Home জানার আছে অনেক কিছু পানিতে বাসা বাঁধে যে মাকড়সা -মেহেদী হাসান নয়ন

পানিতে বাসা বাঁধে যে মাকড়সা -মেহেদী হাসান নয়ন

ঘরের কোণে মাকড়সা দেয়াল বেয়ে চলাফেরা করে। আবার নিজের বোনা জালে অবস্থান করে। শুধু কি ঘরেই, ঘরের বাইরেও এরা জাল বুনে। যেখানে শীতকালে শিশির জমে থাকে। এই জালগুলো মাকড়সারই তৈরি।
শিকার ধরা কিংবা বিশ্রামের জন্য এরা এই কাঠামো তৈরি করে থাকে। কিন্তু কখনো কি এমনটা শোনা গেছে যে পানির নিচেও মাকড়সা থাকে!
অবিশ্বাস্য শোনালেও এটাই সত্যি। ‘ডাইভিং বেল স্পাইডার’ নামের এই প্রজাতির মাকড়সা পানির নিচেই বসবাস করে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Argyroneta aquatica।
রুপার মতো এক ধরনের ঔজ্জ্বল্য তৈরি করে বলে এর এরকম বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয়েছে। ল্যাটিন ভাষায় যার অর্থ ‘পানির ভেতর রুপোর জাল’। এর নাম ডাইভিং বেলস্পাইডার হলেও একে ওয়াটার স্পাইডার বা জলজ মাকড়সা নামেও ডাকা হয়। এরা স্বাদু পানিতে বসবাস করে।
ইউরোপ এবং এশিয়ায় এদের দেখা যায়। যখন এটি পানির ওপরে উঠে আসে, তখন গায়ের রঙ মাঝারি থেকে তীব্র বাদামি হয়ে যায়। বুকের দিকে থাকা লোম দেখতে ধূসর মখমলের মতো লাগে। অন্যান্য মাকড়সার মতো এদেরও পেটের দিকে লোম থাকে।
ডাইভিং বেলই একমাত্র মাকড়সা যেটি পানির নিচে বাস করে। প্রায় পুরো জীবনেই এরা পানির নিচে কাটিয়ে দেয়। বিশ্রাম, শিকার, আহার, প্রজনন, ডিম দেওয়াসহ সবকিছুই এরা পানির নিচে করে থাকে। মাঝে মাঝে অক্সিজেন এবং শিকারের জন্য পানির উপরি স্তরে উঠে আসে।
জলজ মাকড়সাদের পুরুষ সাধারণত স্ত্রী থেকে আকারে ৩০ শতাংশ বড় হয়ে থাকে। এই প্রজাতির পুরুষ মাকড়সা ৭.৮-১৮.৭ মিলিমিটার লম্বা হয়। স্ত্রীর মাথা এবং শরীরের দৈর্ঘ্য হয়ে থাকে ৮ থেকে ১২ মিলিমিটার। সাধারণত অন্যান্য প্রজাতির পুরুষ মাকড়সারা স্ত্রী মাকড়সার তুলনায় ছোট হয়। কিন্তু এই প্রজাতির ক্ষেত্রে তা ব্যতিক্রম। পুরুষদের এই বড় হওয়ার কারণ হিসেবে বিশ্বাস করা হয়, পুরুষরা লম্বা হওয়ার কারণে এরা দ্রুত নাড়াচাড়া করতে পারে। এ কারণেই এরা সহজে শিকার করতে পারে।
এখন প্রশ্ন জাগতে পারে যে এরা পানির নিচে শ্বাস নেয় কীভাবে! স্কুবা ট্যাঙ্ক আবিষ্কৃত হওয়ার আগে ডুবুরিরা পানির নিচে ডাইভিং বেল ব্যবহার করতেন। ডাইভিং বেল একটি বড় চেম্বার। ডুবুরিরা এই চেম্বার থেকে অক্সিজেন পেতেন। অ্যারিস্টটলের সময়ও এটা ছিল।
একই রকমভাবে ইউরোপের নদী এবং হ্রদগুলোতে জলজ মাকড়সা এ ধরনের একটি চেম্বার ব্যবহার করে থাকে। চেম্বারটি মূলত পানির বুদবুদ। চারপাশে পানির দেয়াল এবং মধ্যে একটুখানি বাতাস। সেখান থেকেই বিশেষ এই মাকড়সাটি অক্সিজেন পেয়ে থাকে। পানির নিচের বাবলগুলোই এই মাকড়সাদের বাড়ি, শিকার ধরার ফাঁদ, ডিম রাখার স্থান।
জলজ মাকড়সা বুদবুদ তৈরি করার কৌশল অদ্ভুত। এই প্রজাতির মাকড়সারা নিজস্ব ডাইভিং বেল তৈরি করে শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজ করে। প্রথমত, এরা পানির ‍নিচে থাকা উদ্ভিদের সাথে সিল্কের জাল বুনে বাসা তৈরি করে। এদের বাসা দেখতে অনেকটা গম্বুজাকৃতির হয়।
এই বাবলগুলো মাকড়সার ফুলকার মতো কাজ করে। ক্রমাগত অক্সিজেন গ্রহণ এবং এ থেকে নির্গত হওয়া কার্বন ডাইঅক্সাইড আশপাশের পানিতে দ্রবীভূত হতে থাকে। বাবল থেকে অক্সিজেনের পরিমাণ কমতে থাকায় ধীরে ধীরে নাইট্রোজেন নির্গত হয়। ফলে বাবলগুলো সঙ্কুচিত হতে থাকে।
সঙ্কুচিত হতে হতে বাবলগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে মাকড়সাগুলোকে পানির উপরি তলে উঠে আসতে হয় অক্সিজেন গ্রহণের জন্য। পুরুষ মাকড়সার তুলনায় স্ত্রী মাকড়সাই বেশি ওপরে উঠে আসে অক্সিজেন বাবল নিতে।
বুদবুদ একটি অতিরিক্ত ফুলকা হিসেবে কাজ করে, যার ফলে মাকড়সাটি শ্বাস নিতে পারে। এই বুদবুদগুলো যেন মাকড়সারই নিজস্ব অঙ্গ। এটি মাকড়সার সাথেই থাকে যখন এটি শিকার করতে যায়, সাঁতার কাটতে যায়। এর ফলে এরা সব পরিস্থিতিতে শ্বাস নিতে পারে।
কখনো কখনো বুদবুদ এত বড় হয় যে, মাকড়সাটি এর ভেতরেই অবস্থান করতে পারে।
এই বুদবুদের ভেতরে থেকে এরা শিকার করে কীভাবে! আসলে বুদবুদ মাকড়সাকে শিকার ধরতে সাহায্য করে। জলজ মাকড়সা জলজ পতঙ্গ এবং মশার লার্ভা খেয়ে জীবন ধারণ করে। স্ত্রী ডাইভিং স্পাইডার ৩০ থেকে ৭০টি ডিম দেয়। ডিম সাদা রঙের হয়ে থাকে। স্ত্রী ডিম পাহারা দেয়। ডিম ফুটে বেরোনোর মাসখানেক পর বাচ্চা মাকড়সারাও বুদবুদ তৈরি করতে পারে। দুই থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত এরা মায়ের বাসাতেই বড় হয়। চার সপ্তাহের দিকে চতুর্থ বারের মতো এদের খোলস ছাড়ানো হয়ে যায়। এরপর থেকেই বাচ্চা মাকড়সাগুলো নিজেদের বাসা তৈরি করতে শুরু করে।
এই মাকড়সাগুলো সাধারণত জলজ পোকা এবং ছোট ছোট মাছ খেয়ে বেঁচে থাকে। তাছাড়া মশার লার্ভা খেয়ে এরা আমাদের উপকারও করে। তবে এর কামড় বেশ যন্ত্রণাদায়ক। এর কামড়ে জ্বর, বমি এবং প্রচণ্ড ব্যথা হতে পারে। এরা সাধারণত এক থেকে দুই বছর বেঁচে থাকে।

SHARE

Leave a Reply