Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস মুকুটহীন সম্রাট হারুন -ইবনে শাহাদাত

মুকুটহীন সম্রাট হারুন -ইবনে শাহাদাত

বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। স্কুল বন্ধ। অনেক লম্বা ছুটি। অপেক্ষার পালা শেষ হওয়ার সাথে সাথে বদলে যাবে অনেক কিছু। বয়স বাড়বে। মানে বড় হওয়ার আনন্দ। সেই সাথে নতুন ক্লাস। নতুন ড্রেস। মনকাড়া গন্ধমাখা নতুন নতুন বই। সে তো অনেক দেরি। এই লম্বা ছুটি ঘরে বসে কাটানো অসম্ভব! মোবাইল গেম, টিভি, কার্টুন। বিকেল বেলা মাঠে গিয়ে খেলা, না ঠিক খেলা নয় ব্যাট বল, নয় তো ফুটবল নিয়ে হৈচৈ। না পারবো না। দূরে কোথাও যেতে হবে। যেই ভাবনা সেই কাজ। এক ছুটে সোজা বাবার কাছে হাজির হলো নাবিল।
তারপর আবদার : পরীক্ষা তো শেষ এবার এই লম্বা ছুটিতে কী করবো?
বাবা বললেন: কেন, কোচিং করবে।
নাবিল আহলাদের সাথে মুখ ভার করে বলল: বাবা, বোরিং!
বাবার কপালে ভাঁজ। অবাক হয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন: কী বললে? লেখা-পড়া, কোচিং এই সব বোরিং?
: বাবা আমি তা বলিনি, তুমিই তো বললে, কাজের ফাঁকে ছুটির অবসরে বেড়াতে যাওয়াও পড়ালেখারই অংশ।
নাবিলের কথা শেষ হতেই মুচকি হেসে বাবা বলেন: রাইট। হান্ড্রেড পারসেন্ট ঠিক কথা। তা তোমার মায়ের সাথে কথা হয়েছে না?
: এখনো হয়নি, তবে তার তো আর অফিস থেকে ছুটি নিতে হবে না, তাই তুমিই…
: ওকে, ঠিক আছে। দেখি তোমার মায়ের সাথে কথা বলি।
ওদের কথার মাঝে রাইদা এসে হাজির। নাবিলের ছোট বোন রাইদা। ছোট হলেও বিশাল বড় পণ্ডিত। পড়ার প্রতি খুব ঝোঁক। সামনে যা পায় তাই পড়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সৈয়দ আলী আহসান, ফররুখ আহমদ, আল মাহমুদ, মতিউর রহমান মল্লিক, মোশাররফ হোসেন খানের কবিতা, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিম চন্দ্র, নজিবুর রহমান, সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ, নসীম হেজাজীর উপন্যাস কিছু বাদ দেয় না। সত্যেন্দ্র নাথ দত্ত আর সাজ্জাদ হোসেইন খানের অনেক ছড়া তো ওর ঠোঁটস্থ। মজার ব্যাপার হলো নিজেও বিশাল কবি। মজার মজার কবিতা লিখে খাতার পাতা ভরে ফেলেছে। এবার তিনি হাজির হয়েছেন, একটি ইংরেজি বই নিয়ে। বইটির নাম এ মনার্ক উইদাউট এ ক্রাউন। যার বাংলা মুকুটহীন একজন স¤্রাট। বইটি হাতে নিয়ে পণ্ডিতদের মতো গম্ভীর গলায় বলে,
: বাবা। দেখ দেখ, কী মজার কাহিনী মুকুট নেই, প্রাসাদ নেই, নেই জরির জামা, রেশমি রুমাল হীরের আংটি।
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই বাবার প্রশ্ন: মানে ঠিক বুঝলাম না।
রাইদা বলে, আমার কথা শেষ হয়নি তো।
বাবা বলেন, তা সংক্ষেপে শেষ করো, মা।
রাইদা বইটা বাবাকে দেখিয়ে বলল, এই যে বইটা পড়ছি, এক রাজার কাহিনি। কিন্তু তিনি অন্য সব রাজার চেয়ে আলাদা। তার কোন বিশাল প্রাসাদ কিংবা রাজবাড়ি ছিল না। তিনি মুকুটও পরেননি। অতি সাধারণ দরবেশের মতো জীবনযাপন করেছেন।
বাবা বলেন, তা তো বইয়ের নামটা দেখেই বোঝা যায়। তবে এমন রাজার কথা খুব একটা শোনা যায় না। স¤্রাট বা বাদশাহ অর্থাৎ মুসলমান শাসকদের এমন অনেক কাহিনি আছে।
রাইদা বিজ্ঞের মতো প্রশ্ন করে, তার মানে রাজা, স¤্রাট, শাসক?
বাবা বলেন, সাধারণত মুসলমান শাসকদেরকে রাজা বলা হয় না। তাদেরকে খলিফা, বাদশা কিংবা স¤্রাট বলা হয়। মুসলমান শাসকদের মধ্যে যারা আল্লাহর রাসূল সা.-এর মদীনা শাসন ব্যবস্থার অনুসরণ করে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে রাজ্য বা দেশ পরিচালনা করেন তাদেরকে খলিফা বলা হয়। খলিফা আরবি শব্দ এর অর্থ প্রতিনিধি।
রাইদা জানতে চায়, তাদেরকে প্রতিনিধি বলা হয় কেন?
বাবা বলেন, ‘কারণ তারা নিজেদেরকে রাজা, বাদশা কিংবা স¤্রাট মনে করেন না। তারা মনে করতেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হলেন প্রকৃত বাদশাহ তারা তাঁর প্রতিনিধি মাত্র। দেখি তোমার হাতের বইটা।’ বলে রাইদার বাবা বই হাতে নিয়ে বলেন, আরে এটা তো হযরত খান জাহান আলীকে নিয়ে লেখা।
এবার নাবিল মুখ খুলল, ষাট গম্বুজ মসজিদের খান জাহান আলী?
বাবা বলেন, ঠিক বলেছো?
নাবিল বলল: বাবা, এবার চল না বাগেরহাট যাই, ষাট গম্বুজ মসজিদ, কোদলার মঠ, এক গম্বুজ মসজিদ, চাঁদপাই অভয়ারণ্য, নয় গম্বুজ মসজিদ, বিবি বেগনি মসজিদ, বঙ্গবন্ধু দ্বীপ, সুন্দরবন পূূর্বভাগ অভয়ারণ্য সেই সাথে দেখা যাবে বাগেরহাট জাদুঘর।
নাবিলের বাবা ও রাইদা এক সাথে বলে ওঠে, গুড আইডিয়া।

দুই.

সকাল ৬টা। ভোরের মিষ্টি আলোর প্রভা ছড়িয়ে পুব আকাশে লাল সূর্য উঠছে। মনে হচ্ছে নীল আকাশের ফাঁকে সূর্যটা যেন হাসছে। ড্রাইভার রকিব চাচা আরো আধা ঘণ্টা আগে থেকে গাড়িটা বাসার সামনের রাস্তায় পার্কিং করে অপেক্ষা করছেন। নাবিল, নাবিলের মা-বাবা, ছোট বোন রাইদা সবাই গাড়িতে গিয়ে বসতেই ড্রাইভার রকিব আল্লাহর নাম নিয়ে গাড়ি স্টার্ট করলেন। অনেক দিনের সাথী এই পাজেরোটা ম্যানেজার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই নাবিলের বাবার জন্য নির্ধারিত। ড্রাইভার আংকেলও আছেন সেই প্রথম থেকেই। বলা যায় এত দিনে তিনি ওদের পরিবারেরই একজন হয়ে গেছেন। শো শো চলছে গাড়ি। গাজীপুরের পর ঢাকার মেইন রোডে ওঠার পরই শুরু হলো সিগন্যাল আর জ্যামের যন্ত্রণা। নাবিল আর রাইদা পাশাপাশি বসেছে। নাবিল ওপর ল্যাপটপটা বের করে ইন্টার মোডেম লাগিয়ে গুগলে সার্চ দিয়ে দেখতে শুরু লাগলো বাগেরহাটের কোথায় কী আছে। কিভাবে কোথায় যাওয়া যায়। কারণ তার হাতে সময় খুব কম। ওর আর রাইদার লম্বা ছুটি হলেও বাবার ছুটি মাত্র পাঁচ দিন। তাও শুক্র ও শনিবার মিলিয়ে। মঙ্গলবার থেকে তাকে অফিস করতে হবে। তার মানে যেতে আসতে দুই দিন বাদ দিলে হাতে থাকে তিন দিন। রকিব আংকেল খুব ভালো এবং দক্ষ ড্রাইভার। কিন্তু জ্যামে আটকা পড়লে তার তো কিছু করার নেই।
: ‘ভাইয়া, ঘুমিয়ে পড়লে তো।’ রাইদা নাবিলকে ধাক্কা দেয়।
হাই তুলতে তুলতে নাবিল বলে: ‘কই। আমি তো জেগেই আছি।’
ওদের মা রাইদাকে বলেন: ‘ঘুম আসলে আসুক। গত কয়েক দিন ধরে উত্তেজনায় ওর চোখে ঘুম নেই। তবে হ্যাঁ, সিট বেল্টটা ভালো করে বাঁধা আছে কি না দেখ।’
রাইদা বলে: ‘তা আছে। আমরা দু’জনেই ভালো করে বেল্ট বেঁধে তবেই বসেছি।’
মা বলেন: ‘তাহলে আর ওকে বিরক্ত করো না।’

তিন.

অবশেষে প্রতীক্ষার পালা শেষ হলো। ওদের গাড়ি এখন বাগেরহাট ষাট গম্বুজ মসজিদের সামনের খোলা মাঠে। নাবিল গাড়ি থেকে নামতেই টাইমমেশিন ঘোড়াটা সামনে এসে দাঁড়ায়। নাবিল অবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করে: ‘আরে, এখানেও তুমি।’
ঘোড়া আগের মতোই বলে ওঠে: ‘হ্যাঁ, আমি।’
নাবিল বলে: ‘কিন্তু! আজ তো আমার সাথে আমার ছোট বোন, মা-বাবাও আছেন।’
: তাতে কী।
: আমি একা গেলে ওদের কী হবে।
: তা তুমি কী বলতে চাও?
: মানে …
: মানে মানে করতে হবে না। আমি বুঝতে পেরেছি। কিন্তু সবাইকে তো নেওয়া যাবে না। বড়জোর তোমার বোনকে নিতে পারি।
: কিন্তু
: কিন্তু ভয় পাচ্ছো কেন? শাহজাদীর মতো দেখতে তোমার মিষ্টি বোনকে যদি কোন শাহজাদা পছন্দ করে ফেলে তখন কী উপায় হবে?
ঘোড়ার কথা শুনে লজ্জায় নাবিলের মুখ লাল হয়ে যায়। সে বলে: ধ্যাৎ! তুমি কী সব বলছো, ভারী দুষ্ট হয়েছো! রাইদা তো এখনো অনেক ছোট।
: আমিও এই কথাই বলতে চাচ্ছি। নাবিল সাহেব, ভয় নেই। আপনার বোন এখনো ছোট্ট খুকী। অতএব আর একটুও সময় নষ্ট করা ঠিক হচ্ছে না। বোনকে নিয়ে উঠে পড়েন আমার পিঠে।
নাবিল তো পাশে তাকিয়ে অবাক রাইদা ওর পাশে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসতে হাসতে বলে: এই তোমার সেই টাইমমেশিন ঘোড়া। যার গল্প এতো করেছো, কিন্তু আমরা বিশ্বাস করিনি। বলেছি, ভাইয়া তুমি তো স্বপ্ন দেখেছো। আজ তোমার এই স্বপ্নের ঘোড়া মানে টাইমমেশিনের সফরসঙ্গী আমিও। আমার কী যে ভালো লাগছে।
রাইদার খুশি দেখে নাবিলেরও খুব ভালো লাগছে। দুই ভাই-বোন ঘোড়ার পিঠে ওঠে বসে।
ঘোড়া জানতে চায়: তোমরা আজ কোথায় যেতে চাও?
নাবিল আর রাইদা একসাথে বলে ওঠে, ‘আমরা এসেছি বাগেরহাট ষাট গম্বুজ মসজিদ দেখতে।’
টাইমমেশিন ঘোড়াটা রহস্যের হাসি হেসে বলে, ‘তোমাদের আজ নিয়ে যাবো খলিফাবাদ রাজ্যে।’
রাইদা বলে, ‘আমি বুঝতে পেরেছি। এ মনার্ক উইদাউট এ ক্রাউন নামের যে ইংরেজি বইটা এখানে আসার আগে পড়েছি। সেই বইয়ে এই রাজ্যের নাম আছে। এই দেশের রাজাকেই বলা হয়েছে মুকুটহীন স¤্রাট। তার নাম খান জাহান আলী। এই ষাট গম্বুজ মসজিদসহ তিনি এই অঞ্চলে অসংখ্য মসজিদ নির্মাণ করেছেন। আরো অনেক কিছু করেছেন।’
টাইমমেশিনটা বলে: ঠিক। এই ষাট গম্বুজ মসজিদ ছিল হযরত খান জাহান আলীর সচিবালয়। সেই সুন্দর আরব দেশে মদিনার মসজিদে নববীকে সচিবালয় করে যেমন আল্লাহর রাসূল সা. একটি কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং পরবর্তীতে খলিফারা সেখান থেকেই তা পরিচালনা করেছেন। ঠিক সেই আদর্শের অনুসরণ করে হযরত খান জাহান আলী সুন্দরবন আর সাগরের কোলঘেঁষা এই অবহেলিত জনপদে গড়ে তুলেছিলেন খলিফাবাদ রাজ্য।
নাবিল বলল: আমার যে আর তর সইছে না।
টাইমমেশিন ঘোড়াটা উড়ছে। নীল আকাশ ছুঁয়ে। মেঘের হালকা হিম হিম ছোঁয়ায় এসির বাতাসের মতো লাগছে নাবিল আর রাইদার। আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার! আজানের সুমধুর ধ্বনি ওদের কানে আসে। মনটা আরো ভালো হয়ে যায়। নাবিলের মনে প্রশ্ন জাগে এত ওপরে আজানের ধ্বনি আসে কোথা থেকে? টাইমমেশিন ঘোড়া বুঝতে পারে নাবিল কী ভাবছে। সে বলে, ‘এখন জোহরের নামাজের সময়। খলিফাবাদের সচিবালয়ে আজান হচ্ছে।’
নাবিল প্রশ্ন করে: ‘মানে আমরা খলিফাবাদ এসে গেছি। এখন কত সাল।’
বিজ্ঞের মতো বলে রাইদা: ‘এখন আমরা ১৪০০ ঈসায়ী সালে আছি।’
নাবিল বিরক্ত হয়ে বলল: ‘আমি তোমাকে প্রশ্ন করেছি?’
টাইমমেশিনটা বলল: ‘রাইদা তো ভুল কিছু বলেনি। এখানে আসার আগে বইটা পড়েছে তো। তাই সে আগে থেকেই অনেক কিছু জানে। ছোট বলে বেশি জানা কি অন্যায়?
নাবিল লজ্জা পায়।
চার.

টাইমমেশিন ঘোড়াটা আস্তে আস্তে ওদের নিয়ে নিচে নেমে আসে। বুদ্ বুদের মতো অনেকগুলো গুম্বুজ বিশিষ্ট বিশাল মসজিদ। দলে দলে মানুষ আসছে। অজু করে মসজিদে প্রবেশ করছে। মসজিদে প্রবেশ করার পর পরই সবাই দু’রাকাত করে নামাজ পড়ার পর জোহরের চার রাকাত সুন্নত নামাজ আদায় করছে। তারপরও চুপচাপ বসে মনে মনে তসবিহ পড়ছে, ফরজ নামাজের শুরুর অপেক্ষায়।
নাবিল খুশিতে আটখানা হয়ে বলে উঠে: ‘এই তো ষাট গম্বুজ মসজিদ।’
রাইদা হাসতে হাসতে বলে: ‘ভাইয়া, নাম ষাট গম্বুজ হলেও ..’
ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই নাবিল বলে: ‘গম্বুজ কিন্তু ষাটটা নয়, আমি জানি, বল তো কয়টি গম্বুজ আছে?’
রাইদা বলে: ‘মসজিদটির গম্বুজ, ১১টি সারিতে মোট ৭৭টি। পূর্ব দেয়ালের মাঝের দরজা ও পশ্চিম দেয়ালের মাঝের মিহরাবের মধ্যবর্তী সারিতে যে সাতটি গম্বুজ সেগুলো দেখতে অনেকটা বাংলাদেশের চৌচালা ঘরের চালের মতো। বাকি ৭০টি গম্বুজ আধা গোলাকার।’
নাবিল বলে: মুখস্থ বিদ্যা ঝাড়তে শুরু করলা, তাই তো, আমরা তো এখন মসজিদের সামনে উপস্থিত কোন গম্বুজ কেমন তা তো দেখতেই পাচ্ছি।’
রাইদা লজ্জা পায়। ওর মুখ লাল হয়ে যায়। দৌড়ে গিয়ে মায়ের আঁচলে মুখ লুকাবে, সেই উপায় নেই। ওরা মা-বাবার সাথে ষাট গম্বুজ মসজিদ দেখতে এলেও, এখনো অনেক অনেক দূরে টাইমমেশিন ঘোড়ায় চড়ে ওরা চলে এসেছে পাঁচ শত বছর পেছনে। তাই নাবিল ওর ছোট্ট বোনটির মনের অবস্থা বুঝতে পেরে বলে: ‘লজ্জা পেয়ে আর মুখ রাঙাতে হবে না, এমনিতেই তোকে খুব সুন্দর দেখায়। আরো সুন্দর দেখালে আবার কোন শাহজাদার কাছে বিয়ে দিয়ে আমাকে একাই চলে যেতে হবে।’
টাইমমেশিন ঘোড়া নাবিলকে ধমক দিয়ে বলে: ‘কী সব বাজে বকছো। এখানে তেমন কোন আশঙ্কা নেই। তা সম্ভবও নয়। তোমরা যদি সত্যি সত্যি সেই যুগেও এখানে আসতে তা হলেও এমন অঘটন এই রাজ্যে ছিল অসম্ভব। এটা দরবেশ খান জাহান আলীর খলিফাবাদ রাজ্য। এখানে নারী, শিশু, গরিব, ধনী, সবল, দুর্বল, বৃদ্ধ সবাই নিরাপদ। এই রাজ্যে শুধু আইনের শাসন নয়, ন্যায়ের শাসনও আছে।’
নাবিল বলে: ‘আইনের শাসন মানেই তো ন্যায়ের শাসন।’
টাইমমেশিন বলে: ‘এখানেই তো তোমরা ভুল কর, আইনের শাসন মানেই ন্যায়ের শাসন নয়। শাসকরা আইন তৈরি করেন, তারা নিজেদের ইচ্ছে মতো আইন বানালে তাতে নিজেদের স্বার্থই প্রাধান্য পায়, তাই তা সব সময় ন্যায়সঙ্গত হয় না। তারা যখন আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে আইন তৈরি করেন, তখন নিজেদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার সুযোগ থাকে না, ন্যায়নীতির ওপর ভিত্তি করে আইন রচনা করতে বাধ্য হন।’
: যেমন?
: যেমন তোমাদের এই যুগের চীনের শাসক বা নেতা যতদিন বেঁচে থাকবেন তিনি প্রেসিডেন্ট থাকবেন, এমন আইন বানিয়ে তা পাসও করিয়ে নিয়েছে। এখন তিনি অযোগ্যতার পরিচয় দিলেও কোন নাগরিক যদি তাকে পদত্যাগ করতে বলেন, আইনত তা হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু ন্যায় কী বলে?
: যেহেতু তুমি অযোগ্য অতএব ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে, জনগণকে যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচিত করার সুযোগ দেওয়াই ন্যায়সঙ্গত।
: ‘বুঝতে পারলাম। এবার থামবো। অজু করে সালাত আদায় করবো, মেয়েদের জন্য জায়গা নির্দিষ্ট আছে, রাইদা সেখানে যাও।’ টাইম মেশিনটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে নাবিল বলে, ‘তুমি কী করবে? তোমার তো আর নামাজ-কালামের বালাই নাই।’
: ‘কে বলছে? তুমি কোরআন পড়নি, আল্লাহ কী বলেছেন, ‘সাত আকাশ, পৃথিবী ও এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে, সব কিছুই তাঁর (আল্লাহর) পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। আর এমন কিছু নেই, যা তাঁর প্রশংসা, পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না। কিন্তু তোমরা তাদের পবিত্রতা ও মহিমাকীর্তন বুঝতে পারো না। অবশ্যই তিনি সহিষ্ণু, ক্ষমাশীল।’ (সূরা : বনি ইসরাইল, আয়াত : ৪৪)। আমরাও তাঁর তসবিহ পড়ি, তোমরা যাকে জড় পদার্থ ভাবো তারাও আল্লাহর প্রশংসা করে।’
: তুমি এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা করতে থাকো।
: ‘ঠিক আছে, জনাব। এবার লেকচার রেখে নিজ কর্ম সম্পন্ন করুন।’ মসজিদে গিয়ে নাবিল ও রাইদা যার যার জায়গায় দাঁড়িয়ে যথারীতি দুখুলুল মসজিদ দুই রাকাত নামাজের পর জোহরের চার রাকাত সুন্নাত পড়ে। তারপর মনে মনে তসবিহ পড়ে ফরজ নামাজের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।

পাঁচ.

‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার’ ইকামতের আওয়াজে নাবিল উঠে দাঁড়ায়। নামাজ শেষে তাঁর খুব ইচ্ছে জাগে ইমাম সাহেবের সাথে হাত মিলিয়ে কথা বলার। সে আস্তে আস্তে মেহরাবের দিকে আগায়। তাকে দেখে মিষ্টি মুচকি হেসে সালাম দিয়ে ইমাম সাহেব হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘তোমার নাম?’
: নাবিল জামান, আপনি।
: আমি খান জাহান আলী। আমার পুরো নাম উলুঘ খানুল আজম খান জাহান। আমার প্রকৃত নাম খান জাহান। ‘উলুঘ’ ও ‘খান উল আজম’ বা ‘খান ই আজম’ আমার উপাধি। ‘উলুঘ’ তুর্কি শব্দ, এর অর্থ নেতা বা সরদার। গৌড়ের সুলতান এই উপাধি দিয়ে আমাকে এই দক্ষিণবঙ্গে শাসন পরিচালনার সনদ দেন। আসলে আমি নিজেকে এই এলাকার মানুষের খাদেম বা সেবক মনে করি।
: ‘খান উল আজম’ তুর্কি ও ফার্সি ভাষায় ‘উলুঘ’ এর সমার্থবোধক। এই এলাকার সাধারণ মানুষ আপনাকে খান জাহান আলী, খাঞ্জালী পীর, পীর খাঞ্জা, খান জাহান খান ইত্যাদি নামে ডাকে।
: তুমি এত কিছু জানো কিভাবে?
: আমি তো এখানে এসেছি, একবিংশ শতাব্দী থেকে আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে।
: এত দিন পরও মানুষ আমাকে মনে রেখেছে?
: কত রাজা, বাদশা, স¤্রাটের নাম মানুষ ভুলে গেছে, কিন্তু আজও আপনি আপনার কাজের মাঝে বেঁচে আছেন।
: সবই মহান রাব্বুল আলামিনের রহমত।
: আমি সাদকার নিয়তে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কিছু কাজ করেছি।
: আপনি সুন্দরবন আর সাগর উপকূলের দুর্গম অঞ্চলে শাসনভার পালনকালে রাস্তাঘাট, পুকুর, মসজিদ, সরাইখানা নির্মাণসহ অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন।
: আমার সবচেয়ে বড় কাজ ছিল আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষকে মানুষের গোলামি থেকে মুক্তি দিয়ে আল্লাহর গোলামে পরিণত করা।
: আপনার ৪০ বছরের শাসনকাল তাই তো আজও স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে।
আমি অতি সাধারণ ঘরের সন্তান, আমার বাবা আজর খান কোনো বাদশাহ বা স¤্রাট ছিলেন না। ছিলেন না কোনো বিখ্যাত ব্যক্তিও। কিন্তু বিদ্বান ছিলেন। তিনি পবিত্র কোরআন, হাদিস, আরবি, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য, দর্শনশাস্ত্র এবং তারিখে ইসলামের বড় পণ্ডিত ছিলেন। শৈশবে তাঁর কাছ থেকে এবং যৌবনে আমার শ্বশুর ওলি হযরত নূর কুতুবুল আলমের প্রতিষ্ঠিত জামেয়াতে আমি যে শিক্ষা পেয়েছিলাম তার আলোতেই আমি ইসলামী নিয়ম-নীতি মেনে জনগণের সেবা করার চেষ্টা করেছি।
: জামেয়া মানে।
: বিশ্ববিদ্যালয়, তোমার যুগের মানুষেরা যাকে বিশ্ববিদ্যালয় বলো।
: আপনি তো একজন বীরযোদ্ধাও।
: হ্যাঁ, আমি নূর কুতুবুল আলমের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে জৌনপুরের সুলতান ইব্রাহীম শর্কির সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছি। সুলতান ইব্রাহীম শর্কি নূর কুতুবুল আলমকে অনেক শ্রদ্ধা করতেন ও তার প্রতিটি কথার গুরুত্ব দিতেন। তিনিই আমাকে একটি চিঠি দিয়ে সুলতানের কাছে পাঠিয়েছিলেন। তাই চিঠি পাওয়া মাত্রই সুলতান আমাকে একজন সাধারণ সৈনিকের চাকরি প্রদান করেন। এখান থেকে আমার সৈনিক জীবনের শুরু। নিজ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে আল্লাহর রহমতে আমি কিছুদিনের মধ্যেই একজন সাধারণ সৈনিক থেকে প্রধান সেনাপতির পদে অধিষ্ঠিত হই।
সেই সুলতান শিহাবউদ্দীন বায়জীদ শাহর বিশ্বাসঘাতক অমাত্য রাজা গণেশ বিদ্রোহ ঘোষণা করে। বিদ্রোহী ফৌজদের হাতে শহীদ হন সুলতান শিহাবউদ্দীন বায়জীদ শাহ। গৌড়ের শাসনকর্তার পদে অধিষ্ঠিত হন রাজা গণেশ। মুসলিম প্রজা বিশেষ করে আলেমদের ওপর রাজা গণেশ সর্বদা খড়গহস্ত ছিলেন। গণেশের অত্যাচার যখন মাত্রা ছাড়ায় তখন নূর কুতুবুল আলম ইব্রাহীম শর্কির কাছে পত্র লিখে ইসলাম ও মুসলিমদের রক্ষার্থে রাজা গণেশকে দমন করার আহবান জানান। সুলতান তার বিশ্বস্ত সেনাপতি হিসেবে আমার নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যক সৈন্য রাজা গণেশের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। যুদ্ধে গণেশ পরাজিত হয়ে প্রাণভিক্ষা চান এবং কুতুবুল আলমের পরামর্শে তাকে জীবিত ছেড়ে দেই। যুদ্ধ শেষে আমি সুলতানের কাছে অনুমতি নিয়ে তার ওস্তাদ কুতুবুল আলমের কাছে থেকে যাই। কিন্তু সেই ছুটি শেষ করে আমার আর ফেরা হয়নি।
হযরত নূর কুতুবুল আলম আমাকে আরো উচ্চতর শিক্ষা দেন। আমার সততা ও নিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে তিনি আমার সাথে নিজ কন্যার বিয়েও দেন।
: তারপর;
: চারিদিকে ইসলাম ও মুসলিমদের দুরবস্থা দেখে হযরত নূর কুতুবুল আলমের অনুমতি নিয়ে আমি সমাজ সেবা, ইসলাম রক্ষা ও ইসলাম প্রচারের কাজে বেরিয়ে পড়ি। আমি যখন বঙ্গে আসি, তখন গৌড়ের সুলতান ছিলেন জালাল উদ্দীন মুহাম্মদ শাহ। সুলতান আমাকে দক্ষিণবঙ্গের দুর্গম অঞ্চলের শাসক নির্বাচিত করেন। বিদ্রোহী অত্যাচারী সরদারকে দমন করে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দেন। সেই সময় দক্ষিণবঙ্গে আগমনের একমাত্র পথ ছিল ভৈরব নদী। আমি গৌড় হতে পদ্মা নদী ধরে কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের নিকটবর্তী ভৈরব নদীতে আসি। সেখান থেকে চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ হয়ে যশোরের বারোবাজারে উপনীত হই। ১১ জন আউলিয়া নিয়ে যশোরের বারোবাজারে কিছুকাল অবস্থান করি। এখান থেকেই আমার দক্ষিণবঙ্গ জয়ের সূচনা।
: অনেক কিছু জানতে পারলাম।
: অনেক অনেক জানার বাকি আছে। চলো আগে দুপুরের খানা খাবে তারপর অনেক কথা বলা যাবে।
নাবিল খান জাহান আলীর সাথে মেহমানখানার দিকে হাঁটতে থাকে।
[সমাপ্ত]

SHARE

Leave a Reply