Home বিজ্ঞান ও বিশ্ব ফুটন্ত নদী -আল জাবির

ফুটন্ত নদী -আল জাবির

রূপকথার এক নদী যেখানে গরম পানিতে পড়ে মৃত্যু হয় পশুপাখির। হাজার বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে সেই ফুটন্ত পানির নদীর গল্প। আমাজনের গহিন জঙ্গল যে গভীর রহস্যে মোড়া, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে দুনিয়াজুড়ে আলোড়ন ফেলে দিয়েছে আমাজন জঙ্গলের রহস্যজনক গরম পানির নদী। টগবগ করে ফুটছে পানি। ধোঁয়া উঠছে অনবরত। গরম পানির প্রস্রবণ নয়, একেবারে ফুটন্ত এক নদী। এই নদীতে নামলেই সিদ্ধ হয়ে যেতে হবে।
রূপকথায় আছে, স্প্যানিশ বিজেতারা স্বর্ণের খোঁজে আমাজনের গহিনে গিয়ে ফিরে এসে বিষাক্ত পানি, মানুষখেকো সাপ আর টগবগে ফুটন্ত নদীর গল্প শোনাতেন। রূপকথার সেই নদীর সন্ধান মিললো এবার পেরুতে। নদীটি খুঁজে পেয়েছেন পেরুর ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানী আন্দ্রে রুসো। পেরু অংশে আমাজন জঙ্গলের একেবারে গভীরে নদীটি বয়ে চলেছে। নদীটির নাম মায়ানতুইয়াসু। যার স্থানীয় নাম শানায়-তিমপিশকা অর্থাৎ সূর্যের তাপে টগবগে। ৪ মাইল বা ৬.৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ২৫ মিটার চওড়া এবং গভীরতা কমবেশি ২০ ফুটের এই নদীটি সত্যিই ফুটন্ত পানি বয়ে নিয়ে চলেছে।এই নদীতে পড়লেই যে কোনো প্রাণী মুহূর্তে গলে যাবে। নদীর কাছাকাছি গেলেই ঝলসে যাওয়ার উপক্রম হয়। তাই জঙ্গলের এই অংশে কোনো জীবজন্তুও বাস করে না। নদীটি আবিষ্কার হবার পেছনে রয়েছে ক্ষুদ্র বালকের কৌতূহল। যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে সাউদার্ন মেথোডিস্ট ইউনিভার্সিটির জিওফিজিক্সের ছাত্র রুসো ছোট্টবেলায় তার দাদুর মুখে এই নদীর গল্প শুনেছিলেন। রুসো ভেবেছিলেন, দাদুর অন্য রূপকথার গল্পের মতো এটিও শুধুই গল্প। তবে বড় হয়ে বৈজ্ঞানিক কৌতূহলেই সম্প্রতি খোঁজ চালিয়ে নিজে দেখে এলেন নদীটি।
আন্দ্রে বলেন, গবেষণার সময় ওই নদীর বিষয়ে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞাসা করি। কিন্তু সবাই বলে, এ রকম কোনো নদীর অস্তিত্বই নেই পৃথিবীতে। গবেষক, সরকার, বিভিন্ন খনি সংস্থার সবাই নানা খোঁজ নিয়ে জানিয়ে দেয়, এরকম কোনো নদীই নেই। সবার বক্তব্য, ফুটন্ত নদী থাকতে গেলে কাছাকাছি আগ্নেয়গিরি থাকতে হয়। আমাজনের আশপাশে কোনো আগ্নেয়গিরি নেই। তাপের উৎস না থাকলে পানি গরম হবে কী করে!
সব মহল থেকে না শুনেই জেদ চেপে যায় আন্দ্রের। তিনি নিজেই আমাজনের গভীর জঙ্গলে পাড়ি দেন ফুটন্ত নদীর খোঁজে। আমাজনের গভীরে পেরোতে রুসো দেখা পেলেন আশ্চর্য নদীর। চার মাইল লম্বা এই নদী থেকে ধোঁয়া উঠছে যেমন ফুটন্ত পানি থেকে ওঠে। আর নদীর পানিতে পড়ে রয়েছে নানা রকম পশুপাখির মৃতদেহ।
পানি খাওয়ার আশায় নদীতে নেমে তারা আর ফিরে যেতে পারেনি। নদীতে হাত দিতেই রুসো টের পেয়ে যান পানির উষ্ণতা। একবার নদীতে পড়লে মুহূর্তে গোটা মানুষও সেদ্ধ হয়ে যাবে। পানি টগবগ করে ফুটছে অনবরত। নদীটির আশপাশে বা বহুদূরের অঞ্চলে কোনো সুপ্ত কিংবা জীবন্ত আগ্নেয়গিরি নেই।
আন্দ্রে বলেন- নদীর পানি একটু ছুঁতেই বুঝলাম, এই নদীটি মৃত্যুর ফাঁদ। একটি মরা ব্যাঙকে চুবিয়ে দেখলাম, এক সেকেন্ডে সেদ্ধ হয়ে গেল। রুসো থার্মোমিটার নিয়ে মেপে দেখেছেন, এই পানির স্ফুটনাঙ্ক ৮৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একেবারে ফুটন্ত না হলেও তার একেবারে কাছাকাছি তাপমাত্রার। ফলে এটি কোনও রূপকথা নয়। তিনি জানান, নদীর কাছাকাছি এলাকায় যথেষ্ট গাছ কাটা হচ্ছে। উপজাতিরা চাষের জন্য জমি তৈরি করছেন। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
তবে আমাজনের মাঝে কিভাবে হঠাৎ করে এমন একটি ফুটন্ত নদী এলো তা এখনও খুঁজে বের করা যায়নি। গত পাঁচ বছর ধরে এই এলাকায় থেকে নদীটি নিয়ে যাবতীয় গবেষণা চালিয়েছেন রুসো। তা থেকেই রহস্যের সমাধান বের করা হচ্ছে। গবেষণায় রুসো দেখেছেন বৃষ্টির মতো একটি ঝর্ণার পানি এই নদীতে পড়ে প্রবাহিত হচ্ছে উল্টো দিকে। তাতেই প্রকাণ্ড এক জলবিদ্যুৎ তৈরির মতো করে পৃথিবীর ভূ-তাপীয় শক্তিতে গরম হয়ে উঠছে পানি। এমন প্রাকৃতিক কাণ্ড আর কোথাও মেলেনি এখনও।আপাতত মনে করা হচ্ছে, মূলত উষ্ণ প্রস্রবণের ফলেই এই পানি এতটা গরম হয়ে গিয়েছে। কারণ ভূপৃষ্ঠের বুকে শিরার মতো প্রচুর ফল্ট লাইন রয়েছে। তার মধ্যে গরম পানি ভর্তি। এগুলো ভূপৃষ্ঠের সংস্পর্শে এলে ভূ-তাপ নির্গত হয় এবং ওপরের পানি উষ্ণ হয়ে প্রস্রবণ সৃষ্টি হয়।
বর্তমানে নদীতে রক্ষণাবেক্ষণ ও এর চারপাশের পরিবেশকে রক্ষা করা নিয়েই কাজ করে চলেছেন রুসো। এই ধরনের নদী বা জলাশয় পৃথিবীতে আর একটিও নেই দাবি করেছেন ভূবিজ্ঞানী রুসো। এই ফুটন্ত নদীকে বাঁচাতে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান রুসো। নইলে অচিরেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে মায়ানতুইয়াসু।

SHARE

Leave a Reply