Home দেশ-মহাদেশ আফ্রিকার বৃহত্তম দেশ আলজেরিয়া -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

আফ্রিকার বৃহত্তম দেশ আলজেরিয়া -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

আলজেরিয়া উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকায় ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। সরকারি নাম জন গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র আলজেরিয়া। এটি বিশ্বের দশম বৃহত্তম এবং আফ্রিকা ইউনিয়ন ও আরব অঞ্চলের বৃহত্তম দেশ। দেশটির নয়-দশমাংশ জুড়ে সাহারা মরুভূমি অবস্থিত। ভূমধ্যসাগরের তীরে উপকূলীয় সমভূমি রয়েছে। আলজেরিয়ার প্রায় সব মানুষ দেশটির উত্তরাঞ্চলে উপকূলের কাছে বাস করে। ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত আলজিয়ার্স দেশটির রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। আন্নাবা, কনস্টানটাইন ও ওরান এদেশের অন্যতম তিনটি বড় শহর। আলজেরিয়ার আরবি নাম আলজাজাইর।
আলজেরিয়ার আয়তন ২৩ লাখ ৮১ হাজার ৭৪১ বর্গকিলোমিটার (৯ লাখ ১৯ হাজার ৫৯৫ বর্গমাইল)। জনসংখ্যা ৪ কোটি ৩০ লাখ। আলজেরিয়ার বেশির ভাগ মানুষ আরব, বারবার কিংবা এই দুইয়ের মিশ্রণ। বারবারেরা প্রথম উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকায় বসতি স্থাপন করে। সপ্তম শতকের শেষভাগে আরব মুসলিমরা উত্তর আফ্রিকা জয় করে এবং ইসলাম ও আরবি ভাষার প্রচলন করে। বর্তমানে আলজেরিয়ার প্রায় সবাই মুসলিম ও আরবিভাষী। আলজেরিয়ায় ফরাসি ভাষাও বহুল প্রচলিত।
আলজেরিয়ায় একক আধা-প্রেসিডেন্সিয়াল সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত। বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদেল মাজিদ তেববাউন এবং প্রধানমন্ত্রী আবদেল আজিজ দিয়েরাদ। এ দেশের পার্লামেন্ট দ্বিকক্ষবিশিষ্ট : জাতীয় পরিষদ ও গণ জাতীয় সংসদ। আলজেরিয়ার প্রশাসনিক এলাকা ৪৮টি প্রদেশ (উইলাইয়াস), ৫৫৩টি জেলা (দাইরাস) এবং ১,৫৪১টি পৌরসভায় (বালাদিইয়াহস) বিভক্ত। প্রত্যেক প্রদেশ, জেলা এবং পৌরসভার নামকরণ তার প্রশাসন কেন্দ্র বা বৃহত্তম শহরের নামে করা হয়।
আলজেরিয়ার সীমান্তে রয়েছে উত্তর-পূর্বে তিউনিসিয়া, পূর্বে লিবিয়া, পশ্চিমে মরক্কো, দক্ষিণ-পশ্চিমে পশ্চিম সাহারা অঞ্চল, মৌরিতানিয়া ও মালি, দক্ষিণ-পূর্বে নাইজার এবং উত্তরে ভূমধ্যসাগর। আলজেরিয়া আফ্রিকার বৃহত্তম এবং বিশ্বের দশম বৃহত্তম রাষ্ট্র। দেশটিকে দুইটি সুস্পষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে ভাগ করা যায়। উত্তর প্রান্তে অবস্থিত অঞ্চলটি তেল নামে পরিচিত। এটি মূলত তেল অ্যাটলাস পর্বতমালা নিয়ে গঠিত, যা উপকূলীয় সমভূমিগুলোকে দক্ষিণের দ্বিতীয় অঞ্চলটি থেকে আলাদা করেছে। এখানকার আবহাওয়া ভূমধ্যসাগর দ্বারা প্রভাবিত। দক্ষিণের দ্বিতীয় অঞ্চলটি প্রায় সম্পূর্ণই মরুভূমি আবৃত। এই অঞ্চলটি আলজেরিয়ার আয়তনের সিংহভাগ গঠন করেছে। এটি মূলত গোটা উত্তর আফ্রিকা জুড়ে বিস্তৃত সাহারা মরুভূমির পশ্চিম অংশ।
আলজেরিয়ার ভূমিরূপের মূল গাঠনিক বৈশিষ্ট্যগুলো আফ্রিকান ও ইউরেশীয় ভূত্বকীয় পাতগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের ফলে ভূমধ্যসাগরীয় সীমারেখা বরাবর সৃষ্টি হয়েছে। ফলে দেশটি দুইটি ভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে বিভক্ত। উত্তরের তেল নামক অঞ্চলটিতে দেশের বেশির ভাগ নাগরিক বাস করে। এখানে দুইটি ভৌগোলিকভাবে নবীন স্তূপপর্বতমালা রয়েছে: তেল অ্যাটলাস পর্বতমালা এবং সাহারান অ্যাটলাস পর্বতমালা। এগুলো সমান্তরালভাবে পূর্ব-পশ্চিমে চলে গেছে এবং উচ্চ মালভূমি দ্বারা এরা নিজেদের থেকে বিচ্ছিন্ন। দক্ষিণের সাহারা মরুভূমি অঞ্চলটি একটি কঠিন, প্রাচীন, আনুভূমিক ও সুষম শিলাস্তরের ওপর অবস্থিত। বেশ কিছু মরূদ্যান ছাড়া এখানে তেমন কোনো জনবসতি নেই। তবে এখানে প্রচুর লুক্কায়িত খনিজ সম্পদ আছে, যার মধ্যে পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস অন্যতম।
ক্রমাগত বৃক্ষ ও উদ্ভিদ নিধন এবং ভূমিক্ষয়ের কারণে উর্বর বাদামি মাটিযুক্ত এলাকার আয়তন কমে গেছে। কেবল কিছু উচ্চভূমিতেই এরকম উর্বর মাটি দেখতে পাওয়া যায়; সেখানে এখনও চিরহরিৎ ওক অরণ্যের দেখা মেলে। উত্তর তেল পর্বতমালার অপেক্ষাকৃত নিচু অঞ্চলগুলোতে মূলত ভূমধ্যসাগরীয় লাল মাটি পাওয়া যায়। দক্ষিণের দিকে অগ্রসর হবার সাথে সাথে আর্দ্রতা ও মাটির পরিপক্বতা ক্রমাগত কমতে থাকে। এই অঞ্চলে আবহাওয়ার কারণে রাসায়নিক উপায়ে শিলাভাঙন ও জৈবিক বস্তুর সঞ্চয় খুবই কম। মরু অঞ্চলগুলোতে প্রায় সার্বক্ষণিক শক্তিশালী বায়ুপ্রবাহজনিত ভূমিক্ষয়ের কারণে মাটি সৃষ্টির প্রক্রিয়া আরও ব্যাহত হয়। ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সাহারা মরুভূমির উত্তরমুখী দখল ঠেকানোর জন্য একটি সবুজ প্রতিবন্ধক বলয় তৈরির একটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প শুরু হয়েছিল। প্রকল্পটিতে প্রায় ২০ কিলোমিটার প্রশস্ত এবং প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ফিতাসদৃশ ভূমিকে বনে রূপান্তরিত করার কথা ছিল। প্রকল্পটি আংশিকভাবে সফল হয়। ১৯৮০-এর দশকের মধ্যভাগে আরো প্রায় ৩৬০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা বনায়ন করার প্রকল্প হাতে নেয়া হয়।
আলজেরিয়ায় সারা বছর দিনের মধ্যভাগে গরম মরু তাপমাত্রা বিরাজ করে। তবে, সূর্যাস্তের পর পরিষ্কার, শুষ্ক বাতাস বয়ে যায়, এতে তাপমাত্রা হ্রাস পায় এবং রাতে ঠাণ্ডা থেকে শীতার্ত আবহাওয়া তৈরি হয়। দৈনন্দিন তাপমাত্রার ওঠানামা ব্যাপক। তেল এটলাসের উপকূলীয় অংশে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। এখানে বছরে ৪০০ থেকে ৬৭০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়। তবে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়ছে। পূর্ব আলজেরিয়ার উত্তর অংশে সবচেয়ে ভারী বৃষ্টিপাত হয়। এখানে কোনো কোনো বছর বৃষ্টিপাত ১০০০ মিলিমিটার (৩৯.৪ ইঞ্চি) পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়। আরো অভ্যন্তর ভাগে বৃষ্টিপাত কম। এসব অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে ভারী ও দমকা বাতাস বয় এবং তাপমাত্রা ৪৩.৩ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠে যায়।
১৯৬২ সালের আগে আলজেরিয়া বহু সা¤্রাজ্য এবং রাজবংশ শাসিত অঞ্চলের যেমন, নুমিডিয়ান, ফিনিসিয়ান, কারথাজিনিয়ান, রোমান, ভ্যানডাল, বাইজানটাইন, উমাইয়া, আব্বাসীয়, ইদ্রিসীয়, আঘলাবীয়, রুস্তমীয়, ফাতিমীয়, জিরীয়, হাম্মাদীয়, আলমোরাভীয়, আলমোহদীয়, স্পেনিয়ার্ড, উসমানীয় এবং পরিশেষে ফরাসি ঔপনিবেশিক সা¤্রাজ্যের অংশ ছিল।
আলজেরিয়া একটি আঞ্চলিক ও মধ্যম শক্তি এবং বহুলাংশে জ্বালানি রফতানির ভিত্তিতে আফ্রিকার অন্যতম বৃহত্তম অর্থনীতি। আলজেরিয়ায় বিশ্বের ১৬তম বৃহত্তম এবং আফ্রিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম তেলের মজুদ রয়েছে। এদেশে নবম বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ রয়েছে। দেশটির জাতীয় তেল কোম্পানি সোনাট্রাচ আফ্রিকার মধ্যে বৃহত্তম এবং এই কোম্পানিটি ইউরোপে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করে থাকে। আলজেরিয়া আফ্রিকান ইউনিয়ন, আরব লিগ, ওপেক, জাতিসংঘ এবং আরব মাগরেব ইউনিয়নের সদস্য।
আলজেরিয়া ১৯শ শতকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভের আগ পর্যন্ত ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল। আট বছর ধরে সংঘটিত স্বাধীনতা যুদ্ধে দেশটির অশেষ ক্ষতিসাধন হয় এবং এখান থেকে বহু ইউরোপীয় চলে যায়।
স্বাধীনতার সময়ে আলজেরিয়ার অর্থনীতি ছিল অনুন্নত ও কৃষিনির্ভর, তবে বর্তমানে আলজেরিয়া আফ্রিকার ধনী দেশগুলোর মধ্যে একটি এবং এর অন্যতম কারণ পেট্রোলিয়ামের রফতানি। এদেশের মুদ্রার নাম দিনার।
আলজেরিয়ার রাষ্ট্রপতি আলজেরিয়ার সামরিক বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক। এদেশের সামরিক বাহিনী উত্তর আফ্রিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম, যার আগে রয়েছে মিসর।
১৯৯০ সালে আরবি ভাষাকে সরকারিভাবে আলজেরিয়ার জাতীয় ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সিংহভাগ আলজেরীয় মানুষ প্রচলিত কথ্য আরবি ভাষার একাধিক উপভাষাগুলোর কোনও একটিতে কথা বলে। মরক্কো ও তিউনিসিয়ার যে অঞ্চলগুলো আলজেরিয়ার সীমানার কাছে অবস্থিত সেখানকার উপভাষাগুলোর সাথে এই উপভাষাগুলোর মোটামুটি মিল আছে। বিদ্যালয়গুলোতে আধুনিক আদর্শ বা প্রমিত আরবি ভাষা শেখানো হয়। আলজেরিয়ার ইমাজিগেন নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা আমাজিগ ভাষার বিভিন্ন ভৌগোলিক উপভাষায় কথা বলে, তবে এদের বেশির ভাগই আরবি ভাষায়ও সমানভাবে কথা বলতে পারে।
স্বাধীনতার পর থেকেই আলজেরিয়ার সরকারের নীতি ছিল ‘আরবীকরণ’, অর্থাৎ স্থানীয় আরবি ভাষাকে উৎসাহিত করা এবং ইসলামী সাংস্কৃতিক মূল্যবোধগুলো সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া। এর ফলে জাতীয় ভাষামাধ্যম হিসেবে আরবি ভাষা ফরাসি ভাষাকে প্রতিস্থাপিত করেছে। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষাদানের মূল ভাষা হিসেবে এখন আরবি ব্যবহার করা হয়। ২০০২ সালে আমিজাগ ভাষাকে জাতীয় ভাষা এবং ২০১৬ সালে এটিকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়।
আলজেরীয় জনপ্রিয় খাবার সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। এই দেশটিকে একসময় ‘রোমের শস্যভাণ্ডার’ হিসেবেও গণ্য করা হতো। এদেশে অঞ্চল ও মওসুম ভেদে বেশ কয়েক রকমের খাবারের প্রচলন আছে। আলজেরীয় জনপ্রিয় খাবারে প্রধান উপাদান হিসেবে শস্যদানা থাকবেই। এদেশে শস্যদানা প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হয়। এখানকার সুস্বাদু খাবার মাছ, গোশত ও সবজি সহকারে তৈরি করা হয়। আলজেরিয়ায় যেসব জনপ্রিয় খাবার খাওয়া হয় সেগুলো হলো কাউসকাউস, চরবা, রেচতা, চাখচাওখা, বারকাউসে, শাকশুকা, এমথিউয়েম, চতিথা, এমডারবেল, দোলমা, ব্রিক, গারানতিতা ও ইহামহলাউ। এর সাথে মারগুয়েজ নামক সসেজ ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। অঞ্চল ও মসলা ব্যবহার সাপেক্ষে এগুলোর স্বাদ ভিন্ন হয়।
আলজেরিয়ায় নানা রকম খেলাধুলা হয়ে থাকে। অলিম্পিক গেমসে এদেশের সাফল্য অনেক। তবে ফুটবল এদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। আলজেরিয়ার জাতীয় ফুটবল দল ১৯৮২, ১৯৮৬, ২০১০ ও ২০১৪ সালের ফিফা বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। এই খেলার ইতিহাসে আলজেরিয়ার যে কয়েকজনের নাম খচিত আছে তারা হলেন লাখদার বেলাউমি, রশিদ মেখলাউফি, হাসেন লালমাস, রাবাহ মাদজের, সালাহ আসাদ ও জিনেদিন জিদান।

SHARE

Leave a Reply