Home গল্প বাঘ শিকারে একদিন -জাফর তালুকদার

বাঘ শিকারে একদিন -জাফর তালুকদার

বাবার বন্দুক দিয়ে একটা কুঁজো বক গুলি করে মারার পর বুকের ছাতি চওড়া হয়ে গেল। ঘটনার পর থেকে সবাই কেমন যেন একটু সমীহের চোখে তাকায়। ছোট ছেলেরা রাস্তা ছেড়ে দিয়ে ফিসফিস করে। মেয়েদের কথা বলে আর লাভ নেই। চওড়া বুক দেখে তারা ক্ষণে ক্ষণে লাল হয়ে যায়। এখন আর ঘরে বসে থাকার মানে হয় না। যুদ্ধে যাবার মতো ইন্তেজাম শুরু হলো বাঘ শিকারের। বাবা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, ‘যাবি যা, সঙ্গে মধুটাকে নিস।’ মধু মামা পাকা শিকারি। খুব ভাবসাব বনের লোকজনের সঙ্গে। গেলেই পাস মিলে যায়। নৌকায় চাল-ডাল তুলে রওনা দিলাম। সঙ্গে দুই দুটো বন্দুক। মামারটা দোনলা। আমি নিয়েছি সিঙ্গেল বোর ফ্রান্সের নামকরা সিমপ্লেক্স গান। কার্তুজের অন্ত নেই। এলজি, বুলেট, রেমিংটন সবই আছে। এখন আসল জিনিস সামনে এলেই হলো। একেবারে ফাটিয়ে দেবো। জিতু বলেছিল, যাবার আগে জিম করবেটের ‘মানুষখেকো’ বইটা একটু পড়ে নিতে। মাস্টারের ছেলে, কথাবার্তাও মাস্টারি টাইপের। বই পড়ে আবার শিকার শিখতে হবে নাকি! আমি ১০ নম্বর ছররা দিয়ে বক মারা লোক। চিন্তা করে দেখেছি, শিকারটা যদি সত্যি সত্যি হয়েই যায় তাহলে অবস্থা কী দাঁড়াবে! জোহরাকে চিঠির মুসাবিদাটা করে ফেলা দরকার। আমার সামনে দিয়ে ওই পেটপটকা বিল্টুর সঙ্গে হেসে হেসে কথা! দেব নাকি গুলি চালিয়ে। মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তান আমলের বায়ুদোষ। ক্ষেপে গেলে কেবল গালমন্দ আসে মুখে। এখন মাথা ঠাণ্ডা রাখার সময়। শিকারের আগে মনোযোগ নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। মস্তিষ্ক থাকবে হিমঠাণ্ডা বরফ। পথ বেশি নয়। নদী-খাল বেয়ে বেলাবেলি পৌঁছে গেলাম বনের কাছে। রাতে আমরা থাকবো বনের ভেতর ছোট্ট একটা আঁটোসাঁটো খালে। জোয়ার থাকতে থাকতে যেতে হবে। না হলে ভাটার টানে পানি নেমে যাবে হাঁটুর কাছে। মাঝি ঠিকঠাকমতো নৌকাটা বাঁধাছাঁদা করে মাছের ঝোল দিয়ে খেতে দিল আমাদের। উত্তেজনায় কাঁই হয়ে খেতে পারলাম না তেমন। এই প্রথম বাঘ শিকারে এসেছি। একটু উত্তেজনা তো হবেই। তাছাড়া, চারদিকে ঘন অন্ধকার। নিস্তব্ধ, নিঝুম। ঝিঁঝিঁ আর নানা রকম পশু-পাখির ডাকে কান ঝালাপালা হবার জোগাড়। সব ছাপিয়ে থেমে থেমে ভেসে আসছে নানাজির হুঙ্কার। জঙ্গলে বসে ওনাদের নাম মুখে নিতে নেই। সবাই ঠারে ঠারে মামা টামা বলে চালিয়ে দেয়। আমি ঠিক করেছি নানা বলে ডাকবো। কিন্তু ঘুম যে আসে না পোকার কামড়ে! ওদিকে থেমে থেমে নানার ডাক। ডাকতো নয়, প্রলয়নাচন। হুঙ্কারের তোপে নৌকার হাঁড়িকুড়ি ঝনঝনিয়ে উঠছে। এর ভেতর শুরু হল আরেক বিপত্তি। যতবার ডাক আসে ততবার সুড়সুড়িয়ে গিয়ে প্যান্টের বোতাম খুলে বসি নৌকার গলুইয়ের কাছে। বাইরে তাকাতে পারি না। ওনাদের চোখ নাকি টর্চের মতো জ্বলে। মাইল মাইল দূর থেকেও ঠিকঠিক নাতিদের ঘ্রাণ টের পান নাকে। সর্বনাশ! সঙ্গে সঙ্গে সদ্য খাওয়া টেংরা মাছ গুড়গুড়িয়ে উঠলো পেটের মধ্যে। বন্দুকটা ধরে কেবল বুকের কাছে টানছি। ভাগ্নের তাড়না দেখে মামা একচোখ ফাঁকা করে জ্ঞান দিলেন সামান্য, ‘ঘুমো, ঘুমো, ভোররাতে নেমেই গাছে চড়ব। তখন ওনারা বেড়াতে আসবেন খালের কাছে।’ আর বলতে হলো না। টেংরা মাছ এমন জোরে পেটে গাই মারল যে প্যান্ট খোলার সময় পেলাম না। মাঝি গলা খেঁকিয়ে উঠলো সশব্দে, ‘আপনারা যে ক্যান এই পুলাপান লইয়া জঙ্গলে আহেন হেইডা বুঝি না! এহন ঠ্যালা সামলান।’ মামা এবার দুই চোখ ফাঁক করে নাক চেপে বললেন, ‘কিরে, হেগে দিয়েছিস!’ রাত পোহানোর বাকি নেই। মামার কোমর ধরে কোনরকম পা রাখলাম বনের কিনারে। কেবল অন্ধকার ফিকে হতে শুরু করেছে। মামা সময় নষ্ট না করে ভাগ্নেকে নিয়ে যুতমতো চড়ে বসলেন একটা সুন্দরী গাছের ডালে। আমি ওপরে। মামা নিচে। বসতে না বসতেই ছেঁকে ধরল বাউরা পোকার দল। কামড়ের উৎপাতে প্রাণ যায় অবস্থা। কাঁপাকাঁপির চোটে বন্দুকটা কোনদিকে ধরব বুঝতে পারছি না! এদিকে ওনাদের নাকি এখনি আসার সময় হয়ে গেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। বুকের ভেতর আওয়াজ দিচ্ছে দ্রিম দ্রিম। হাত-পায়ের নাচনের কথা আর বলে লাভ নেই। কাতর গলায় মামাকে বললাম, ‘চল মামা, ফিরে যাই। এখানে কুঁজোবক আছে না, তাই একটা মেরে নেব সকালে।’ মুখের কথা মুখেই আটকে থাকে। মামা মুখে আঙুল দিয়ে চুপ করার ইশারা দিলেন। হ্যাঁ, তাইতো, মচমচ শব্দে কী যেন এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। সর্বনাশ, নানা নাকি! বন্দুকটা ঠিকমত ধরে রাখতে পারছি না কেন! নলের মাথাটা দেখি কেঁপে কেঁপে ঠেকে আছে মামার পিঠের ওপর।
এদিকে শব্দটা দ্রুত এগিয়ে আসছে। ছপ, ছপ, ছপ, ছপ। ফিকে অন্ধকারে কালোমতো জন্তুটা মাটিতে বুক ঠেকিয়ে ধীরে ধীরে চলে এসেছে গাছের কাছে। আর দেরি নয়। হাত-পা বিদ্রোহ করে দ্রুত ধপাস করে আছড়ে পড়লাম মাটিতে। কোথায় ছিটকে গেল বন্দুক! কোথায় এলজি, বুলেট! জ্ঞান ফিরতে সময় লেগেছিল অনেক। নৌকার ছইয়ের ভেতর শিকারি ভাগ্নের মাথায় হাত দিয়ে মামা মৃদু হেসে বললেন, ‘কিরে জ্বর উঠে গেছে দেখছি! আরে পাগল, ওটাতো গুঁইসাপ ছিল। ওই দেখেই তোর…!’ বাকিটুকু শোনার ইচ্ছে হলো না। কান চাপা দিলাম।

SHARE

Leave a Reply