Home গল্প তোমাদের গল্প ক্ষমার প্রতিদান -তাসলিমা শেখ

ক্ষমার প্রতিদান -তাসলিমা শেখ

এই আজিমপুর!
নিউমার্কেট..কলাবাগান..
ধানমন্ডি..আজিমপুর! আজিমপুর..।
ভিআইপি ২৭ বাসের হেল্পার গাড়ির হ্যান্ডেল ধরে যাত্রী উঠাচ্ছিল।
এক ফাঁকে হেল্পারের পাশ হয়ে লাফ দিয়ে গাড়িতে উঠে সাইফ। উঠেই ওর মন একটু খারাপ হয়ে যায়। কোন সিট ফাঁকা নেই। আব্দুল্লাহপুর-নিউমার্কেট দাঁড়িয়ে যেতে তো কষ্ট হয়ে যাবে। আধঘণ্টা লেট হওয়ার ফল এটা। কাল রাতে বেশ দেরি করে ঘুমিয়েছে সাইফ। এ জন্য ফজর পড়ে ক্লান্তি দূর করতে আবার একটু বিছানায় শুয়েছিল সে। যাই হোক কী আর করা। মাথার ওপরের হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে রইল।

এক বৃদ্ধা উঠছিলেন, সাথে মনে হয় কেউ নেই। হেল্পার উঠতে সহযোগিতা করতে চাইলে উনি ডান হাত উঁচিয়ে বললেন, ‘এই ধরবা না। একলাই উঠমু।’ হেল্পার সরে গেল। সামনের সিটের এক যুবক সিট ছেড়ে দিয়ে বৃদ্ধার বসার ব্যবস্থা করে দিল।
বিষয়টি ভালো লাগে সাইফের। বেশ কিছুক্ষণ পর গাড়ি এয়ারপোর্টে পৌঁছলে সাইফের পাশের লোকটি নেমে যাওয়ায় সাইফ সিটে বসে। মনে মনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে সে। আল্লাহই সিটের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
পাশের সিটে বসা লোকটি জিজ্ঞেস করে, ভাই কোথায় নামবেন?
– নিউমার্কেট।
– আমি আসাদগেট নামবো, আপনি চাইলে এ পাশে বসতে পারেন। সাইফ খুশি মনে জানালার পাশে বসে।
ঢাকা কলেজের হিসাববিজ্ঞানের ছাত্র সাইফ। সেই চার বছর আগে প্রিয় পরিবার, গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় আসা। প্রতিদিন এভাবে বাসে ওঠা, জ্যামে বসে থাকা ইত্যাদির সাথে যুদ্ধ-বন্ধুত্ব করে ক্লাস করা। ক্লাস শেষে টিউশনি, নিজের পড়া, এভাবেই যেন কেটে যাচ্ছে জীবন। তবুও আল্লাহ ভালো রেখেছেন। ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধু শামীম অনেকবার বলেছে নিউমার্কেট এর ওদিকে কলেজের কাছাকাছি থাকতে, বলেছে টিউশনির ব্যবস্থা করে দেবে। কিন্তু…থাক..।
আব্দুল্লাহপুর থেকে ক্যাম্পাসের দূরুত্ব বেশি হলেও সাইফ ওর এক দূর সম্পর্কের চাচার বাসায় থাকে। চাচা-চাচী বেশ ভালো মানুষ, আন্তরিক। তাদের বাসায়ই খাওয়া দাওয়া করে সাইফ। আলাদা রান্না বা কাজের খালা রাখার ঝামেলা নেই। বিকেলের দিকে চাচার দুই ছেলেকে গণিত, ইংরেজি দেখিয়ে দেয়। এ ছাড়া সন্ধ্যার পর দুটি টিউশনি করে।
এরপর নিজের পড়া….।

আসলে সাইফের ছাত্রাবাস বা মেসে থাকতে ভালো লাগে না। প্রায় মেসগুলোতেই ছাত্রদের রুটিনবিহীন যাচ্ছেতাই জীবন। এর চেয়ে বাসাই ভালো। এ ছাড়া ওর টিউশনিগুলো উত্তরায় হওয়াতে বেশ ভালো অ্যামাউন্ট পায় বলা যায়। নিজের খরচ বাঁচিয়ে কিছু টাকা মাঝে মধ্যে বাড়িতে পাঠানো যায়। সাইফরা ২ ভাই ১ বোন। ছোট ভাই অষ্টম শ্রেণিতে আর বোন থ্রিতে পড়ে। সাইফের বাবা গ্রামের মসজিদের ইমাম। আর নিজের অল্প জমিতে সময় অনুযায়ী ফসল ফলান। সাইফের মা-বাবার সন্তানদের নিয়ে অনেক স্বপ্ন। তারা মানুষের মতো মানুষ হবে। নেক হবে। দেশ সমাজের জন্য কাজ করবে। সাইফের ইচ্ছা একজন আদর্শ শিক্ষক হওয়া।

– এই ব্যাটা ড্রাইভার! গাড়ি ডানে নে, সিগন্যালে বসে থাকবি নাকি?
মধ্যবয়সী এক লোক বলে উঠল।
ড্রাইভার ডানে নিতে নিতে ট্রাফিক পুলিশ সিগন্যাল দিয়ে দিল। বিজয় সরণির এই সিগন্যাল মাঝে মাঝে অনেকক্ষণ থাকে। মিনিট দশেক পরে সিগন্যাল ছেড়ে দিল।
ক্লাস শেষে জোহর পড়ে নিল সাইফ। নোটিশ বোর্ড চেক করে দেখল পরীক্ষার রুটিন দিয়ে দিয়েছে। ওহ! রোজাও শুরু পরীক্ষাও। বিরক্তিকর!
কী যে একটা অবস্থা। প্রতি বছর রোজার সময় পরীক্ষা থাকে। প্রশান্তচিত্তে রমজান উদযাপন করবে সে সুযোগও নেই। কী আর করা!
এখনও যেহেতু কিছুদিন বাকি, তাই এখন থেকেই পড়া কিছুটা এগিয়ে রাখতে হবে ইনশাআল্লাহ। এবার রোজায় অর্থসহ কুরআন খতম করার ইচ্ছা সাইফের। আল্লাহ যেন সাহায্য করেন।
– আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছো সাইফ?
শামীম এসে সালাম দিল।
– ওয়ালাইকুমুস সালাম। আলহামদুলিল্লাহ। তুমি?
– আলহামদুলিল্লাহ।
এই যে তোমার বইটা।
খুব ভালো লেগেছে। আমি ভেবেছি সব খণ্ড কিনবো। এগুলো বলে ‘আসহাবে রাসূলের জীবনকথা-১’ বইটি সাইফকে ফেরত দিল শামীম।
পরীক্ষার রুটিন দিয়েছে দেখেছো? শামীমকে জিজ্ঞেস করলো সাইফ।
– হ্যাঁ। ভালো করে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।
– হ্যাঁ আসলেই। কোন নোট লাগলে নিও আমার কাছ থেকে।
– হ্যাঁ অবশ্যই।
এখন বের হবো নইলে আবার জ্যামে পড়তে হবে। আসি, আল্লাহ হাফেজ।
– আল্লাহ হাফেজ।

দেখতে দেখতে প্রায় সব পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল সাইফদের।
আজই শেষ হয়ে যাবে। গত মাসের জমানো টাকাগুলো নিয়ে বের হলো সাইফ। ঈদ উপলক্ষে বাড়ির সবার জন্য কিছু না কিছু কিনবে। পরীক্ষা শেষে চাঁদনী চক থেকে মায়ের জন্য শাড়ি, ভাই বোনের জন্য জামা এবং বাবার জন্য একটি পাঞ্জাবি কিনল। হিসাব করে দেখল পকেটে আর ২৫০০ টাকা আছে।
ঈদের আগে টিউশনির টাকা পেলে এবং এ টাকা দিয়ে একটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল কিনবে। ক্লাসের মধ্যে ওরই শুধু অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল নেই। পড়ার সুবিধার্থে বিভিন্ন গ্রুপ খোলা হয়েছে এ জন্য আবার স্যারেরা অনেক লেকচারের স্লাইড দিয়ে দেন শুধু। অবশ্য শামীম সব বিষয়ে জানিয়ে দেয় ওকে। এমনকি স্লাইড প্রিন্টআউট করে ফটোকপি করেও দেয়। এসব কারণে মোবাইল কেনাটা দরকার।

মার্কেট থেকে বের হয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াল সাইফ। ১৫ মিনিটের মতো দাঁড়িয়ে থেকে বাস পেল। বাসে বসে হাতের ব্যাগ দুটো নিজের পাশেই রাখলো।
কিছুক্ষণ পর ধানমন্ডি থেকে একটি বয়স্ক লোক উঠল। সাইফ জানালার দিকে একটু সরে বসল। লোকটি তার পায়ের দিকে কী যেন খুঁজছিল। বারবার সাইফের দিকে সরে আসছিল। সাইফ জিজ্ঞেস করল, চাচা কোন সমস্যা?
– আমার বিশ টাকা হারিয়েছে।
সাইফ নিজের আশপাশে খুঁজতে সাহায্য করল। লোকটি বনানী নেমে গেল।
সাইফ বাসায় পৌঁছে, ফ্রেশ হয়ে টিউশনিতে বের হবে এমন সময় মনে হলো টাকার ব্যাগ ওর তালা দেওয়া ট্রাংকে রেখে যাবে। কিন্তু ইন্নালিল্লাহ! একি! ব্যাগটা নেই। বাস থেকে নেমে চেক করা হয়নি। বাসে ওঠা-নামার সময় বেশি ভিড় ছিল না। তাহলে কি বাসে বসা ঐ বৃদ্ধ লোকটিই টাকাসহ ব্যাগটা নিয়ে গিয়েছে। সে তো সাইফের দিকে বারবার সরে আসছিল। আল্লাহ।
মন খারাপ হয়ে গেল ওর।
তবুও পড়ানো শেষ করে আসল।
রাতে তারাবিহ শেষ করে আল্লাহর কাছে এর জন্য উত্তম প্রতিদান চাইলো। লোকটি হয়তো বিপদে পড়ে ওর টাকাটা নিয়েছে। আল্লাহ যেন তাকে মাফ করে দেন। হেদায়াত দেন। সাইফ তাকে মন থেকে মাফ করে দিল।
যদিও কলেজ এখন বন্ধ হয়ে গিয়েছে কিন্তু ২৫ রোজা পর্যন্ত পড়িয়ে এরপর সাইফ বাড়িতে যাবে। ছাত্রদের বলে রাখল। ২৫তম রোজার সকাল। আজ সকাল সকাল পড়াতে এসেছে সাইফ। বিকেলের ট্রেনে বাড়ি ফিরবে ইনশাআল্লাহ। ব্যাগ গুছিয়ে রেখে এসেছে। পড়ানো শেষ প্রায়। সাইফ বন্ধের জন্য কিছু হোমওয়ার্ক দিচ্ছিল। এমন সময় ছাত্রদের বাবা এসে সালাম দিল।
সাইফ সালামের উত্তর দিল।
– সাইফ! তুমি মনে হয় আজ বাড়িতে চলে যাচ্ছো?
– জি, ইনশাআল্লাহ।
– তুমি ওদের স্যার হওয়ার পর থেকে ওদের পড়াশোনার মনোযোগ বেড়েছে। আমি চাচ্ছিলাম তুমি যতদিন ঢাকায় আছো ততদিন ওদেরকে কষ্ট হলেও পড়াবে।
– জি চাচা, চেষ্টা করবো।
– শোন, এ খামটিতে তোমার জন্য একটি ঈদের গিফট আছে। কিছু মনে করো না।
নিজের ছেলে মনে করে দিয়েছি। এরপর তিনি বের হয়ে গেলেন।
সাইফ ছাত্র মারফত জানতে পারলো। বাসার চাচা সপ্তাহ খানেক আগে একটি মোবাইল কিনেছেন। এরপর তাদের অফিস থেকে মোবাইল দিয়েছে। ছেলেদের তো এখনই মোবাইল দেবেন না। তাই নিজের কেনা মোবাইলটি সাইফকে উপহার হিসেবে দিয়ে দিলেন।
সাইফ আল্লাহর অনেক অনেক শুকরিয়া আদায় করল। এটি আসলেই আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার। সাইফের ধৈর্যের প্রতিদান কত দ্রুত দিলেন তিনি।

সাইফ রেডি হয়। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দ্রুত স্টেশনের দিকে যায়। আহ! কত দিন বাড়ি যাওয়া হয় না। মন চাচ্ছে উড়ে চলে যেতে…।

SHARE

Leave a Reply