান হচ্ছে পশ্চিমা দর্শন, অলিম্পিক গেম্স, পশ্চিমা সাহিত্য, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং নাটক। সব মিলিয়ে গ্রিসের সভ্যতা সমগ্র ইউরোপে এক সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী সভ্যতা হিসেবে পরিগণিত হতো। প্রাচীন গ্রিসের প্রখ্যাত দার্শনিকদের মধ্যে রয়েছেন সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টেটল এবং আরো অনেকে।
খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দী থেকে গ্রিকরা পোলিস নামে পরিচিত বিভিন্ন স্বাধীন নগর-রাষ্ট্রে সংগঠিত ছিলো, যা ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণসাগরের মাঝে বিস্তৃত ছিল। মেসিডোনের ফিলিপ দ্বিতীয় খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে বর্তমানকালের গ্রিসের বেশির ভাগকে একীভূত করেন। তার পুত্র আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে ভারত পর্যন্ত প্রাচীন বিশ্বের বেশির ভাগ অংশ জয় করেন।
পরবর্তী হেলেনিক আমলে প্রাচীনকালের গ্রিক সংস্কৃতি ও প্রভাব তুঙ্গে পৌঁছে। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে রোম গ্রিসকে কুক্ষিগত করে এবং গ্রিস রোমান সা¤্রাজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়। এরপর এর উত্তরসূরি বাইজান্টাইন সা¤্রাজ্য গ্রিক ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নেয়। প্রথম খ্রিষ্টাব্দে আবির্ভূত গ্রিক অর্থোডক্স চার্চ আধুনিক গ্রিক পরিচিতির রূপ দিতে এবং বিস্তৃত অর্থোডক্স বিশ্বে গ্রিক ঐতিহ্য সঞ্চারে সহায়তা করে। পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি উসমানীয় সা¤্রাজ্যের শাসনাধীনে চলে যায় গ্রিস। অতঃপর স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৮৩০ সালে গ্রিস আধুনিক জাতি রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়।
বর্তমানে গ্রিস উচ্চ-আয়ের অর্থনীতিসহ একটি উন্নত দেশ। এদেশের মানুষের জীবন যাত্রার মান বেশ উন্নত। বলকান অঞ্চলে গ্রিসের অর্থনীতি বৃহত্তম এবং এ অঞ্চলে দেশটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগকারী। গ্রিসের অর্থনীতি জাতীয় উৎপাদনের ধারাক্রম অনুযায়ী প্রধানত সেবা খাত (৮৫ শতাংশ), শিল্প (১২ শতাংশ) ও কৃষি (৩ শতাংশ) ভিত্তিক। পর্যটন এদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। এদেশের মুদ্রার নাম ইউরো।
গ্রিস জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ১৯৮১ সাল থেকে গ্রিস ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য। এ ছাড়া এটি ২০০১ সাল থেকে ইকোনমিক অ্যান্ড মনিটারি ইউনিয়ন অফ দ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ১৯৫১ সাল থেকে ন্যাটো এবং ১৯৬০ সাল থেকে ওইসিডি-এর সদস্য। গ্রিসের অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, বড় পর্যটন শিল্প, উন্নত জাহাজ চলাচল খাত এবং ভূকৌশলগত গুরুত্ব তাকে মধ্যম শক্তিতে পরিণত করেছে।
গ্রিসের রাজনীতি একটি সংসদীয় প্রতিনিধিত্বমূলক বহুদলীয় গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় পরিচালিত হয়। এদেশের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ক্যাটেরিনা সাকেলারো পাউলাউ এবং প্রধানমন্ত্রী কাইরিয়াকস মিতসোতাকিস। সরকারপ্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের ওপর ন্যস্ত। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সরকার এবং আইনসভা উভয়ের ওপর ন্যস্ত। আইনসভা এককক্ষবিশিষ্ট, এর নাম হেলেনিক পার্লামেন্ট এবং সদস্য সংখ্যা ৩০০। বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভা হতে স্বাধীন।
গ্রিস ১৩টি প্রশাসনিক অঞ্চলে এবং অঞ্চলগুলো আবার ৩২৫টি পৌরসভায় বিভক্ত। ৫৪টি প্রাচীন প্রিফেকচার এবং প্রিফেকচার-পর্যায়ের প্রশাসনগুলোকে অঞ্চলগুলোর সাব-ইউনিট হিসেবে রাখা হয়েছে। এছাড়া আঞ্চলিক ভিত্তিতে প্রশাসনিক উদ্দেশ্যে এক থেকে তিনটি অঞ্চল নিয়ে ৭টি বিকেন্দ্রীয়করণকৃত প্রশাসন গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। এদেশে সেন্ট্রাল মেসিডোনিয়া অঞ্চলের সীমান্তে মাউন্ট অথোস নামে একটি স্বায়ত্তশাসিত এলাকা রয়েছে। গ্রিসের ১৩টি অঞ্চল (রাজধানীসহ) হলো আত্তিকা (এথেন্স), সেন্ট্রাল গ্রিস (লামিয়া), সেন্ট্রাল মেসিডোনিয়া (থেসালোনিকি), ক্রিট (হেরাকলিয়ন), পূর্ব মেসিডোনিয়া ও থ্রেস (কোমোতিনি), ইপিরাস (আয়োনিনা), আয়োনিয়ান দ্বীপপুঞ্জ (করফু), উত্তর ইজিয়ান (মাইতলিনি), পেলোপোন্নেস (ত্রিপোলি), দক্ষিণ ইজিয়ান (ইরমাউপোলি), থেসালি (লারিসা), পশ্চিম গ্রিস (প্যাট্রাস) ও পশ্চিম মেসিডোনিয়া (কোজানি)।
গ্রিসের আবহাওয়া প্রাথমিকভাবে ভূমধ্যসাগরীয়। এখানে শীতকাল মৃদু ও ভেজা এবং গ্রীষ্মকাল গরম ও শুষ্ক। সব উপকূলীয় এলাকায়ই এরকম আবহাওয়া বিরাজ করে। পার্বত্য এলাকায় প্রচণ্ড তুষারপাতসহ আলপাইন আবহাওয়া বিরাজ করে। উত্তর গ্রিসের অভ্যন্তর ভাগে নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া বিরাজ করে অর্থাৎ এখানকার শীতকাল ঠাণ্ডা ও আর্দ্র এবং গ্রীষ্মকাল গরম ও শুষ্ক। সেইসাথে ঘনঘন বজ্রপাত হয়। পার্বত্য ও উত্তর অঞ্চলে প্রতি বছরই তুষারপাত হয় এবং সংক্ষিপ্ত তুষারপাত এথেন্সসহ নিচু দক্ষিণাঞ্চলে প্রায়ই হয়ে থাকে।
জনপ্রিয় গ্রিক খাবার ভূমধ্যসাগরীয় খাবারের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। যা আসলে ক্রেটের খাবারেরই প্রতিনিধিত্ব করে। গ্রিক জনপ্রিয় খাবারে বিচিত্র স্থানীয় খাবার যেমন মাওসাকা, পাসতিতসিও, মানসম্মত গ্রিক সালাদ, ফাসোলাদা, স্পানাকোপিতা ও সাওভলাকির টাটকা উপাদানগুলো একীভূত করা হয়। কিছু খাবার সেই প্রাচীন গ্রিক আমল থেকে চলে আসছে যেমন স্করডালিয়া (আখরোট, কাঠবাদাম, রসুন ও অলিভ অয়েলের ঘন পুরী), মশুরডালের সুপ, রেটসিনা ও পাসটেলি (মধু দিয়ে বেক করা তিলসহ ক্যান্ডিবার)। সারা গ্রিসে মানুষ ছোট ছোট খাবারের পদ থেকে খাওয়া উপভোগ করে। যেমন জাতজিকির মতো নানারকম সসের সাথে ক্ষুধাবর্ধক বা রুচিকর খাবার মেজ, গ্রিলকৃত অক্টোপাস ও ছোট মাছ, ফেটা পনির, ডলমেট (দ্রাক্ষা পাতায় মোড়ানো ভাত, কিশমিশ ও পাইন শাঁস), নানারকম ডাল, জলপাই ও পনির। এদেশে প্রায় সব খাবারের সাথেই অলিভ অয়েল যোগ করা হয়।
গ্রিসে অ্যাথলেটিকস, ফুটবল, বাস্কেটবল, ভলিবল, ওয়াটার পোলো ইত্যাদি নানা খেলা করা হয়ে থাকে। গ্রিস প্রাচীন অলিম্পিক গেমসের জন্মস্থান। এদেশের অলিম্পিয়ায় খ্রিষ্টপূর্ব ৭৭৬ সালে অলিম্পিক গেমস শুরু হয় বলে রেকর্ড আছে। গ্রিস দু’বার আধুনিক অলিম্পিক গেমসের আতিথেয়তা করেছে। উদ্বোধনী ১৮৯৬ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকস এবং ২০০৪ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকস। আধুনিক অলিম্পিকসের প্রতিষ্ঠাতা দেশ হিসেবে দেশসমূহের কুচকাওয়াজের সময় গ্রিসকে সবসময় প্রথমে ডাকা হয়। দেশটি এ পর্যন্ত গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক গেমসের প্রত্যেকটিতে অংশগ্রহণ করেছে। আর এ পর্যন্ত মাত্র চারটি দেশ এটা করতে পেরেছে।
গ্রিক জাতীয় ফুটবল দলের সাফল্যের মধ্যে রয়েছে তারা বিশ্বকাপ ফুটবলে ২০০৮ ও ২০১১ সালে অষ্টম স্থানে পৌঁছে। এছাড়া ইউরো ২০০৪ এ গ্রিস ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপা লাভ করে। গ্রিক সুপার লিগ হচ্ছে দেশটির সর্বোচ্চ পেশাগত ফুটবল লিগ। এই লিগে ১৬টি দল অংশগ্রহণ করে থাকে।
গ্রিক জাতীয় বাস্কেটবল দল কয়েক দশক ধরে অসাধারণ ক্রীড়া নৈপুণ্য দেখিয়ে আসছে। এই দলটি বিশ্বের শীর্ষ বাস্কেটবল দলগুলোর মধ্যে অন্যতম। ২০১২ সালে এই দলটি বিশ্বে চতুর্থ এবং ইউরোপে দ্বিতীয় স্থান লাভ করে। তারা ১৯৮৭ ও ২০০৫ সালে দু’বার ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপা লাভ করে এবং সর্বশেষ চারটি ফিবা বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের দু’টিতে শেষ চারে পৌঁছে। এ ছাড়া ২০০৬ সালের ফিবা ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থান লাভ করে।

SHARE

Leave a Reply