Home খেলার চমক অপেক্ষা ফুরাল লিভারপুলের -আবু আবদুল্লাহ

অপেক্ষা ফুরাল লিভারপুলের -আবু আবদুল্লাহ

কোন ক্লাবের জন্য দেশের ঘরোয়া ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরের শিরোপা জেতা অন্য যে কোন শিরোপার চেয়ে অনেক বেশি সম্মানজনক; কিন্তু শীর্ষ সারির একটি ক্লাবের কাছে যদি সেই শিরোপা অধরা থাকে টানা ৩০ বছর তবে তার চেয়ে কষ্টের আর কিছু বোধ হয় হতে পারে না। সেটিও আবার এমন একটি ক্লাব যারা এক সময় শিরোপা জিতেছে একের পর এক। অবশেষে সেই কষ্ট আর হতাশা থেকে মুক্তি মিললো ইংল্যান্ডের ক্লাব লিভারপুল এফসির। এবার তারা বেশ দাপটের সাথেই জিতেছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা। লিভারপুলের সেই হতাশা ঘোচানোর মুহূর্ত এসেছে মোহাম্মাদ সালাহ-সাদিও মানেদের পায়ে। ইংল্যান্ডের ঘরোয়া ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে এটি তাদের ১৯তম শিরোপা (প্রিমিয়ার লিগ নামকরণের পর প্রথম)। এ প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি, সবচেয়ে বেশি ২০ বার জিতেছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড।
১৯৭২-৭৩ মৌসুম থেকে ১৮৮৯-৯০ মৌসুম পর্যন্ত ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ১৮ আসরের ১১টিই জিতেছে লিভারপুল এফসি। এর মধ্যে পরপর তিনবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্বও আছে ইংল্যান্ডের লিভারপুল নগরীর এই ক্লাবটির। পরপর দুইবারও হয়েছে; কিন্তু এরপর কী যেন হয় ক্লাবটির। আর লিগ শিরোপা ছুঁয়ে দেখতে পারেনি তারা পরবর্তী ৩০ বছরে। বেশ কয়েকবার খুব কাছে গিয়েও ফিরে আসতে হয়েছে; কিন্তু কাক্সিক্ষত শিরোপা ছোঁয়া হয়নি।
এই তিন দশকে অনেক কিছু জিতেছে ক্লাবটি। তিনটি এফএ কাপ, চারটি লিগ কাপ, একটি উয়েফা কাপ, দু’টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা, তিনটি সুপার কাপ ও একটি ক্লাব বিশ্বকাপ; কিন্তু এত কিছু অর্জনের পরও দেশের সর্বোচ্চ লিগের শিরোপা জিততে না পারার ব্যর্থতা দলটি এড়াতে পারেনি। সেই অপেক্ষা এতটাই দীর্ঘ হয়েছে যে, এক সময় মনেই হয়েছে লিভারপুল লিগ শিরোপা জিততে পারে না। গত এক দশকে বেশ কয়েকবার রানার্সআপও হয়েছে দলটি। এর মধ্যে গত মৌসুমে মাত্র এক পয়েন্টের ব্যবধানে শিরোপা হারাতে হয়েছে ম্যানচেস্টার সিটির কাছে। এত কাছে এসেও তাই যেন অধরাই থেকে যাচ্ছিল লিগ শিরোপা। অবশেষে সেটি করে দেখালো কোচ জার্গেন ক্লপের শীষ্যরা।
এবার শুরু থেকেই দুর্দান্ত ছিলো দলটি। যেন এত বছরের আক্ষেপ ঘোচানোর জন্য পণ করেই তারা মাঠে নেমেছিল। একবারও তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারেনি কোন দল। লিগের শুরু থেকেই লিভারপুলের এতটা দাপট ছিলো যে, অন্য কোন দল যে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনাটুকুও তৈরি করতে পারেনি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই ছন্দ ধরে রেখেছে দলটি।
শেষ পর্যন্ত ৭ ম্যাচ বাকি থাকতেই শিরোপা নিশ্চিত হলো। ২০ দলের ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে প্রতিটি দলকে হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে পদ্ধতিতে ম্যাচ খেলতে হয় ৩৮টি। অর্থাৎ প্রতিটি দলের বিপক্ষে একবার নিজের মাঠে, আরেকবার ওই দলের মাঠে গিয়ে। লিগে কোন ফাইনাল, সেমিফাইনাল ম্যাচ হয় না। সব খেলা শেষে যারা পয়েন্ট টেবিলে এগিয়ে থাকে তারাই জেতে শিরোপা।
এবারের প্রিমিয়ার লিগে যখন সব দলের ৩১টি করে ম্যাচ শেষ হয়েছে তখনই নিশ্চিত হয়ে গেছে লিভারপুলের শিরোপা। কারণ ৩১ ম্যাচ শেষে লিভারপুলের পয়েন্ট ছিল ৮৬। দ্বিতীয় স্থানে থাকা সার্জিও আগুয়েরোদের দল ম্যানচেস্টার সিটির পয়েন্ট ছিলো ৬৩, তৃতীয় স্থানে লেস্টার সিটি (৫৫), চতুর্থ স্থানে ছিল চেলসি (৫৪)। তাই অন্য ক্লাবগুলো নিজেদের বাকি সাত ম্যাচ জিতলেও পয়েন্টে লিভারপুলকে টপকাতে পারবে না। এমন সমীকরণ নিশ্চিত হওয়ার পরই লিভারপুল শহরে শুরু হয় শিরোপার উৎসব। এই উৎসব অবশ্য আরো তিন মাস আগেই হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে লিগ বন্ধ ছিলো তিন মাস।
এবার প্রথম ৩১ ম্যাচে লিভারপুল মাত্র ১টি ম্যাচ হেরেছে (ড্র করেছে ২টি)। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ জয়ের রেকর্ড ২৯টি। কাজেই সেই রেকর্ডটিও এককভাবে নিজেদের করে নিয়েছে তারা। এ ছাড়া লিগের শুরু থেকে টানা ২৭ ম্যাচ জয়ের রেকর্ড আগে কোন দল করতে পারেনি। ৭ ম্যাচ বাকি থাকতে শিরোপা জেতার রেকর্ডও নেই। ২০০০-০১ মৌসুমে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ২০১৭-১৮ মৌসুমে ম্যানচেস্টার সিটি জিতেছিল ৫টি করে ম্যাচ বাকি থাকতে। পয়েন্ট টেবিলে ২৫ পয়েন্ট বা তার বেশি লিড নিয়ে এগিয়ে থাকার রেকর্ডও ইংলিশ লিগ এবারই প্রথম দেখেছে।
অনেকগুলো নতুন ইতিহাস লিখেই এবার শিরোপা জিতেছে লিভারপুল। দীর্ঘ ৩০ বছরের অপেক্ষার কষ্ট ভুলতেই কি এবার এমন দুর্দান্ত খেলেছে দলটি!

নায়ক মোহাম্মাদ সালাহ

লিভারপুলের শিরোপা জয়ের অন্যতম নায়ক ক্লাবটির মিসরীয় ফরোয়ার্ড মোহাম্মাদ সালাহ। এই সুপারস্টার লিভারপুলে যোগ দেওয়ার পর থেকেই প্রতিটি মৌসুমে খেলছেন দুর্দান্ত। বর্তমান বিশ্বের সেরা কয়েকজন ফুটবলারের মধ্যে সালাহ একজন।
২০১৭ সালে ৩৭ মিলিয়ন ইউরোতে লিভারপুলে যোগ দেওয়ার পর থেকেই ক্লাবটিকে এনে দিয়েছেন একের পর এক সাফল্য। প্রথম মৌসুমে ক্লাবকে লিগ জেতাতে না পারলেও নিজে জিতেছেন সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার। গত বছর ক্লাবকে জিতিয়েছেন ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড় শিরোপা উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। এবারের লিগ শিরোপা জেতার পথে করেছেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৭ গোল (৩১ ম্যাচ পর্যন্ত)। পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন ৬টি গোল।
মিসরীয় এই ফুটবল তারকা এখন লিভারপুলবাসীর হৃদয়ের মণিকোটায় জায়গা করে নিয়েছেন। তিনি যোগ দেওয়ার পর থেকেই লিভারপুল ক্লাবের জয়ের পাল্লা ক্রমশ ভারী হয়েছে। তাইতো মোহাম্মাদ সালাহ আর লিভারপুল যেন একে অন্যের সমার্থক হয়ে গেছে।

নেপথ্য নায়ক ক্লপ

লিভারপুলের শিরোপা জয়ের নায়ক যদি হন মোহাম্মাদ সালাহ, তাহলে এই সাফল্যের পর্দার পেছনের নায়ক অবশ্যই কোচ জার্গেন ক্লপ। জার্মান এই কোচ (ইংল্যান্ডে বলা হয় ম্যানেজার) ২০১৫ সালের অক্টোবরে লিভারপুলের দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরই ক্লাবটিকে বদলে দিতে দারুণ ভূমিকা রাখেন তিনি। ক্লপ দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই বলেছিলেন, আমাদের সামর্থ্য নিয়ে সমর্থকদের মনে সন্দেহ আছে, আমরা এই সন্দেহ দূর করে তাদের মাঝে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে চাই যে, আমরাও জিততে পারি।
৫ বছরের মধ্যেই ক্লপ সেটি করে দেখালেন। ক্লপ দায়িত্ব নেওয়ার আগের দুই মৌসুম লিভারপুল লিগ শেষ করেছিল ৮ ও ৬ নম্বরে থেকে। তার মানে তারা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলতেই পারেনি। এরপর ক্রমশই উন্নতি হয়েছে। ক্লপের জাদুর ছোঁয়ায় গতবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার পর এবার ক্লাবটি জিতলো লিগ শিরোপা। এখন নিশ্চয়ই আর কোন ফুটবল ভক্তের মাঝে লিভারপুলের সামর্থ্য নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়।

SHARE

Leave a Reply