Home গল্প ঈদের প্রতিজ্ঞা -মো: তোফাজ্জল হোসাইন

ঈদের প্রতিজ্ঞা -মো: তোফাজ্জল হোসাইন

– নিবেন… হরেক মাল… নিবেন…।
– না আমরা হরেক মাল কিনি না।
– নিবেন… হরেক মাল… নিবেন…।
বিরক্ত হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে দেখে যে, তার প্রিয় ছোট মামা-মামী এসেছে।
– আরে ছোট মামা-মামী যে।
– ঐ মা, ঐ আপা, দেখে যাও কারা এসেছে?
– কে আসছেরে আল আমিন? বলে ঘর থেকে বের হয়, মা ও তার একমাত্র বড় বোন বীথি।
– এই যে মামা-মামী। কেমন আছেন আপনারা?
– বললো বীথি মণি।
– আলহামদুলিল্লাহ আমরা ভালো আছি।
– তোমরা কেমন আছো?
– আলহামদুলিল্লাহ আমরাও ভালো আছি।
– কোথা থেকে এলে তোমরা? বলল আল আমিনের মা।
– মাওনা শ্রীপুর থেকে।
– তোমাদের বাড়ি হয়ে, আমরা বাড়ি যাবো ঈদ করতে।
– যাক তাহলে তো ভালোই হলো। বললো আল আমিনের মা।
প্রাথমিক কথা বলতে বলতে তারা সবাই বাড়িতে প্রবেশ করল।
ছোট মামা বলল, আল আমিন তোমার রোজা কেমন চলছে? এবার কয়টা রোজা রেখেছো? তোমার কি এবার কুরআন খতম দেওয়া হয়েছে?
আল আমিন জবাবে বলল, আলহামদুলিল্লাহ রোজা খুব ভালোই হচ্ছে। একটা ছাড়া সবগুলো রোজা রেখেছি। আর আশা করি আগামীকালের মধ্যেই আমার কুরআন খতম শেষ হবে ইনশাআল্লাহ।
আর তোমার কী অবস্থা বীথি খালা? কুরআন কি খতম সম্ভব হবে?
– জবাবে বলে, অবশ্যই সম্ভব হয়েছে। আমি ইতোমধ্যে এক খতম কুরআন তেলাওয়াত করেছি। আর দুই পারা তেলাওয়াত করতে পারলে দুই খতম হবে ইনশাআল্লাহ।
আলহামদুলিল্লাহ তাহলে খুব ভালো কথা। তোমার মামীও এক খতম কুরআন তেলাওয়াত করেছে। আমিও চেষ্টা করছি।
সবাই একটু এখানে আসবে? আমরা তোমাদের ঈদের জন্য কিছু পোশাক নিয়ে এসেছি। দেখতো পছন্দ হয় কি না? এ কথা বলে ছোটমামা ডাকলো। তাতে সবাই একত্রিত হলো।
প্রথমে আল আমিনের জন্য একটা নীল পাঞ্জাবি বের করে বলল, এটা কেমন পরো তো দেখি মামা? পাঞ্জাবিটা দেখতে এত সুন্দর। দেখামাত্র আল আমিন তো খুশিতে ডগমগ। কারণ তার বন্ধু হিমেল এরকম একটা পাঞ্জাবির কথা বলেছিল তাকে। তখন থেকে মনে মনে আকাক্সক্ষা ছিল কেউ যদি আমাকে এরকম একটা পাঞ্জাবি কিনে দিতো তাহলে খুব ভালো হতো।
আল আমিন পাঞ্জাবি পরার পর কয়েকটা ছবি তুলে তার প্রবাসী বাবা ও তার অন্যান্য মামাদের পাঠিয়ে দিল। তা দেখে অনেক প্রশংসা করলো। যদিও একদিন আগে তার মা, তার ও তার বোনের জন্য শার্ট-প্যান্ট, গেঞ্জি, পাঞ্জাবি ও থ্রিপিস কিনে দিয়েছে। তবুও ছোট মামার পছন্দের পাঞ্জাবিটা তার অনেক ভালো লেগেছে।
এরপর মামা বললো, এ থ্রিপিসগুলো দেখতো কোনটা তোমার পছন্দ হয় বীথি খালামণি।
– আমার তো সবগুলোই পছন্দ হয়। তবে এই হলুদটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে।
– আল আমিন বললো, আপারটা আমার পাঞ্জাবির চেয়েও বেশি সুন্দর লাগছে।
– আর তোমার কোন শাড়িটা পছন্দ দেখতো আল আমিনের মা, বললো ছোটমামা।
– এই নীল শাড়িটা মাকে খুব সুন্দর লাগবে বলে আল আমিন একটা নীল শাড়ি হাতে নিলো।
– বীথিও বললো আমারও এটা পছন্দ।
– যেহেতু আমার ছেলে-মেয়ে এটা পছন্দ করেছে, তাহলে এটাই আমার পছন্দ। বললো আল আমিনের মা।
যদিও প্রায় প্রতি বছর ছোট মামা আল আমিনের পরিবার, তার খালামণিদের পরিবার, ছোট ছোট মামাতো ভাই-বোন, অন্যান্য মামা-মামীদের ও নানীকে ঈদের পোশাক দিয়ে থাকে। পোশাক দিতে পারাই যেন ছোট মামার আনন্দ।
এভাবে সবাইকে তাদের পছন্দের পোশাক দেওয়া শেষে বাড়ির সবার খোঁজ খবর নিলো।

দুই.
ইফতার শেষে নামাজ আদায় করে সবাই রাতের খাবার গ্রহণ করছে।
তখন ছোট মামী বললো, ছোটদাদী (আল আমিনোর মা) আপনারা এবার আমাদের সাথে ঈদ পালন করতে আমাদের বাড়িতে চলেন। অনেক আনন্দ হবে। অনেক ভালো হবে। সবাই আনন্দ ভাগাভাগি করে উদযাপন করতে পারবো। কী বলো মামা ও খালামণি?
এই কথা শুনে তো আল আমিন প্রায় লাফিয়ে ওঠে বললো, ঠিক ঠিক।
– তাহলে অনেক ভালো হবে মা। খুব মজা হবে। সবাইকে নিয়ে ঈদের মাঠে নামাজ আদায় করতে পারবো।
– আর বীথি বললো, তাহলে তো সবাইকে নিয়ে অনেক মজা করে ঈদ উদযাপন করা যাবে।
– গেলে তো ভালোই হয় কিন্তু বীথির বাবা কী বলে দেখি? বললো আল আমিনের মা। কারণ আল আমিনের বাবা কয়েক বছর যাবৎ সৌদি আরব থাকে। ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যৎ ও মানুষ করার জন্য, বিদেশ থেকে টাকা উপার্জন ও আল্লাহর ঘর জিয়ারত অর্থাৎ ওমরাহ করতে বিদেশে আছে।
– তোমরা সবাই রাজি থাকলে সে আর কী বলবে? আশা করি সেও আমাদের সাথে ঈদ করতে তোমাদের অনুমতি দেবে। বললো ছোট মামা।
প্রতি রাতেই ফোন করে পরিবারের খোঁজখবর নেয় আল আমিনের বাবা। ঠিক সেদিনও ফোন করলে আল আমিনের মা তাকে জানালো যে, আজ আমাদের বাড়িতে মেহমান এসেছে। শুনে আল আমিনের বাবাও খুশি হলো। কথা শেষে আল আমিনের মা বললো যে, ছোট ভাই-ভাবী তো আমাদের ঈদ করতে তাদের বাড়িতে যেতে বলে, কী বলেন আপনি?
ঠিক আছে যাও। বেশি দিন থেকোও না। বললো আল আমিনের বাবা।
ঠিক আছে তাড়াতাড়ি চলে আসবো। কারণ সামনে আল আমিন ও বীথির স্কুল কলেজ শুরু হয়ে যাবে।
কথোপকথন শেষে আল আমিনের মা জানালো যে, তার বাবা তাদের ঈদ করার অনুমতি দিয়েছে।
আল আমিন, বীথি খুশি মনে সেই রাতে ঘুমিয়ে পড়লো।

তিন.
ওই যে চাঁদ। ওই যে চাঁদ। ছোট্ট একটা কাস্তের মতো দেখেছো? বললো আল-আমিন।
– নাতো আমি তো দেখতে পাচ্ছি না। বললো মুস্তাফিজ ও রেজাউল করিম রাব্বী (আল আমিনের মামাতো ভাই)
– আরে ঐ দেখ চাঁদ। দেখেছো দেখেছো ঈদের চাঁদ। কত সুন্দর।
– হ্যাঁ এবার আমি দেখেছি। বললো মুস্তাফিজ ও রেজাউল করিম রাব্বী।
তখন সকল ছোট ছোট মামাতো ভাই বোনেরা একত্রে বলে উঠলো ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। খুশিতে সবাই বাড়ি ফিরে এলো। কাল ঈদ।
ঈদের চাঁদ দেখা শেষে বাসায় এসে সবার সাথে কথোপকথন হচ্ছে। কারণ আজকেই কিছুক্ষণ আগে আল আমিনরা এসেছে তার নানা বাড়িতে ঈদ উদযাপন করতে। তাই সবার সাথে এখনও ভালোভাবে খোঁজখবর নেওয়া হয়নি।
আল আমিনদের বাড়ি আসতে দেখে মুস্তাফিজ, রাব্বী, মরিয়ম ও রহিমা খুব খুশি হয়েছে। কারণ এর আগে তারা কোন সময় ঈদ করতে আসেনি। ঈদের ২-৩ দিন পরে আসতো। সবাই এক সাথে নতুন জামা পরে, ঈদগাহে যেতে পারবে। ঈদের নামাজ আদায় করতে পারবে।
রাতে সবার সাথে মেহেদি দিলো। রাতে খুশি মনে ঘুমিয়ে পড়লো।

চার.
ঈদের দিন।
ছোট মামার সাথে ফজরের নামাজ জামায়াতে আদায় করলো আল আমিন।
কিছুক্ষণ কুরআন তেলাওয়াত করে সে। সকাল সকাল গোসল করে নিলো মামাতো ভাইদের সাথে। তারপর সেই নতুন নীল পাঞ্জাবি পরলো। হালকা সেমাই খেয়ে বের হলো ঈদগাহে ছোটমামার সাথে। ঈদগাহের ইমাম হলো ছোট মামা। কিছু সময় মসজিদের ইমাম সাহেব বক্তব্য রাখলেন। আমাদের রোজা-পরবর্তী করণীয় বিষয়ে। এরই মধ্যে ঈদের মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেল। তারপর ছোটমামা খুতবা দিলেন। ঈদের নামাজ পড়ালেন। নামাজ শেষে মুনাজাতের আগে কিছু কথা বললেন; ঈদের শিক্ষা নিয়ে। তিনি বললেন; ঈদ মানে খুশি। ঈদ মানে আনন্দ। গরিব দুঃখীদের মাঝে খাদ্য দেওয়া। যাদের নতুন পোশাক নেই তাদের পোশাক দেওয়া। মানে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেয়া। সকল ভেদাভেদ ভুলে আমরা যেমন আজ ঈদের নামাজ আদায় করলাম ঠিক তেমনি সবাই এক হয়ে যাওয়া। ঐক্যবদ্ধ থাকা। মিলে মিশে থাকা। সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেয়া।
রোজা যেমন আমাদের খোদাভীতি শিক্ষা দেয়। তেমনি আমাদের সারা বছর আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে খারাপ কাজ ছেড়ে দেয়া। পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা। ভালো কাজ করা। পরের উপকার করা।
রমজান মাসে যেমনি আমরা নামাজ আদায় করেছি। তেমনি যেন আমরা সারা বছর নামাজ আদায় করতে পারি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে উক্ত কাজ করার তৌফিক দান করুক। আমিন।
বক্তব্য শেষে ছোট মামা মুনাজাত করলেন। দেশের জন্য, নিজের বাবা-মায়ের জন্য, নিজের গুনাহ মাফের জন্য, সবার গুনাহ মাফের জন্য, দোয়া করলেন। সবাই চোখের পানি ফেলে শুধু আমিন আমিন বললো।
সবার সাথে কোলাকুলি করে মামাদের সাথে বাড়ি ফেরার আগে নানাদের কবর জিয়ারত করল।
এসে আল আমিনের মাকে বললো, আজ ঈদগাহে অনেক সুন্দর কথা শুনে এলাম। আর আমিও প্রতিজ্ঞা করলাম। আমরা যেমন ঈদে নতুন পোশাক ক্রয় করি। তেমনি আমার গরিব বন্ধুর জন্য একটা নতুন পোশাক কিনে দেয়ার চেষ্টা করবো। আমি যেমন টিফিন খাই, তেমনি আমার যে বন্ধুটি টিফিন খেতে পারে না তার সাথে ভাগাভাগি করবো- এটাই হোক আমার এবারের ঈদের প্রতিজ্ঞা।

SHARE

Leave a Reply