Home স্বপ্নমুখর জীবন সুন্দর জীবনের সন্ধানে -আমিনুল ইসলাম ফারুক

সুন্দর জীবনের সন্ধানে -আমিনুল ইসলাম ফারুক

মানুষকে আল্লাহ তা’য়ালা সর্বোত্তম অবয়বে সৃষ্টি করেছেন। সমস্ত প্রাণিজগতের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরতম সৃষ্টি হচ্ছে মানুষ। তাই মানুষ সবসময় সুন্দরের পূজারি। বয়স্ক, যুবা, শিশু, ধনী-দরিদ্র, মূর্খ-জ্ঞানী নির্বিশেষে সবাই সুন্দরকে ভালোবাসে। সুন্দর শুধু দেখতে সুন্দর নয়, অভ্যন্তরীণভাবেও সুন্দর হতে হবে। ভেতরে-বাইরে পুরোটাই সুন্দর। সুন্দর জীবন মানে সুখী, শান্তিময় এবং সফল জীবন। আর এই সুখ, শান্তি আর সফলতা শুধু পৃথিবীর নয়- পরকালীনভাবেও সুখ, শান্তি আর সফলতাপূর্ণ জীবন। তবেই সেটা হবে পূর্ণাঙ্গ সুন্দর জীবন। প্রতিটি মানুষই এমন সুন্দর জীবন চায়। তবে এটা অর্জনের উপায় কী? পরীক্ষায় ফেল করতে যেমন কষ্ট হয় না, ফেল করা খুব সহজ একটা কাজ। লেখাপড়া না করে ঘরে বসে থাকলেই ফেল নিশ্চিত। অন্য দিকে পাস করা তথা ভালো রেজাল্টের জন্য চাই কঠিন পরিশ্রম। নিয়মকানুন মেনে চলা, সবসময় চেষ্টা এবং রুটিনমাফিক পথচলা। অনুরূপভাবে সুখ, শান্তি, সফলতা তথা সর্বতো সুন্দর জীবনের জন্যও কিছু নিয়মকানুন, পরিশ্রম ও পদ্ধতির অনুসরণ আবশ্যক। সুন্দর জীবনের জন্য প্রথম শর্তই হলো মনেপ্রাণে লক্ষ্য স্থির করতে হবে। মনকে বুঝাতে হবে আমি সফলতার জন্য চেষ্টা করব। সফলতার জন্য প্রয়োজনীয় পরিশ্রমে কার্পণ্য করব না। দ্বিতীয় শর্ত হলো সামনে অগ্রসর হব। সুন্দরের জন্য কিছু অসুন্দর বিষয় ও অভ্যাসকে ত্যাগ করব। সবশেষ শর্ত হলো, মহান স্রষ্টায় বিশ্বাসী হয়ে মঙ্গলময় জীবন যাপন করব।

প্রকৃতি সুন্দর। আকাশ, নদী-সমুদ্র, পাহাড়-পর্বত, বৃক্ষরাজি, পশু-পাখি, কীটপতঙ্গ, ফুল-ফল, বর্ণ, বৈচিত্র্য, সুগন্ধি, আলো, চাঁদ-সূর্য, তারকা, ছায়াপথ সবকিছুই সুন্দর। বর্ণে, গন্ধে, বৈচিত্র্যে, প্রকৃতি যেন সুন্দরের মেলা। প্রকৃতির দুটি সুন্দর জীবন হলো- প্রাণী এবং উদ্ভিদ। প্রকৃতিতে সবচেয়ে সুন্দরতম জীবন হলো মানুষের। স্রষ্টা মানুষের সুখ ও শান্তির জন্য পুরো প্রকৃতিকে অপরূপে সাজিয়েছেন। এ জন্যই মানুষের প্রধান দায়িত্ব হলো স্রষ্টাকে ধন্যবাদ দেওয়া। এত বড়ো উপহার কেউ কাউকে দিতে পারে না। প্রতিটি মানুষকেই মহান স্রষ্টা এত বড়ো উপহার এককভাবে দিয়েছেন। বিনিময়ে স্রষ্টা চান মানুষ শুধু তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করুক। স্রষ্টাকে মন থেকে ধন্যবাদ দিক মানুষ। স্রষ্টাকে ধন্যবাদ দেওয়া মানেই স্রষ্টার ইবাদত করা। সব ধর্মের মূল বক্তব্যই হচ্ছে- স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন এবং সর্বদা তাকে স্মরণ করা। বিনিময়ে স্রষ্টা তাকে সুখ, শান্তি, সফলতা দান করেন। শান্তি ও সফলতা স্রষ্টার একান্ত বিষয়। স্রষ্টা যাকে শান্তি দেবেন না, সে কখনই শান্তি পাবে না। এ জন্যই বিশ্বজয়ী নেপোলিয়ান জীবন সায়াহ্নে বলেছিলেন- ‘জীবনে ছয়টি দিনও শান্তিতে কাটাতে পারিনি। জীবন দুর্বিষহই রয়ে গেল।’

শয়তান প্রেম ও ভালোবাসা ধ্বংস করার জন্য যত রকম উপায় উদ্ভাবন করেছে, তার মধ্যে ঘ্যানর ঘ্যানর, অবিশ্বাস এবং সন্দেহ হলো প্রধান। কোনো পরিবারে এ বিষয়টি ঢুকে গেলে শান্তি দরজা-জানালা দিয়ে পালিয়ে যাবে। সক্রেটিস, আব্রাহাম লিঙ্কন, নেপোলিয়ান, লিও টলস্টয়ের মতো প্রতিভাধর মনীষীরা গৃহসুখ ও শান্তি পাননি। তাদের স্ত্রীরা ঘ্যানর ঘ্যানর করে আর সন্দেহের জালে ঘরে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিল।
ফ্রান্সের সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ান সুন্দরী মেরি ইউজিসকে ভালোবেসে বিয়ে করেন। অতি সাধারণ ঘরের এ সুন্দরী রমণী সম্রাটের ঘরে অশান্তির আগুন জ্বেলেছিলেন। তিনি সর্বদা ঘ্যান ঘ্যান, প্যান প্যান করতেন আর সবক্ষেত্রেই সম্রাটকে সন্দেহ করতেন। ঈর্ষার আগুনে দগ্ধ হয়ে আর সন্দেহের জ্বালায় মেরি ইউজিস নেপোলিয়ানের কোনো কথাই শোনেননি। এমনকি সম্রাটকে এক মুহূর্তও একাকী থাকতে দেননি। শাসনকার্য পরিচালনার সময় রাজসভায় ঢুকেও তিনি তার দরকারি কাজে বাধা দিতেন এবং লোকজনের সামনে সম্রাটকে হেস্তনেস্ত করতেন। সম্রাটকে কষ্টের আগুনে দগ্ধ করে অঙ্গারে পরিণত করেছিলেন সুন্দরী ইউজিস। মানুষের ঘ্যানর ঘ্যানর ও সন্দেহপূর্ণ স্বভাবটি গোখরো সাপের মতো, যা শান্তিকে এক নিমিষেই বিনাশ করে দেয়।

যে কোনো বিয়েতে সাফল্য নির্ভর করে সঠিক মানুষকে খুঁজে বের করার ওপর। তবে যিনি এ কাজটি করবেন তাকেও সঠিক মানুষ হতে হবে। আমরা প্রিয়জন, আত্মীয়, পাড়া-প্রতিবেশীদের ভালোবাসব কিন্তু তাদেরকে নিজের অধীনে আনবার চেষ্টা করব না। জোরাজুরি, ধস্তাধস্তি করে কারো মন পাওয়া যায় না। ভালোবাসা দু’পক্ষের সমঝোতার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। পরিবারে সুখের মূলে রয়েছে মেনে নেওয়ার মতো কৌশল অবলম্বন। কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করতে নেই। একটু ছাড় দেওয়ার মতো মানসিকতা থাকা চাই। একটু ক্ষমা, দয়া, অনুগ্রহ, ঈড়সঢ়ৎড়সরংব থাকাটা খুবই জরুরি। গৃহের মানুষটির সমালোচনা না করে কৌশলে বুঝিয়ে দেবো। প্রয়োজনে ক্ষমা করে দেব। ক্ষমা করতে তো আর অর্থের প্রয়োজন হয় না। ফরাসি ছেলেদের শেখানো হয়, ‘যে কোনো সন্ধ্যায় মেয়েদের পোশাকের প্রশংসা করতে হবে এবং তা বারবার করতে হবে। রাশিয়ার জাররা খাদ্য পরিবেশনের সময় রাঁধুনিদের পরিবেশিত খাদ্যের সামনে নিয়ে আসতেন এবং তাদের রন্ধন কর্মের প্রশংসা করতেন। প্রশংসা হতে হবে নগদ এবং গরম গরম। দেরি করলে যে কোনো প্রশংসা পানসে হয়ে যায়। এতে কাজের কাজ হয় না। মানুষ সবকিছু নগদ আশা করে। এটিই মানুষের সহজাত স্বভাব। মেয়েরা তাদের জন্মবার্ষিকী এবং বিবাহবার্ষিকীকে সবচেয়ে বেশি মনে রাখে। এ দু’টি দিন তাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নারীরা কেন এ দুটো দিনকে এতবেশি গুরুত্ব দেয়- সেটা অবশ্য রমণীসুলভ এক রহস্য। ইউরোপে এক গবেষণায় এসেছে, নারীরা যদি প্রাতঃকালে স্বামীর বিদায়ের সময় (অফিসে বা কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার কালে) একটু উপস্থিত থাকত এবং একটু মুচকি হেসে বিদায় দিত তাহলে অনেক বিবাহ বিচ্ছেদই ঠেকানো যেত। এ বিষয়ে অ্যামেরিকাতেও সার্ভে হয়েছে, ফলাফল একই। স্ত্রীরা যদি স্বামীর প্রতি একটু ভদ্রতা দেখায় তবে অন্য কিছু লাগে না। বোকা স্বামীরা কুপোকাত। ভালোবাসাকে শেষ করতে কড়া আর কটু কথা হলো ক্যান্সারের মতো। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমরা তাই করি। একটু সতর্ক হলেই পরিবার সুখের ও সুন্দর হয়।

জীবনকে সুন্দর ও আকর্ষণীয় করবার জন্য ব্যক্তিত্ব একটি বড়ো জিনিস। কিছু মানুষকে সবাই পছন্দ করে। এই যে পছন্দ করা, এটাই হলো আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব। ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্টকে সৈনিক ও আমজনতারা খুবই পছন্দ করত। এমনকি সম্রাট যখন ব্রিটিশদের সাথে যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে হেরে যান, ব্রিটিশ সৈনিকেরা তখনও তাকে গার্ড অব অনার দিয়ে সাদর অভ্যর্থনা দিয়েছে। এমনকি সেন্ট হেলেনা দ্বীপেও তাঁকে সম্মানের সাথে অবস্থান করতে দেওয়া হয়েছিল। এসবই তাঁর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের জন্য সম্ভব হয়েছে। ব্যক্তিত্ব হলো এমন এক সিলমোহর, যার সুস্পষ্ট ছাপ আমরা অপরের মধ্যে রেখে যাই। তবে চমৎকার ব্যক্তিত্বের সাথে যদি অহঙ্কার থাকে তা খুবই ক্ষতিকর। অহঙ্কার সবকিছুকেই নষ্ট করে দেয়। অহঙ্কারী মানুষকে স্বয়ং স্রষ্টাও পছন্দ করেন না। আল্লাহ বলেছেন- ‘অহঙ্কার হলো আমার পোশাকতুল্য, এটা নিয়ে যে টানাটানি করবে তার ধ্বংস অনিবার্য।’

সফল ব্যক্তিদের কয়েকটা কমন বৈশিষ্ট্য ছিল। সেগুলো হলো- সময়ানুবর্তিতা, ভদ্রতা, উন্নত চরিত্র, চটপটে, ক্ষিপ্রতা, মিতব্যয়িতা, বুদ্ধিদীপ্ততা, হাস্যরসময়, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব। আমাদের মনে রাখা চাই যে, অনুপম চরিত্র ও ব্যবহারিক জ্ঞান মানুষকে আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। কলঙ্কময় চরিত্র ব্যক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়।
প্রতিটি মানুষই একটি বিন্দু এবং সে একটি কেন্দ্রের দিকে ধাবিত। আবার প্রতিটি মানুষকে কেন্দ্র করে অন্যরা চলছে। এ দুটো বিষয়ের মধ্যে সঠিক সমন্বয় জরুরি। আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোকে আলোয় আনতে হবে- আলোতে এনে বাস্তবতার মুখোমুখি করতে হবে। বাস্তবতার নিরিখে আমাদের চাওয়াকে বাছাই করা জরুরি।

আত্মসমালোচনা এবং দূরদৃষ্টি- এ দুটো কাজ সাধারণ মানুষকে অসাধারণ মানুষে পরিণত করে। প্রতিদিনই প্রতিদিনের কাজ নিয়ে আত্মসমালোচনা হওয়া উচিত। মনের দৃষ্টিকে প্রসারিত করে ভবিষ্যৎ দেখতে হবে। জীবনের শুরুতে স্রোতের অনুকূলেই চলা উচিত। সঠিক চিন্তাশক্তির প্রয়োগে ভালো-মন্দ বিচার করা উচিত। তবে সত্য-মিথ্যা বিচার না করে শুধু স্রোতের অনুকূলে চলা বোকামি এবং ব্যক্তিত্বহীনতার পরিচয়। যা সত্য তাকে স্বীকার করা এবং মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকাই উত্তম চরিত্রের জরুরি শর্ত। ধরেই নিতে হবে, সবাইকে খুশি করা যাবে না। অন্যায় কাজ করে কাউকে খুশি করতে যাওয়া মহাভণ্ডামি। সঠিক সময়ে ভুল সিদ্ধান্ত, সিদ্ধান্তহীনতার চেয়ে উত্তম। কালক্ষেপণ করা দুর্বল ব্যক্তিত্বের লক্ষণ। সব কাজে প্রয়োজনীয় ও সঠিক মনোযোগ দেওয়াটা জরুরি। যেখানে যতটুকু দরকার তা করা, বেশি বেশি করাটা হালকা ব্যক্তিত্বের পরিচয়।

মানুষ চলার পথে অনেক ভুল করে থাকে। তবে বাস্তব বুদ্ধি আর সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে পুনরায় সাফল্য অর্জন সম্ভব। মানসিক শক্তিই একজন মানুষকে সাফল্যের চূড়ান্ত গন্তব্যে নিয়ে যেতে পারে, যদি সেই শক্তি হয় ইস্পাতদৃঢ়। মানসিক শক্তিই মানুষের মূল চালিকাশক্তি। অনেকটা ব্যাটারিতে চার্জ দেওয়ার মতো। গাড়ির জ্বালানি বা ফুয়েলের মতো। ভারতবর্ষের মহান সম্রাট আকবর অক্ষরজ্ঞানহীন ছিলেন। কিন্তু তাঁর বাস্তববুদ্ধি, চতুরতা, কৌশলী মনোভাব, সহিষ্ণুতা- সবমিলিয়ে সুন্দর ব্যক্তিত্বে তিনি মহান সম্রাটে পরিণত হয়েছিলেন। অতিবড়ো শত্রুও তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্বের সামনে ম্লান হয়ে যেত। আজ এ পর্যন্তই। সবাই ভালো থাকবে, সুস্থ থাকবে। আল্লাহ হাফিজ।

SHARE

Leave a Reply