Home স্বপ্নমুখর জীবন চেষ্টা ও পরিশ্রম উন্নতির চাবিকাঠি -আমিনুল ইসলাম ফারুক

চেষ্টা ও পরিশ্রম উন্নতির চাবিকাঠি -আমিনুল ইসলাম ফারুক

2য় পর্ব
তুমি যদি সত্যি সত্যি একজন বড়ো মানুষ হতে চাও, তবে অসাধারণ পরিশ্রমী হও। দেখবে, কোনো বাধাই তোমার কাছে বাধা বলে মনে হবে না। ছোটবেলায় তুমি হয়তো পড়াশোনায় খুব একটা ভালো ছিলে না কিন্তু তাতে কী। ছোটবেলায় পড়াশোনায় ভালো না হলে বড়ো হয়ে যে, সে আর ভালো হবে না, এ কথার কোনো মানে নেই। ক্রমাগত চেষ্টা আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তুমি নিজেকে যে কোনো সময়ে বদলাতে পারো। কারণ আর সবকিছু মানুষকে ধোঁকা দিলেও শিক্ষা এবং পরিশ্রম এই দুটো জিনিস মানুষকে কখনো ধোঁকা দেয় না। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১) এ প্রসঙ্গে একটি চমৎকার কথা বলেছেন- ‘মানুষের যদি বড়ো হবার জন্য কঠোর পরিশ্রম আর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা থাকে; তাহলে কোনো বাধাই তাকে টলাতে পারে না। সহায় সম্পদও তার আপনা-আপনি জুটে যায়।’
আগেকার দিনে টাকা পয়সার অভাবে অনেক গরিব ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া বেশি দূর এগোতে পারত না। কিন্তু যারা সত্যিকারের প্রতিভাবান ও পরিশ্রমপ্রিয় ছিলেন তাদের এই দুর্বলতা বড়ো হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। এমন অনেক মনীষী আছেন, যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেননি। অনেকে তো ইচ্ছে করেই করেননি। যেমন- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)। তিনি স্কুলের শিক্ষা সমাপনান্তে কোনো সার্টিফিকেট নেননি। এজন্য তাঁকে নন ম্যাট্রিক বলা হয়। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৭) তো প্রথাগত শিক্ষার সুযোগই পাননি। তাই বলে নজরুলের বিদ্রোহী কবি হওয়া আটকে থাকেনি। তিনি সারাদিন রুটির দোকানে কাজ করে রাতে ল্যাম্প লাইটের নিচে বসে পড়াশোনা করেছেন, লিখেছেন অজস্র কবিতা ও গান।
বিখ্যাত ডিটেকটিভ গল্প লেখিকা আগাথা ক্রিস্টির কোনো প্রথাগত শিক্ষা ছিল না। অথচ তিনি বই লিখে সেই সময়ে পাঁচ কোটি ডলার আয় করেছেন। তাঁর সাড়াজাগানো ‘স্লিপিং মার্ডার’ বইটির পেপারব্যাক কপিরাইট ৭৫ লাখ ডলারে বিক্রি হয়েছিল।
আমি মনে করি, কোনো মানুষ যদি সব দিকে ব্যর্থ হয়; কিন্তু মনুষ্যত্ব বাঁচিয়ে রাখে, তাহলে তাঁর জন্ম সার্থক। মার্টিন লুথার কিং (১৯২৯-১৯৬৮) আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি ঠিকই কিন্তু ব্যক্তিত্বে, জ্ঞানে, সাহসিকতায় ও জনপ্রিয়তায় অনেক রাষ্ট্রনায়ককে ছাড়িয়ে গেছেন। রবার্ট ব্রুস (১২৭৪-১৩২৯) এর নাম শুনেছো নিশ্চয়ই। তিনি একুশবার যুদ্ধে হেরে গিয়েও তাঁর হারানো রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে পেরেছিলেন। আর তিনি এই বারবার চেষ্টা আর এত পরিশ্রম করার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন মাকড়সার জাল বুনা থেকে।
উহুদ যুদ্ধের ইতিহাস তোমরা অনেকেই জানো। এই যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দে। মুসলিম সৈন্যসংখ্যা ছিল মাত্র এক হাজার। অপরদিকে কাফিরদের সৈন্যসংখ্যা ছিল তিন হাজার এবং তাদের অস্ত্রশস্ত্রও ছিল মুসলিম বাহিনীর তুলনায় অনেক বেশি। কাফিরদের মোকাবেলায় সাময়িকভাবে পরাজয় বরণ করেছিল মুসলিম বাহিনী। এই যুদ্ধে প্রিয় নবীর দাঁত ভেঙে গিয়েছিল। শহিদ হয়েছিলেন ৭০ জন মুজাহিদ সাহাবি। উহুদের এই পরাজয় থেকে মুসলিমরা শিক্ষা গ্রহণ করেন। যার ফলে মাত্র দুই বছর পরে ৬২৭ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত খন্দকের যুদ্ধে মুসলমানরা আবার বিজয়ী হন। সুতরাং পরিশ্রমী ও উদ্যমী মানুষ ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করে এক জনমেই সফল হতে পারে।
বড়ো হওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার প্রচণ্ড পরিশ্রম, ধৈর্য, সাহস, সংযম আর বিচক্ষণতা। একজন মানুষের শুধু বুদ্ধি থাকলেই চলে না, বিচক্ষণতাও থাকতে হয়। একজন সিঁদেল চোরের বুদ্ধি সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক গুণ বেশি। একজন পকেটমার যে ঝুঁকি নেয় সাধারণ মানুষ তা পারে না। একজন মুটে যে পরিশ্রম করে, সাধারণ মানুষ তার সিকিভাগও করে না। কিন্তু তারা কি জীবনে সফল? মোটেও না। তারা সমাজে হয় উপেক্ষিত ও ধিক্কৃত। কারণ তাদের সাফল্য নেতিবাচক। বিচক্ষণতাই বুদ্ধিকে সুপথে এবং ন্যায়ের পথে পরিচালনা করতে পারে। তখন মানুষ যে শ্রম দেয় সেই শ্রম সার্থক হয়।
পড়াশোনা থেকে এবার আসি একটু খেলার রাজ্যে। বিশ্বখ্যাত আর্জেন্টাইন জায়ান্ট ফুটবলার ম্যারাডোনাকে, কে না চিনে? তোমরা হয়তো অনেকেই তাঁর ভক্ত। ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে শিরোপার সম্মান এনে দিয়েছিলেন এই মহাতারকা ফুটবলার। কিন্তু এই সম্মান লাভের পেছনে তাঁর যে কত পরিশ্রম, ধৈর্য, একাগ্রতা আর উদ্যম ছিল, তা হয়তো অনেকেই তোমরা জানো না।
ম্যারাডোনার বাড়ি আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সে। তাঁর বাড়ির অবস্থা একদমই ভালো ছিল না। বাবা ছিলেন কারখানার সামান্য শ্রমিক, থাকতেন বস্তিতে। দিন আনি দিন খাই- এর চেয়েও নাজুক অবস্থা ছিল তাদের। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলে উৎসাহ ছিল ম্যারাডোনার। কাগজ দিয়ে বল বানিয়ে অলিগলিতে খেলতেন। খেলায় ছেলের এই উৎসাহ দেখে বাবা অনেক কষ্টে একটি চামড়ার বল কিনে দিলেন। বাবা বল কিনে দেয়ায় ম্যারাডোনার উৎসাহ আরও বেড়ে গেলো।
সেই ছোটকালেই ম্যারাডোনার খেলার খ্যাতি খুব দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। এক ভদ্রলোক তার খেলায় সন্তুষ্ট হয়ে আর্জেন্টিনার জুনিয়র দলে নিমরাজি হয়ে খেলার সুযোগ করে দিলেন। দারুণ খেললেন সেদিন। একাই তিন গোল করে ম্যাচ সেরা পুরস্কার লাভ করেন। কালক্রমে তিনি হয়ে ওঠেন দলের এগারো জনের গুরুত্বপূর্ণ একজন। ম্যারাডোনার অসাধারণ পারফরম্যান্সে সেই দল আর্জেন্টিনা জুনিয়র বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়। তখন ম্যারাডোনার বয়স মাত্র ১৩ বছর। তাঁর খেলায় মুগ্ধ হয়ে একটি নামকরা ক্লাব চড়া দামে ম্যারাডোনাকে কিনে নেয়। ৪০ ম্যাচে ২৮টি গোল করে সেই ছোট বয়সেই বিশ্বরেকর্ড গড়েন তিনি। তার কয়েক বছর পর বিশ্বব্যাপী এমন খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল যে, স্পেনের বিখ্যাত বার্সেলোনা ক্লাব তাঁকে সে সময়ে নয় কোটি ডলারে কিনে নেয়। এরপর ম্যারাডোনাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
ব্রাজিলের পেলেকে বলা হয় ফুটবল ঈশ্বর। তাঁর উত্থানও ম্যারাডোনার মতো ঘটনাবহুল। শুধু পেলের অধিনায়কত্বে ব্রাজিল ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ সালে মোট তিনবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। তাঁর পরিবারের আর্থিক অবস্থা একেবারেই নাজুক ছিল। খেলার প্রতি তাদের পরিশ্রম এবং একাগ্রতা এত বেশি ছিল যে, কোনো বাধাই তাঁদের প্রতিভাকে আটকাতে পারেনি।
এলাম দেখলাম জয় করলাম- এমন ঘটনা খুব কমই ঘটে। পৃথিবী বীরভোগ্য। পরিশ্রমী, উদ্যমশীল ও ধৈর্যশীল মানুষের জন্যই আজকের পৃথিবী। সবসময় তোমরা একটা কথা মনে রাখবে, কোনো কিছুতে প্রথম চেষ্টায় সফলতা নাও আসতে পারে। তবে এর জন্য মন খারাপ করে বসে থাকবে না। কোনো খেলায় অনেকবার হেরে গিয়ে কি খেলা পরিত্যাগ করতে পারো? মোটেও না। সুতরাং একবার ব্যর্থ হয়েছো, তো কী হয়েছে? বারবার চেষ্টা চালিয়ে যাও। দেখবে একসময় সব ব্যর্থতার দুয়ার ভেঙে যাবেই। সাফল্য তোমায় তখন হাতছানি দিয়ে ডাকবে। আজ এ পর্যন্তই। সবাই ভালো থাকবে, সুস্থ থাকবে। আল্লাহ হাফিজ।

SHARE

Leave a Reply