Home গল্প তোমাদের গল্প সত্যবাদিতা -ইমাম সাজিদ

সত্যবাদিতা -ইমাম সাজিদ

রাজিন অঙ্ক করা নিয়ে খুব ব্যস্ত। স্কুলের গণিত স্যার অনেকগুলো অঙ্ক হোমওয়ার্ক দিয়েছেন। স্যার ওদের স্কুলে নতুন এসেছেন। তিনি রাজিনদের অর্থাৎ অষ্টম শ্রেণির গণিত ক্লাস নেন। প্রচুর রাগী মানুষ। এই অল্প কয়েকদিনে ক্লাসে ঝড় তুলে কতগুলো বেত ভেঙেছেন তার কোনো হিসাব নেই। কিন্তু রাজিন এখন পর্যন্ত একদিনও স্যারের বেতের বাড়ি খায়নি। কারণ সে খুব ভালো ছাত্র। তাই স্যার একদিনও মারার সুযোগ পাননি। কিন্তু কালকের ক্লাসের হোমওয়ার্ক নিয়ে রাজিন খুব শঙ্কায় আছে। হয়তো স্যারের হাতে বেতের বাড়ি না খাওয়ার রেকর্ডটা কাল সকালেই ভেঙে যাবে।
সকাল ৮টা থেকে ক্লাস। সকালে নাস্তা আর রেডি হওয়া নিয়েই সময় চলে যাবে। তাই এটি ভেবে রাতেই হোমওয়ার্ক সেরে ফেলার চেষ্টা করছে। অথচ এদিকে ওর চোখে ঘুম এসে ডাকাডাকি করছে। চোখের পাতা বন্ধ হয়ে যায় যায় অবস্থা। এ দিকে পেটে ক্ষুধাও খুব। সেই সন্ধ্যায় হালকা কিছু খেয়েছে, রাতে কিছুই খায়নি। কারণ সন্ধ্যা থেকে অন্যান্য সাবজেক্টের পড়া শেষ করে রাগী স্যারের হোমওয়ার্ক নিয়েই বসে আছে। ওর মা রাতে খাওয়ার জন্য অনেকবার ডেকেছেন। কিন্তু পড়ার চাপে খায়নি।
এক পর্যায়ে অনেক রাত হয়ে যাওয়াতে অর্ধেক হোমওয়ার্ক করেই পড়ার টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। রাজিনের মা কিছুক্ষণ পর এসে দেখার পর আস্তে আস্তে ধরে খাটে শুইয়ে দেন। খাট পড়ার টেবিলের একদম পাশেই। সকালে স্কুল আবার এদিকে অনেক রাত হয়েছে, এসব ভেবে তখন আর ঘুম থেকে ডাকেননি।
তারপর সকালে একটু দেরি করে ওঠার কারণে হোমওয়ার্কটা আর করতে পারেনি। তারপর তাড়াহুড়ো করে রেডি হয়ে নাস্তা করে কাল রাতে যে অর্ধেকটুকু হোমওয়ার্ক করেছিলো তা নিয়েই স্কুলে চলে যায়।
রাজিন ক্লাসে গিয়ে দেখে বেশির ভাগ ছাত্রই হোমওয়ার্ক করেনি। কয়েকজন করেছে কিন্তু সম্পূর্ণ করতে পারেনি। প্রথম ক্লাসই ঐ রাগী গণিত স্যারের। ক্লাস শুরু হতে ১০ মিনিট বাকি। সবাই খুব ভয়ে ভয়ে আছে। তারপর ক্লাসের সবাই এমনটি সিদ্ধান্ত নেয়-
স্যারের মনে নাও থাকতে পারে, তাই স্যার হোমওয়ার্ক এর কথা না বললে আমরা সবাই চুপচাপ থাকবো, কেউ হোমওয়ার্কের ব্যাপারে কোনো কথা বলবো না। এই সিদ্ধান্তের পর কয়েকজন বলে যে, এটিতো মিথ্যা বলা হয়ে যাবে। কিন্তু স্যারের বেতের ভয়ে ওরাও এক পর্যায়ে মিথ্যা বলবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এ দিকে রাজিন কিছুতেই এ কাজ মেনে নিতে পারছিলো না। রাজিন সবাইকে অনুরোধ করে মিথ্যা না বলার জন্য। কিন্তু কেউই পাত্তা দেয় না। তারপর রাজিন একাই মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় কিছুতেই মিথ্যা বলা যাবে না। প্রয়োজনে বেতের বাড়ি খাবো, অপমানিত হবো তবুও মিথ্যা বলবো না।
অতঃপর, একটু পরেই স্কুলের ঘণ্টা বাজার পর ক্লাসে স্যার ঢুকেন। হাতে ইয়া বড় একটি বেত। পুরো ক্লাস জুড়ে সুনসান নীরবতা। সবাই খুব ভয় আর আতঙ্কে আছে। তারপর স্যার নাম ডাকার খাতা খুলে নাম ডাকা শেষ করেন। তারপর বোর্ডে অঙ্ক করানো শুরু করেন। স্যার সত্যিই কেমন করে যেনো হোমওয়ার্কের কথাটা ভুলে যান। এ কারণে রাজিন ছাড়া ক্লাসের সবার মুখেই হাসির ছাপ। তারপর রাজিন সাহস করে দাঁড়িয়ে বলে ওঠে,
– স্যার আমাদের হোমওয়ার্ক ছিলো। আপনি হয়তো ভুলে গিয়েছেন।
এটি শুনে ক্লাসের অন্যান্যরা কেউ কেউ রাগান্বিত চাহনিতে রাজিনের দিকে তাকিয়ে থাকে, আবার কারও কারও মুখ ভয়ে লাল হয়ে যায়।
তারপর স্যার হাতে বেত নিয়ে চোখ দুটো বড় বড় করে ক্লাসের বাকি স্টুডেন্টদের উদ্দেশে করে বলেন,
– হ্যাঁ ঠিকইতো। তোমাদেরতো হোমওয়ার্ক ছিলো। বাকিরা কেন বলোনি? কত বড় সাহস।
তারপর রাজিন বলে,
– আসলে স্যার অনেকগুলো অঙ্ক দিয়েছিলেনতো তাই কেউই পুরোপুরি করতে পারেনি। এ কারণে ভয়ে কেউ হোমওয়ার্কের কথা বলেনি। আমিও পুরোপুরি করতে পারিনি। অর্ধেক করতে পেরেছি, আর ঐ অর্ধেকটাই নিয়ে এসেছি আপনাকে দেখানোর জন্য। মিথ্যা চর্চা থেকে দূরে থাকার জন্য আমি ভয়ের মাঝেও সত্য কথাটি বলেছি। কেননা মিথ্যা বলার সুযোগ নেই, এটি একটি মহাপাপ। মুনাফিকের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে মিথ্যাও একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
তারপর স্যার বলেন,
– বাহ! খুব ভালো লাগলো তোমার কথা শুনে। আমি সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি তোমার এই মহৎ কাজের প্রতি। আজ তোমার এই সত্যবাদিতার পরিচয়ের জন্য সবাইকে মাফ করে দিলাম। তবে হ্যাঁ বাকিদের বলছি, সবাই রাজিনের মতো সত্য বলতে শেখো। কেননা মিথ্যা বলা মহাপাপ। আল্লাহ তাআলা মিথ্যাবাদীকে পছন্দ করেন না। প্রত্যেকের উচিত মিথ্যাকে বর্জন করে সর্বদা সত্য কথা বলা। এতে করে আল্লাহও খুশি হন।
রাজিন বলে,
– আমি এ কারণেই মিথ্যা কথা বলিনি। সবসময়ই সত্য কথা বলি। আপনার প্রতি আজ প্রচুর ভয় ছিলো। ভয়ের মাঝেও মিথ্যা বলিনি।
তারপর স্যার বলেন,
– সত্যবাদিতা একটি মহৎ গুণ। মহান আল্লাহতায়ালা সর্বদা সত্য, সুন্দর ও সঠিক কথা বলার নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে তিনি বলেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর ও সঠিক সত্য কথা বলো।” (সূরা আল-আহজাব, আয়াত ৭০)
মানবজাতির মহান শিক্ষক আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মাদ (সা:) তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে সততা ও সত্যবাদিতার চর্চা করেছেন। যে ব্যক্তি সত্যবাদী তাকে বলা হয় সাদিক, আর যে ব্যক্তি মহাসত্যবাদী তাকে বলা হয় সিদ্দিক। রাসূল (সা:)-এর সাথি হযরত আবু বকর (রা:) ছিলেন মহাসত্যবাদী। তাই হযরত আবু বকর (রা:)কে সিদ্দিক বলা হয়। হযরত মোহাম্মদ (সা:) হাদিসে বলেছেন, “তোমরা সত্যবাদী হও। কেননা সত্য পুণ্যের পথ দেখায়। আর পুণ্য জান্নাতের পথে নিয়ে যায়।” (বুখারি ও মুসলিম)।
সত্যবাদিতা হলো নৈতিক গুণাবলির অন্যতম প্রধান গুণ। এটি মানুষকে কল্যাণ ও সফলতা দান করে। সুতরাং আমাদের সকলেরই সত্যবাদী হওয়া একান্ত কর্তব্য।
স্যারের মনটা হঠাৎই কোমল হয়ে যায়। যা ওরা কখনোই এর আগে দেখেনি। ক্লাসের সবাই একদম অবাক। এই সুযোগে রাজিন স্যারকে বলে,
– স্যার আমাদেরকে যদি হোমওয়ার্কটা সব সময় একটু কম কম করে দেন তাহলে আমাদের জন্য খুব ভালো হয়।
স্যার বলেন,
– আচ্ছা ঠিক আছে এখন থেকে কম কম হোমওয়ার্ক দিবো।
এ কথার পর ক্লাসের সবাই রাজিনের ওপর খুব খুশি হয়।
রাজিন বলে,
– ধন্যবাদ স্যার। খুব ভালো হলো আমাদের জন্য।
তারপর স্যার বলেন,
তবে হ্যাঁ, অবশ্যই হোমওয়ার্ক করে আনতেই হবে।

SHARE

Leave a Reply