Home গল্প গাঁধার মুখে ফুটলো কথা -এস. এম রুহুল আমীন

গাঁধার মুখে ফুটলো কথা -এস. এম রুহুল আমীন

বনি ইসরাইলের নবী হযরত মূসা আলাইহিস সালামের জামানা। সে জামানায় কিনানে বাস করতেন তাওরাতের হাফিজ, মুফাসসির ও প্রখ্যাত আলিম। নাম তার বালয়াম বাউরা। আল্লাহর আবিদও ছিলেন তিনি। তার মর্যাদাও ছিল আল্লাহর কাছে অনেক। তিনি যে দোয়া করতেন আল্লাহ তা কবুল করতেন।
হযরত মূসা আলাইহিস সালামের সাথে ভালো ও সুসম্পর্ক ছিল তাঁর। বিপত্তি হলো হযরত মূসা আলাইহিস সালামের মৃত্যুর পর। বনি ইসরাইলের শাসক ও খলিফা হলেন হযরত মূসা আলাইহিস সালামের আপন ভাগ্নে ইউশা ইবনে নুন আলাইহিস সালাম। বালয়াম বাউরা খলিফার কাছে একটি রাজকীয় উচ্চপদ লাভের ইচ্ছা পোষণ করেন। হযরত ইউশা ইবনে নুন আলাইহিস সালাম তা দিতে অস্বীকার করেন। তখন লোভী আলিম অভিমানে অসন্তুষ্ট হয়ে দেশ ত্যাগ করে বসতি স্থাপন করেন পার্শ্ববর্তী মুশরিক রাজ্য বেলকায়। বেলকায় বসবাসের জন্য পেয়ে যান নাগরিকত্ব এবং সেখানকার শাসক থেকে একখণ্ড জমি।
হযরত ইউশা ইবনে নুন আলাইহিস সালাম মহান আল্লাহর আদেশপ্রাপ্ত হন বেলকা রাজ্যে ইসলামের বিজয় পতাকা উত্তোলনের। আল্লাহর আদেশপ্রাপ্ত হয়ে হযরত ইউশা ইবনে নুন আলাইহিস সালাম চিঠি লেখেন বেলকা রাজ্যের বাদশাহর কাছে। হে রাজন! আপনি ইসলামী আদর্শের অনুসারী হয়ে যান অথবা আত্মসমর্পণ করুন।
বেলকার রাজা চরমপত্র প্রত্যাখ্যান করে ও তার রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। শুরু হলো তুমুল যুদ্ধ। লড়াই করলো দু’দল সেনাবাহিনী বীর বিক্রমে। বিজয়ী হলো হযরত ইউশা ইবনে নুন আলাইহিস সালামের দল। বেলকার সৈন্যদের কিছু হয় নিহত এবং অধিকাংশ যায় পালিয়ে। নিরুপায় বেলকার বাদশাহ যায় বালয়াম বাউরার কাছে। ধরনা দেয় বিনীতভাবে ও সবিনয়ে অনুরোধ জানায় সে। হে বালয়াম বাউরা! আজকের এ বিপদ মুহূর্তে আপনার সাহায্য একান্ত প্রয়োজন। আপনি আপনার আল্লাহর কাছে বলুন। আমার জন্য দু‘আ করুন। যাতে ইউশা ইবনে নুন আলাইহিস সালামকে তাড়িয়ে যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারি।
বালয়াম বাউরা শুনলেন রাজার কথা। মনে পেলেন ব্যথা। সে বললো, এ কি কথা বলছেন আপনি? এটা কি করে সম্ভব? হযরত ইউশা ইবনে নুন আলাইহিস সালাম আল্লাহ মনোনীত প্রিয় নবী। তার বিরুদ্ধে দোয়া করা আমার জন্য মহাপাপের কাজ ছাড়া আর কিছুই নয়। তা ছাড়া এরূপ দু‘আ কবুল হওয়ার সামান্যতম সম্ভাবনাও নেই। তার চেয়ে আপনি বরং ইসলাম গ্রহণ করুন। নিরাপদ থাকবে আপনার রাজ্য, নিরাপদ থাকবেন আপনি নিজেও।
বালয়াম বাউরার কথায় রাজা ক্ষুব্ধ হলেন। দিলেন হত্যার হুমকি। অপর দিকে বালয়াম বাউরার স্ত্রীর কাছে পাঠালেন গোপনে দূত। অঢেল সম্পদের প্রলোভন দিয়ে। বালয়াম বাউরা ভাবনায় পড়লেন। ভয়ে ভড়কে গেলেন। কী করবেন তিনি। দেশ ত্যাগ করে আছেন মুশরিক রাজার হাতের মুঠোয়। তার পক্ষে রাজার শক্তি মোকাবেলা কি সম্ভব? অন্য দিকে অঢেল সম্পদের হাতছানি। সম্পদের মোহে হলেন অন্ধ। রাজাকে সময় দিলেন একদিন। ভাবনার জন্য। রাজা তাকে সময়ও দিলো। বালয়াম বাউরার নিয়ম ছিল। কোন বিষয়ে দোয়া করতে হলে আল্লাহর অনুমতি নিতেন। আল্লাহ তাকে স্বপ্নের মধ্যে জানিয়ে দিলেন। সাবধান! আমার নবীর বিরুদ্ধে কোনো দোয়া করো না। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। এরূপ হলে তোমার বরবাদ হবে দুনিয়া ও আখিরাত।
বালয়াম বাউরা রাজাকে তার স্বপ্নের কথা জানালেন। কিন্তু কিছুতেই মানছেন না রাজা। সে আরো একদিন সময় দিয়ে চলে গেলো। দোয়ার জন্য বলে গেলো সে। বালয়াম বাউরা আবার আল্লাহর অনুমতি চেয়ে শুয়ে পড়লেন। কিন্তু স্বপ্নে কিছুই দেখলেন না। কিছুই জানালেন না আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা। বালয়াম বাউরা পড়লেন ভীষণ ভাবনায়। হলেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়! এমন সময় উপস্থিত রাজার দূত। তাকে তাড়া দিলেন দু‘আর জন্য।
শয়তান দিতে লাগলো ওয়াসওয়াসা। তোমার ভাবনা কিসে? গত রাতে আল্লাহ কিছু বলেনি এটা হলো মৌনতা। আর মৌনতা সম্মতির লক্ষণ বটে। তাছাড়া কাফির বাদশাহকে দোয়ার মাধ্যমে বিজয়ে সাহায্য করলে সে থাকবে চিরকৃতজ্ঞ। এ সুবাদে তাকে হিদায়াত করাও সহজ হবে। শয়তানের ক্ষুরধার যুক্তি ও চটকদার কথার কাছে পরাজিত হলেন বালয়াম বাউরা। ভাবলেন না আল্লাহর নবীর বিপক্ষে যাওয়া আর আল্লাহর বিরোধিতা করা একই কথা। দ্বিতীয়ত আল্লাহর নবীর বিরুদ্ধে গিয়ে অন্য কাউকে হিদায়াত এতো চরম বোকামি ও দুরাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। আসল সত্য হলো, দুনিয়ার লোভে লোভাতুর স্বার্থ ও সম্পদের মোহে অন্ধ। বালয়াম বাউরা ভাবতে পারেনি কিছুই।
বালয়াম বাউরা উঠলো এবং গাধার পিঠে চড়লো। রওয়ানা দিলো তার নির্দিষ্ট ইবাদাত খানার দিকে। রাজার পক্ষে দোয়া করার জন্য। গাধাটি থমকে দাঁড়ায়। চলার শক্তি হারিয়ে ফেলে আল্লাহর হুকুমে। গাধাটিকে প্রহার করতে থাকলে তার জবান খুলে যায়। গাধার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে কথা। হে বালয়াম বাউরা! তুমি যে উদ্দেশ্যে যাচ্ছো, সে কাজে তোমাকে বহন করতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন আমাকে।
রাজার এক বিরাট সেনাদল ছিল বালয়াম বাউরার সাথে। চলতে না পেরে সেখানেই দোয়া শুরু করলো বালয়াম বাউরা। কিন্তু তিনি যা বলছেন মুখ দিয়ে বের হচ্ছে তার ঠিক উল্টো কথা। সবাই তো তাজ্জব। সে বললো, হে আল্লাহ! রাজাকে বিজয়ী করো। সবাই শুনতে পেলো হযরত ইউশা ইবনে নুনকে বিজয়ী করো। পিছন থেকে রাজার লোকেরা তীব্র প্রতিবাদ জানালো। চিৎকার করে বলতে লাগলো। ওহে বালয়াম বাউরা! আপনি তো উল্টো দু‘আ করছেন। বালয়াম বাউরা বললেন, আমি ঠিকই দোয়া করছি। কিন্তু আমার জিহবা আমার কথা শুনছে না। চলে গেছে আমার আয়ত্তের বাইরে।
এ সময় হঠাৎ! বালয়াম বাউরার জিহবা বের হয়ে পড়লো বুক পর্যন্ত। হাঁফাতে থাকলো। কারো কারো মতে তার মুখমণ্ডল হয়ে গেলো কুকুরের মতো। শরীরের নিচের অংশ থাকলো মানুষের মতো। এবার বালয়াম বাউরা বললো, আমারতো দুনিয়া আখিরাত দুটোই বরবাদ হয়ে গেলো!
বালয়াম বাউরা মারা না গেলেও আল্লাহ তার দু‘আ কবুলের সক্ষমতা কেড়ে নিলেন। তার আর কোনো দোয়াই কবুল হতো না। তার দেহাকৃতির পরিবর্তন মৃত্যু অবধি একই রকম থাকলো। দুনিয়ার ক্ষমতা ও সম্পদের লোভ মানুষকে এরকম আল্লাহর নাফরমান ও পথভ্রষ্ট করে। হয়ে যায় ‘কালবুদ দুনিয়া’ বা দুনিয়ার কুকুর।
বালয়াম বাউরার নাম পবিত্র কুরআনে সরাসরি আসেনি। তবে কুরআনুল কারীমের সূরা আল আরাফের একশত পঁচাত্তর নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, “আর হে নবী; আপনি তাদেরকে শুনিয়ে দিন, সে লোকের অবস্থা। যাকে আমি আমার নিদর্শনসমূহের জ্ঞান দান করেছিলাম অথচ সে তা পরিহার করে বিপরীত কাজ করে আসল সত্য থেকে বেরিয়ে গেছে। আর তার পিছনে লেগেছে শয়তান। ফলে সে গোমরাহি লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছে।”
সুতরাং দুনিয়ার লোভ, মোহ বা কোন পরিস্থিতিতেই আল্লাহর অসন্তুষ্টিমূলক কিছুই করা উচিত নয়। এই ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়ার অনেক কিছুই আছে।

SHARE

Leave a Reply