Home খেলার চমক সুলতান অব সুইং -আবু আবদুল্লাহ

সুলতান অব সুইং -আবু আবদুল্লাহ

বিশ্ব ক্রিকেটের এক কিংবদন্তির নাম ওয়াসিম আকরাম। বল হাতে যিনি সৃষ্টি করেছেন অনেক স্মরণীয় মুহূর্ত। যার বলের মোকাবেলায় বিশে^র বাঘা বাঘা ব্যাটসম্যানদেরও হাত কাঁপতে শুরু করতো। বল যেন তার ভাষা বুঝতো। বাউন্সার, ইয়র্কার, কাটার, সুইং- যখন যেভাবে দরকার সেভাবেই বলটাকে ছুড়তেন। তবে তার সেরা অস্ত্র ছিল সুইং। বিশেষ করে পুরনো বলে রিভার্স সুইং করাতে পারতেন সুনিপুণ দক্ষতায়। সাধারণত বোলাররা বলের পোলিশটাকে কাজে লাগিয়ে যেদিকে সুইং করান, ওয়াসিম আকরাম পুরনো বলে তার উল্টো দিকে সুইং করাতে শুরু করেন। স্লোগ ওভারে তার এই বল মোকাবেলা করা ছিল ভীষণ কঠিন। রিভার্স সুইং বুঝতে ব্যাটসম্যানদের লেগেছে অনেক বছর। এই ধাঁধার মুখে পড়ে কত ব্যাটসম্যান যে উইকেট ছুড়ে এসেছেন তার ইয়ত্তা নেই। যেটাকে কেউ বলেন ক্রিকেটের ডাক আর্ট বা গোপন বিদ্যা। সুইংয়ের এই দক্ষতার কারণে তাকে বলা হয় সুলতান অব সুইং।

১৯৬৬ সালের তেসরা জুন লাহোরের এক পাঞ্জাবি মুসলিম পরিবারে জন্ম ওয়াসিম আকরামের। ছোটবেলায় হতে চেয়েছিলেন টেবিল টেনিস খেলোয়াড়; কিন্তু দাদার উৎসাহে ক্রিকেট খেলতে শুরু করেন। লাহোরে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের একটি প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে নজরে আসেন নির্বাচকদের। ১৯৮৪ সালের শেষ দিকে ফয়সালাবাদে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেক হয় এই বামহাতি পেসারের। এক মাস পরে ফিরতি সফরে অকল্যান্ডে তাদের বিপক্ষেই টেস্ট অভিষেক। কোনো প্রথম শ্রেণির ম্যাচ না খেলেই আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়েছিল তার। ব্যক্তিগত দ্বিতীয় টেস্টেই নেন ১০ উইকেট, আর ক্যারিয়ারের তৃতীয় ওয়ানডেতেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নেন ৫ উইকেট। এরপর শুধুই এগিয়ে চলা।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে রিভার্স সুইংয়ের শুরুটা করেছিলেন পাকিস্তানি পেসার সরফরাজ নওয়াজ। কিন্তু ওয়াসিম আকরামের হাতেই সেই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। আবার ইয়র্কার, বাউন্সারেও ওয়াসিম ছিলেন অতুলনীয়। এসব অস্ত্র দিয়েই পাকিস্তানকে এনে দিয়েছেন অনেক কিছু।

১৯৯২ সালে পাকিস্তানের বিশ^কাপ জয়ের অন্যতম নায়ক ওয়াসিম আকরাম। মেলবোর্নের সেই ফাইনালে পরপর দুই বলে ম্যাচের ভাগ্য পাল্টে দেন তিনি। নেইল ফেয়ারব্রাদার আর অ্যালান ল্যাম্বের জুটি যখন পাকিস্তানের কাছ থেকে ম্যাচ ছিনিয়ে নিচ্ছিল, তখন ওয়াসিম আকরামকে দ্বিতীয় স্পেলে ডাকেন অধিনায়ক ইমরান। ৩৫তম ওভারের পঞ্চম বলে ৩১ রান করা ল্যাম্বের ব্যাটকে ফাঁকি দিয়ে বল আঘাত হানে স্টাম্পে। পরের বলে নতুন ক্রিজে আসা ক্রিস লুইসকেও বোল্ড করেন। জোড়া উইকেট নিয়ে পাকিস্তানের ম্যাচ জয় অনেকটাই নিশ্চিত করেন তিনি। এর আগে ইনিংসের শুরুতেই ০ রানে ফিরিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড়ো তারকা ইয়ান বোথামকে।

ফাইনালের সেই মঞ্চে ব্যাট হাতেও ওয়াসিম আকরাম ছিলেন আগ্রাসী। ১৮ বলে খেলেছিলেন ৩৩ রানের ঝড়ো এক ইনিংস। যার সুবাদেই পাকিস্তানের স্কোরটা ২৪৯ এ পৌঁছেছিল। ব্যাটে বলে এমন দুর্দান্ত নৈপুণ্যের পর বিশ^কাপ ফাইনালের ম্যান অব দ্য ম্যাচ পুরস্কারটা তার হাতেই উঠেছিল।
ওয়ানডের পাশাপাশি টেস্টেও ছিলেন সফল। দুই ফরম্যাটেই চারশতাধিক উইকেট পেয়েছেন এমন বোলারের সংখ্যা বিশে^ মাত্র দুজন, তার মধ্যে প্রথমজন ওয়াসিম আকরাম। দ্বিতীয়জন মুত্তিয়া মুরালিধরন। ওয়ানডেতে প্রথম ৫০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। সব মিলে দুই ফরম্যাটে ৯১৬টি উইকেট তার। ১০৪ টেস্টে ৪১৪ টি আর ৩৫৬ ওয়ানডেতে ৫০২টি উইকেট নিয়েছেন। একমাত্র বোলার হিসেবে উভয় ফরম্যাটেই দুটি করে মোট ৪টি হ্যাটট্রিক রয়েছে ওয়াসিম আকরামের। এর মধ্যে ওয়ানডেতে তার দু’টি হ্যাটট্রিকের সবগুলোই বোল্ড আউট। বামহাতি পেসারদের মধ্যে ওয়াসিম আকরামের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। অনেকে তাকে সর্বকালের সেরা পেসার হিসেবেও আখ্যায়িত করেন।

বোলিংয়ের পাশাপাশি লেট অর্ডারে ব্যাট হাতেও কিছু দারুণ ইনিংস উপহার দিয়েছেন ওয়াসিম আকরাম। টেস্টে ৩টি সেঞ্চুরি রয়েছে তার, এর মধ্যে একটি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। এছাড়া জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২৫৭ রানের একটা ইনিংস আছে, যা আট নম্বর ব্যাটসম্যান হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রানের বিশ্বরেকর্ড। ওয়ানডেতে ৬টি হাফ সেঞ্চুরিতে সাড়ে তিন হাজারের বেশি রান তার। স্লগ ওভারে ব্যাট করতে নেমে রান রেট বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। পাকিস্তানের বিশ^কাপ জয়ী অধিনায়ক ইমরান খান আক্ষেপ করে বলতেন, ওয়াসিম আকরাম যদি ব্যাটিং নিয়ে সিরিয়াস হতেন তাহলে একজন গ্রেট অলরাউন্ডার পেত পাকিস্তান।
ওয়ানডে ব্যাটসম্যানদের গেম হলেও ওয়াসিম আকরাম ২২ বার ওয়ানডেতে ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হয়েছেন। টেস্টে ম্যাচ সেরা হয়েছেন ১৭ বার। টেস্ট ম্যাচে ১০ উইকেট নিয়েছেন ৫ বার। ৫টি বিশ্বকাপ খেলে ৩৮ ম্যাচে নিয়েছেন ৫৫ উইকেট। যে রেকর্ড পরবর্তীতে ভেঙেছেন শুধুমাত্র গ্লেন ম্যাকগ্রা।
নেতা হিসেবেও ছিলেন সফল। তার অধিনায়কত্বে ইংল্যান্ডের মাটিতে সিরিজ জয়, এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জয় ও ১৯৯৯ বিশ^কাপের ফাইনালে উঠেছিল পাকিস্তান।

বল হাতে মাঠে যতটা ভয়ঙ্কর ছিলেন, ব্যক্তিগত জীবনে ততটাই আন্তরিক আর বন্ধুসুলভ ছিলেন তিনি। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের কাছে পরাজয়ের পর বাংলাদেশের ড্রেসিং রুমে গিয়ে টাইগারদের অভিনন্দন জানিয়েছিলেন এই গ্রেট বোলার। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে ঢাকার ঘরোয়া ক্রিকেটেও খেলেছেন। ঢাকার মাঠ তার প্রিয় ভেন্যুগুলোর একটি ছিল, যে কারণে বাংলাদেশকে বলতেন সেকেন্ড হোম।
২০০৩ বিশ^কাপের পর আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলা হয়নি ওয়াসিম আকরামের। এরপর ধারাভাষ্যকার ও কোচ হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন। ব্যক্তিগত জীবনে দুই পুত্র ও এক কন্যাসন্তানের জনক তিনি।

SHARE

Leave a Reply