Home গল্প মীমমণি -এস আই সানী

মীমমণি -এস আই সানী

নির্ধারিত সময়ের আধাঘণ্টা আগেই চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছালো রৌদ্র। প্লাটফর্মে অনেক মানুষ। সবাই আপন গন্তব্যে পৌঁছাতে ব্যস্ত। স্টেশনে আবার টোকাই পথশিশু আর সহায়সম্বলহীন কিছু মানুষেরও বসবাস। তাদের অর্থসম্পদ বলতে কিছুই নেই। তারা মানুষের কাছে চেয়েচিন্তে, কাগজ কুড়িয়ে, বোতল কুড়িয়ে পেট চালানোর জন্য যুদ্ধ করে বেড়ায় সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি। থাকার জায়গা নেই তাদের, আরামে ঘুমানোরও জায়গা নেই। রৌদ্রের তাদের জন্য বড্ড মায়া হয়। সাধ্যমতো সাহায্যও করে।
বাড়ি ফিরছে রৌদ্র। অনেকদিন পর। গত বছর কুরবানির ঈদে বাড়ি গিয়েছিল। পূর্ণ এক বছর পর আবার সেই কুরবানির ঈদে বাড়ি ফিরছে। রমজানের ঈদে লকডাউনের কারণে বাড়ি ফেরা সম্ভব হয়নি। তবে এ ঈদে ফিরতে পেরে বেজায় খুশি সে।
রৌদ্রের বাড়ি ফেরার কথা শুনে তার মাও কী যে খুশি! আহা! কতদিন হয় বুকের মানিককে দেখেন না তিনি। তার মানিকের জন্য কত কিছুইনা বানিয়ে রেখেছেন। বিশেষ করে গেল শীতে কুমড়োর বড়ি শুকিয়ে রেখেছেন। চালকুমড়োর বড়ি রৌদ্রের অত্যন্ত পছন্দ। এছাড়া আরো কতো কী! সাফিয়া বেগম এখন কেবল তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বনের ফেরার অপেক্ষায় সময় গুনছেন।

ট্রেন ছাড়তে খুব বেশি বাকি নেই। রৌদ্র টিকিট অনুযায়ী নির্দিষ্ট বগিতে তার সিটে গিয়ে বসলো। সঙ্গে কিছু বিস্কুট আর পানিও কিনে নিলো। নির্দিষ্ট সময়ে লম্বা করে হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন প্লাটফর্ম ছাড়লো। ছুটে চললো সামনের দিকে।
চট্টগ্রাম পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় রেললাইনের দুই পাশে ছোটো—বড়ো পাহাড় আছে। সবুজ গাছগাছালি আর নানান গুল্মলতায় ঘেরা পাহাড়। এসব পাহাড় প্রকৃতিকে অসাধারণ সৌন্দর্য দান করেছে। পাহাড়ের ঢালুতে এবং ওপরে ছোটো ছোটো ঝুপড়ি ঘর বেঁধে পাহাড়িরা বাস করে। ট্রেনের জানালা দিয়ে মাথা বের করে পাহাড়ের সৌন্দর্য আর পাহাড়িদের জীবনযাপন দেখতে রৌদ্রের অসম্ভব ভালো লাগে। সে সারাটাক্ষণ প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য রাশি রাশি মুগ্ধতা নিয়ে অবলোকন করে।
পাহাড়তলী স্টেশনে পৌঁছাতেই সীতাকুন্ড পাহাড়ের শুরু। সীতাকুন্ডকে আবার চন্দ্রনাথ পাহাড়ও বলা হয়। সেই মিরসরাই পর্যন্ত এর বিস্তৃতি। ভারতের আসাম আর ত্রিপুরা রাজ্যের মধ্য দিয়ে ফেনী নদী পার হয়ে চট্টগ্রামের সাথে মিশেছে এই পাহাড়। কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু। অসাধারণ সৌন্দর্য নিয়ে কোথাও গাঢ় আবার কোথাও হালকা সবুজে ছেয়ে থাকে এই পাহাড়। পাহাড়ের চূড়া কিংবা খাঁজে খাঁজে হালকা কুয়াশা ভেসে থাকে কখনো কখনো। রৌদ্রের চোখেমুখে মুগ্ধতার আবেশ এনে দেয় এই দৃশ্য। সে কেবল অপলক নেত্রে তাকিয়ে থাকে সীতাকুন্ডের দিকে। পাহাড় ছুঁয়ে বাতাসের ঝাপটা এসে পড়ে তার ওপর। সঙ্গে নিয়ে আসে সুমধুর এক পাহাড়ি ঘ্রাণ। রৌদ্র চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ নিশ্বাসের সাথে পাহাড়ের গন্ধ শেঁাকে প্রাণভরে।

ফেনী জংশন পেছনে পড়লো। সামনে বিস্তৃত ফসলের মাঠ। তার বুক চিরে এগিয়ে চলেছে রেলগাড়ি। ঝকঝক ঝকঝক। তীব্র বেগে। দু’পাশে সারিসারি গাছ। সাঁইসাঁই করে পেছনে পড়ছে। রৌদ্রের পাশের সিট এখনো খালি। সেখানে কারো আগমন ঘটেনি। সেদিকে একবার দেখে নিয়ে বাইরে তাকালো সে। সবুজ ধানক্ষেত। দিগন্ত বিস্তৃত। দখিনহাওয়া এসে আছড়ে পড়ছে ক্ষেতে। দোল খেয়ে দুলে দুলে উঠছে কচি ধানপাতা। যেন মহাখুশিতে নৃত্য করছে তারা। বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতের ওপারে ছোটো ছোটো সবুজগ্রাম। হালকা কুয়াশায় ঝাপসা ঝাপসা। কোথাও কোথাও ধানক্ষেত শেষ হয়ে অন্যান্য ফসলের মাঠ। কোথাও আবার জলাশয়। অল্প অল্প পানি। কচুরিপানা তাতে। তার ফাঁকে ফাঁকে ডিঙিনৌকো। ছোটো ছোটো। দু’একটি কোন্দাও আছে। এমন মনোহর দৃশ্য ছুঁয়ে যাচ্ছে রৌদ্রকে। প্রাণ জুড়িয়ে দিচ্ছে তার। ভালোলাগার আবেশে ভরে যাচ্ছে মন। অকৃপণ সৌন্দর্য প্রকৃতির। রৌদ্র কেবলই উপভোগ করে চলেছে। দু’চোখ ভরা মুগ্ধতা তার।

রৌদ্র এতক্ষণে খেয়াল করলো, তার পাশের সিটে এসে বসেছেন তার মায়ের বয়সী একজন মহিলা। সঙ্গে ছয়—সাত বছর বয়সী ফুটফুটে একটি মেয়ে। ভারি মিষ্টি চেহারা তার। মেয়েটি রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে দিল। রৌদ্রও মুচকি হাসলো।
‘ভাইয়া, তোমার কি মন খারাপ?’ আচমকা বলে উঠলো মেয়েটি। ভ্রম্ন কুঁচকালো রৌদ্র। হয়তো রৌদ্রের আনমনা ভাব অনেকক্ষণ থেকে দেখছে মেয়েটি। তবে অচেনা ছোট্ট একটি মেয়ে এত সাবলীলভাবে রৌদ্রকে কোনো প্রশ্ন করবে, তা রৌদ্রের ভাবনায়ও ছিল না। ওর প্রশ্ন করার ঢঙে মনে হচ্ছে ও যেন রৌদ্রেরই আপন কেউ।
‘ও ভাইয়া! কী ভাবছো?’ রৌদ্রের নীরবতা দেখে আবার বলে উঠলো মেয়েটি। চমকে উঠলো রৌদ্র। তাকালো মেয়েটির দিকে। বুঝলো সে কেবল মিষ্টিই নয়, দারুণ বুদ্ধিমতীও।
‘আমার সাথে গল্প করবে? তোমার মন ভালো করে দেবো।’ পুনরায় বললো সে। এবার যেন অবাক হলো রৌদ্র। মেয়েটির মায়ের দিকে তাকালো।
‘আমার মেয়েটা এমনই, বাবা। ওর কাছে পরিচিত—অপরিচিত বলে কিছু নেই। তোমাকে দেখো পাগল করে ছাড়বে।’ বললো তার মা। মুচকি হাসলো রৌদ্র। ওর গালে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
‘বাহ্! তুমি তো দারুণ স্মার্ট।’
‘আর তুমি গোমড়া।’ কণ্ঠটা খানিকটা অভিমানী শোনালো তার।
‘তাই?’ হাসলো রৌদ্র।
‘হুমম। আমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছো না।’
‘আচ্ছা, এবার সব প্রশ্নের উত্তর দেবো।’
‘তাহলে আগে বলো, তোমার নাম কী?’
রৌদ্র ট্রেনের জানালা দিয়ে পূর্বাকাশ ছেড়ে মধ্যগগনের পথে এগিয়ে চলা গনগনে সূর্যকে দেখালো। মেয়েটি উঁকি দিয়ে দেখে নিয়ে বললো, ‘সূর্য?’
‘উঁহুঁ।’ ডানে—বাঁয়ে মাথা নাড়ালো রৌদ্র।
‘তাহলে আকাশ?’ উত্তর পাওয়ার আকাক্সক্ষা তার চোখে মুখে।
‘তাও না’।

‘তাহলে কী?’ যেন খানিকটা বিরক্তি ঝরে পড়লো মেয়েটির কণ্ঠ থেকে। রৌদ্র মুচকি হাসলো। বললো,
‘সূর্য কী ছড়ায়?’
‘আলো ছড়ায়।’ ত্বরিত উত্তর তার। ‘কিন্তু আলো তো মেয়েদের নাম। তুমি তো ছেলে।’ রাজ্যের সমস্ত ভাবনা যেন ওর চোখেমুখে। হঠাৎ বলে উঠলো, ‘ওও… বুঝেছি, তোমার নাম রোদ। তাইনা?’
হেসে উঠলো রৌদ্র। মাথা ওপর—নিচ করে বললো,
‘হুমম।’
‘আমি তাহলে তোমাকে রোদ ভাইয়া বলে ডাকবো।’ বললো সে।
‘তাই?’
‘হুমম।’ একটু থেমে পুনরায় বললো, ‘আচ্ছা রোদ ভাইয়া, আমার নাম কী বলো তো?’
ভাবুকের মতো ভঙ্গি করে খানিকটা ভেবে নিল রৌদ্র। তারপর বললো, ‘মিষ্টি।’
‘ধুর বোকা!’ যেন বিরক্তি ঝরলো কণ্ঠ থেকে। ‘তুমি তো আমার নাম জানোই না। আন্দাজে বললে হবে? আমার কাছে তো জিজ্ঞেস করবে যে, তোমার নাম কী?’
এক নাগাড়ে বললো মেয়েটি। ওর এমন কাণ্ডে রৌদ্র হেসে কুটিকুটি।
‘আচ্ছা, বলো তো শুনি, কী নাম তোমার?’
‘মীম। মীম আমার নাম।’
‘বাহ্! ভারি মিষ্টি নাম তো তোমার। তোমাকে তবে আমি মীমমণি বলে ডাকবো।’
‘আচ্ছা ডেকো, রোদ ভাইয়া।’

মীম আর রৌদ্রের মধ্যে অল্পতেই ভাব জমে উঠলো। কতকত গল্প করতে থাকলো তারা। রৌদ্র মীমকে তার সিটে জানালার পাশে বসিয়ে নিল। তারপর দু’জন মিলে বাইরের প্রকৃতি দেখতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর মীম তার ছোট্ট ব্যাগ থেকে কিটক্যাট চকোলেট বের করলো। তার অর্ধেক দিতে চাইলো রৌদ্রকে। কিন্তু রৌদ্র খেতে চাইলো না। বললো,
‘না, মীমমণি, তুমিই খাও।’
কিন্তু নাছোড়বান্দা মীম। বললো,
‘তোমাকে আমি খাইয়েই ছাড়বো।’ চকোলেটের কাগজ ছাড়ালো সে। তারপর রৌদ্রের মুখের কাছে নিয়ে বললো,
‘প্লিজ রোদ ভাইয়া, প্লিজ!’ আদুরে কণ্ঠ থেকে আদর গলে গলে পড়লো তার। না খেয়ে থাকতে পারলো না রৌদ্র। চকোলেটের অর্ধেকটা নিলো সে। এরপর একে একে কেক, বিস্কুট, চিপস, চুইংগাম বের করলো মীম। আধাআধি ভাগ করে দিল রৌদ্রকে। হকারের কাছ থেকে ঝালমুড়ি আর বরই আচার কিনলো। তা থেকেও ভাগ দিল রৌদ্রকে। আর সুবোধ বালকের মতো রৌদ্রকে চুপচাপ সব খেয়ে যেতে হলো। খাওয়া শেষ হলে রৌদ্রের গলা জড়িয়ে ধরে সিটে হেলান দিয়ে শুয়ে পড়লো মীম।

এদিকে রৌদ্রের বুকের ভেতর তোলপাড় হতে শুরু করলো। মীমকে বড্ড আপন মনে হতে লাগলো। আত্মার টান অনুভব করলো সে। অচেনা অজানা এই ছোট্ট মেয়েটিকে মনে হতে লাগলো অতি আপনজন। যেন নিজেরই অতি আদরের ছোটবোন, কোলেপিঠে করে বেড়ে তুলছে তাকে। হঠাৎই চোখটা ছলছল করে উঠলো রৌদ্রের। আহা! যদি এমন একটি মিষ্টি ছোটোবোন থাকতো তার! পরম মমতায় মীমকে বুকে জড়িয়ে নিলো সে। দৃষ্টি দিল বাইরে। মনমাতানো সবুজ প্রকৃতি কেমন যেন ঝাপসা হয়ে উঠলো তার চোখে।

ছুটছে ট্রেন। হুইসেল বাজিয়ে। সমানতালে। দুরন্ত গতিতে। বাতাস কেটে কেটে। সাপের মতো এঁকেবেঁকে। হিস্ হিস্ করে। গ্রামের পরে গ্রাম পেরিয়ে। মাঠের পরে মাঠ পেরিয়ে। নদী আর খাল পেরিয়ে। ছুটতে ছুটতে অবশেষে গতি মন্থর হলো ট্রেনের। আখাউড়া জংশন সামনেই। এখানে মীমদের নামতে হবে। মীমের মা সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। ডাকলো মীমকে। ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। জানালা গলে ঠাণ্ডা হাওয়ার শীতল স্পর্শ ঘুম এনে দিয়েছিল ওর দু’চোখে। রৌদ্রের গলা জড়িয়ে ধরে তার কোলেই ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। মায়ের ডাকে ঘুমপরীরা পালিয়ে গেল ওর চোখের কচিপাতা ছেড়ে।
‘আমরা এসে গেছি?’ চোখ কচলাতে কচলাতে মীম জিজ্ঞেস করলো ওর মাকে।
‘হ্যাঁ, এসে গেছি। এখন নামতে হবে। ভাইয়াকে টা টা দিয়ে চলে আসো।’ বললো ওর মা।

মায়ের সাথে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে মীম বললো,
‘নিজের খেয়াল রেখো রোদ ভাইয়া। সাবধানে যেও।’ হাত নেড়ে বাই বাই জানালো। রৌদ্র কেবল নির্বাক চোখে বোবার মতো তাকিয়ে থাকলো।
রৌদ্র যেপাশে বসেছে, সেপাশেই প্লাটফর্ম। যাত্রীরা একে একে নামছে। মায়ের সাথে মীমও নেমে দাঁড়ালো। রৌদ্র জানালা গলে মাথা বের করে দিলো। তা দেখেই প্লাটফর্ম দিয়ে মীম দৌড়ে এলো রৌদ্রের সোজাসুজি। জোর শব্দে বললো,
‘রোদ ভাইয়া, ভালো থেকো।’
রৌদ্র কেবল স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলো।
গড়াতে শুরু করলো রেলগাড়ির চাকা। বিষাদে ছেয়ে গেল রৌদ্রের মন।
হু হু করে উঠলো রৌদ্রের বুকটা। কালবৈশাখী ঝড়ের সাথে এবার বজ্রপাত হতে লাগলো বুকের ভেতর। রৌদ্রের কেবলই মনে হতে লাগলো, ইশশ্! মীম যদি তার নিজেরই বোন হতো…!
গতি পেল ট্রেন। মীম আর রৌদ্রের দূরত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকলো। মীম এবার দু’হাত নেড়ে টা টা দিতে লাগলো রৌদ্রকে। আর ধরে রাখতে পারলো না রৌদ্র নিজেকে। ঝরঝর করে অশ্রু ঝরে পড়লো চোখ থেকে। হাত নেড়ে টা টা জানালো মীমকে। গলাটা আরো বাড়িয়ে দেখতে লাগলো তাকে। কিন্তু কেমন যেন চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে গেল মীম। মীমমণি।

SHARE

Leave a Reply