Home গল্প মেঘ ভেসে যায় নদী বয়ে যায় -এনায়েত রসুল

মেঘ ভেসে যায় নদী বয়ে যায় -এনায়েত রসুল

ফিতের মতো সরু নদীটি এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে বহু দূর- কতো দূর, কেউ তা জানে না। সেই নদীর বুকে তারার মতো ঝিলমিল করছে ছোটো ছোটো ঢেউ। ঢেউয়ের ওপর ভেসে যাচ্ছে একটি ছইঅলা নৌকা। সেই নৌকায় চড়ে বাড়ি যাচ্ছি আমি আর দাদু।
এই প্রথম আমার দাদাবাড়ি যাওয়া। এই প্রথম নৌকায় চড়া। আর এই প্রথম নদীও দেখা। তাই ছোটো ছোটো ঢেউয়ের মতো বিস্ময়ের পর বিস্ময় আমার মন জুড়ে তিরতির করে ফিরছে। মনে হচ্ছে এ জীবনে আমি যতো কিছু দেখেছি, নদীটা তার ভেতর সবচে সুন্দর। নদীর মতো সুন্দর আর কিছু নেই এ পৃথিবীতে। নদীর বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে কতো নৌকা। মাঝিরা হাল ধরে বসে আছে সে সব নৌকার গলুইয়ের ওপর। চোখে তাদের নতুন কোনো ঘাটে পৌঁছার স্বপ্ন। গলা ছেড়ে তারা গাইছে- আমি উজানে যাই ভাটিতে যাই, আমার কোনো কূল নাই, কিনার নাই রে…।
মাঝির গানের মিষ্টি সুরের সাথে ভেসে ভেসে পাখির পালকের মতো নরম হাওয়া এসে আদর বুলিয়ে যাচ্ছে সবাইকে- আহ্! এই হাওয়ার ছোঁয়ায় প্রাণ জুড়িয়ে যায়।
দাদু বসে আছেন পাশে। নাকের ডগায় চশমা বসিয়ে খবরের কাগজ পড়ছেন তিনি। সেদিকে তাকিয়ে আমার রাগ হলো। মনে হলো, কতো কিছু দেখার রয়েছে চারপাশে। অথচ খবরের কাগজের কালো কালো অক্ষরগুলো ছাড়া দাদু যেন কিছু দেখতেই পাচ্ছেন না! দাদুর কি কোনো সৌন্দর্যজ্ঞান নেই? প্রকৃতিপ্রেম নেই? ধ্যাৎ, আমার দাদু এমন কেন?
দাদুকে ছোট্ট একটা ধাক্কা মেরে আমি বললাম, কি ব্যাপার বলো তো? নৌকায় ওঠার পর থেকে তুমি শুধু পেপারই পড়ে যাচ্ছো! এই যে এতো সুন্দর একটা নদী এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে, এই যে রঙিন রঙিন পাল তুলে নৌকাগুলো যাচ্ছে, মাঝিরা গান গাইছে, আমি বসে আছি তোমার পাশে- তুমি একবারও এসব দেখছো না! অন্তত আমার দিকে তো তাকাতে পারো, তাও তাকাচ্ছো না! দাদু, নদীকে তোমার ভালো লাগে না?
কাগজটাকে ভাঁজ করে দাদু বললেন, নদীকে ভালো লাগে না, অমন নীরস বুঝি আমি? না, একেবারেই নীরস নই। নদীকে আমার ভালো লাগে। তবে তার চেয়েও বেশি ভালো লাগে তোমাকে।
আমার খুব ভালো লাগলো দাদুর কথা শুনে। আমি গর্বে ঝলমল করে উঠে বললাম, এ আর নতুন কি! এ কথা সবাই বলে। সবাই আমাকে ভালোবাসে।
: সত্যি?
দাদু মিটিমিটি হেসে আমার দিকে তাকালেন। আমি বললাম, সত্যি নয় তো কি! মুনিয়া আপু কী বলেন জানো?
: কী বলে তোমার মুনিয়া আপু?
: মুনিয়া আপু বলেন, উফা আমার মিষ্টি বোন। উফা আমার পুতুল খেলার সাথী। উফা না থাকলে আমার দিন কাটে না। ভালো না বাসলে কেউ এ কথা বলে, বলো?
দাদু বললেন, নাহ্। ভালো না বাসলে কেউ এ কথা বলে না।
: ঠিক বলেছো। আর মামণি কী বলেন, জানো? মামণি বলেন, উফা আমার জীবন। আর আমার সঙ্গে কথা না বলে যেদিন বাবা অফিসে যান, সেদিন নাকি তার কাজকর্ম এলোমেলো হয়ে যায়।
: তাই? একেবারে এলোমেলো হয়ে যায়?
: হ্যাঁ দাদু, বাবা তো তাই বলেন। বাবা বলেন তার কাজ এলোমেলো হয়ে যায়। কিন্তু এখন আর এসব কথা নয়। এ নদীটাকে দেখে আমার একটা কবিতা আবৃত্তি করতে ইচ্ছে করছে। করবো? তুমি শুনবে?
বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে আমি দাদুর দিকে তাকালাম। দাদু অবশ্য নিরাশ করলেন না। বললেন, তুমি আবৃত্তি করবে আর আমি শুনবো না, এ কখনো হয়? করো, গলা ছেড়ে আবৃত্তি করো।
আমি এবার আমার কণ্ঠস্বরটাকে অসম্ভব রকম ভরাট করে বলে চললাম:
মেঘ ভেসে যায়- নদী বয়ে যায়
দূর থেকে দূর- কোন্ ঠিকানায়,
কোন্ সুদূরে- কোন্ অজানায়
আমার এ মন- ভেসে যেতে চায়…
: বাহ! বাহ্ অপূর্ব! অপূর্ব কবিতা উফামণি।
উচ্ছ্বাসে ভেঙে পড়লেন দাদু। কিন্তু সেই উচ্ছ্বাসে বাদ সেধে আমি চেঁচিয়ে উঠলাম- কি মুশকিল! আমার আবৃত্তিই তো শেষ হয়নি! তার আগেই তুমি অপূর্ব অপূর্ব বলে দুনিয়া মাথায় তুলছো! শেষটা শোনো তারপর বলো কবিতা কেমন হয়েছে। শেষ দুটো লাইন হলো:
তুমি যাবে সাথে- এই নদীপথে
সেই ঠিকানায়- যেথা মন চায়…

কবিতা শেষ করে চোখেমুখে আলো ছড়িয়ে আমি দাদুর দিকে তাকালাম। বললাম, এবার বলো কেমন হয়েছে?
দাদু বললেন, অপূর্ব হয়েছে! খু-উ-ব মিষ্টি কবিতা হয়েছে।
বললাম, মিষ্টি বলার জন্য ধন্যবাদ। এবার বলো, এ কবিতা কে লিখেছেন?
দাদু বললেন, রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কে! তবে জীবনানন্দ দাশও হতে পারেন। তিনি প্রকৃতি নিয়ে লেখেন। এ কবিতার ভেতরও প্রকৃতির গুণগান আছে।
দাদুর জবাব শুনে আমার মন খারাপ হলো। এতো চেষ্টা করে বানিয়ে বানিয়ে একটা কবিতা বললাম, অথচ দাদু সেই কবির নামই বলতে পারলেন না! তাহলে কবিতা বলে কী লাভ?
কবিতাটা যে আমারই সৃষ্টি তা বোঝাবার জন্য বললাম, তুমি কিচ্ছু জানো না। মিষ্টি কোনো কবিতা হলেই রবীন্দ্রনাথ লিখবেন, আর প্রকৃতি নিয়ে জীবনানন্দ দাশ- এমন কোনো কথা নেই। কবিতাটা আমিই আমার মন থেকে বলেছি।
: তুমি? মন থেকে বলেছো? এতো সুন্দর কবিতা?
বিস্ময়ের পর বিস্ময় প্রকাশ পেলো দাদুর কণ্ঠে। তা দেখে আমার একটু অভিমানও হলো। আমি বললাম, কবির নাম তো বলতে পারলে না। এবার নদীর কথা বলো। এ নদীটা যেতে যেতে কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে- কোথায় গিয়ে এর পথচলা থেমে গেছে, এবার সে কথা বলো।
আমার প্রশ্ন শুনে দাদু অসহায় চোখে নদীর দিকে তাকালেন। তারপর বিড়বিড় করে বললেন, আশ্চর্য! এতদিন ধরে এ নদীটার ওপর দিয়ে যাওয়া-আসা করছি, অথচ কোনোদিন এ প্রশ্নটি মনেও আসেনি। তাই তো, কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে এ নদীর পথচলা?
নদী থেকে চোখ তুলে দাদু আমার দিকে তাকালেন। দেখতে পেলেন উত্তর শোনার জন্য আমি অপেক্ষা করছি। তাই তিনি দ্রুত একটা উত্তর গুছিয়ে নিয়ে বললেন, নদীরা যেতে যেতে আরেকটা নদীর বুকে মিশে যায়। সেই নদীটা আবার অন্য একটা নদীর বুকে মিশে যায়। এভাবে এক নদী অন্য নদীর বুকে মিলেমিশে একাকার হয়ে বছরের পর বছর বয়ে চলে। তাই এ নদীটা কোথায় গিয়ে থেমে গেছে, আমার তা জানা নেই।
আমি বললাম, আমার জানা আছে। যেতে… যেতে… যেতে… যেতে এ নদীটা সমুদ্রে গিয়ে মিশেছে। সমুদ্রে যাবার পর নদীটার পথচলাও থেমে গেছে। নদীরা এমন করেই সমুদ্রে গিয়ে মিশে যায় আর তাদের পথচলা থেমে যায়। আমার বইতে এমন কথাই লেখা আছে।
দাদু বললেন- তাইতো, আমিও তো ছেলেবেলায় এমন কথাই পড়েছি। অথচ বুড়োবেলায় সব ভুলে গেছি!
দাদু আমার কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। আর আমি সেই সুযোগটি লুফে নিয়ে বললাম, ফাঁকিবাজরা সব কথা ভুলেই যায়। এতো বুড়ো হয়েছো, এতো বই পড়ো, অথচ আমার একটা প্রশ্নের জবাব দিতে পারলে না! দাদু, তুমি যতো কথাই বলো, ছেলেবেলায় তুমি খুব ফাঁকিবাজ ছিলে।
দাদু মিনমিন করে বললেন, তা কিছুটা ছিলাম। তবে তুমি যতোটা ভাবছো ততোটা না। কারণ এ নদী সম্পর্কে আমি অন্য একটা কথা জানি। সেই কথাটা তুমি জিজ্ঞেস করোনি।
: কোন্ কথা?
আমি দাদুর দিকে তাকালাম। দাদু বললেন, এ নদীটা কোথা থেকে শুরু হয়েছে, সেই কথা।
: জানো তুমি? কোথা থেকে শুরু হয়েছে, দাদু?
দাদু বললেন, নেপালে হিমালয় নামে একটা পাহাড় আছে- আকাশ ছোঁয়া বিশাল এক পাহাড়। সেই পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা পানি থেকে এসব নদীর সৃষ্টি হয়েছে।
দাদুর বলা আকাশ ছোঁয়া শব্দটা খুব ভালো লাগলো। সে কথা স্বীকার করে বললাম, আকাশ ছোঁয়া হিমালয়- খুব মিষ্টি কথা শোনালে। আকাশের দিকে তাকালেই আমার মন রিনঝিন করে ওঠে। তোমারও কি অমন হয়, দাদু?
দাদু বললেন, হয়। তবে রিনঝিন নয়- আকাশের দিকে তাকালে আমার মন উদার হয়ে যায়।
: তোমার মন উদার হয় আর আমার মন রিনঝিন করে। যখন মন রিনঝিন করে তখন আমার পাখি হয়ে উড়ে বেড়াতে ইচ্ছে করে। দাদু! মানুষ না হয়ে আমরা যদি পাখি হতাম- তুমি আর আমি পাখা মেলে উড়ে বেড়াতাম, তাহলে খুব মজা হতো। ডানা মেলে উড়ে উড়ে সেই হিমালয়টাকে দেখে আসতাম।
কেমন একটা ভালো লাগায় মন ভরে গেল আমার। সেই ভালো লাগা নিয়ে আমি ওপর দিকে তাকালাম। দেখতে পেলাম মাথার ওপর বিশাল এক আকাশ ছড়িয়ে আছে! কী গাঢ় নীল সেই আকাশের রঙ! নীলের ফাঁকে ফাঁকে তুলোর মতো সাদা মেঘের দল ভেসে বেড়াচ্ছে। ছোটো ছোটো পাখিরা উড়ে বেড়াচ্ছে মেঘের ফাঁকে ফাঁকে। কী সুন্দর সে সব দেখতে- নীল আকাশ, সাদা মেঘ, কালো পাখি!
ভালো লাগার আবেশে আমার শরীরটা থিরথির করে উঠলো। মনে হলো, ইস্! পাখিরা কতো সুখী। আর মেঘেরা কতো ভাগ্যবান- ডানা নেই, তবু ওরা উড়ে বেড়াতে পারে। ধ্যাৎ, কেন যে আমি মানুষ হলাম? আমি তো মেঘ বা পাখি হতেও পারতাম! কথাটা মামণিকে জিজ্ঞেস করতে হবে- মামণি! পাখি না হয়ে আমি তোমার মেয়ে হলাম কেন?
আমি যখন এসব কথা ভাবছি, সে অবসরে আমাদের নৌকা খালের ভেতর চলে এসেছে। সেই খালের দু’পাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে সাদা ফুলের গাছ। বাতাস ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে সাদা সাদা ফুলের চুড়োগুলো। ফুলগুলো এদিকে হেলছে ওদিকে দুলছে। তা দেখে মনে হলো ফুলগুলো যেন মাথা দুলিয়ে এই সুন্দর প্রকৃতিকে স্বাগত জানাচ্ছে।
আমি বসেছিলাম, এবার ছইয়ের গায়ে হেলান দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। তারপর সামনে তাকালাম- পেছনে তাকালাম। সে সময় দেখতে পেলাম খালের দু’পাশে দৃষ্টিজুড়ে ছড়িয়ে আছে সাদা ফুলের দেয়াল। কী যে সুন্দর লাগছে! কিন্তু কী নাম এই ফুলগুলোর?
দাদুকে জিজ্ঞেস করলাম- দাদু! তোমার চুলের মতো সাদা সাদা ওই যে ফুলেরা হেলেদুলে খেলছে, কি নাম ওদের?
দাদু তার চুলের ওপর হাত ছুঁইয়ে বললেন, ওগুলো? ওগুলোকে বলে কাশফুল। তোমার ভালো লাগছে কাশফুল?
: খু-উ-ব। তবে শুধু কাশফুল নয়, আকাশে ভেসে বেড়ানো ওই তুলো তুলো মেঘ, বিন্দু বিন্দু পাখি- সব ভালো লাগছে।
বেশি ভালো লাগলে আমার মন থেকে সব ছবি মুছে গিয়ে শুধু ভালোলাগা ছবিটি মনজুড়ে ফুটে থাকে। চোখ বুজে সেই ছবি উপভোগ করি আমি। আজও তাই করলাম- কাশফুল, নদী আর মেঘদের মাঝে নিজেকে বিলীন করে দিয়ে চোখ বুজে রইলাম।
এভাবে অনেকটা সময় কেটে যাবার পর যখন চোখ খুললাম তখন থির হয়ে গেলো আমার চোখ দুটো। সেই চোখের তারায় তারায় অপার বিস্ময় খেলা করতে লাগলো। বাঁধভাঙা স্রোতের মতো সেই বিস্ময় বেরিয়ে এলো আমার কণ্ঠ চিরে- অপূর্ব! হায় আল্ল­াহ! কী সুন্দর এ পৃথিবী! ওহ্ দাদু! এই সৌন্দর্য এতদিন কোথায় ছিল? কার আঁচলে বাঁধা ছিল সৌন্দর্যের এই ছবি?
দাদু বললেন, ঋতুর রানি শরৎ- সেই শরতের আঁচলে বাঁধা ছিল এই সৌন্দর্য। তুমি প্রকৃতিকে ভালোবেসেছো। শরৎরানি তাই তার আঁচল খুলে দিয়েছে। সেই সুযোগে প্রকৃতি এমন করে সেজেছে।
আমি বললাম, ঠিক বলেছো। আর সেই প্রকৃতি দেখে তোমার-আমার মন ভালোলাগায় ভরে উঠেছে।

SHARE

Leave a Reply