Home গল্প বাবার উপহার -এনায়েত রসুল

বাবার উপহার -এনায়েত রসুল

বাবা সরকারি চাকরি করেন। তাই একটা নির্দিষ্ট সময় পর বাবাকে বদলি করা হয়। কোনো এক শহরে থিতু হয়ে বসার পরপরই অন্য কোনো শহরে বদলি হয়ে যেতে বাবার কেমন লাগে জানি না- আমার কষ্ট হয়। পাড়াপ্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব আর স্কুলের অঙ্গন ছেড়ে নতুন কোনো শহরে গিয়ে আবার নতুনভাবে নিজেকে মানিয়ে নিতে আমার ইচ্ছে করে না। বাবারও হয়তো ইচ্ছে করে না। কিন্তু তার তো বদলির আদেশ মেনে নেওয়া ছাড়া উপায়ও থাকে না। বাবাকে তো চাকরি করতেই হবে আর আমাকেও বাবার সঙ্গে থাকতে হবে। তাই সব বন্ধন ছিন্ন করে আমাকে বাবার পিছু পা বাড়াতে হয়- সঙ্গে থাকেন মামণি।
চার মাস আগে বাবা খুলনা থেকে বগুড়া বদলি হয়ে এসেছেন। এখানে এসে মালতীনগর নামে এক শান্ত সুনিবিড় এলাকায় বাসা নেওয়া হয়েছে। এলাকার মতো এখানকার প্রতিবেশীরাও শান্ত। তারা এতোটাই শান্ত যে, আমাদের চারপাশে কেউ আছে কি নেই, তা প্রায় বোঝাই যায় না! নবাগতদের সঙ্গে পরিচিত হতে তারা যতোটা আগ্রহী, তার চেয়েও বেশি আগ্রহী নিজেদের গুটিয়ে রাখতে। তাই বাবা-মা আর স্কুলের সীমানার ভেতরই আমাকে দিন কাটাতে হচ্ছে।

বাসার কাছাকাছি এক স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছে আমাকে। ছোটো স্কুল, তাই ছাত্রীসংখ্যা কম। আমাদের ক্লাসে আমাকে নিয়ে ছাত্রী রয়েছে মাত্র ঊনত্রিশ জন। আমি ওদের সঙ্গে কথা বলতে চাই কিন্তু ওরা হাই-হ্যালো করে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। বন্ধুত্ব গড়ে তোলার মতো আন্তরিকতা দেখায় না। তাই আজও আমি বন্ধুহীন হয়ে আছি। এই বন্ধুহীনতার কষ্ট আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। ভেতর থেকে প্রতিনিয়ত আমাকে বদলে দিচ্ছে। আমি নিশ্চুপ হয়ে যাচ্ছি।
আমার ভেতর যে একটা অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন এসেছে, এ ব্যাপারটা মামণি লক্ষ করেছেন। আর তা তাকে শঙ্কিত করে তুলেছে। তাই আজকাল তিনি প্রায়ই জানতে চাইছেন কেন আমি মন খারাপ করে বসে থাকি। কেন আমি আগের মতো হইচই করে বেড়াই না। দিন দিন চঞ্চলতা হারিয়ে নিশ্চুপ হয়ে যাচ্ছি?
মামণির প্রশ্নের জবাব দিতে আমার ইচ্ছে করে না। আমি থমকে যাই। আমার মনে হয়, সহপাঠীরা যে আমাকে বন্ধু করে নিচ্ছে না, প্রতিবেশী কোনো মেয়ের সাথেও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেনি, এসব কথা মামণিকে জানিয়ে কি লাভ হবে- কোনো লাভ হবে না। আমার কষ্টের কথা শুনে তিনি ব্যাকুল হবেন কিন্তু সমস্যার সমাধান খুঁজে পাবেন না। মাঝ থেকে তার কষ্ট বাড়বে। তার চেয়ে নিজের কষ্ট নিজের বুকে চেপে রাখাই ভালো। আমি আমার মন খারাপের কারণ আমার বুকের মাঝেই চেপে রাখি। তাই মামণির আর কিছু জানা হয় না।

দুই.

মামণি সম্ভবত আমার সম্পর্কে বাবাকে কিছু বলেছেন। হয়তো বলেছেন- তুলিটা দিনদিন অ্যাবনর্মাল হয়ে যাচ্ছে। ওর মাঝে নর্মালিটি ফিরিয়ে আনা দরকার। আর এ জন্যে ওকে একটু হাসিখুশি রাখতে হবে। সঙ্গ দিতে হবে। মামণির কথাগুলো হয়তো বাবার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। তাই একদিন বাবা আমাকে ডেকে বললেন, তুলি! ঝটপট তৈরি হয়ে নে। তোকে নিয়ে বেড়াতে যাব।
বাবা তার কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকেন বলে আজকাল আর তার সঙ্গে কোথাও যাওয়া হয় না। সেই বাবা আমাকে নিয়ে বেড়াতে যাবেন শুনে আমার এতো ভালো লাগল যে, চোখের পলকে আমি তৈরি হয়ে গেলাম। তারপর ছুটে গিয়ে বাবাকে বললাম, লুক অ্যাট মি, আই অ্যাম রেডি।
বাবা বললেন, আমিও রেডি। চল বেরিয়ে পড়ি।
বাবার হাতে হাত রেখে আমি পথে নামলাম।

শহর থেকে বিশ কিলোমিটার উত্তরে মহাস্থানগড়। বাবা আমাকে সেখানে নিয়ে গেলেন।
মহাস্থানগড়ের মাটি খুঁড়ে বের করা হয়েছে কয়েক হাজার বছর আগে গড়ে ওঠা পুন্ড্রবর্ধন বা পুন্ড্রনগর নামে এক শহরের ধ্বংসস্তূপ। সেই ধ্বংসস্তূপের পাশ দিয়ে যেতে যেতে বাবা বলে যেতে লাগলেন শহর নির্মাণের ইতিহাস আর সে সময়কার জীবনযাত্রার কথা। আমি তন্ময় হয়ে সেসব শুনে যেতে লাগলাম। মাঝে মধ্যে দু-একটা প্রশ্ন করে যে বাবাকে উৎসাহ জোগানো দরকার, সেই প্রয়োজনীয় কথাটা একবারও আমার মনে এলো না। কিন্তু বাবার মনে এলো। আমার আচরণ তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হলো। তাই কথা বলা থামিয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন, তোর কি মন খারাপ?
: না তো! কেন বাবা, তোমার কি তাই মনে হচ্ছে?
উল্টো আমি বাবাকে প্রশ্ন করলাম। বাবা খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে জবাব দিলেন, একটু একটু মনে হচ্ছে।
: কেন বাবা? মনে হচ্ছে কেন?
: কারণ, তুই কথা বলছিস না। আমি বলে যাচ্ছি, তাতে কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছিস না। তাই মনে হলো হয়তো তোর মন খারাপ, তাই নিশ্চুপ হয়ে আছিস।
আমি বললাম, না বাবা, মন খারাপ না। আসলে আমি চুপ করে থেকে মনোযোগ দিয়ে তোমার কথা শুনছিলাম। কতো কিছু জানো তুমি! আমাদের ইতিহাস স্যারও এতোকিছু জানেন না।
: বাবা!
আমার ভেতর থেকে বিস্ময়ধ্বনি বেরিয়ে এলো। সেই ছোট্ট শব্দটি শুনে বাবা সোজাসুজি আমার দিকে তাকালেন। তারপর আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, হয়েছে কি বল্ তো? আমার কাছে কিছু লুকোস না- আমি তোর বাবা।
এই যে বাবা বললেন ‘আমি তোর বাবা’- এ কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতর একটা অন্যরকম অনুভূতির সৃষ্টি হলো। মনে হলো, বাবা শুধু বাবা নন, তিনি আমার বন্ধু। যে বন্ধুকে সব কথা বলা যায়, বিশ্বাস করা যায়- তেমন এক নির্ভরযোগ্য বন্ধু।
আমাদের চলা থেমে গিয়েছিল। বাবা দাঁড়িয়ে ছিলেন। এবার আমি আরো সরে গিয়ে বাবার শরীর ছুঁয়ে দাঁড়ালাম। তারপর বললাম, বাবা! তোমার কাছে কিছু লুকোবো না। জানো বাবা, আমার কিছু ভালো লাগে না।
: কিছু মানে?
: কিছু মানে সবকিছু। যেমন ধরো আলো বাতাস ফুল পাখি নদী- এমন আরো যা কিছু আছে, সবকিছু। তুমি আছো সব সমস্যার সমাধান করে দেওয়ার জন্যে, মামণি থাকেন পাশে পাশে, তবুও নিজেকে ভীষণ নিঃসঙ্গ মনে হয়। লোনলি ফিল করি সারাটা সময়।
: লোনলি ফিল করিস!
: হ্যাঁ বাবা, অলওয়েজ আই ফিল লাইক দ্যাট। মনে হয় মানুষের মাঝে নয়, কোনো জনমানবহীন দ্বীপে বাস করছি। চারপাশে শুধু নিঃসঙ্গতার সমুদ্র। বাবা! আজকাল…
: আজকাল কী, মা? আজকাল কী?
ব্যাকুল হয়ে বাবা আমার দিকে তাকালেন। আমি বললাম, আজকাল আমার স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে না।
ভেবেছিলাম কথাটা শুনে বাবা রাগ করবেন। কিন্তু রাগ না করে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে না কেন? বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া করেছিস?
বললাম, কি যে বলো! বন্ধু থাকলে তো ঝগড়া করবো। আমার কোনো বন্ধু নেই।
: বন্ধু নেই? বন্ধু নেই বলতে তুই কি বোঝাতে চাইছিস? স্কুলে তোর বন্ধু নেই- নট অ্যা সিঙ্গল ফ্রেন্ড?
: ইউ আর কোয়াইট রাইট, বাবা। আই হ্যাভ নট অ্যা সিঙ্গল ওয়ান। কারো সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়নি।
: বাট হোয়াই? হোয়াই, মাই চাইল্ড? বন্ধুত্ব হয়নি কেন?
বাবার কণ্ঠে একই সঙ্গে বিস্ময় ও বিচলিত ভাব প্রকাশ পেল। আমি বললাম, কী করে বন্ধুত্ব হবে? সারাটা ক্ষণ ওরা শুধু নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে। নতুন হিসেবে আমাকে কোনো কন্সিডার করে না। একটা প্রশ্ন করলে শুধু সেই প্রশ্নটার জবাব দেয়, তারপর অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকে। এমন করে বন্ধুত্ব হয়? বলো বাবা, বন্ধুত্ব হয়?

বাবা বললেন, না, এক পক্ষের চেষ্টায় বন্ধুত্ব হয় না। তবে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা খুব কঠিন কাজও নয়। দেখবি, কিছু দিনের মধ্যে ওরাও তোর বন্ধু হয়ে যাবে।
: ইম্পসিব্ল। ওদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার টেকনিকটা অ্যারোনটিক্যাল সায়েন্সের চেয়েও জটিল।
ক্ষোভের সঙ্গে কথাটা বললাম আমি। কিন্তু বাবা বেশ শান্ত কণ্ঠেই বললেন, নাথিং ইজ ইম্পসিবল। তোকে শুধু আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চেষ্টা করে যেতে হবে। দেখবি, শেষ পর্যন্ত তোরই জয় হবে।
বললাম, জয় হতো, ওরা যদি আত্মকেন্দ্রিক না হতো। ওরা যে কেমন, তুমি তা বুঝতেই চাইছো না!
এতোক্ষণ ধৈর্য ধরে আমার কথা শুনছিলেন, এবার তার কণ্ঠে বিরক্তি প্রকাশ পেল। তিনি বললেন, এমন সব কথা বলিস, যার কোনো মানে হয় না। তোদের বয়সী মেয়েরা আবার আত্মকেন্দ্রিক হয় নাকি? ওরা তো টকেটিভ হয়। সারাক্ষণ শুধু কথা বলে।
আমি দ্রুত নিজেকে শুধরে নিয়ে বললাম, হ্যাঁ বাবা, তুমি ঠিক বলেছো। ওরা সারাক্ষণ কথা বলে। তবে কথা বলে শুধু নিজেদের মধ্যে। আমি কিছু বলতে চাইলেই মুখে তালা…
আর বলা হলো না। তার আগেই বুকের ভেতর থেকে কান্না উথলে এলো। সে কান্না আমার কথা বলা থামিয়ে দিল আর বাবাকে বিচলিত করে তুলল। বাবা বললেন, কী মুশকিল! কাঁদছিস কেন? বলেছি তো ওরা তোর বন্ধু হয়ে যাবে।
: উহ্ বাবা! তুমি শুধু বলেই যাচ্ছো ওরা আমার বন্ধু হয়ে যাবে। বাট হাউ ইট উইল বি? কেমন করে বন্ধু হবে? কেমন করে?
আমার প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে এক মুহূর্ত সময় নিলেন বাবা। তারপর বললেন, হ্যাঁ, এটাও একটা প্রশ্ন- কেমন করে? দাঁড়া, একটু ভেবে নিই। নিশ্চয়ই কোনো না কোনো উপায় পেয়ে যাবো।
আকাশের দিকে তাকিয়ে উপায় খুঁজে চললেন বাবা। খুঁজতে খুঁজতে এক সময় তার চেহারা ঝলমল করে উঠল। তখন তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন, ও হ্যাঁ, উপায় পেয়েছি। এবার জন্মদিনে তোকে একটা উপহার দেবো। সেই উপহার তোর সব দুঃখ মুছে দেবে। ঠিক আছে? বল, ঠিক আছে?
বাবাকে খুশি করার জন্য বললাম, আচ্ছা বাবা, ঠিক আছে।
সঙ্গে সঙ্গে বাবা প্রতিবাদ করে বললেন, না না, এভাবে বললে চলবে না। তোকে হেসে হেসে বলতে হবে। বলবি, হ্যাঁ বাবা- ঠিক আছে। বল, হেসে হেসে বল…
চোখমুখ নাচিয়ে বাবা কথাটা এমন করে বললেন যে, তা দেখে কান্নাঝরা চোখেও আমার হাসি পেয়ে গেল- আমি হাসিতে ভেঙে পড়লাম।

তিন.

আজ আমার জন্মদিন। সে অজুহাতে বাবা অফিসে গেলেন না। এক সেকেন্ড রেস্টও নিলেন না। সারাটা দিন ব্যস্ত থেকে লাল-নীল বাতি দিয়ে বাড়ি সাজালেন। আমার জন্য বার্থডে কেক কিনে আনলেন। গেস্টদের ইনভাইট করলেন। এসব কাজ করতে করতে সন্ধ্যা নেমে এলো। তখন বাবা বললেন, আয় তুলি, তোকে সাজিয়ে দিই।
অবাক কাণ্ড, সত্যি সত্যিই তাই করলেন বাবা- নিজ হাতে আমাকে সাজিয়ে দিলেন! তারপর আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বললেন, বল, তোকে কেমন দেখাচ্ছে?
: কেমন দেখাচ্ছে বাবা, সিন্ডারেলার মতো?
উল্টো আমি প্রশ্ন করলাম বাবাকে। বাবা বললেন, না না, সিন্ডারেলার মতো দেখাবে কেন! তোকে তোর মতোই দেখাচ্ছে- একেবারে তিলোত্তমা মেয়ের মতো।
তিলোত্তমা শব্দটার অর্থ জানি না, তবুও মনটা আনন্দে রিনঝিন করে উঠল। মনে হলো বাবা যখন বলেছেন, তখন সুন্দর কিছুর কথাই বলেছেন।
বুকভরা বিশ্বাস নিয়ে আমি আয়নার দিকে তাকালাম। সে আয়নায় যে ছবি ভেসে উঠল, সেই ছবি দেখে আমার চোখ দুটো থির হয়ে গেল- হায় আল্লাহ, আমি এত্তো সুন্দর- এতো! আয়নায় এ কার ছবি ভেসে উঠেছে- আমার, না কোনো রূপবতী রাজকন্যার? ওহ্ মাই গড!
নিজের সৌন্দর্য দেখে নিজেই আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আয়না থেকে চোখ সরাতে ইচ্ছে করল না। তাই অপলক চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইলাম।
কতোক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম জানি না, হঠাৎ বাবা সেই তন্ময়তা ভেঙে দিলেন। তিনি বললেন, চল্ মা, ড্রইরুমে যাই। গেস্টরা হয়তো এসে গেছেন।

গেস্টরা সত্যি সত্যিই এসে গিয়েছিলেন। বাবার অফিস কলিগ আর প্রতিবেশীদের কয়েকজন এসেছেন। মামণি তাদের সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলছেন। আমি ঘরে পা রাখতেই একটা বিস্ময়ধ্বনি ভেসে এলো- ওয়া-ও-উ, সো কিউট! হু ইজ দ্য এঞ্জেল? এ মেয়েটা কে?
প্রশ্নটা কানে যেতেই অন্য সবার সঙ্গে মামণিও ঘুরে তাকালেন। তার চোখ পড়ল বাবা আর আমার ওপর। অমনি সেই চোখ দুটো ঝলমল করে উঠল। তিনি তখন গর্বিত কণ্ঠে বললেন, আপনারা যে মেয়েটির জন্মদিনে এসেছেন, এ হলো সেই মেয়ে- তুলি। যাক, হোস্ট যখন এসে গেছে তখন আর সময় নষ্ট করবো না। অনুষ্ঠান শুরু করবো।
মামণির কথা শেষ হতেই বাবা বললেন, হ্যাঁ, শুরু করবো। তবে তার আগে আমি তুলিকে একটা উপহার দেবো- মেয়ের জন্য বাবার উপহার। তুলি! চোখ বন্ধ র্ক- এক দুই তিন বলার পর চোখ খুলবি।
বাবা বলেছেন তাই চোখ বন্ধ করলাম- বাবা এক দুই তিন বললেন তাই চোখ খুললাম। অমনি পাশের ঘর থেকে কলকল ছলছল করতে করতে আমার ক্লাসমেটরা বেরিয়ে এলো। আর আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওরা হ্যাপি বার্থডে টু তুলি বলে আমাকে জড়িয়ে ধরল। ঘটনাটা এতো দ্রুত, এতো অবিশ্বাস্যভাবে ঘটে গেল যে, মনে হলো আমি স্বপ্ন দেখছি!
অন্তরা, মিমি, ইশারা আর নীলারা কার কাছ থেকে আমার জন্মদিনের কথা জানতে পেরেছে, সে কথা জানার জন্য আমি যখন প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যাচ্ছি, তখন বাবা বললেন, তোর প্রশ্নের জবাবটা আমি দিচ্ছি। বলেছিলাম জন্মদিনে তোকে উপহার দেবো- ওরা হলো সেই উপহার। পুরো সাতাশ জন এসেছে তোর জন্মদিনে- তোকে নিয়ে আটাশ। বন্ধু হবার জন্য আর কেউ বাকি নেই তোর ক্লাসে। খুশি হয়েছিস?
খুশি? এ প্রশ্নের কী জবাব দেবো? খুশি হলে সবার মন আনন্দে নেচে ওঠে, কিন্তু আমার কান্না পেল! আমি বড়ো হয়েছি। চারপাশে গেস্টরা আমাকে ঘিরে রেখেছেন, তারা অপলক চোখ আমার দিকে তাকিয়ে আছেন, নতুন বন্ধুরা হইচই করছে, সামনে বার্থডে কেক পড়ে আছে, সব উপেক্ষা করে বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে আমি কান্নায় ভেঙে পড়লাম।

SHARE

Leave a Reply