Home গল্প তোমাদের গল্প ঈদ আনন্দ -জাকারিয়া আল হোসাইন

ঈদ আনন্দ -জাকারিয়া আল হোসাইন

খালিদ ঢাকার একটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। ও পড়াশোনা করে নিয়মিত। ছাত্র হিসেবে অনেক ভালো এবং মেধাবী। পড়াশোনার পাশাপাশি আবৃত্তি, ড্রয়িং ক্লাসও করতে হয় খালিদের। গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ খুব কম হয়। কারণ, ওর বাবা ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত আর মা চাকরি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তবে বছরে একবার ঢাকা শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে যায় ঈদের ছুটিতে। গ্রামের বাড়িতে থাকেন খালিদের দাদা আর দাদী। গত বছর খালিদ ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিল কিন্তু মন খারাপ করে চলেও এসেছিল। মন খারাপ হয়ে চলে আসার কারণ আছে। খালিদ ছাড়া আর অন্য কেউ জানে না। এ বছরও গ্রামের বাড়িতে যাবে খালিদ।
শুক্রবার সকালবেলা। মা-বাবার সঙ্গে খালিদ খেতে বসেছে। ওর বাবা হাত দিয়ে রুটি ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলল, ‘খালিদ, ঈদের তো আর বেশি দিন নেই। শপিং করতে হবে। বলো, এবার ঈদে তুমি কী কী নেবে?’
খালিদ রুটির কিছু অংশ মুখের ভেতর না দিয়ে প্লেটে রেখে বলল, ‘বাবা, এবার ঈদে আমি আমার জন্য কিছুই চাই না।’
‘কেন, তোমার মা কি কিছু বলেছে?’
‘না, মা কিছু বলেনি। আমি নিজের জন্য শপিং করব না, অন্যদের জন্য ঈদের শপিং করলে কেমন হয়, বাবা?’
খালিদের মা বলল, নিজের বাজেটের টাকা দিয়ে কাদের জন্য ঈদের কেনাকাটা করতে চাও?
মা-বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে খালিদ বলল, গত বছর ঈদের আগের দিন বিকেলে যখন আমরা মাইক্রোবাস নিয়ে গ্রামে ঢুকলাম তখন তোমরা কি লক্ষ করেছ, গাড়ির পেছনে অনেক ছেলে-মেয়ে খালি শরীরে ছুটছিল। বাড়ির গেটে গাড়ি থামার পর আমি ওদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমাদের শরীরে ঈদের নতুন পোশাক নেই কেন? ওরা কেউ কেউ বলেছিল, আমাদের বাবা-মা নতুন পোশাক কিনে দিতে পারেনি। পরবে কোত্থেকে। ওদের কথা শুনে আমার মন ভীষণ খারাপ হয়েছিল। মনে হয়েছিল আমার পোশাকগুলো দিয়ে দেই কিন্তু দিতে পারিনি। কারণ ওরা সংখ্যায় ছিল অনেক। এবার ঈদে ওদের জন্য কিছু একটা করতে চাই, যদি তোমরা আমাকে সহযোগিতা করো। আমি গত বছর থেকেই পরিকল্পনা করে রেখেছি। তোমাদের এতদিন বলিনি। যদি তোমরা রাজি না হও, সে জন্য বলিনি। তবে, যদি তোমরা টাকা না দাও, তবু আমি এবার ঈদে ওদের শরীরে নতুন পোশাক পরাবই।
আমি টিফিনের টাকা বাঁচিয়েছি। বিভিন্নভাবে এত দিনে অনেক টাকা সংগ্রহ করেছি।
খালিদের বাবা-মা তাদের সন্তানের মুখে এমন প্রতিভাবান কথা শুনে যেমন হতবাক হলেন ঠিক তেমনি খুশিও হলেন।
ওর বাবা বলল, আমিও ভেবেছিলাম গ্রামের এমন অসহায় মানুষদের জন্য কিছু একটা করতে। আজ তুমি সে বিষয়টা আমাকে স্মরণ করে দিলে। তোমার দাদুকে এক্ষুনি মোবাইল করে বিষয়টা বলো, কতজন ছেলেমেয়ের জন্য নতুন পোশাক নিয়ে যেতে হবে?
খালিদের মা মোবাইলটা এগিয়ে দিল। ও দাদুর নাম্বারটা বের করে মোবাইলের সবুজ বাটন চাপল। ওপাশ থেকে দাদু কল রিসিভ করলো। সালাম দিয়ে দাদুর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল খালিদ।
ও জানতে পারল, ৩০ জনের জন্য নিয়ে গেলেই হবে। তার বেশি হলে আরও ভালো হয়। কারণ, কেউ যেন পোশাক নিতে এসে খালি হাতে ফেরত না যায়।
খালিদের বাবা টিস্যু দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে করতে বলল, তুমি নিয়ে যাবে শিশু-কিশোরদের জন্য আর আমিও নতুন পোশাক নিয়ে যাবো বৃদ্ধাদের জন্য। এক্ষুনি চলো, নিউমার্কেটে গিয়ে কেনাকাটা করে আসি।
কাজের বুয়া ড্রাইভারকে বলতে গেল গাড়ি বের করতে।
খাওয়া শেষ। খাবার টেবিল থেকে উঠল খালিদ। মা-বাবাকে সঙ্গে করে গাড়ি নিয়ে নিউমার্কেটে গেল সে। বিভিন্ন রকমের জামাকাপড় কিনে নিয়ে এলো বাসায়।
ঈদের ঠিক দু’দিন আগে খালিদ তার বাবা-মার সঙ্গে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলো। কারণ, ঢাকা থেকে তাদের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছতে সময় লাগে প্রায় দেড় থেকে দু’দিন। গত বছরের মত ঈদের আগের দিন ঠিক বিকেলে তাদের মাইক্রোবাস ঢুকল মেইন রোড থেকে গ্রামের রাস্তায়। কিছু দূর পরেই তাদের বাড়ি। এই তো মাত্র দশ থেকে পনেরো মিনিট লাগবে। ওদের গাড়িটা গ্রামে ঢুকতেই অনেক ছেলেমেয়ে গাড়ির পেছনে ছুটতে লাগল। গাড়িটা ওদের বাড়িতে পৌঁছামাত্র এলাকার ছেলেমেয়েরা ঘিরে ধরল। ওরা গাড়ি থেকে নামল। খালিদ দেখে, দাদু চেয়ারে বসে আছেন। দাদুকে দেখামাত্র খালিদ এগিয়ে গেল, দাদুকে লম্বা সালাম দিয়ে কোলাকুলি করল।
তারপর দাদুকে সঙ্গে করে গ্রামের যে ছেলেমেয়েরা ঈদ উপলক্ষে নতুন জামাকাপড় কিনতে পারেনি, তাদের দাঁড়াতে বলল। সবাই নতুন কাপড় পাওয়ার আশায় লাইন ধরল। খালিদ আর ওর দাদু ওদের হাতে নতুন কাপড় তুলে দিতে লাগল। সবাই নতুন জামাকাপড় পেয়ে মহাখুশি। খালিদ ওদের সবাইকে নতুন পোশাক পরতে বলল। সবাই পরল। নতুন পোশাকে ওদের সাথে অনেক সেলফি তুলল খালিদ। ওদের হাসিমাখা মুখ দেখে ঈদের আনন্দ দ্বিগুণ বেড়ে গেল খালিদের।

SHARE

Leave a Reply