Home গল্প মা -ওমায়ের বিন ইসলাম

মা -ওমায়ের বিন ইসলাম

কিশোরকণ্ঠ জাতীয় গল্প লেখা প্রতিযোগিতা ২০২০-এর
ক-গ্রুপে প্রথম স্থান অধিকারী গল্প

ঈদের রাত। নতুন চাঁদ আকাশে। লাইটপোস্টের আলো আর জোছনার আলোয় মাখামাখি। দূরের কোন বাসা থেকে সদ্য রান্না করা গোশতের ঘ্রাণ ভেসে আসছে। বাবুলের ক্ষিদেটা আবার জেগে ওঠে। শরীরে প্রচণ্ড জ্বর। ডাস্টবিনটা কোন দিকে মনে করার চেষ্টা করে বাবুল। শক্তি সঞ্চয় করে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করে। পারে না। তিন দিন ধরে অভুক্ত সে। শুধু পানি খেয়ে বেঁচে আছে। মিরপুরের এই ব্যস্ত সড়কটাও এত রাতে বড়ো রকম নীরব। হঠাৎ দু’ একটা গাড়ি শাঁ শাঁ করে ছুটে যাচ্ছে। স্টেডিয়ামের নিচে টোকাইয়ের বাস। স্টেডিয়ামের কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। কাজ শেষ হলেতো তাদের এখানে থাকতে দেওয়া হবে না। তখন কোথায় যাবে? চোখ বন্ধ করে ভাবার চেষ্টা করে বাবুল। না, তার মতো টোকাইদের কোনদিন থাকার জায়গার অভাব হয় না। স্টেডিয়াম নেই তো কী হয়েছে? কমলাপুর রেলস্টেশন আছে, মোহাম্মদপুর বস্তি আছে, সদর-ঘাটের বন্ধুরা আছে-থাকার জায়গার অভাব হবে না তার। এসব ভাবতে ভাবতে তিন দিনের অভুক্ত বাবুল ঘুমিয়ে পড়ে। ডাস্টবিনে যাওয়া আর হয় না। বাবুল স্বপ্নে দেখে-ডাস্টবিনে আজ অনেক ভাত, রূপোর মতো চকচকে সাদা চিকন চালের ভাত, রান্না করা গোশত, মুরগির রোস্টের উচ্ছিষ্ট- আরো কতো কী! স্বপ্নের মধ্যেই তার মনটা ভালো হয়ে যায়। রূপোর মতো চকচক করা সাদা ভাতের স্বপ্ন দেখতে তার ভালো লাগে।

সকাল নাগাদ জ্বরটা আরো বেড়ে যায়। যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠে বাবুল। রাজধানীর ব্যস্ত সড়কের হাজার হাজার দৃষ্টি ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকায়। তারপর গটগট করে হেঁটে যায় নিজ গন্তব্যে। কারো অবয়বে হালকা দুঃখ বোধের ছাপও পড়ে না। পেটটা মোচড় দিয়ে ওঠে। চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করে বাবুল। সে কি মরে যাচ্ছে? না, সে মরতে চায় না। আরো কিছু দিন বাঁচতে চায়। পৃথিবীর এই নিষ্ঠুরতাকে জয় করতে চায় বাবুল।

শরীরের সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে উঠে দাঁড়ায় সে। দুর্বল পদক্ষেপে হাঁটা দেয় স্টেডিয়াম পাড়ার দিকে। একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। উঠোনের নারকেল গাছটায় হেলান দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। টিভিতে খাওয়ার দৃশ্য দেখানো হচ্ছে। তার তিন দিনের অভুক্ত পেটটা আবার মোচড় দিয়ে ওঠে। পরম বিস্ময়ে খাওয়ার দৃশ্যটা দেখতে থাকে। বাবুলের চোখে কি জল জমছে? কাঁদছে সে? না, সে কাঁদতে ভুলে গেছে। টোকাইদের কাঁদতে নেই। এক সময় কেঁদেছে, অনেক কেঁদেছে। চোখের পানি এখন শুকিয়ে গেছে। এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর থেকেও বেশি পাথুরে হয়ে গেছে তার মনটা। জানালা দিয়ে এক মহিলা উঁকি দেন।
: কি রে, দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
বাবুল উত্তর দেয় না। চুপ করে তাকিয়ে থাকে মহিলার চোখের দিকে। চোখ দুটিতে কী গাঢ় মায়া! কী গভীর অনুরাগ; মোলায়েম কণ্ঠস্বরটা আবার ভেসে আসে।
: কিরে, ভাত খাবি?
‘ভাত’ শব্দটা শুনে বাবুলের সমগ্র সত্তায় এক অপূর্ব শিহরণ খেলে যায়। অবচেতন মনে সে বলে ওঠে- ‘হ, খামু।’
মহিলা তাকে ঘরে বসিয়ে ভাত খাওয়ান। এক বাটি গোশত এনে দেন। বাবুল তৃপ্তি ভরে ভাত খায়। যে ভাতের স্বপ্ন সে ঘুমিয়ে দেখে, যে ভাতের স্বপ্ন তাকে ঘুমোতে দেয় না।
বাবুল শরীরে শক্তি ফিরে পায়। বলে- মা, তুমি অনেক ভালা মানুষ, আল্লায় তোমার মঙ্গল করব।’

: তুই আমায় মা বললি?’ প্রায় আর্তনাদ করে ওঠেন মহিলা। মা বলে এমন কী অপরাধ করে ফেলল, বুঝে উঠতে পারে না বাবুল।
রাহেলা বেগমের মনে পড়ে যায় দশ বছর আগের এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যের কথা। তার দু’ বছরের বাচ্চা ছেলেটা তাঁর সামনেই ছটফট করতে করতে মারা গেলো। সে রাতে তিনি খুব কেঁদেছিলেন। আজগর সাহেব তাকে সান্ত¡না দিয়ে বলেছিলেন- ‘কেঁদো না রাহেলা যার জিনিস তিনি নিয়ে গেছেন। কেঁদে কী হবে। তারপর নীরব-কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন আজগর সাহেব।
এরপর তাদের আর সন্তান হয়নি। তাঁর ছেলেটা বেঁচে থাকলে এখন কতো বড় হতো? এই ছেলেটার সমান? মনে মনে ভাবার চেষ্টা করেন রাহেলা বেগম। আজ দশ বছর পরে ও বারো-তেরো বছর বয়সী কোনো ছেলে দেখলেই তাঁর বুকটা হু হু করে ওঠে। ছেলে হারানোর বেদনাটা খুব গভীরভাবে অনুভব করেন তিনি। এই ছেলেটা তাকে মা ডাকলো? অভিভূত হয়ে পড়েন রাহেলা বেগম। বাবুলকে গোসল করান। যত্ন করে মাথায় তেল লাগিয়ে দেন। কপালে হাত দিয়ে আঁতকে ওঠেন তিনি। প্রচণ্ড জ্বর ছেলেটার গায়ে।
: তোর শরীর যে জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। বলিস নি তো?
: আফনে আমারে খাওয়াইছেন। এইডাই বড় মা। ভাবলেশহীন উত্তর বাবুলের। রাহেলা বেগম কথা বাড়ান না। দুটো প্যারাসিটামল খাইয়ে দেন। বলেন এখন কোথাও যাস না। এখানেই শুয়ে থাক। জ্বর কমে এলে যাবি।
বিকেল নাগাদ বাবুলের জ্বরটা কমে আসে। রাহেলা বেগম তাকে চলে যেতে বলেন। আজগর সাহেব এক্ষুনি এসে পড়বেন। স্বামীকে বড় ভয় পান তিনি। যাবার সময় বলে দেন- কাল সকালে আমি গিয়ে তোকে দেখে আসবো।

রাহেলা বেগমের কথা শুনে বাবুলের চোখ জলে ভরে ওঠে। তার মরুভূমির মতো শুকনো চোখ দুটোতে জলের বান ডাকে। ভাবার চেষ্টা করে- আজ কতো দিন পর সে কাঁদছে? মায়ের মৃত্যুর দিন কেঁদেছিলো। তারপর সৎমা আর সৎভাইয়ের নির্যাতনে প্রত্যেক রাতেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদত। তার কান্না দেখে মেজভাইটা বিদঘুটে শব্দ করে হেসে উঠতো। কী পাষাণ ছিল ওরা! বাবা কেমন আছে? অনেক দিন পর বাবুলের বাবার কথা মনে পড়ে। বাবা তাকে বড্ড ভালোবাসতেন। দূরে চাকরি করতেন বলে বাবুলের খোঁজখবর তেমন রাখতে পারতেন না। বাবুলও কোনদিন মুখ ফুটে বাবাকে সৎমায়ের নির্যাতনের কথা বলেনি। শেষমেশ আলী চাচা একদিন তাকে লঞ্চে তুলে দিয়ে কান্না ধরে আসা কণ্ঠে বলেছিলেন- যা বাবা। ঢাকা গিয়া কাম কর। এই হানে থাকলে ওরা তোরে মাইরা ফেলাইবো। যেদিন নিজের পায়ে খাড়াইতে পারবি, সেই দিন আইবি।’

সেই শৈশবে নয় বছর বয়সী বাবুল ঢাকায় পাড়ি জমালো। আর আজ তার নাম টোকাই। তার ঠিকানা ফুটপাথ। তার খাবার ডাস্টবিনের উচ্ছিষ্ট।

: এ্যাই, ওঠ, সকাল হয়ে গেছে। জ্বরটা কমেছে? হকচকিয়ে জেগে ওঠে বাবুল। দেখে রাহেলা বেগম তার শিয়রে দাঁড়িয়ে আছেন।
: তুমি আইছো মা। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলে সে।
: হ্যাঁ। এটা খেয়ে নে।
: হ, খাইতাছি। সত্যিই তুমি খুব ভালা।
বাবুল ভাতটুকু খেয়ে ফেলে। রাহেলা বেগম অষুধ খাইয়ে দেন। ভোর-সকাল তখন। ঢাকা শহর তখনো জেগে ওঠেনি। দূরে কোথাও পত্রিকা-বিক্রেতাদের হাঁকডাক শোনা যাচ্ছে। রাহেলা বেগম বাবুলের কপালে হাত দেন। তিনি কিছু বলার আগেই বাবুল বেলে ওঠে- ভালা হয়া গেছি মা। তোমার দোয়ায় ভালা হয়া গেছি। মা শব্দটা রাহেলা বেগমের কানে অনুরণিত হতে থাকে। তার চোখ দুটো জলে ভিজে যায়। আঁচল দিয়ে চোখ দুটো মুছে ফেলেন। বলেন ক্ষিদে পেলে আমার বাড়ি চলে আসবি। সাহেব থাকলে আবার ঢুকিস না যেন।

আইচ্ছা, বলে বাবুল মাথা নাড়ে। রাহেলা বেগম চলে যান। বাবুল বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তাঁর গমনপথে, তার মায়ের গমনপথে।

শরতের বিকেল। অপরাজিতা ফুলের মতো নীল আকাশ। কোথাও মেঘের ছিটেফোঁটা নেই। বাবুল নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। আকাশটাকে বড্ড আপন মনে হয় তার। ভাবে- যার আপন কেউ নেই, এই আকাশটাই তার আপন। শরীরটা আজ বেশ ভালো লাগছে। বিড়বিড় করে গান ধরে সে। মনমাঝি তোর বৈঠা নেরে, আমি আর বাইতে পারলাম না…..

গান গাইতে গাইতে মনটা বিষণœ হয়ে যায় তার। মনে পড়ে যায় পদ্মা পাড়ের সুরুজ মাঝির কথা। ভর দুপুরবেলা সুরেলা কণ্ঠে এই গানটা ধরতো সে। তার গলার টানে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যেতো প্রকৃতি। নদীর জলে বৈঠা বাওয়ার ছপছপ শব্দ হতো। এসব ভাবতে ভাবতে স্টেডিয়াম পাড়ায় চলে আসে বাবুল। নির্দ্বিধায় ঢুকে পড়ে রাহেলা বেগমের বাড়িতে। জোর গলায় ডেকে ওঠে- মা, ও……
ক্ষণকাল পরেই বুঝতে পারে- মস্তবড় ভুল করে ফেলেছে সে। আজ শুক্রবার। সাহেব বাড়িতে আছেন। আজগর সাহেবের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই তিনি জিজ্ঞেস করেন- কে তুই? এখানে কেন?
কোন উত্তর দেয় না বাবুল। রাহেলা বেগম বলেন- আমি মাঝে মধ্যে ওকে আসতে বলেছি।
আজগর সাহেব প্রচণ্ড রেগে ওঠেন। বলেন- এই রাস্তার ছেলেদের এতো লাই দাও কেন তুমি? যেদিন টাকা-পয়সা চুরি করে পালাবে সেদিন বুঝবে। জানোই তো এসব আমার সহ্য হয় না।

: ও আমায় মা ডেকেছে! ক্ষীণ স্বরে বলেন রাহেলা বেগম।
: ও……এর মধ্যে মাও ডেকে ফেলেছে। শোন এসব ছোটলোকদের যদি আর কোন দিন বাড়িতে দেখি, তাহলে তোমার গায়ে হাত তুলতেও আমার দ্বিধা হবে না।
: তুমি আমায় মারবে বললে।
: হুঁ। মারব। একশবার মারব।
বাবুলের আর এসব শুনতে ভালো লাগে না। টলোমলো পায়ে ও বাইরে বেরোয় ততক্ষণে দিনের আলো নিভে গেছে। ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে এসেছে ঢাকা শহরে। সাহেব কি এখনো মাকে বকছে? কে জানে। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হতে থাকে বাবুলের।

: এ্যাই বাবুল, ওঠ দেখি। হকচকিতের মতো রাহেলা বেগমের দিকে তাকায় বাবুল। আবার এসেছেন এই মহিলা। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না সে।
: মা, তুমি আবার আইছো? সাহেব তোমারে মারবো। যাও মা, বাড়ি যাও।
: তুই আমার সঙ্গে চল বাবুল। সাহেব বাড়িতে নেই।
: না, মা আমি আর তোমার বাড়ি যামু না। সাহেব জানতে পারলে তোমারে মারব।
: সাহেব বাড়িতে নেই তো!
: না, মা। আমি গ্যালে তোমারে খুব মারব, বকব। তুমি বাড়ি যাও মা!
: আজকে শুধু আয় আমার সাথে।
: না, মা। তোমারে মারলে আমার খুব কষ্ট লাগবো। আমি সহ্য করবার পারুম না।

রাহেলা বেগম নিশ্চুপ হয়ে যান। তাঁর চোখে জলের ধারা নেমেছে। বাবুলকে জড়িয়ে ধরে হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলেন তিনি। পাগলের মতো কপালে চুমু খান। বাবুল নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। তুমি যাও মা, বাড়ি যাও- কান্না ধরে আসা কণ্ঠে বলে বাবুল। সকালের ফাঁকা সড়ক ধরে রাহেলা বেগম হাঁটতে থাকেন। পৃথিবীকে বড় নিষ্ঠুর মনে হয় তার কাছে।
পরদিন রাহেলা বেগম খবর পান-বাবুল মিরপুর ছেড়ে চলে গেছে। একজনকে বলে গেছে মা আইলে কইয়ো- আমি বড় হইয়া ফিইরা আহুম। রাহেলা বেগম ভাবেন- পৃথিবীতে এখন তাকে মা বলে ডাকার আর কেউ রইলো না।

এরপর আর রাহেলা বেগমের বাড়ি যায়নি বাবুল। সদরঘাটে গিয়ে আশ্রয় নেয় সে। সেখানে পরিচিত হয় আরেক পৃথিবীর সঙ্গে। বড় নোংরা পৃথিবী। বন্ধুবান্ধবের খপ্পরে পড়ে সিগারেট ধরে। এক সময় গাঁজা মদে আসক্ত হয়ে যায়। চুরিবিদ্যাও ভালোভাবে আয়ত্ত করে নেয়। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বয়স বাড়ে। একদিন মগবাজার থেকে একটা সাইকেল চুরি করে। সাইকেল বিক্রি করা টাকায় পাড়ি জমায় চট্টগ্রামে। ঢাকায় নেশা দ্রব্য যতটা সস্তা এবং হাতের নাগালে ছিলো। এখানে ততোটা নয়। মরিয়া হয়ে ওঠে বাবুল। সিদ্ধান্ত নেয়- আবার ঢাকায় ফিরে যাবে। ঢাকায় ফেরার আগেই তার পরিচয় হয় হুজুর মতোন একটা লোকের সাথে। লোকটা তাকে কাজের সন্ধান দেয়। প্রথমে অমত করলেও পরে কী ভেবে যেন রাজি হয়ে যায়। ঢাকায় ফেরা তার হয় না। রাজমিস্ত্রির কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করে বাবুল। কাজের মধ্যে সে আনন্দ খুঁজে পায়। প্রথম নেশাসক্ত বাবুল নেশা ছেড়ে দেয়। টাকা জমাতে থাকে। স্বপ্ন দেখে একটা সুন্দর ভবিষ্যতের। সে আর এখন টোকাই নয়। সে একজন শ্রমিক। বাবুল ভুলে যায়- ঢাকা শহরে আকাশসম ভালোবাসা নিয়ে এক মহিলা তার জন্য অপেক্ষা করছেন।

১০ বছর পর…
বাবুল এখন পূর্ণ যুবক। হাজার পঞ্চাশেক টাকা জমিয়ে ফেলেছে সে। মিরপুরের ফুটপাথে অবহেলায় পড়ে থাকা টোকাই ছেলেটা আজ স্বাবলম্বী! বাবুলের বিশ্বাসই হতে চায় না। সেজদায় পড়ে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে সে।

আজ ঈদ। শ্রমিকরা সবাই যার যার বাড়িতে। কন্ডাক্টর তাকে জিজ্ঞেস করেন- বাসায় যাবি না বাবুল? দশ বছর ধরে তো কোথাও গেলি না?

অনেক দিন পর বাবুলের বাড়ির কথা মনে পড়ে। বাবা বেঁচে আছেন? আলী চাচা? মায়ের কবরের গাছটা কত বড় হয়েছে। জলছবির মতো পুরনো সব স্মৃতিগুলো বাবুলের মানসপটে ভেসে উঠতে থাকে। সৎমায়ের কথা মনে পড়তেই বাবুলের মনটা বিষিয়ে ওঠে। স্থির সিদ্ধান্ত নেয় সে বাড়ি যাবে না। তাহলে কোথায় যাবে সে? তার তো কোন আপনজন নেই! হঠাৎ তার মনে পড়ে যায় ১০ বছর আগের এক ঈদ রাতের কথা, তার ক্ষুধাকাতরতার কথা, রাহেলা বেগমের কথা, তার মায়ের কথা! সেদিন রাতের ট্রেন ধরেই ঢাকায় ফেরে সে। পরদিন ভোরে গিয়ে হাজির হয় স্টেডিয়াম পাড়ায়। রাহেলা বেগমের বাড়ির সামনে নারকেল গাছটা নেই। কে যেন কেটে ফেলেছে। দরোজার সামনে গিয়ে সে থমকে দাঁড়ায়। বুকটা ধক করে ওঠে। দরোজায় বড় করে বিজ্ঞপ্তি সাঁটানো ‘টু লেট’। প্রতিবেশীকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারে- রাহেলা বেগম এখন এখানে থাকেন না। এক বছর আগে তিনি চলে গেছেন।

বর্ষার মেঘে ঢাকা আকাশ ভেঙে ঝরঝর করে বৃষ্টি নামে। বৃষ্টিতে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে বাবুল। চোখ ভর্তি পানি নিয়ে বৃষ্টি দেখে। বৃষ্টির পানি আর তার চোখের পানি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ঘোর বর্ষার প্রবল বর্ষণে দাঁড়িয়ে পাগলের মতো বাবুল ডেকে ওঠে- মা, মা! হাহাকারের মতো শোনায় ওর দরাজ কণ্ঠস্বর!

SHARE

Leave a Reply