Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস নো ম্যানস ল্যান্ড -আহমদ মতিউর রহমান

নো ম্যানস ল্যান্ড -আহমদ মতিউর রহমান

[গত সংখ্যার পর]

৭.
মায়মুনাদের কক্ষে এলেন এক ব্দ্ধৃা আর তার নাতি। মায়মুনা তেমন একটা ঘরের বাইরে যায় না। তবে ইব্রাহীম ও বশির যায়। ওদের আটকে রাখা যায় না। ওরা বাইরের পরিস্থিতি দেখে এসে বোনকে বর্ণনা দেয়। শুনে মায়মুনা দীর্ঘ নিঃশ^াস ছাড়ে।
: অত চিন্তা ন কর। একগিন ভালো দিন আইয়ের। আঁরা ঘরত ফিরি যাইওম।
: কিবা হরি যাবি? বর্মীরা কি মোগক নিবি?
: নিবি নিবি। আঁর ত মনো লয়। আল্লাহ আছে ন? আল্লায় ব্যবস্থা গড়ি দিব।
: অরা না দিলি আঁরা যুদ্ধ গড়ি নিজের দ্যাশ স্বাধীন করিম। বলে ইব্রাহিম। আরো বলে,
: ইহানো কষ্ট গড়ি কত থাইউম?
ছোট ভাইটার দৃঢ়তা দেখে মনে সাহস পায় মায়মুনা। ভুলে যেতে চায় সব হারানোর বেদনা। নতুন আগত বয়স্কা মহিলার নাম জয়নব খাতুন। নাতির নাম জিহাদ। ওদের পরিবারের কেউ বেঁচে নেই। মানুষের স্রােতের সঙ্গে ভাসতে ভাসতে মংডু থেকে এখানে এসে পৌঁছেছে।
মায়মুনাও কিছু ইংরেজি শব্দের মানে জানে। সুন্দর করে ঘটনার বর্ণনা করতে পারে। ফারহানা পারভিনের নজরে এসেছিল বিষয়টা। সেই খবর তিনি জানিয়ে গেছেন কুতুপালং টিমের কাছে। একদিন সেই টিমের দু’জন এলেন মায়মুনার সাথে কথা বলতে। একজন বাংলাদেশি। একজন বিদেশী। বাংলাদেশী অফিসার নাম বললেন রাজিয়া সুলতানা। বিদেশী মহিলার নাম জামিলাহ এরগুল। তুর্কী দূতাবাসের অফিসার।
: মায়মুনা, তোমার জন্য খুশির খবর আছে। বললেন রাজিয়া।
: খি খবর মেম। জানতে চায় মায়মুনা। পাশে বাঁশের খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে আছে ইব্রাহিম।
: তুরস্কের প্রেসিডেন্টের পত্নী ক্যাম্প পরিদর্শনে আসবেন। তুমি কথা বলবে তার সাথে। তিনি তোমাদেরকে নিয়ে রোহিঙ্গাদের এলাকা, ক্যাম্পগুলো ঘুরে ফিরে দেখবেন। তোমাদের সবার সাথে কথা বলবেন।
: আই কি কইমু। আই কি হারমু? বিস্ময় মায়মুনার চোখে মুখে।
: হ্যাঁ পারবে। মনে সাহস রাখ।
আরো কয়েক দিন ওরা এলেন। রাজিয়া শেখালেন সুন্দর বাংলা আর কিছু কিছু ইংরেজি শব্দ। ইংরেজি শব্দগুলো মায়মুনার জানা। মায়মুনা ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছে। সিক্সে উঠেছিল। জামিলাহ শেখালেন ওয়েলকাম এর তুর্কী প্রতিশব্দ কারসিলাম, হোস কারসিলাম। গুড ইভনিং – আইয়ি আকসামলার। আর বিদায় বেলায় বলতে হবে গুলে গুলে, মানে গুড বাই, বিদায় শুভেচ্ছা। তুর্কী শব্দগুলো খুব কষ্ট করে মনে রাখার চেষ্টা করছে, মুখস্থ করছে।
নির্ধারিত দিনটি এসে গেল। তুর্কী প্রেসিডেন্টের পত্নী এমিনেহ এরদোগান এসে গেছেন। মাথায় হিজাব পরা এমিনেহ এরদোগানকে দেখে খুব ভালো লাগলো মায়মুনার। কী সুন্দর দেখতে। মুখের গড়নে ওর মায়ের ছাপ আছে যেন। পৃথিবীর সব মায়েরাই বুঝি এরকম হয়- কেন যেন তার মনে হলো। এমিনেহ বিভিন্ন ক্যাম্প ঘুরে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের বুকে জড়িয়ে ধরলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। কাঁদলেন। রোহিঙ্গা নারীদের হিজাব ও শালীন পোশাক তার কাছে বেশ লাগল। শেষে মায়মুনাদের নিয়ে যাওয়া হলো একটি স্থানে। সেখানে আমিনা ফুপুকে দেখে অবাক হলো মায়মুনা। ঝলমলে পোশাকে তাকেও খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। এমিনেহ একে একে সবাইকে কাছে ডাকলেন। মায়মুনার পালা এলে তুর্কি ভাষায় বললেন –
: তোমার নাম কী? আরেকজন বাংলা বা রোহিঙ্গা ভাষায় অনুবাদ করে দিলেন।
নামের দিকে না গিয়ে মায়মুনা তুর্কী ভাষায় বললো –
: কারসিলাম, হোস কারসিলাম। ওয়েলকাম, মোস্ট ওয়েলকাম। আইয়ি আকসামলার। গুড ইভনিং। মাই নেম ইজ মায়মুনা। ছোট্ট মায়মুনার মুখে তুর্কী শব্দ শুনে এমিনেহ খুব খুশি হলেন। তার চেহারা চক চক করে উঠলো।
তিনি জানতে চাইলেন-
: তুমি কোন ক্লাসে পড়। একজন বাংলা করে দিলেন।
: আমি সিক্সে পড়তাম।
: তোমার বাবা মা কোথায়? তাদের কথা বল শুনি।
: তাদেরকে বর্মীরা মেরে ফেলেছে। খারাপ কাজ করেছে আমার মায়ের সাথে। এ বলে কান্নায় ভেঙে পড়লো মায়মুনা।
এমিনেহ পরম যতেœ মেয়েটিকে বুকে টেনে নিলেন। তিনিও কতক্ষণ কাঁদলেন। কান্না থামিয়ে বললেন-
: বুঝতে পেরেছি। মনে করো আমি তোমার মা। তুমিও মুসলিম, আমিও মুসলিম। মহান ধর্ম ইসলাম আমাদের এক করে দিয়েছে। আমি তো তোমার মায়েরই মতো তাই না!
: হ্যাঁ আম্মা। কান্না থামিয়ে বললো মায়মুনা। মা ডাকাতে বুঝা গেল এমিনেহ খুবই আপ্লুত হয়েছেন।
: কাঁদছ কেন? বোকা মেয়ে। লেখাপড়া করবে। অনেক বড় হবে।
: জি আচ্ছা। গুলে গুলে। গুড বাই। তুর্কী শব্দ শুনে আবার হাসলেন এমিনেহ। ওর মাথায় বিলি কেটে দিলেন। মায়মুনার হাতে এমিনেহর পক্ষ থেকে কিছু উপহার দেওয়া হলো। সাংবাদিকেরা তাদের ঘিরে আছে, ছবি তুলছে। ফ্লাশ জ¦লছে। বহু লোক মোবাইলে ছবি তুলছে। কয়েক জনের পর এল আমিনার পালা।
: বোন আমার। এবার তোমার কথা বলো। বললেন এমিনেহ।
: খি আর খইম। আঁর দুগা মেইয়া আছিল। তারারে, আঁর স্বামীরে বর্মীরা মারি ফেলাইছে। আঁর বাপ মা আর শ^শুরেরও কোন খোঁজ ন হাই। রোহিঙ্গা ভাষায় বলে গেলেন আমিনা। অনুবাদ করে দিলেন এক অফিসার। আমিনা আবার তার কাহিনি বলতে শুরু করলেন-
: আঁর চউখের সামন দি আঁর এলাকার কয়েকগান মাইয়ার লগে খারাপ কাম করতে দেইখখি। ইয়ার হর বর্মী বাইনি তারারে মারি ফেইলছে। লাশ খাদত ফালাই দিছে। আঁরে টোকাইন হায়। আই হলাইচিলাম ঘরর পিছনত জঙ্গল। আই বাচি রইছি। তয় এই বাচন বাচন না বইন। এই পর্যন্ত বলে ঝর ঝর করে কাঁদলেন আমিনা। তার কথাগুলো ইংরেজি আর তুর্কী ভাষায় অনুবাদ করে দিলেন একজন। আমিনার দুঃখের কথা শুনে বার্মিজ সেনাদের চরম বর্বরতা আর গণহত্যার প্রমাণ পেয়ে বিমর্ষ হলেন এমিনেহ। তাকেও বুকে জড়িয়ে ধরলেন, কতক্ষণ কাঁদলেন। গণমাধ্যম কর্মীরাও এই লোমহর্ষক বিবরণ পেয়ে নোট করছিল। আরো কয়েক জনের দুঃখের কথা শুনলেন তিনি। সবাইকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন। চোখ মুছলেন রুমালে। সব শেষে বললেন-
: আপনারা অসহায় নন। বাংলাদেশ আছে আপনাদের পাশে, আছে আমার দেশ তুরস্ক। তুরস্ক আপনাদের দুঃখ কষ্ট লাঘবে সব কিছু করবে। অনুষ্ঠান শেষ হলো।

৮.
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জীবন কেটে যাচ্ছে আপন গতিতে। সবার। মায়মুনারা মিশে গেছে কুতুপালং ক্যাম্পের শরণার্থীদের সাথে। কক্ষ নম্বর ২৩। কবে দেশে ফিরতে পারবে, স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারবে তা জানা নেই। কবে নিজ ভিটেতে পাখির ডাক শুনবে, বাতাসে ঢেউখেলানো ধানক্ষেতের মাঝখান দিয়ে দৌড়ে যাবে সবই অজানা। সেই রকম দিন ফিরে আসবে কি? ভেবে পায় না মায়মুনা। বার্মা দেশটা তো ছোট নয়। প্রায় ছয় কোটি লোকের দেশ। বামার নামক বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর লোক বেশি, তাই তার থেকে নাম হয়েছে বার্মা। ব্রহ্মদেশও বার্মার আরেক নাম। একটা প্রদেশ আরাকান। আরাকান এক সময় স্বাধীন মুসলিম রাজ্য ছিল। আরাকানের রাজসভায় বাংলা ভাষার খুবই প্রভাব ছিল। আরাকান রাজসভায় যে সকল কবি বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা অর্জন করেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন- মহাকবি আলাওল, দৌলত কাজী, মাগন ঠাকুর। বাংলাদেশের বাইরে আরাকান রাজ্যে বাংলা সাহিত্য চর্চার বিষয়টি ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বাংলা সাহিত্যে আরাকানকে ‘রোসাঙ্গ’ বা ‘রোসাং’ নামে উল্লেখ করা হয়। আরাকানের রাজারা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী হলেও তারা মুসলমানদের ব্যাপারে ছিলেন যথেষ্ট উদার। আরাকানের রাজারা পঞ্চদশ শতাব্দীতে যখন ক্ষমতা হারায়, তাদের সিংহাসন উদ্ধার করে দিয়েছে বাংলার রাজারা। এটা ১৪৩০ সনের কথা। এরপর থেকে আরাকান রাজসভায় বাংলাই ছিল বলা যেতে পারে এক নম্বর রাজ ভাষা। রোসাং থেকেই রোহিঙ্গা নামটি এসেছে। এত কিছুর পরও দেশটির কর্তৃপক্ষ আরাকানের রোহিঙ্গাদের সব সময় সন্দেহের চোখে দেখে এসেছে। তাদের বলা হয় তারা বাঙালি। আরাকানের মানুষের ভাষা আরাকানি, তবে তাদের সঙ্গে বাংলার একটি ঐতিহাসিক সংযোগ রয়েছে। ঠিক বাঙালি বলতে যা বুঝায় তা তারা নয়, তারা আরাকানি। শত শত বছর ধরে থেকেও তারা ওখানকার নাগরিক হতে পারলো না। সংখ্যায় কতোই হবে রোহিঙ্গারা। দশ বারো লাখ। আরো কতো জাতিগোষ্ঠী আছে মিয়ানমারে। কাচিন, হান, চিন ইত্যাদি। কই তাদের তো তারা তাড়িয়ে দিচ্ছে না। এ সবের কারণ ভেবে পায় না মায়মুনা।

৯.
একদিন একটা খারাপ ঘটনা ঘটলো ক্যাম্পে। রোহিঙ্গা ছেলেদের মধ্যে কী নিয়ে যেন বিরোধ হলো। সে থেকে মারামারি পর্যন্ত। রক্তাক্ত দেহে ঘরে ফিরলো ইব্রাহিম। দেখে আঁতকে ওঠে মায়মুনা।
: কি রে? ইবা কিরুইম্মা অইল।
: কিছু ন। হেরা বেকগিন আঁরে মোন্দ কতা কইল।
: হের লিগা মাইর গড়বি?
: বুজি। আঁই মাইর ন গড়ি।
যা বোঝার বুঝে নিয়েছে মায়মুনা। পরম যতেœ তুলা আর ডেটল দিয়ে রক্ত মুছে দিল ভাইয়ের। পরের দিন একটা সুখবর এলো। আমিনা ফুপুর মেয়ে হয়েছে। মিষ্টিও পাঠিয়েছে। খবর শুনে দেখতে গেল মায়মুনা। খুশি খুশি মনে আমিনা বেডে শুয়ে স্বাগত জানালেন।
: মারে। তোর কতা মোনে হড়ে। মোনডা পোড়ায়। তুই আইচস, খুব খুশি লাগতাছে। তোর বইন অইছেরে মুনা। তোর লগে মিলাই নাম রাইক্কুম মুনা।
: হাছাই কও ফুপু! আমার যে কি ভালা লাগতাছে। খুশি হয় মায়মুনা।

১০.
দীর্ঘদিন এক যায়গায় থাকতে থাকতে রোহিঙ্গারা আসলে হাঁপিয়ে উঠেছে। জাতিসংঘ ইউএনএইচসিআর অ্যামনেস্টি অক্সফাম কত কথাই তো বলছে। কাজের কাজ হচ্ছে কই। সে থেকে হতাশা। কুতুপালং এ নম্বর দেওয়া অনেক ক্যাম্প আছে। অন্য স্থানেও রোহিঙ্গা ক্যাম্প আছে। তার নাম নয়াপাড়া, উখিয়া। তবে কুতুপালংয়ে বেশি। এসব ক্যাম্পে বিভিন্ন সাহায্য সংস্থার লোকজন আসা যাওয়া করে। নাম রুম নম্বর ক্যাম্প নম্বর লিখে নিয়ে যায়। কেউ উপহার খাবার পাঠায়। এসবে মন নেই কিশোর যুবক রোহিঙ্গাদের। তারা আরাকানের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে চায়। ইব্রাহিম দিন দিন বেড়ে উঠছে। গত প্রায় এক বছরে সে বেশ লম্বা হয়েছে। তার মনেও স্বাধীনতার প্রেরণা। ইব্রাহিম ভাবে, যদি এমন হতো অস্ত্র হাতে লড়াই করে নিজ রাজ্য স্বাধীন করা যেত। বাংলাদেশওতো যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছে, সে শুনেছে। তাহলে রোহিঙ্গারা পারবে না কেন?
ওরা তিন ভাইবোনই ক্যাম্পের ভেতরে ইউনিসেফের একটি স্কুলে পড়ে। আরো শিশুরাও আছে। মিয়ানমারের সিলেবাসের সাথে মিল রেখে পড়ানো হয়। একদিন আবার আসেন ম্যাডাম রাজিয়া। ইব্রাহিম ও বশির স্কুলে ভালো ফল করেছে। ওদের বেশ নাম হয়েছে। তিনি জানালেন, জাতিসংঘের সাহায্য সংস্থা ইউএনএইচসিআরের বিশেষ দূত হলিউডের নামকরা অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি তাদের দেখতে আসবেন। তিনি রোহিঙ্গাদের নিয়ে হয়তো একটি সিনেমা বানাবেন। যাদের সঙ্গে তিনি আলাপ করবেন সেই টিমে সিলেক্ট হয়েছে ইব্রাহিম ও বশির।
: ইব্রাহিম তুমি গান গাইবে। আমি চাই তুমি জোলি মেমের সেরা উপহারটা পাও। বললেন রাজিয়া।
: আঁই চেষ্টা করিয়ের। জানালো ইব্রাহিম। চোখে মুখে তার আত্মবিশ^াস। এটা ভালো লাগলো রাজিয়া ও তার পুরুষ সহকর্মীর।
: তুমি কি করবে বশির? জানতে চাইলেন রাজিয়া।
: আঁই বাঁশি বাজাইম।

১১.
নির্ধারিত দিন এলো। শত মানুষের ভিড় ঠেলে ফুটফুটে সুন্দরী এক নারী বের হয়ে এলেন। তিনিই জোলি। হিজাবের মতো করে সাদা ওড়না পরেছেন। তাতে একটা সৌম্য ভাব এসেছে। খুব সুন্দর লাগছে। চার পাশে তার সহকারী আর সিকিউরিটির লোকরা। সারা বিশে^ কতো তার নাম। তিনি এসেছেন রোহিঙ্গাদের দুঃখ দুর্দশা দেখতে। সারা ক্যাম্পে সাড়া পড়ে গেছে। ক্যাম্প ঘুরে দেখলেন জোলি। অনেকের সাথে দোভাষীর মাধ্যমে কথা বললেন। দোভাষী মেয়েটা অল্প বয়সী। কক্সবাজারের মেয়ে। ইংরেজি, বাংলা ও আরাকানি ভাষা ভালোই জানে। পট পট করে বুঝিয়ে দিচ্ছেন জোলিকে। জোলি শুনে ব্যথিত হলেন। শেষে নির্ধারিত একটি স্থানে ছেলেমেয়েদের নিয়ে বসলেন জোলি। একটা সাধারণ মোড়ার মধ্যে বসে আছেন তিনি। চার পাশে রোহিঙ্গা ছেলেমেয়েরা। কেউ কবিতা পড়লো, কেউ গান গাইলো। কেউ করলো অভিনয়। নিজ নিজ পালা শেষ হলে প্রত্যেককে কাছে টেনে নিয়ে আদর করছেন জোলি। কথা বলছেন। দিচ্ছেন উপহারের বাক্স। ইব্রাহিমের পালা এলো। সে রোহিঙ্গাদের একটি দেশাত্মবোধক গান বেশ দরদ দিয়ে গাইল। শুনে গম্ভীর হয়ে গেলেন জোলি। এটাতে ছিল আরাকানের কথা আর বর্মী নির্যাতনের কাহিনি। কিন্তু তবুও দমে যাবার পাত্র নয় তারা। কথাটা জোলির ভালো লাগলো। ইব্রাহিমকে কাছে ডেকে নিয়ে আদর করলেন। ওর মা বাবাকে বর্মী সেনারা হত্যা করেছে শুনে খানিকটা কাতর হয়ে পড়লেন। আবারও অশ্রুসজল হয়ে উঠলো তার চোখ।
: কি নাম তোমার? লেখা পড়া করো? জানতে চাইলেন।
: ওয়েলকাম মেম। মাই নেম ইজ ইব্রাহিম। হ্যাঁ স্কুলে যাই।
: খুব সুন্দর নাম। দোভাষী মেয়েটা বুঝিয়ে দিল এটা আব্রাহাম নামের মুসলিম রূপ।
: তোমার দেশে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে?
: করে তো। কী সুন্দর আমাদের আরাকান।
: আমরা তো চেষ্টা করছি। দেখা যাক। মা বাবার কথা মনে করে আর দুঃখ করো না। আমি তোমার মায়ের মতো। একদিন তোমাদের আর কোনো দুঃখ থাকবে না। জাতিসংঘ আছে তোমাদের সাথে। আমি আছি।
আর কিছু বলতে পারলো না ইব্রাহিম। কেঁদে ফেললো বাবা মায়ের কথা মনে পড়ায়।
: বোকা ছেলে, কাঁদে না। ছেলেদের কি কাঁদতে আছে? তোমরা লড়াই করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে একদিন।
এর পর ওকেও দেওয়া হলো উপহারের একটা বাক্স। পরে বশির বাঁশি বাজালো। তার বাঁশি শুনে মুগ্ধ হলেন জোলি। তাকেও কোলের কাছে নিয়ে আদর করলেন। আরো অনেকেই অনুষ্ঠানে অংশ নিলো। ছোট্ট মুনা মধ্যমণি হয়ে উঠলো। তাকে কোলে করে অনেকক্ষণ বসে থাকলেন জোলি। মনে হয় মুনা বেশ মজা পেয়েছে। সুইট বেবি বলে আদর করে মা আমিনার কোলে ফেরত দিলেন। এরপর ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বেশ মজা করলেন। তাদের সঙ্গে বল খেললেন। ছেলেমেয়েরা খুব খুশি। সবাই হাসছে দেখে জোলির মুখেও হাসি ফুটে উঠলো। জোলি একটা খেলনা হাতে নিয়ে শিশুদের মতো ফুঁ দিয়ে বুদবুদ বার করছেন আর তা ছড়িয়ে পড়ছে চার দিকে। তার সাথে এই খেলায় মেতে উঠলো একবারে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ হলো। জেলা প্রশাসক সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে আর লেখাপড়ার কথা বলে অনুষ্ঠান শেষ করলেন। বিরাট বহর নিয়ে চলে গেলেন জোলি। ইব্রাহিম বশির ফিরে এলো ক্যাম্পে। মুনা বাক্সগুলো খুলে খুলে দেখছে কী আছে এতে। বাক্স থেকে বিস্কিট চকোলেট খুলে নিজে খায় দুই ভাইকে দেয়। বিদেশী বিস্কিট ও চকোলেট। বেশ স্বাদের।
দেখতে দেখতে মায়মুনাদের ক্যাম্পে আসার প্রায় দু’ বছর হয়ে গেল। এখন ইউনিসেফের স্কুলের একটি শাখার ক্লাস এইটের ছাত্রী মুনা। বাংলা শিখছে ইংরেজি শিখছে। বিদেশি যে কোন বড় প্রতিনিধি বা অতিথি এলে তার ডাক পড়ে। ইব্রাহিম ও বশিরও বেড়ে উঠেছে। লেখাপড়ায় মন আছে দু’জনেরই। ইব্রাহিমকে দেখা যায় যুবকের মতো। বশিরও দুষ্টুমিভরা ভাবটা কাটিয়ে উঠেছে। ইব্রাহিম আর কোন বিবাদে জড়ায়নি। আমিনা মেয়ে মুনাকে পেয়ে দুঃখ ভোলার চেষ্টা করছেন। মুনা দেখতে দেখতে বড় হয়ে উঠছে। কি আদরমাখা মুখ। মামা জাফরের কাঁধে চড়ে পুরো ক্যাম্প ঘুরে বেড়ায়। মায়মুনা মাঝে মাঝে মুনাকে দেখতে আসে। আমিনা আদর করে তাকেও কাছে টেনে নেয়। এটা তার আরেকটা মেয়ে। এত সাহায্য দেওয়ার পরও মাঝে মাঝে খাবারের টানাটানি পড়ে, পানির অভাব দেখা দেয়। বৃষ্টির দিন আসছে। বর্ষায় ওদের অবস্থা কী হয় কে জানে? এটুকু জানে ওদের দুঃখের সীমা থাকবে না।

১২.
২৫ আগস্ট ২০১৯, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আগমনের দ্বিতীয় বার্ষিকী। দুই বছর হয়ে গেল রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে তেমন কিছু কেউ করতে পারছে না। রোহিঙ্গারা ভাবে এবার বিশ^বাসীকে জানান দিতে হবে ওরা বাংলাদেশে থাকতে আসেনি, বাংলাদেশের বোঝা হয়ে থাকতে চায় না। ২৫ আগস্ট সমাবেশ করবে, রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবস পালন করবে তারা। দেখতে দেখতে দিনটি এসে গেল। বিশাল সমাবেশ। মায়মুনা ও তার ভাইরা এসেছে। মুনাকে কোলে করে এসেছেন আমিনা, সঙ্গে তার ভাই। দুই লাখ রোহিঙ্গার সমাবেশ সাড়া ফেলে দিলো। সংবাদ মাধ্যমে বড় বড় ছবি আর নিউজের ঝড় বয়ে গেল। প্রশাসনের বড় বড় কর্তারা কড়া কথা বললেন।
: বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তো আঁরার নালিশ নাই। আঁরা আরাকানত ফিরত যাইম, আঁরা গণহত্যার নির্যাতনের শিকার এই হান কি কইতে হারুমনা? বললেন কমিউনিটির এক নেতা নূর আহমদ। বলিষ্ঠ এক কণ্ঠস্বর। যা হবার হয়ে গেছে। রোহিঙ্গাদের বার্তা পৌঁছে গেছে সবখানে। এতেই নেতারা খুশি।
আরো ছয় মাসেও অবস্থার কোন পরিবর্তন নেই। একটা ঘটনা ঘটলো। আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে মিয়ানমারের এক মন্ত্রী এলেন। দেখা করলেন ক্যাম্পের নেতাদের সাথে। সাথে বাংলাদেশের মন্ত্রী। ঘোষণা দিলেন যারা জেনুইন তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আনন্দের জোয়ার বইলো। সেই আনন্দ মিলিয়েও গেল। কেন না এটা ছিল ভাঁওতাবাজি। এর পর একটা ভালো কাজ হলো। আফ্রিকার একটা দেশ গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ঠুকে দিল একটি মামলা। অভিযোগ আনলো গণহত্যার। মিয়ানমারের নেত্রী সু চি স্বয়ং হাজিরা দিলেন। বললেন, তার দেশ গণহত্যা করেনি। গাম্বিয়া প্রমাণ দিল বর্বরতা গণহত্যা ও নারীদের বেইজ্জত করার।
আরেক খবর এলো। বাংলাদেশ এক লাখ রোহিঙ্গাকে নোয়াখালীর ভাসানচরে নিয়ে যেতে চায়। রোহিঙ্গারা শুনেছে এটা অনেক দূরের একটা দ্বীপ। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থার এতে মোটেই সায় নেই।
: তোরা যাবি মায়মুনা। ওদের রুমের বৃদ্ধা মহিলা জানতে চান।
: ন ন। আঁরা ইয়ানই থাউম। হুনছি ইডা অনেক দূর। গেলে আর ফিরন যাইবো না দাদী। মদ্যিহানে সাওর নদী।
: আরে না। ইয়ানো বালা ঘর বানাইছে আঁরার লাই।
: মোন চাইলে আন্নেরা যন। থউন গিয়া। আঁরা ন যাইয়ের।
দুই ভাগ হয়ে গেল রোহিঙ্গারা। অনেকেই বললো ওখানে গেলে জীবনে আর আরাকানে ফেরা হবে না। কতুপালং থাকলে তবু আশা থাকে। কিছু লোক বললো, এখানে চাল ফুটো পানি পড়ে, ওখানে পাকা বাড়ি। খাবার দাবাড়ও দেবে ঠিক মতো। আমরা ক্যাম্পেও বন্দী, ওখানে গেলেও বন্দী। যাওয়াই ভালো।
আমিনার ভাই জাফর রোহিঙ্গা গ্রুপের সাথে ভাসানচর গিয়েছিল। তার বেশ ভালো লেগেছে। বোনকে বলে এরি মধ্যে রাজিও করিয়ে ফেলেছে। কথা পৌঁছে যায় মায়মুনাদের কানে। ওদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। আমিনা ফুপু চলে গেলে কার কাছে গিয়ে দুঃখের কথা বলবে? ইব্রাহিম শুনে বলে-
: ইবা কি হুনাইলি বুজি। আমিনা ফুপু জাইনা শুইন্যা জেলত যাইব? আমাগো কেডা দেখপো?
: আল্লাহ আছে না, আল্লায় দেখপে। বলে মায়মুনা।
আমিনা ফুপুর যাবার দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেছে। তেসরা ডিসেম্বর ২০২০ প্রথম দলটি ভাসানচরে পাড়ি জমিয়েছে। তারা যাবে দ্বিতীয় ব্যাচে ২৮ ডিসেম্বর। উখিয়া কলেজের সামনে সারি সারি বাস প্রস্তুত। বিদায় জানাতে বিশেষ পারমিশন নিয়ে মায়মুনারা এসেছে উখিয়া কলেজ ট্রানজিট পয়েন্টে। আমিনা বেরিয়ে এলেন। কোলে মুনা। মুনাকে কোলে নিয়ে আদর করে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দেয় মায়মুনা। এর পর ফিরিয়ে দেয় আমিনার কোলে। কান্নায় ভেঙে পড়ে মায়মুনা। এ যেন মা মেয়েতে সারা জীবনের বিচ্ছেদ। জড়িয়ে ধরে তাকে সান্ত¡না দেন আমিনা।
: মারে, কান্দিস না। কোহালে থাইলে আবার দেহা তো অইব। মায়মুনার চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে আরেক হাতে হিজাব ঠিক করেন আমিনা। মুনা ততক্ষণে মামার কোলে উঠেছে। আমিনা ফুপুদের বাসটি এক সময় চলতে শুরু কবে। হু হু করে আবার কেঁদে ওঠে মায়মুনা ও ইব্রাহিম। বশিরও কাঁদছে। তিন ভাই বোন যেন আবারও মাতৃহারা হয়েছে। আমিনা বাসের জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছেন পেছন পানে। যতক্ষণ দেখা যায় হাত নাড়লেন। এক সময় অদৃশ্য হয়ে গেল বাসটি।
[সমাপ্ত]

SHARE

Leave a Reply