Home সায়েন্স ফিকশন মঙ্গলে অমঙ্গল -ইশরাত জাহান জাইফা

মঙ্গলে অমঙ্গল -ইশরাত জাহান জাইফা

সদ্য মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। হাতে অফুরন্ত সময়। এ সময় দূরে কোথাও বেড়িয়ে আসা যায়। অবশ্য দূরেই যেতে হবে তা নয়, কাছে পিঠেও দেখার মতো অনেক কিছুই আছে। তারপরও এটা যেহেতু লম্বা ছুটি, চাইলে ভ্রমণ লিস্টের দূরের জায়গাগুলো দেখে আসা যায়। বান্ধবী নূপুর ফোন করে জানাল, তারা সাজেক ভ্যালি যাওয়ার প্ল্যান করছে, আমি যেতে চাই কি না জানতে চাইল। আমি তো শুনেই লাফিয়ে উঠলাম। ওয়াও! সাজেক? আমি তো যাবোই। আমার কত দিন ধরে সাজেক ভ্যালি যাওয়ার ইচ্ছা।
ঠিক হলো ৯ তারিখ, শুক্রবার আমরা ঢাকা থেকে যাত্রা করব।
এক সপ্তাহ আগে থেকেই দিন গোনা শুরু করে দিলাম, কখন ৯ তারিখ আসবে! কখন ৯ তারিখ আসবে!
আট তারিখ আসার পর আমার আনন্দ আর ধরে না। অপেক্ষার পালা শেষ। আজকের দিনটাই বাকি শুধু।
রাতে তো আমার ঘুমই আসছিলো না। ফেসবুক ফ্রেন্ডদের সাজেক ভ্রমণের পোস্টগুলো পড়ে সময় কাটাচ্ছিলাম।
হঠাৎ আমার মোবাইলে টুং করে একটা শব্দ হলো। একটা ভিমেইল এসেছে। ইমেইল নয়, জিমেইল নয়, ভিমেইল। ভিনগ্রহ থেকে বার্তা আসে বলে আমি এটার নাম দিয়েছি ভিমেইল। জুপিটারের রাজা আমাকে একটা লিংক দিয়েছিল, যে লিংকের মাধ্যমে আমি ভিনগ্রহের সাথে যোগাযোগ করতে পারব।
মোবাইলে ভিমেইলের লিংক ওপেন হয় না, তাই কম্পিউটারে লিংকটা ওপেন করলাম।
হ্যাঁ। জুপিটারের রাজপরিবার থেকেই বার্তা এসেছে।
আমার সাথে যে অন্য গ্রহের যোগাযোগ আছে, ইতোমধ্যে আমি একটা গ্রহ ভ্রমণ করে এসেছি সেটা কাউকে জানাইনি। আমি চাইনি মানুষ আমাকে নিয়ে মাতামাতি করুক। আগে আমি পড়াশোনা শেষ করি, তারপর এই ব্যাপারটা দেখা যাবে।
ভিমেইল পড়ে আমি চমকে উঠলাম। আমাকে ডেকেছেন জুপিটারের রাজা। তাও জুপিটারে নয়, মঙ্গলে। আমি কখনো মঙ্গলে যাইনি। রাজা আমায় কেন ডাকলেন সেখানে?
তবে জরুরি প্রয়োজন সেটা তো বুঝতেই পারছি, নইলে রাজা বার্তা পাঠাতেন না। কিন্তু তারিখটা আজই। আজ রাতেই আমাকে যেতে হবে। কিন্তু কাল যে আমাদের বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান, সেটার কী হবে? এতদিন উৎসাহ দেখিয়ে শেষে যদি আমিই যাব না বলি, তাহলে সেটা কেন মেনে নেবে আমার বন্ধুরা?
কিন্তু আমারও কিছু করার নেই। বেঁচে থাকলে সাজেক যাওয়ার অনেক সময় সুযোগ পাব। মঙ্গলগ্রহ ভ্রমণের সুযোগ আর কখনো নাও পেতে পারি। জুপিটার রাজার আমন্ত্রণ হেলাফেলা করার মতো নয়।
নূপুরকে একটা টেক্সট পাঠালাম, আমি যেতে পারব না, তারা যেন যায়। বাকি কয়েকজনকেও মেসেজ দিয়ে রাখলাম। এত রাতে ফোন করা ঠিক হবে না।
সকালে উঠে আমার টেক্সট পড়ে তারা কি ভাববে জানি না।
গতবারের মতোই ছাদে এসে দাঁড়ালাম। আকাশে গোলগাল চাঁদ। এমন চাঁদ দেখেই হয়ত সুকান্ত ভট্টাচার্য্য লিখেছিলেন,
‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।’
এত সুন্দর জোছনার আলো। জানি না আর কত সুন্দর হলে তাকে সিদ্ধার্থের সেই গৃহত্যাগী জোছনা বলা যায়!
কিছুক্ষণ পর আমার পরিচিত মহাকাশযান টিটি এলো আমাদের ছাদে। কিছু ভয়, কিছু শঙ্কা আর অনেক রোমাঞ্চ নিয়ে মহাকাশযানে উঠে বসলাম। মনে মনে বললাম, প্রভু, আমার মঙ্গল ভ্রমণ যেন মঙ্গলময় হয়।
টিটি আমাকে নিয়ে ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে লাগলো। জানালার পাশেই বসেছিলাম। নিচে তাকিয়ে দেখলাম, আমার শহরের আলো দেখা যাচ্ছে। কী সুন্দর লাগছে দেখতে। আরেকটু ওপরে উঠার পর জানালা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেলো। আর নিচে তাকানোর অনুমতি নেই।
আমাকে নিয়ে টিটি যখন মঙ্গলে অবতরণ করল, তখন দিনের মতো পরিষ্কার আলো। সূর্যকিরণের মতো আমার দু’চোখ ঝিলিক দিয়ে উঠলো। আমি মঙ্গলে এসে গেছি! এই সেই মঙ্গল, যেখানে আসার জন্য বিজ্ঞানীরা কত চেষ্টা-সাধনা করে যাচ্ছেন। অথচ আমি অনায়াসে দিব্যি মহাকাশযানে চড়ে গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে চলে এসেছি।
টিটি আমাকে যেখানে নামিয়ে দিয়েছে, এই জায়গাটা দেখতে মরুভূমির মতো। কিন্তু মরুভূমি নয়। আশপাশে কেউ নেই। যতদূর দৃষ্টি যায় সীমাহীন শূন্যতাই চোখে পড়ে। এই কি মঙ্গল? রাজা আমাকে কেন ডেকেছেন এখানে? কাউকে তো দেখছি না।
‘ওয়েলকাম সানি!’ হঠাৎ একটা ভারী কণ্ঠের আওয়াজ শুনে ডান দিকে তাকালাম। আরে! আমার পাশে তো একটা বড় টিটি এসে দাঁড়িয়েছে। মানুষের মতো দেখতে একজন বেরিয়ে এলো। আমার দিকে তাকিয়ে বললো, মঙ্গলে তোমাকে স্বাগত, সানি।
– ধন্যবাদ, কিন্তু আপনি আমার নাম…
– জেনেছি। রাজা জিউ (জুপিটারের রাজা) তোমার নাম বলেছিলেন। জুপিটার থেকে তো ঘুরে এসেছো শুনেছি। ভাবলাম আমাদের গ্রহটাও তোমার দেখা হোক।
– আপনি কি মঙ্গলের রাজা?
– না আমি রাজার প্রতিনিধি। আমার নাম জিম।
– ওহ, তো আপনিই কি আমাকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন?
– না। বলেই টিটির দিকে ফিরল জিম। একটা দরজা খুলে গেলো। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন জুপিটারের রাজা জিউ, নিশি এবং আরও কয়জন।
– তুমি এসেছো তাহলে। ভালোই হলো। খুশি হলাম।
– আমারও ভালো লাগছে যে আপনারা এসেছেন। কিন্তু আমাকে কেন ডেকেছেন সেটা বুঝতে পারছি না।
– একটু পরেই জানতে পারবে। নিশি বলল।
জিম আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, আমার সাথে এসো সবাই।
জিমের কথামতো আমরা তার সাথে চললাম। কিছুক্ষণ পর আমরা একটা বড় হলরুমে এসে পৌঁছলাম। দূর থেকে এটা দেখিনি আমি। সবাই গোল হয়ে বসে আছে। শান্ত চুপচাপ। কেউ কোনো শব্দ করছে না। অধীর আগ্রহে সবার সাথে আমিও অপেক্ষা করছি কিছু একটার জন্য। কিন্তু কী সেটা আমি জানি না।
আমার চোখ বারবার জিমের দিকে চলে যাচ্ছে। একে দেখতে একদম মানুষের মতো। শুধু কথাবার্তাগুলো একটু অন্যরকম। গলার স্বরও আমাদের মতোই। নিশি বা রাজা জিউদের মতো নয়। কী জানি মঙ্গলের প্রাণীগুলো বোধ হয় এরকমই! কিন্তু জিম নামটা মাথায় ঘুরছে। জিম…জিম…হ্যাঁ! জিম নামে তো আমার এক আঙ্কেল আছেন। বারো বছর ধরে আমেরিকায় থাকেন। ধুর এসব কী ভাবছি! জিম আঙ্কেলের ছবি তো আমি দেখেছি। তিনি এখানে আসবেন কী করে?
হঠাৎ একটা সাইরেন বেজে উঠলো। অমনি পুরো হল ধোঁয়ায় ভরে গেলো। কিছু বুঝে উঠার আগেই আমার মাথা ঘুরতে শুরু করলো। বুঝতে পারলাম মেঝেতে পড়ে যাচ্ছি।
জ্ঞান ফিরলে দেখি আমি একটা ঘরের দেয়ালে পিঠ ঠেকে বসে আছি। আমার জ্ঞান ফিরেছে দেখে, মুখ ঢাকা দু’জন এলিয়েন এগিয়ে এলো। পরস্পর মুখ চাওয়া চাওয়ি করে মাথা নাড়লো। তারপর টেবিল থেকে একটা স্যুপের বাটি নিয়ে আমার হাতে দিলো। যন্ত্রের মতো করে বলল, ‘খেয়ে নাও।’
ক্ষিধে ছিল তাই খেয়ে নিলাম। খাওয়ার পর অনেক সতেজ লাগলো। বাটিটা রেখে দেয়ার পর দু’জন মুখের আবরণ সরাল। এরা আর কেউ নয়। জিউ আর নিশি। অদ্ভুত! তারা এভাবে মুখ ঢেখে ছিল কেন?
এটা বলার জন্য মুখ খুলতে যাব তখনই রাজা ধমকে উঠলো। ‘চুপ! একদম মুখ খোলার চেষ্টা করবে না।’
আমি অবাক হয়ে নিশির দিকে তাকালাম। দেখলাম সেও আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে আছে। চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে।
– তোমরা এমন করছো কেন?
– আরে? বলেছি না কোন কথা বলবি না?
– খুব শখ হয়েছিল না ভিনগ্রহ ভ্রমণের? নিশি ভয়ঙ্কর চোখে তাকিয়ে বলল।
বুঝলাম কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে। রাজা এবার চিৎকার করে বললেন,
আমরা আসতে বললাম, অমনি চলে এলি? হা হা হা কী ভেবেছিলি? আমরা তোকে সত্যি সত্যি বন্ধু বানিয়েছি? তোর মতো একটা মানুষের বাচ্চাকে বন্ধু বানাব আমরা?? হা হা হা
আমি বললাম, তোমরা এভাবে কথা বলছো কেন? আমি তো একবারও ভিনগ্রহে আসতে চাইনি। তোমরাই আমাকে জুপিটারে নিয়ে গিয়েছিলে। তারপর আবার এখানে ডাকলে।
– হ্যাঁ আমরাই ডেকেছি। তোর কী ধারণা, আমরা তোকে ভালোবেসে ডেকেছি? বোকা!
– আমরা তোকে নিজের স্বার্থেই ডেকেছি। হা হা হা।
দু’জনের হাসির শব্দে আমার কানে তালা লেগে যাচ্ছে। দু’হাতে কান ঢেকে মনে মনে বললাম, আল্লাহ আমি তো বলেছিলাম, আমার মঙ্গলভ্রমণ যেন মঙ্গলময় হয়, এরকম হচ্ছে কেন?
– এই শোন! এসেই যখন পড়েছিস, কী আর করবি? থাকবি এখানে। পৃথিবীতে আর ফিরতে পারবি না।
নিশি মুখ বাঁকিয়ে বলল।
আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘জুপিটারে যখন গিয়েছিলাম তখন তোমরা এমন ব্যবহার করোনি। হঠাৎ পাল্টে গেলে।’
-ওটা ফাঁদ ছিলো, ফাঁদ। বুঝলি? তখন যদি ভালো ব্যবহার না করতাম, তাহলে কি আজ আমাদের কথায় চলে আসতি? তোর মস্তিষ্ক আমরা হ্যাক করেছি। চাইলেও আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারবি না।
– যথেষ্ট হয়েছে! চিৎকার করে বললাম আমি। তোমরা যা বলবে তাই আমি মেনে নেব, এটা হয় না। পৃথিবীতে আমি ফিরে যাবই। তোমাদের মতো বিশ্বাসঘাতকদের হাতে বলি হবো না আমি। ভুলে যেও না, আমি মানুষ। সৃষ্টিকর্তার দৃষ্টিতে আমরাই সৃষ্টির সেরা। আর সেটা এমনি এমনি নয়। মানবীয় গুণ ও বিশ্বাসের কাছে এখনো তোমরা পরাজিত হতে বাধ্য।
– খবরদার! সৃষ্টিকর্তাকে এখানে জড়াবে না। এটা তোর আর আমাদের ঝামেলা।
– আমি কোন ঝামেলা সৃষ্টি করিনি। তোমরাই করছো।
– অনেক হয়েছে নিশি। নিয়ে যাও ওকে।
নিশি আমাকে জোর করে একটা ঘরে টেনে নিয়ে গেলো। তারপর বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে চলে গেলো। ভেতরে ঘুটঘুটে আঁধার। কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না প্রথমে। পরে একটু পরিষ্কার হলো।
হাত-পা অন্তত দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এখানেই কি আমাকে বন্দী থাকতে হবে? কেন এসেছিলাম পৃথিবী ছেড়ে? কেন এদের বিশ্বাস করেছিলাম? এখন কি এই ভিনগ্রহেই প্রাণ খোয়াতে হবে?
নিশি, নিশি! আমি তোমাকে সত্যিকারের বন্ধু ভেবেছিলাম। তুমি কী করে এটা করলে? আমি তোমার কথা বিশ্বাস করে পৃথিবী পর্যন্ত ছেড়েছি। তুমি বলেছিলে তোমার একজন মানুষবন্ধু চাই। কে জানত তুমি প্রতারণা করবে? এটা যদি দুঃস্বপ্ন হতো! ঘুম ভাঙলে যদি দেখতাম আমি বাড়িতেই আছি। কালকে আমাদের সাজেক যাওয়ার প্ল্যান ছিলো। আমারই ভুল হয়েছে। যে জায়গায় অনেক মানুষ শত চেষ্টা করেও আসতে পারে না, সেখানে আমি বিনা পরিশ্রমেই চলে এলাম। এ জন্যই বলা হয়, খুব সহজে কিছু পাওয়া ভালো না। জীবনটা ম্যাজিক না।
নিজের বোকামির জন্য নিজেকেই ভুগতে হচ্ছে। এখন এই অন্ধকার ঘরে বসে থাকা ছাড়া কিছু করার নেই।
বদ্ধঘরে বসে নিজেকে দোষারোপ করে যাচ্ছি- এমন সময় খট করে শব্দ হলো। একটা দরজা খুলে গেলো। ভেতরে প্রবেশ করলেন জিম। ঘরে আলো জ্বাললেন। সেই সাথে আমার মনেও আশার আলো জ্বলে উঠলো। জিম কি তবে আমায় ছেড়ে দেবে? পৃথিবীতে পৌঁছে দেবে? আগেই মনে হয়েছিল জিম মানুষের মতো। সে কখনো ওই দানবগুলোর মতো নয়।
‘সানি।’
-‘হ্যাঁ।’ এখানে এসে এই একজনের মুখেই নিজের নাম শুনেছি।
– ‘তোমার সাথে কথা আছে। আমার সাথে এসো।’ বলেই জিম বেরিয়ে গেলো। আমিও বাইরে এলাম। এতক্ষণে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম যেন। ওই ঘরে আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল।
উঠোনের মতো একটা জায়গায় এসে বসল জিম। আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
– ‘তুমি কি জানো, তোমার এ অবস্থার জন্য দায়ী কে?’
– ‘আর কে! জিউ আর নিশিই তো প্রতারণা করল আমার সাথে।’
– ‘না।’
‘না? তাহলে?’
– ‘তোমাকে মঙ্গলে নিয়ে আসা, আঁধার ঘরে আটকে রাখা, পৃথিবীতে যেতে না দেয়া এসবের জন্য আমি দায়ী।’
– ‘আপনি?’
– ‘হ্যাঁ আমি। অবাক হচ্ছো? অবাক হওয়ার এখনো অনেক কিছু বাকি। তুমি জানো আমি কে?’ আমার উত্তর এর অপেক্ষা না করে আবার বলতে শুরু করলেন, ‘আমি তোমার বাবার চাচাতো ভাই। তোমার জিম আঙ্কেল।’
-‘জিম আঙ্কেল? তার মানে আমি ঠিক সন্দেহ করেছিলাম! কিন্তু আমার সন্দেহকে গুরুত্ব দিইনি। আপনি এখানে এলেন কী করে? ওই দানবগুলো আপনাকেও নিয়ে এসেছে?’
-‘না। আমি নিজেই এসেছি।’ মৃদু হেসে বললেন জিম আঙ্কেল। এতক্ষণ যাদেরকে জিউ আর নিশি ভেবেছো আদতে ওরা জিউ বা নিশি না। ওরা আমার তৈরি বিশেষ রোবট। জিউ আর নিশির কিছু প্রোগ্রাম তাদের মধ্যে সেট করে দিয়েছি। তারা আমার নির্দেশ অনুযায়ীই কাজ করেছে। আসল জিউ আর নিশি তো জুপিটারে। তারা জানেই না যে তাদের বন্ধু বিপদে আছে।’
-‘আহ! হতাশ হয়ে বসে পড়লাম আমি। অথচ আমি তাদের সম্পর্কে কত খারাপ ধারণা করে ফেলেছি!’ আপনি কেন আমাকে এখানে নিয়ে এলেন? কেন রাজার নাম করে বার্তা পাঠিয়েছিলেন?
– প্রতিশোধ নিতে।
– প্রতিশোধ? আমার ওপর আপনি কিসের প্রতিশোধ নিতে চাইছেন?
– তোমার বাবার জন্য আমি কখনও ক্লাসে ফার্স্ট হতে পারতাম না। টিচাররাও তোমার বাবাকেই বেশি স্নেহ করতেন। যেন সে হিরো, আমি ভিলেন। খুব রাগ হতো আমার। কলেজেও তোমার বাবার জন্য সুবিধা করতে পারিনি আমি।
– আপনি এই কারণে আমার ওপর প্রতিশোধ নিতে চাইছেন? ব্যক্তিগত আক্রোশ আপনি মহাকাশ অবধি টেনে আনলেন আঙ্কেল?
হা হা। তোমার কী মনে হয়, তোমার বাবার ওপর আক্রোশের জন্যই তোমাকে মঙ্গলে এনেছি? এখন তোমাকে আটকে রেখে তোমার বাবার কাছে মুক্তিপণ চাইব? না সানি, মাই ডটার। কেসটা ভিন্ন। তোমার বাবার ওপর আমার এখন কোন রাগ-ক্ষোভ নেই। ওসব তো বাচ্চাকালের ঘটনা। আমার রাগ তো তোমার ওপর।
– আমার ওপর?
– হ্যাঁ তোমার ওপর। তুমি হয়ত জানো, আমি বারো বছর ধরে আমেরিকা থাকি। কিন্তু এটা জানো না, আমি একজন বিজ্ঞানী। মহাকাশ নিয়ে গবেষণা করি। সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহ নিয়ে আমার কৌতূহল ব্যাপক। বার বছরের চেষ্টা সাধনার ফলে আমি মঙ্গলে আসতে পেরেছি। শুধু আসিনি। মঙ্গলের ওপর আধিপত্য লাভে সক্ষম হয়েছি। এই গ্রহের প্রাণীগুলো এখন আমার কথা শুনে চলতে বাধ্য। আমেরিকায় আমার রোবটের ব্যবসা ছিল। আমি রোবট বানিয়ে বিক্রি করতাম। সে যাই হোক, আগে আমি ভাবতাম মঙ্গল সবচেয়ে শক্তিশালী গ্রহ। কিন্তু না। এখানে এসে বুঝতে পারি জুপিটার সব থেকে শক্তিশালী গ্রহ। প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর একটি গ্রহ। পৃথিবীর মানুষের বসবাসের জন্য সবচেয়ে উপযোগী গ্রহ। তাই জুপিটারের প্রতি আমার আকর্ষণ ছিলো। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও আমি জুপিটারে যেতে পারিনি। সেদিন শুনলাম এক মানুষ এসেছে জুপিটারে। তাও নাকি রাজা জিউর আমন্ত্রণে। শুনে আমি আহত হলাম। চেয়েছিলাম আমিই হব জুপিটারে পা রাখা প্রথম মানুষ। তার আগেই কেউ এসে গেলো?
এই পর্যন্ত বলে একটু থামলো জিম। আবার শুরু করল,
অনেক কষ্টে সেই মানুষের ছবি আনালাম। যেটা তোমার ছিল। কিন্তু আমি চিনতে পারিনি। বারো বছর আগে দেখেছি তোমাকে, বেশ ছোট ছিলে তখন। তারপর তোমার পরিচয় বের করলাম। তখন আমার পুরনো রাগ আবার ফিরে এলো। যার জন্য আমি ক্লাসে ফার্স্ট হতে পারিনি, শিক্ষকদের উপচে পড়া স্নেহ পাইনি, আজ তার মেয়েও আমাকে হারিয়ে দিলো? এতদিন চেষ্টা করে যেটা আমি পাইনি সেটা সে অনায়াসে পেয়ে গেলো? এটা তো আমি মেনে নিতে পারি না।
– আঙ্কেল, আমি তো আপনাকে হারাবার জন্য কিছু করিনি। আমি তো জানতামই না আপনি জুপিটারে যেতে চান। এতক্ষণে মুখ খুললাম আমি।
-ওরা তোমায় কেন বেছে নিলো? কেন? কোন গুণটা দেখে ওরা তোমাকে জুপিটারের রাজকীয় অতিথি বানালো? আমার এতদিনের চেষ্টার কোন দাম দিলো না কেন? কেন আমিই হতে পারতাম না জুপিটারের বুকে পা রাখা প্রথম মানুষ, প্রথম বিজ্ঞানী?
– হয়ত আপনার উদ্দেশ্য তারা বুঝতে পেরেছিল। অর্থাৎ আপনি কিভাবে একটা গ্রহকে গ্রাস করছেন সেটা তারা জেনেছে তাই আপনাকে তাদের গ্রহে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। কে স্বেচ্ছায় বিপদ ডেকে আনে বলুন?
– থামো। আমার সাথে মজা করছো? তুমি জানো, একটু পর তোমার মৃত্যু হবে। এই গ্রহেই সমাধি হবে তোমার।- এই বলে উঠে দাঁড়ালো জিম আঙ্কেল। পকেট থেকে একটা পিস্তল বের করে আমার দিকে তাক করে ধরলো।
তোমার বাবা বলতো, আমার মাথায় ডিস্টার্ব আছে। কিন্তু সে এটা জানে না যে, জিম তার ডিস্টার্বওয়ালা মাথা নিয়ে মঙ্গল অবধি পৌঁছে গেছে এবং সেখানেই তার মেয়ের শেষকৃত্যের আয়োজন করবে সে। হা হা হা। অনেক কথাবার্তা হলো খুকি। এবার মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও। এক থেকে দশ পর্যন্ত গুনব আমি। তারপর শেষ তুমি। ওয়ান…টু…
নিজের সময় ফুরিয়ে এসেছে বুঝতে পারলাম। এই উন্মাদ বিজ্ঞানীর হাত থেকে বাঁচার আর কোন উপায় নেই। হায় মঙ্গল তুমি চোখ বুজে থাকো। তোমার বুকে অমঙ্গল ঘটানোর জন্য আমিই দুঃখিত। পৃথিবীকে ভুল বোঝো না।
টু…থ্রি…সেভেন..নাইন…গুনে যাচ্ছে আমার চাচা। চোখ বন্ধ করলাম আমি।
আঃ! শব্দ শুনে চোখ মেললাম আমি। জিম চাচা মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন, কাতরাচ্ছেন। জুপিটারের রাজা জিউ আর নিশি এসে গেছে। আমাকে জড়িয়ে ধরলো নিশি।
– আর কোন ভয় নেই, আমরা এসে গেছি। – রাজা বললো।
– ধন্যবাদ জানানোর ভাষা নেই আমার। কিন্তু আপনারা কিভাবে খবর পেলেন?
– সে অনেক কথা। এই জিমের ওপর নজর ছিল আমাদের। অনেকবার সে আমাদের গ্রহে হামলা চালানোর চেষ্টা করেছে। সেসব কথা পরে হবে। তোমার ওপর অনেক ধকল গেছে। চলো আমাদের সাথে। টিটিতে বিশ্রাম নেবে। জুপিটারে যাই আগে। তারপর তোমাকে পৃথিবীতে পাঠানোর ব্যবস্থা করব।- নিশি বললো।
জিম আঙ্কেল তখনো মাটিতে পড়ে ছিলেন। সেদিকে তাকিয়ে রাজা বললেন, একে পুরোপুরি শেষ করে দেয়া হোক।
– না! আমি চিৎকার করে উঠলাম। আমাকে ক্ষমা করবেন। এই মধ্যবয়সী লোকটা আমার চাচা। আপনাদের গ্রহে হামলার জন্য আমিই দায়ী। আমার ওপর রাগ করে চাচা এটা করেছে। সত্যিই তো, আমি এখন সাধারণ স্কুলছাত্রী হয়ে কী করে মহাকাশ ভ্রমণের যোগ্যতা রাখি? আমার চাচা একজন বিজ্ঞানী। একজন মহাকাশ গবেষক। তারই অধিকার গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ভ্রমণ করার। আপনারা দয়া করে জিম আঙ্কেলকে ক্ষমা করে দিন। তাকে একটিবার জুপিটারে নিয়ে চলুন।
নিশি ও রাজা একটু অবাক হলো। তারপর স্বাভাবিক হয়ে বলল, ঠিক আছে, তুমি যখন বলছ নিয়ে যাব। কিন্তু সে যদি আবার তোমার ক্ষতি করার চেষ্টা করে?
-করবে না। আমার ওপর আস্থা রাখতে পারেন। আমার বিশ্বাস চাচা আর কখনো এমন করবে না।
তারপর আমি জিম আঙ্কেলকে হাত ধরে উঠতে সাহায্য করলাম। আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। আমি একটু হেসে বললাম, চলো আঙ্কেল, এবার তোমার স্বপ্নের জুপিটারে যাব আমরা।
আমার মাথায় একটা হাত রাখলেন জিম আঙ্কেল। মুখে কিছু বলতে পারলেন না। আমার বলতে ইচ্ছে করল, কেন অমন পাগলামো করতে গেলেন আঙ্কল? বলতে পারিনি। খেয়াল করে দেখলাম, চাচার চোখে পানি। একজন মহাকাশবিজ্ঞানীর চোখের জল না একজন চাচার? অলক্ষ্যে চোখ মুছলাম আমিও।
কী হে বিজ্ঞানী, যাবেন না আমাদের গ্রহে? রাজা জিউ হেসে বললেন। হাসি ফুটলো জিম আঙ্কেলের মুখেও।
সবাই মিলে জুপিটারের দিকে যাত্রা করলাম আমরা।

SHARE

Leave a Reply