Home প্রচ্ছদ রচনা কিশোর মানসে কাজী নজরুল -মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন

কিশোর মানসে কাজী নজরুল -মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন

কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি। তিনি জাতীয় কবি কেননা সবার কথা মাথায় রেখে তিনি সাহিত্য রচনা করেছেন। সবাই যখন সাহিত্যে আনন্দ-বিনোদন নিয়ে ব্যস্ত তখন কাজী নজরুল ইসলাম শিশু-কিশোরের মানস ও চরিত্র গঠনের উপায় নিয়ে সাহিত্য রচনা করেছেন। মজার বিষয় হলো তিনি কিশোর বয়সেই বড়দের কথা বলেছেন আবার শিশু-কিশোরদের মনোজগতের কথাও বলেছেন। এমন দৃষ্টান্ত কেবল কাজী নজরুল ইসলাম দেখিয়েছেন। তার জন্ম ১১ই জ্যৈষ্ঠ ১৩০৪ বঙ্গাব্দে এবং মৃত্যু ১২ই ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দে।
কাজী নজরুল ইসলামকে সবাই ভালোবেসে বিদ্রোহী কবি বলে ডাকেন। কিন্তু বর্তমানে তাকে ‘জাতীয় মুক্তির কবি’ ও ‘হতাশগ্রস্ত কিশোরদের জাগরণ, আনন্দ, বিনোদনের কবি’ বলেই সম্মান দেন। প্রকৃতির কাছে শিক্ষা নিতে হয় শিশু-কিশোর বয়সে এবং তার প্রতিফলন ঘটে প্রাপ্ত বয়সে। নজরুলও সে কাজটি করেছেন সবার জন্য। তাঁর কবিতা, গান, অনুবাদ, নাটিকা, উপন্যাস ও প্রবন্ধে আগুনঝরা বাক্যে বা ছন্দে সৎ মানুষ হবার রাস্তা দেখিয়েছেন।

কিশোরদের জানতে হয় দেশপ্রেম ও মানব কল্যাণের কথা। সে কথা কাজী নজরুল ইসলাম সাহিত্যের মাধ্যমে এমনভাবে দেখিয়েছেন যা অনুসরণের মাধ্যমে পরকালকেও খুঁজে পাওয়ার রাস্তা খুলে যায়। বীররসের বিপুল সঞ্চয় ছিল তাঁর মনে। তার বহুমুখী প্রতিভার কারণে তিনি কালজয়ী সাফল্য অর্জন করতেও সমর্থ হয়েছিলেন।
তার সৃষ্টি জগতের একটি বিশাল ক্ষেত্র হচ্ছে শিশু-কিশোর জগৎ। তিনি কিশোরদের মনভোলানো রচনায়ও অসামান্য সাফল্য অর্জন করেছিলেন। ফলে বাংলা কিশোর সাহিত্যে তার আসনটি চিরভাস্বর। চারপাশ ও বিশ্বজগৎ সম্পর্কে কিশোরদের কৌতূহল, তাদের অবাধ কল্পনার বিস্তার ও কাল্পনিক জগতে বিচরণ করার অপরিমেয় ক্ষমতা, অদ্ভুতের প্রতি, উদ্ভটের প্রতি আকর্ষণ, তাদের অভিমান-প্রিয়তা, প্রখর ছন্দদোলার প্রতি আকর্ষণ-এসবই সুন্দরভাবে কাজী নজরুল ইসলামের কিশোর সাহিত্যে রূপ রসে সমৃদ্ধ হয়েছে।

কাজী নজরুল ইসলাম কল্পনা ও স্বপ্নে বিভোর শৈশবেরও রূপকার। ফলে নজরুল কিশোর সাহিত্যের অন্যতম লেখক। কাজী নজরুল ইসলামের সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে আছে এক ধরনের প্রাণোচ্ছলতার দীপ্তি। শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা তাঁর সৃষ্টিসমূহেও এই প্রাণোচ্ছলতার উদ্ভাস লক্ষ করা যায়, যা শিশু-কিশোরদের মনোজগতের এক প্রধান ও মৌলিক অনুষঙ্গ। এর ফলে নজরুলের রচনাসমূহ শিশু-কিশোরদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছে। পাঠ্যপুস্তক কিংবা অন্যান্য মাধ্যমে নজরুলের গুটিকয় শিশু কবিতা আজ সাধারণ পাঠক মহলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেলেও, নজরুলের এমন অনেক লেখা রয়েছে যা প্রচলিত লেখার চেয়ে বেশি শক্তিশালী।
একটা কবিতাকে সার্থক হয়ে উঠতে হলে যে সব গুণ থাকতে হয় যথা-কল্পনাপ্রতিভা, ভাব, ছন্দ, অলঙ্কার ইত্যাদি- ছোটদের জন্য লেখা কবিতাতেও সেইসব গুণ থাকতে হয়। কিন্তু সাধারণভাবে একটা কবিতার কবিতা হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে যে স্বাধীনতা থাকে, ছোটদের কবিতায় বা ছড়ায় সে স্বাধীনতা থাকে না। কারণ, শিশু-কবিতায় কবিকে কাজ করতে হয় শিশুর মনোজগৎ নিয়ে। শিশু মনোজগতের সীমানার বাইরে পা রাখার উপায় নেই তার। আর নজরুল সে অসামান্য কাজটি করেছেন অবলীলায়।
শিশু-কিশোর মনোজগতে থাকে যুক্তিপারস্পর্যহীন কল্পনার অবাধ বিস্তার। কল্পনাই শিশুর কাছে বাস্তব। সুতরাং তার পৃথিবীতে ভূত-পেত্নী, দৈত্য-দানো, রাজপুত্র, ক্ষীরসাগর, ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমী সবকিছুই সত্য। নজরুলের কিশোর সাহিত্যে সবকিছুর সন্ধান পাওয়া যায়।

পাশাপাশি রয়েছে নজরুলের স্বভাবসুলভ গুণ- শেয়োচেতনা, দেশপ্রেম, মুক্তির আকাক্সক্ষা, উজ্জীবনের সুর, ধর্মচেতনা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, হাস্যরস, লোকসাহিত্যের সরল কল্পনা। বিজ্ঞান জগতের নব উদ্ভাবনী চিন্তা তার কাব্যে আরো প্রবল। তার ‘সঙ্কল্প’ কবিতা ও ‘জাগো সুন্দর চিরকিশোর’ নাটকে বিজ্ঞান মনস্কতা উঠে এসেছে প্রবলভাবে। ‘সঙ্কল্প’ কবিতাটি নানাভাবে অসাধারণ। বিশেষ করে উদ্দীপনা ও বিজ্ঞানময়তার কারণে। এ কবিতায় কবি কিশোর মনের প্রশ্ন করে বললেন, ‘দেশ হতে দেশ-দেশান্তরে/ছুটছে তারা কেমন করে,/কিসের নেশায় কেমন করে মরছে যে বীর লাখে লাখে,/ কিসের আশায় করছে তাঁরা বরণ মরণ-যন্ত্রণাকে।’
নানা অভিযানের কথা তিনি উল্লেখ করেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো যখন হেলিকপ্টার বা বিমান আবিষ্কার হয়নি তখন তিনি ‘হাউই’ জাহাজের কথা বলেছেন। বলেছেন চন্দ্রাভিযান অর্থাৎ চাঁদে যাবার কথা অথচ বিজ্ঞানীরা ষাটের দশকে হেলিকপ্টার এবং বিমান আবিষ্কার করেন। সত্তরের দশকে রকেটে করে চাঁদে যান। নজরুল ত্রিশের দশকেই কল্পনা করতে পেরেছেন সে-সব বিষয় নিয়ে নিখুঁতভাবে। এ কল্পনার মাধ্যমে তিনি কিশোর-তরুণদের উদ্দীপনা জুগিয়েছেন আগামীর বিশ্বকে সাজিয়ে তোলার। তার ‘সঙ্কল্প’ কবিতায় তিনি বললেন, ‘কেমন করে মথলে পাথার-লক্ষ্মী ওঠেন পাতাল ফুঁড়ে,/ কিসের অভিযানে মানুষ চলেছে হিমালয়ের চূড়ে।/ তুহিন মেরু পার হয়ে যায়/সন্ধানীরা কিসের আশায়;/হাউই চড়ে যেতে কে চন্দ্রলোকের অচিনপুরে;/শুনবো আমি, ইঙ্গিত কোন ‘মঙ্গল’ হতে আসছে উড়ে।’ যে মঙ্গলাভিযানের জন্য বিজ্ঞানীরা প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন তারও উল্লেখ আছে এখানে।

নজরুলের ‘জাগো সুন্দর চিরকিশোর’ নাটকে লোক সাহিত্যের উপাদান সবার হৃদয়ে আনন্দ জোগায়। সে লোকজ উপাদানের সাথে প্রচলিত কুসংস্কারও তিনি এনেছেন এখানে। যেমন ‘জাদু’, ‘পরীর বাচ্চা’র সাথে ‘তাবিজ’কেও ব্যবহার করেছেন এবং পরে তাবিজের ব্যবহারকে মিথ্যা প্রমাণিত করে বৈজ্ঞানিক সত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। লোকজ উপাদানের মাধ্যমে তিনি পরাধীনতার শিকল ভেঙে স্বাধীনতার উৎসাহ জুগিয়েছেন এ নাটকে। ওঙ্কার ও কল্পনার কথোপকথনে তা উঠে আসে।
ওঙ্কার ॥ হ্যাঁ, আমাদের গাঁয়ে দেখেছিলুম, একপাল ভেড়ার মাঝে একটা নেকড়ে বাঘ এসে পড়ল। যাহা
নেকড়ে বাঘ দেখা, আর অমনি পালের সব ভেড়া গোল হয়ে মাথায় মাথা ঠেকিয়ে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে রইল।
কল্পনা ॥ আর তাই দেখে বুঝি নেকড়ে বাঘ পালিয়ে গেল!
ওঙ্কার ॥ দূর। তা হবে কেন? নেকড়ে বাঘ বেড়াদের এক একটার কান ধরে ঘাড় মটকে রেখে আসে,
এসে আবার একটার কান ধরে নিয়ে যায়।

এ নাটকে সকল মানুষের মধ্যে প্রেম-ভালোবাসার কথা বলেছেন তিনি। মানুষে মানুষে এবং জাতিতে জাতিতে কোন ভেদাভেদ রাখতে তিনি নিষেধ করেছেন। এরপরই একজন কিশোরের দেশ ও বিশ্বভাবনা তুলে ধরেন আমি হব ‘সকাল বেলার পাখি’ কবিতার মধ্য দিয়ে। কিশোর সবার আগে ঘুম থেকে উঠেতে চায়। কেন উঠতে চায় তাও বলেছে। তার মতে ‘হয় নি সকাল, তাই বলে কি সকাল হবে না কো?/আমি যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে?’ কিন্তু কোন সকালের কথা বেণু এ কবিতায় বলছে তাও উঠে এসেছে এভাবে: ‘তোমার মেয়ে উঠলে গো মা রাত পোহাবে তবে!’
নজরুল নিজে কিশোর অবস্থায় নতুন বিশ্ব সৃষ্টিতে মত্ত ছিলেন। তাই কিশোর-তরুণদের প্রতি তার আস্থা ছিল সীমাহীন। তার ‘ছাত্রদলের গান’ কবিতায় সে আকাক্সক্ষা আরো স্পষ্ট হয় যখন তিনি বলেন, ‘আমরা শক্তি আমরা বল, আমরা ছাত্রদল।/মোদের পায়ের তলায় মূর্ছে তুফান/উর্ধ্বে বিমান ঝড়-বাদল!’ তাই একজন প্রকৃত মানুষ হতে হলে সকল কিশোরের প্রয়োজন এ বয়সেই নজরুলের মতো করে ভাবা এবং তার কবিতা, গল্প, ছড়াগুলো পড়ে সেগুলো বুকে ধারণ করা।

SHARE

Leave a Reply