Home কুরআন ও হাদিসের আলো হাদীসের আলো লাভজনক ব্যবসা -এস এম রুহুল আমীন

লাভজনক ব্যবসা -এস এম রুহুল আমীন

হযরত আনাস বিন মালিক বিন নাযর রা. বর্ণনা করেন। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ সা.-এর প্রিয় আনসার সাহাবী হযরত আবু তালহা রা.। আবু তালহা তার লকব বা উপাধি। তার আসল নাম ছিলো হযরত যায়িদ বিন সাহল রা.।
আনসার সাহাবীদের মধ্যে আবু তালহা ছিলেন ধনী। বেশ অর্থসম্পদের মালিক। তার সম্পদের অন্যতম ছিলো অনেকগুলো বাগান। যা ছিলো বনজ ও ফলদ। তার বাগানসমূহের মধ্যে একটি ছিলো মসজিদে নববীর একেবারেই সামনে। বাগানটি ছিলো সবুজের সমারোহে অনেক সুন্দর ও নয়নাভিরাম। তাঁর প্রিয় ও পছন্দের বাগানের একটি।
এ বাগানটিতে প্রায়ই যেতেন আমাদের প্রিয় নবী সর্বকালে সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ও শিক্ষক হযরত মুহাম্মদ সা.। সেখানকার শীতল সবুজ ছায়ায় তিনি বিশ্রাম নিতেন। জুড়াতেন ক্লান্তি অবসাদ। চোখের প্রশান্তি নিতেন পবিত্র সবুজের সমারোহে। সেখানে তিনি পান করতেন সুমিষ্ট ও সুপেয় পানীয়। শুনতেন হরেক রকম পাখির কলকাকলি গুঞ্জন ও সুমিষ্ট গান আর কিচিরমিচির শব্দ। বাগানটির নামও ছিলো খুব চমৎকার বায়রুহা‘আ।
হযরত মুহাম্মদ সা.-এর সাহাবীরা ছিলেন আল্লাহর সন্তোষ অর্জনে পাগলপারা। তারা ছিলেন আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট এবং আল্লাহ তা‘য়ালাও ছিলেন তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। যেখানে আল্লাহর সন্তুষ্টি সেখানেই উপস্থিত হতেন সাহাবীরা। হযরত আনাস বিন মালিক রা. বলেন। সূরা আলে ইমরানের ঊনত্রিশ নম্বর আয়াত নাযিল হলো হযরত মুহাম্মাদ সা. এর ওপর। ‘‘তোমরা যে সম্পদ বেশি ভালোবাসো, তা আল্লাহর পথে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনোই প্রকৃত কল্যাণ লাভ করতে পারবে না।’’ মহান আল্লাহর এ অমিয় বাণী কানে পৌঁছল হযরত আবু তালহার রা.।
আল্লাহর ভালোবাসার টানে ছুটে গেলেন হযরত আবু তালহা রা.। একবারে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ সা.-এর সামনে। ভরা মজলিসে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর খেদমতে হাজির হয়ে বিনয়ের সাথে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সা.! আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আমার কাছে অত্যধিক প্রিয় আমার একটি বাগান আছে। যার নাম বাইরুহা‘আ। অবস্থান আপনার মসজিদের সম্মুখপানে। শুধুমাত্র আপনি সাক্ষী থাকুন। আমি কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রকৃত কল্যাণ লাভের আশায় আমার এই প্রিয় বাগানটি আল্লাহর রাস্তায় দান করলাম। সুতরাং আপনি যেভাবে ইচ্ছা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী উহা ব্যয় ও ব্যবহার করুন। বিনিময়ে আমি শুধুমাত্র সওয়াব ও কল্যাণ হিসেবে চাই কঠিন কিয়ামতের দিনে আল্লাহর কাছে এক বিশাল সম্পদের ভাণ্ডার। প্রভুর একমাত্র সন্তোষ, যা দিতে পারবে আমাকে নাজাত। উসিলা হবে জান্নাতে যাওয়ার পথে। মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সা. তাঁর প্রিয় সাহাবী আবু তালহার এই বিশাল ও প্রিয় বস্তুর দানশীলতায় হলেন অভিভ‚ত ও অবাক।
সাথে সাথে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ইরশাদ করলেন মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সা. বড়ই লাভজনক ব্যবসা, দুনিয়ায় যতো লাভজনক ব্যবসা আছে তার মধ্যে এটা অনেক বেশি লাভজনক ব্যবসা। বিন্দু পরিমাণ সন্দেহ নেই তাতে। হে আবু তালহা! আমি তোমার কথা গভীর মনোযোগের সাথে শুনেছি। তোমার কথার যথার্থ মর্ম উপলব্ধি করেছি। আবেগে আপ্লুত হয়ে আনন্দিত ও পুলকিত হয়েছি।
তোমার জন্য আমি বেশি ভালো ও কল্যাণকর মনে করছি। এটা আল্লাহর পথে তোমার নিঃসন্দেহে বড় দান ও কোরবানি। তুমি বড়োই সৌভাগ্যবান। তুমি অবশ্যই এর জাজা আখিরাতে পাবে আল্লাহর কাছে। তবে এটা তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তোমার নিজের আপনজন ও অপেক্ষাকৃত অভাবী গরিব আত্মীয় স্বজনের মধ্যে দান করে দাও। তুমি তো অবশ্যই জানো গরিব আত্মীয়দের দান করলে আল্লাহ তোমার আমলনামায় দু’টি সওয়াব দেবেন। একটি হলো গরিবকে দান করার সওয়াব আর অপরটি হলো আত্মীয়দের হক আদায়ের সওয়াব।
কথা অনুযায়ী কাজ। অনুগত সাহাবী। প্রিয় রাসূলের নির্দেশনা শিরোধার্য। বললেন হযরত আবু তালহা রা., হে আল্লাহর রাসূল সা.! অবশ্যই আমি আপনার পরামর্শ অনুযায়ী তাই করবো। আপনি যা নির্দেশ করেছেন আপনার পবিত্র জবানিতে। কাজেই আমি আমার প্রিয় বাইরুহা‘আ বাগান আপনার নির্দেশনা অনুযায়ী আমার নিজের নিকট আত্মীয়দের মাঝে বণ্টন করে দেবো এবং আবু তালহা রা. তার প্রিয় বাগানটি প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর নির্দেশনা অনুযায়ী তার নিকট আত্মীয় ও তার চাচাতো ভাইদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন।
আলোচ্য হাদীসটিতে ফুটে উঠলো আল্লাহর নবীর সাহাবীদের আল্লাহর নির্দেশের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন। দান করে দিলেন প্রিয় বস্তু ও সম্পদ বাগানটি। দান করতে অনুসরণ করলেন প্রিয় নেতা ও নবীর নির্দেশনা। প্রতিষ্ঠিত হলো সামাজিক দায়বদ্ধতা। গরিব অসহায় আত্মীয়স্বজন ও আপনজনদের অধিকার। প্রতিষ্ঠা পেলেন আপন চাচাতো ভাইয়েরা। হটে গেলো তাদের দরিদ্রতা। মুছে গেলো তাদের দুঃখ কষ্ট। মুখে ফুটলো তাদের আনন্দের হাসি।
(বুখারি ও মুসলিম শরিফ অবলম্বনে)

SHARE

Leave a Reply