Home নিয়মিত রহস্যভেদ গন্ধ-পাগল -জুবায়ের হুসাইন

গন্ধ-পাগল -জুবায়ের হুসাইন

[গত সংখ্যার পর]

‘চুপ করে আছো কেন? জবাব দাও?’ কিছুটা চিল্লিয়ে উঠল ফিরোজ।
‘বাংলো রহস্যের সমাধানের জন্য।’ মিনমিন করল আবিদ।
‘পেরেছ করতে?’
‘আমি কিছুই পারিনি, তবে বিপ্লব করে থাকতে পারে।’
‘হুঁ।’ মাথা দোলালো ফিরোজ। ‘ও কোথায় এখন?’
‘জানি না।’ এপাশ ওপাশ মাথা নেড়ে বলল আবিদ।
‘আমি জানি। বলল ফিরোজ। ‘মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে।’
‘মা-মানে?’ আবিদের কণ্ঠে বিস্ময় ও জিজ্ঞাসা।
‘কী হয়েছে বিপু ভাইয়ার?’ উদ্বিগ্ন শোনালো সুমির কণ্ঠ।
‘আমরা ডাকাত।’ সোজাসাপ্টাভাবে বলল ফিরোজ। ‘জেল পালানো আসামি। গ্রেট গিলটি।’
ঘন ঘন ঢোক গিলে এ ওর দিকে তাকাতে লাগল আবিদ ও সুমি। প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে বোঝা যায়।
‘আমাদের কী করবেন আপনারা?’ গলায় তেমন জোর নেই আবিদের। এখন ও ভয়ই পাচ্ছে। গোয়েন্দিগিরিতে রিস্ক আছে জানে ও, কিন্তু সেই রিস্কটা যে এতটা হবে তা বুঝতে পারেনি। বুঝতে পারলে হয়ত বিপুর সাথে এভাবে এই অজানা অচেনা জায়গায় চলে আসত না।
সুমি অতটা ভয় না পেলেও বেশ ঘাবড়ে গেছে। এলাকার মেয়ে ও। ওদের বাড়ি ফিরতে দেরি দেখে আব্বু নিশ্চয়ই বসে থাকবেন না। কোনো না কোনো ব্যবস্থা করবেন ওদের উদ্ধারের।
‘আগেই বলেছি তোমাদেরকে কিছু করার জন্য ধরে আনিনি আমরা। শুধুমাত্র ভয় দেখাতেই তোমাদের ধরে আনা।’
‘ছাড়া পেয়ে আমরা যদি পুলিশকে সব জানিয়ে দিই?’ মনে অনেকটা সাহস এনে বলল সুমি।
জবাবে ঠোঁট মুড়ে হাসল ফিরোজ। এখান থেকে ছাড়া পেয়ে সুমি বাড়ি গেলেও আবিদ এবং তোমাদের বন্ধু- বিখ্যাত গোয়েন্দা বিপ্লব খান ওরফে বিপু ভাইয়া বাড়ি চলে যাবে।’ বলে গটমট করে বাইরে বেরিয়ে বাইরে থেকে দরজা আটকে দিল।
নির্জন ঘরটাতে ওরা এখন বড় একা।

দশ.
পাবলিক লাইব্রেরি এই শহরে নেই। বিপ্লব বাংলোটা সম্পর্কে জানতে শহরে এসেছে। লাইব্রেরি বলতে এখানে কয়েকটা বই-খাতা ও স্টেশনারির দোকান। একটা বড় দোকান দেখে ঢুকে পড়ল বিপ্লব। এই দোকানটার ভেতরে বসে বই এবং পত্রিকা পড়ার ব্যবস্থা আছে। অনেকেই পড়ছে এবং কেউ কেউ তাকে সাজানো বই দেখছে, কেউ পছন্দের বই বা অন্যান্য স্টেশনারি সামগ্রী কিনে নিয়ে যাচ্ছে।
ভেতরে চার-পাঁচজন কর্মচারী রয়েছে। ক্যাশে যিনি বসা তাকে দোকানের মালিক বলে মনে হলো।
বিপ্লব তাকে সাজানো বইয়ের ওপর চোখ বুলাতে লাগল। একটু খুঁজতেই পেয়ে গেল ও- “এনায়েতপুরের পোড়োবাড়ি” নামক বইটা তাক থেকে পেড়ে নিলো। বেশ মোটা বই। একটা চেয়ারে বসে পড়ল বিপ্লব। টেবিলে বইটা রাখল। উল্টাতে লাগল একের পর এক পৃষ্ঠা। মন দিয়ে পড়তে লাগল। বাংলোটি তৈরি সম্ভবত ইংরেজ আমলে, ১৮০২ সালের দিকে। বেশ সুন্দর করেই বানিয়েছিল বাংলোটা। রুম ছিল দুটো। কিন্তু আশ্চর্য! এতে কোনো পাথরের কাজ করা হয়নি। সম্পূর্ণ পাকা ইটের।
বাংলোটিতে একটি গোপন ঘর ছিল। অনেকের ধারণা, একটি নয়, বেশ কয়েকটি ঘর আছে মাটির নিচে।
পেশি টানটান হয়ে গেল বিপ্লবের। ঘাড়ের রোমগুলো খাড়া হয়ে গেল। নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ করে পড়তে লাগল ও।
ইংরেজদের সাথে এই এলাকার মানুষের সংঘর্ষ হয় সে সময়। তখন ইংরেজদের রোষানল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অনেকে আশ্রয় নেয় এর ভেতর। ইংরেজরা কামানের গোলা ফেলে বাংলোটার ওপর। তাতে ধ্বংস হয়ে যায় বাংলোর একটা রুম। মারা পড়ে বহু লোক। কেউ কেউ চাপা পড়ে মাটির নিচের গোপন ঘরে।
ঐ সময় বিশিষ্ট এক খবরে জানা যায়, বাংলোতে আশ্রয় নিয়েছিল প্রায় ৭৬ জন লোক। লাশ উদ্ধার হয় সত্তর জনের। বাকি ছয়জনের লাশ পাওয়া যায়নি।
বইয়ের চুম্বক অংশ ছিল এগুলো।
পড়া শেষ করল বিপ্লব। সেলসম্যানের কাছ থেকে একটা খাতা আর একটা বলপয়েন্ট কলম নিয়ে খস খস করে লিখে নিলো কিছু নোট। কাগজটা ছিঁড়ে ভাঁজ করে পকেটে ভরল।
তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বইটা জায়গামত রেখে বেরিয়ে এলো লাইব্রেরি ঘর থেকে। কাছে কোথাও হোটেলে আগে কিছু খেয়ে নেবে ও। তারপর যাবে কোন ক্লিনিকে মাথার আঘাতের জন্য ওষুধ নিতে। ব্যস, আজকের দিনের কাজ এটুকুই। অনেক কিছুই জেনে নিয়েছে ও। তাতে চিন্তার খোরাক পেয়েও গেছে ও। কাজেই আগে সঙ্গীদের উদ্ধার করতে হবে। তারপর বের করবে বাংলোর এখানকার রহস্য।

মাটির নিচের এক ঘর।
পাহাড়ের একটা গুহার মত ছোট ঘরটা। একটা দুই শ’ পাওয়ারে বাল্প জ্বলছে ঘরে। আলো লেগে চিকচিক করছে পাথরের দোয়াল। যেন ভৌতিক হাসি হাসছে। হাতছানি দিয়ে ডাকছে পৃথিবীর মানুষকে। গ্রাস করবে সে সবাইকে।
ঘরের মেঝেতে পাশাপাশি পড়ে আছে এক কিশোর আর এক কিশোরী- আবিদ এবং সুমি।
ভয়ার্ত দৃষ্টিতে একবার চারদিকটা দেখল আবিদ। কোথাও কোন দরজার চিহ্ন চোখে পড়ল না। কিভাবে এখানে এসেছে তাহলে ওরা? এখন রাত না দিন, তাও বুঝতে পারছে না। তবে আবিদের ধারণা এখন রাতই হবে।
পল পল করে বয়ে চলেছে সময়।
কথা বলতেও ভয় পাচ্ছে ওরা। পাছে কোনো ভূত এসে ওদেরকে খেয়ে ফেলে!
এক সময় দেয়ালের একটা পাথর সরে গেল পাশে। একটা দরজার মত ফাঁক হয়ে গেল ওখানে। ওদিকেই তাকিয়ে রইল ওরা।
ঘরের আলো যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ল ওখানে। অস্পষ্টভাবে দেখা গেল পাথরের সিঁড়িটা। একটা কাঁপা আলো এগিয়ে আসছে এদিকে।
রক্ত হিম হয়ে গের ওদের। কি-কি ওটা? ভূত কি টের পেয়ে গেল ওদের উপস্থিতি?
গায়ে গা মিশিয়ে এক জায়গায় জড়ো হয়ে বসলো ওরা। ভয়ে পাথরের মত জমে গেছে পাথরের মেঝেতে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কয়েকটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল পিঠের শিড়দাঁড়া দিয়ে। নড়াচড়া করতেও ভুলে গেছে দু’জনে। যেন মাটির সাথে শিকড় গজিয়ে গেছে।
সিঁড়ির শেষ মাথায় চলে এলো আলোটা। ‘গুড ইভনিং!’ আলোটা হঠাৎ কথা বলে উঠল। চমকে উঠল ওরা। ‘কেমন আছো?’ আবার কথা বলল আলোটা।
‘কে-কে?’ ভয়ার্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করে আবিদ। জোর নেই তাতে।
সুমি চিল্লাতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো স্বরই বের হলো না।
আলোটা ওদের চোখের সামনে থেকে একপাশে সরে গেল। দেখা গেল লোকটাকে- পিকমিক। হাতে জ্বলন্ত হারিকেন। ওটাকেই ওরা ভূত মনে করেছিল।
আশ্বস্ত হলো ওরা। ওঠে দাঁড়িয়ে আবিদ বলল, ‘আপনি এভাবে এলেন কেন? জানেন কী ভয়টা আমরা পেয়ে গিয়েছিলাম!’
‘সে জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত। এখন চলো তোমরা।’
‘কোথায়?’ সুমি উঠে দাঁড়াল এবার।
‘তোমাদের যাবার সময় হয়েছে।’ বলে হারিকেন হাতে সিঁড়িতে উঠে গেল পিকমিক। পেছনে এ-ওর মুখের দিকে তাকিয়ে পিকমিকের পিছু নিল সুমি ও আবিদ।

রাত দশটা পনেরো মিনিট।
কপোতাক্ষ নদের তীরে সিঁড়িতে বসে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে বিপু।
কাছে আলো বাতি কিছুই নেই। গত রাতে নিজের টর্চটা খুইয়েছে ও। তবে অসুবিধা নেই, আকাশে গোল থালার মত পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে, চারিদিক মোটামুটি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে তার আলোয়।
বিপ্লবের মাথায় এখনো ব্যান্ডেজ বাঁধা। শুকিয়ে গেছে ক্ষত প্রায়। ডাক্তার বলেছেন কাল বিকেলের দিকে ব্যান্ডেজ খুলতে পারবে ও।
চাঁদের আলোয় আবছাভাবে হাতঘড়িটা দেখল বিপু। দশটা বেজে ষোল মিনিট সাতান্ন সেকেন্ড। এই সময় শুনতে পেল শব্দটা। কাছেই কোথাও পানিতে দাঁড় ফেলার শব্দ হলো। সেই সঙ্গে একটা চিৎকার, যে চিৎকারটা এ কয়েকদিন ধরে শোনা যাচ্ছে।
পরক্ষণই আর একটা চিৎকার। বিপ্লব উঠে শব্দের উৎসের দিকে এগিয়ে গেলো।
বাংলোর ওদিকটাতে নোঙর ফেলেছে নৌকাটা। সেখানে গিয়ে হাজির হলো বিপ্লব।
‘তুমি কী চাও?’ গম্ভীর অথচ ভারী কণ্ঠ শুনতে পেল বিপু।
‘সবুজ পাখি।’ যতটা সম্ভব মোটা গলায়ই জবাব দিল বিপ্লব।
‘গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে দেবে?’
‘হ্যাঁ।’
‘ওকে। সবুজ পাখিটাই পাবে তুমি। চিকমিক, সবুজ পাখি ছেড়ে দাও।’
সুমি ও আবিদকে ওর সামনে হাজির করা হলো। ছেলেমেয়েরা একে অন্যকে দেখে খুব খুশি হলো। তিনজন তিনজনকে জড়িয়ে ধরল খুশিতে।
এই সময় শোনা গেল একটা চিৎকার। পরক্ষণই পানিতে দাঁড় ফেলার শব্দ।
পাশে তাকিয়ে দেখল কেউ নেই। কোন ফাঁকে চলে গেছে।
বাংলোর দরজায় মস্ত বড় এক তালা ঝুলছে।

এগারো.

বেলা ৩টা। চৌগাছা থেকে যশোরগামী বাস। উঠে বসেছে দুই গোয়েন্দা।
ফুফু ওদেরকে খুব বকা দিয়েছেন। রাগ করে বলেছেন। ‘তোমাদের যদি কিছু হয়ে যেত, তাহলে তোমাদের মা-বাবাকে কী জবাব দিতাম আমি? এবার বেড়াতে আসলে আর ওসব করবে না।’
গোয়েন্দারা কিছুই বলেনি। সত্যিই তো, কী বলবে ওরা?
চূড়ামনকাঠি বাজারে এসে বাস থামল। কিছু লোক উঠল এবং কিছু লোক নামল। ওখানেই নেমে গেল গোয়েন্দারা। কারণ জানতে চাইলে বিপ্লব বলল, ‘আমি অনেক কিছু জেনেছি বাংলোটা সম্বন্ধে।’ তারপর বই থেকে জানা সব কিছু খুলে বলল আবিদকে।
‘এত কিছু জেনেছো?’ সব শুনে অবাক না হয়ে পারল না আবিদ। ‘কী করবে এখন?’
‘বাংলো রহস্যের সমাধান করব।’
যদি আবার ধরা পড়ি?’ শুকনা গলা আবিদের।
‘সেটা তখন দেখা যাবে। তবে এখন থেকে আমাদের সাবধান থাকতে হবে। চলো, আপাতত কোথাও গিয়ে বসি।’
একটা হোটেলের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল ওরা। পরিচিত একটা কণ্ঠে থেমে গেল। বিপ্লবকে নাম ধরে ডাক দিলেন কেউ।
পেছন ফিরে তাকাল বিপ্লব আবিদের ঘাড়ের ওপর দিয়ে। দেখল, পুলিশের পোশাক পরা এক ভদ্রলোক হোটেল থেকে বেরিয়ে আসছেন।
‘স্যার আপনি?’ পুলিশ ইন্সপেক্টর হারিস মোল্লার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল বিপ্লব। আবিদও।
‘হারিস মোল্লা ছেলেদেরকে হোটেলে নিয়ে বসলেন। চা-নাশতার অর্ডার দিয়ে বললেন, ‘বল এবার, কতদূর এগোলে তোমরা?’
‘একটু ও না, স্যার।’ বলল বিপ্লব খান। ‘আমার মনে হয় শর্ষের ভিতরেই ভূত আছে।’
‘মানে?’
জবাবে লাল মিয়া বিপ্লবের সাথে কী কাণ্ড ঘটিয়েছে তা খুলে বলল কিশোর গোয়েন্দা বিপ্লব খান।
‘বাংলোটা তাহলে রহস্যেই থেকে যাবে? ওখানে তাহলে সত্যিই ভূতদের বাস?’ অস্ফুটে বলে গেলেন পুলিশ ইন্সপেক্টর।
‘স্যার,’ বলল আবিদ। ‘লাল মিয়া ওদের গুপ্তচর হিসেবে কাজ করছে না তো?’
‘হুঁ। সন্দেহ এখন আমারও হচ্ছে।’ গভীর ভাবনায় পড়ে গেলেন যেন পুলিশ অফিসার। তারপর আবার বললেন, ‘তাহলে তোমরা ফিরেই যাচ্ছ?’
চুপ করে থাকল বিপ্লব। সত্যটা তাকে জানাতে চায় না ও। ইশারায় আবিদকেও চুপ থাকতে বলল।
‘তোমাদের আর দোষ দিয়ে কী লাভ? এতদিন পুলিশ যেটা পারেনি, সেখানে তোমরাই বা কী করবে?’ উঠে দাঁড়ালেন ইন্সপেক্টর। ‘ও কে ইয়াংমেন্স, আবার দেখা হবে তোমাদের সাথে।’ বলে করমর্দন করলেন ছেলেদের সাথে। হোটেল থেকে বেরিয়ে যেতেও আবার পেছন ফিরে ওদের কাছে এসে দাঁড়ালেন। ‘এটা দেখ।’ বলে পকেট থেকে ভাঁজ করা একটা কাগজ এগিয়ে দিলেন বিপ্লবের দিকে।
বিপ্লব কাগজটা হাতে নিল। ভাঁজ খুলল। একটা চিঠি। পড়ল-
ইন্সপেক্টর হারিস, তোমার মরণ ঘনিয়ে এসেছে। প্রস্তুত হও। আর মাত্র কয়েকদিন। ভালো করে খাওয়া-দাওয়া করবে। তোমার সব খবরই আমরা রাখি। তুমি আমাদের পিছনে গোয়েন্দা লাগিয়েছ। কিন্তু তাতে কোন লাভ হবে না। আমার শক্তি সম্পর্কে তুমি জান না। তবে তোমার সাথে শক্তি পরীক্ষা করে আমি বেশ মজা পাচ্ছি। কিন্তু ভেব না, আমি হার মেনে নিয়েছি। তাই রেডি থেক।
‘কোথায় পেলেন স্যার চিঠিটা?’ পড়া শেষে প্রশ্ন করল বিপ্লব।
‘থানার মধ্যে কেউ ফেলে গিয়েছিল। তো, ভালো থেক তোমরা। বাই।’ বলে ছেলেদের সাথে আরেকবার হ্যান্ডশেক করে বাইরে বেরিয়ে গেলেন তিনি।

বিপ্লব খেয়াল করেছে লোকগুলো রাত সাড়ে নয়টা থেকে দশটার দিকে বাংলোয় প্রবেশ করে। তাই তার আগেই ওখানে একবার তদন্ত চালানোর সিদ্ধান্ত নিল। সেই মোতাবেক গোপনে গিয়ে হাজিরও হলো। বাংলোর ভাঙা রুমটাতে ঢুকেছে দুই গোয়েন্দা। এখনও কিছু কিছু ইট পড়ে আছে। খুঁজছে মাটির নিচে গোপন ঘরে যাবার পথ। বিপুর ধারণা, ওটা আবিষ্কার করতে পারলেই সব রহস্যের সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু ওদের জন্য রহস্য আরো গভীর হচ্ছিল। গোপন ঘরে যাবার পথ আবিষ্কার করতে পারলেও রহস্য শেষ হলো না। মনে হলো কেবল শুরু হলো রহস্য।
ইট উঠিয়ে, যতটা সম্ভব শব্দ না করেই মাটিতে ইট দিয়ে আঘাত মেরে পরীক্ষা করছে কোথাও ফাঁপা আছে কি না। দেয়ালেও আঘাত দিতে লাগল।
অনেকক্ষণ ধরে খুঁজল ওরা। ধড়ফড় করে ঘামছে। নাহ্, কিছুই পেল না। কিন্তু তাই বলে নিরাশ হলো না। কাজ চালিয়েই যাচ্ছে ওরা।
আবিদ একটা ইট হাতে নেবে, এই সময় চোখে পড়ল ওটা। অক্ষত রুমটার দেয়ালে নিচের দিকে একটা লাল কিছু লেগে রয়েছে। বৈদ্যুতিক সুইচ মনে হলো ওটাকে।
‘ওটা কী?’ বিস্ময়ে চোখ কপালে উঠল আবিদের।
‘কোন্টা?’ আবিদের পাশে এসে দাঁড়াল বিপ্লব। আবিদের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাল। চাঁদের আলোয় অস্পষ্ট দেখতে পেল জিনিসটা। কাছে চলে গেল ওটার। আস্তে আস্তে হাঁটু গেড়ে বসে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে সুইচে চাপ দিল ও। আর অমনি হিসহিস শব্দ করতে করতে মাটির দিকের খানিকটা জায়গা ফাঁক হয়ে গেল।
একে অন্যের মুখের দিকে তাকাল গোয়েন্দারা। তারপর আস্তে আস্তে ঢুকে পড়ল ভেতরে। সামান্য একটুখানি জায়গায় চাঁদের আলো পৌঁছে।
এদিকে ওদিকে তাকাল ওরা। কিছুই দেখতে পেল না অন্ধকার ছাড়া।
পিঠ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে রেখে আবিদের হাত থেকে টর্চটা নিল বিপ্লব। আলো জ্বালালো। বদ্ধ একটা ঘরে এসে পৌঁছেছে ওরা। এখান থেকে বের হবার আর কোনো পথ নেই ওপরের সিঁড়িটা ছাড়া। খুঁজতে লাগল বিপু টর্চ জ্বেলে। পেয়েও গেল। মেঝতে লোহার একটা আংটা দেখা যাচ্ছে।
বিপ্লব ধরে টান দিল।
নড়ল না এক চুলও।
টর্চ রেখে দু’জনে একসাথে টান মারল। ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ তুলে ওপরে উঠে এল পাথরের মেঝের খানিকটা। অবাক হলো না ওরা। পাশে সরিয়ে রাখল। আবিদ টর্চ নিয়ে আগে আগে নামল। বিপ্লব নামল পেছনে ব্যাগটা পিঠে ঝুলিয়ে।
‘তাড়াতাড়ি করো, ওরা আসার আগেই এখান থেকে বের হতে হবে।’ পাথরের মজবুত সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে বলল বিপ্লব।
আগে আগে টর্চ জ্বেলে পথ দেখিয়ে হাঁটছে ভয়কাতুরে আবিদ। তবে এই মুহূর্তে ভয় কাকে বলে ভুলে গেছে যেন। রহস্য সমাধানে পাগল হয়ে উঠেছে।
তীক্ষè একটা মোড় ঘুরলো সিঁড়ি।
মোড় ঘুরে সিঁড়ির দুই-তিন ধাপে নিচে নামতেই থমকে দাঁড়াল আবিদ।
‘কী হলো? দাঁড়িয়ে পড়লে যে?’ পেছন থেকে বিপু বলল। আবিদের ঘাড়ের ওপর দিয়ে সামনে তাকাল।
সামনে মস্ত দেয়াল।
এই সময় শুনতে পেল পদশব্দ, এদিকে এগিয়ে আসছে, ওপরের দিক থেকে।
মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল কিশোর গোয়েন্দারা। তাহলে কি ডাকাতগুলো টের পেয়ে গেল ওদের উপস্থিতি? কিন্তু আজ তারা এত তাড়াতাড়ি এলো কেন? এখন কী করবে ওরা?
বুকের ধুকধুকানি বেড়ে গেল শত গুণে। তিন জোড়া পদশব্দ এগিয়ে আসছে, বুঝতে পারল বিপ্লব।
পালাবার পথ নেই। সামনে পথ রুদ্ধ। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে গেলে ধরা পড়বে। সিঁড়ির নিচে যে লুকাবে, কিন্তু সিঁড়ির নিচে এক ইঞ্চিও ফাঁকা জায়গা নেই।
নিষ্ক্রিয় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ওরা।

বারো.

পরদিন সকাল ৯টা।
বিপ্লবের ঘরে বসে আছে দুই গোয়েন্দা।
গত রাতে পিকমিকই ওদেরকে যশোরের বাসে উঠিয়ে দিয়ে গেছে। আর বলে দিয়েছে, এর পরের বার আর ছেড়ে দেওয়া হবে না ওদেরকে। আর যেন ভুলেও ওদিকে পা না বাড়ায়।
আলোচনা তেমন চলছে না। রহস্যের সমাধান করতে না পারায় মন ভেঙে গেছে ওদের।
বিপ্লব বলল, ‘আমি ভাবতেও পারিনি যে কেসটায় ব্যর্থ হয়ে ফিরে চলে আসব।’
সারারাতের পরিশ্রম ও বাস জার্নিতে ক্লান্ত ওরা। বসে বসে দুশ্চিন্তা করছে।
বিপ্লবের মা ঘরে ঢুকলেন। বললেন, ‘যাক, এসেছিস তাহলে। আমি মনে করেছিলাম পুরো ছুটিটাই বুঝি কাটিয়ে আসবি।’
আবিদ কিছু বলতে যাচ্ছিল, ইশারায় থামতে বলল বিপ্লব। বলল, ‘সফরটা খুব একটা ভালো যায়নি আম্মু। ফুফা সবসময় বাড়ি থাকেন না। ব্যবসার কাজে বাইরে থাকেন। তবে…’ বলতে গিয়েও থেমে গেল।
‘চলে এসে ভালোই করেছিস।’ বলল মা। ‘একজন ভদ্রমহিলা ফোন করেছিলেন। কাল বিকালে। বলেছি আজ আর একবার ফোন করতে।’
‘কী বলেছেন উনি?’ বিপ্লবের জিজ্ঞাসা।
‘আমাকে কিছুই বলেননি। তোদের সাথে কথা বলতে চায়।’
‘নাম জিজ্ঞেস করেছো?’
‘করেছি। মিসেস কারমল।’
‘মিসেস কারমল?(!)’
বিপ্লবকে চিন্তিত হতে দেখে বললেন মা, ‘চিনিস নাকি মহিলাকে?’
‘চিনি। পরে তোমাকে বলব আম্মু।’
সকালের নাশতা সেরে এসে আবার আলোচনায় বসেছে ওরা।
কিছুতেই মন থেকে গত কয়েক দিনের ঘটনা মুছে ফেলতে পারছে না। বারবার ভাবছে আর অবাক হচ্ছে। আর তাতে বাড়ছে ক্লান্তি।
টেলিফোনের পাশে বসে বিপ্লব। যদি আবার ফোন আসে, সেই অপেক্ষাতেই আছে। আর অন্যদিকে চলছে ভাবনা। আবার যাবে কি চৌগাছা? অর্ধসমাপ্ত অবস্থাতে রেখে দেবে রহস্যটা? অনেক কিছুই তো জানা হয়েছে। কেবল জানা হয়নি লোকগুলো সত্যি সত্যিই ডাকাত কি-না। বাংলোতে ওরা অত রাতে কেন আসে, চিৎকারটা কিসের? কেনইবা চিৎকার শোনা যায়? ইত্যাদি ইত্যাদি।
‘কী করবে এখন?’ নীরবতা ভেঙে কথা বলে উঠল আবিদ।
‘অ্যা! ও, হ্যাঁ।’ বাস্তবে ফিরে এলো গোয়েন্দা প্রধান। ‘এখন আপাতত একটা কাজ করতে পারি।’
‘কী?’ আগ্রহে সামনে ঝুঁকলো সহকারী গোয়েন্দা।
‘নো, নো। উত্তেজিত হয়ো না।’ নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে চুপ করে গেল বিপ্লব।
আবিদ জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে ধরল বিপ্লবের দিকে। বিপ্লব স্মিথ হেসে বলল, ‘কাজটা খুবই জরুরি।’
‘ওসব ভণিতা বাদ দিয়ে আসল কথাটাই বলে ফেল তো?’ আবিদ মনে মনে বিরক্ত হচ্ছে।
মুখে গাম্ভীর্য টেনে বলল গোয়েন্দা প্রধান, ‘কিশোর গোয়েন্দা বিপ্লব হার মানতে শেখেনি।’
‘তার মানে…’
কথা শেষ করতে পারে না আবিদ, ‘ক্রিং! ক্রি!’ শব্দ তুলে টেলিফোন বেজে উঠল। ছো মেরে রিসিভার নিয়ে কানে ঠেকালো বিপ্লব। বলল, ‘হ্যালো! আমি বিপ্লব বলছি।’
‘হ্যালো, বিপু ভাইয়া? আমি মিসেস কারমল বলছি। চিনতে পেরেছ?’ ওপাশের মহিলা কণ্ঠ।
প্রায় মিনিটখানেক দু’জনের মধ্যে কথোপকথন চলল। তারপর রিসিভার নামিয়ে রহস্যজনকভাবে আবিদের দিকে তাকাল বিপু ভাইয়া।

তেরো.
কল্পনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে এলো বিপ্লব। মিসেস কারমলের ফোন পেয়ে আবারও চৌগাছার স্বরূপদাহ গ্রামে গিয়ে হাজির হয় বিপ্লব ও আবিদ। কিন্তু ভুল একটা করেই ফেলে। আর না করেও উপায় ছিল না। এখানে তো ওদের চেনা কেউ নেই যে তার বাড়িতে গিয়ে উঠবে। কাজেই আবারও সেই ফুফু বাড়ি গিয়ে ওঠে ওরা। ফুফুকে বলে, স্কুল খোলার এখনও তিন দিন বাকি আছে। এ তিন দিন ওরা এখানেই কাটিয়ে যাবে। ফুফু ওদেরকে সাবধান থাকতে বলেন।

বিপ্লবরা এখানে ছুটি কাটাতে এসেছে। স্কুল আর কোচিংয়ের একঘেয়েমিতে বোরিং হয়ে গিয়েছিল। পরিবেশ পাল্টালে ভালো লাগবে। গিয়ে আবারও মন দিয়ে পড়ালেখা করতে পারবে। উদ্দেশ্য এটাই। সুমিরও লাভ হয়েছে ওরা আসাতে। ছুটিটা আনন্দেই কাটবে নিশ্চয়ই। বিপু ভাইয়া যে ছোটখাটো একজন নামকরা গোয়েন্দা তা আর সব রহস্যপ্রিয় কিশোর-কিশোরীর মতো ও-ও জানে। ওর বিশ্বাস, বিপু ভাইয়া রহস্যের পিছনে ছোটে না, রহস্যই বিপু ভাইয়ার পিছে পিছে ছোটে। এখানেও নিশ্চয়ই কোনো না কোনো রহস্য সে খুঁজে পাবেই। সেই রহস্য সমাধানে ও-ও বিপু ভাইয়ার সহযোগী হতে পারবে। ভাবতেই আনন্দে লাফাতে ইচ্ছে করছে।
একটু পরে হাঁটতে বের হলো ওরা। বাসায় বসে আলোচনা করতে ভালো লাগছে না। বাইরে কোথাও গিয়ে বসে তবেই প্ল্যান করবে, উদ্দেশ্য সেটাই।
‘কোথায় বসবে?’ হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করল আবিদ।
‘সুমি, এদিকে কোথাও নির্জন জায়গা আছে, যেখানে লোকজনের যাতায়াত কম?’ বিপ্লবের জিজ্ঞাসা।
সুমি একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘আছে। তবে বেশ দূরে। মাইলখানেক হবে।’
একটু ভাবল বিপ্লব। তারপর বলল, ‘ঠিক আছে, সেখানেই চলো।’
আবিদ কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু বিপ্লবের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারল না। গভীরভাবে কিছু একটা ভাবছে বিপ্লব।
সুমি আগে আগে পথ দেখিয়ে চলতে লাগল। পিছনে দুই কিশোর।
পথে আর তেমন কোনো কথা হলো না। গলা শুকিয়ে উঠেছে। তাই একটা দোকান থেকে মিনারেল ওয়াটারের আধা লিটারের একটা বোতল কিনে নিল।
আরও মিনিট বিশেক হাঁটার পর ওরা সুমির সেই ‘নির্জন’ জায়গাটিতে এসে পৌঁছল। জায়গাটা বেশ পছন্দ হলো বিপ্লবের। আবিদেরও। এমন খোলামেলা জায়গা বিপ্লবের দারুণ পছন্দ। শহরে তো এমন একটি নির্জন খোলা জায়গা কল্পনাই করা যায় না। সেখানে কেবল ইট-পাথরের প্রাসাদ উঠছে, কেবল আকাশের দিকে। যেন আকাশ ছোঁয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে ডেভেলপার কোম্পানিগুলো। তাছাড়া শহরের বাতাসে অক্সিজেনেরও যেন কিছুটা ঘাটতি আছে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চায়।
‘আহ্!’ বুক ভরে শ্বাস নিল বিপ্লব।
জায়গাটা বাংলো থেকে কিছু উত্তরে, ছোটখাটো একটা জঙ্গলের ওপাশে। সকালের সূর্যটা গাছের আড়ালে ঢাকা পড়েছে। নদীর কিনারে নদীর দিকে মুখ করে সূর্য এবং বনকে পেছন ফিরে বসেছে ওরা।
জায়গাটার প্রশংসা না করে পারল না আবিদ। কবিত্ব ভাষায় বলল, ‘আহা! কী মনোরম পরিবেশ! শান্ত নদীর পানি। দিগন্তে সবুজ রঙের লুকোচুরি খেলা। কিচিরমিচির পাখির তান। সব মিলিয়ে এক অপরূপ সুন্দর পরিবেশ। হে আমার রব, আমার সৃষ্টিকর্তা, তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ তোমার সৃষ্টির এমন সৌন্দর্য আমাকে দেখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।’
বিপ্লবেরও ভালো লাগছে। গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছে করছে। যদিও গলায় তেমন সুর নেই ওর। তবে একটা গানের দুটো লাইন না আওড়ে ও পারল না-
“আল্লাহ তোমার দরবারে জানাই হাজার শুকরিয়া
এই দেশেতে জন্ম নিয়ে হৃদয় গেল ভরিয়া…”[চলবে]

SHARE

Leave a Reply