Home গল্প দোয়া -আবুল হোসেন আজাদ

দোয়া -আবুল হোসেন আজাদ

শাঁখরা বাজারে মসজিদের পাশে তয়জুল মিয়ার চায়ের দোকানে ভোর থেকে ভিড় লেগেই থাকে। ফজরের জামাত শেষে একদল মুসল্লি চা খেতে ভিড় জমায় দোকানে। চায়ের সাথে দোকানে টোস্ট, বিস্কুট, কেক, কলা, কোল্ড ড্রিংকসহ খিলি পানও পাওয়া যায়। তবে তয়জুল মিয়ার দোকানে বিক্রি হয় না কোন বিড়ি, সিগারেট। শুধু তাই নয়, তার দোকানে বসে কেউ ধূমপান করতে পারবে না। এতে ধূমপায়ীরা তার দোকানকে পছন্দ না করলেও বেশির ভাগ লোকজন তার সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানায়। তারাও স্বস্তিতে চা, বিস্কুট, পান খেয়ে তৃপ্তিবোধ করে।
তয়জুল মিয়ার বাজারের পাশে বাড়ি। গরিব মানুষ। জমিজমা তেমন নেই। শুধু ভিটেবাড়ি ছাড়া। বিলে বিঘাখানেক ধানের জমি আছে। এখন আর ধান চাষ হয় না সেখানে। মাছের ঘের। গ্রামের প্রভাবশালী ধনী লোকেরা সমস্ত জমি হারি নিয়ে বছরের পর বছর ধরে মাছ চাষ করে। মাছের মধ্যে থাকে বাগদা চিংড়ি, গলদা চিংড়িসহ অন্যান্য রুই, কাতলা, মৃগেল, পারশে, টেংরা প্রভৃতি।
তয়জুল মিয়ার ছোট্ট সংসার। এক ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রী। ছেলে পারভেজ ক্লাস এইটে পড়ে। ভালো ছেলে। ক্লাসের ফার্স্ট বয়। পড়াশুনায় যেমন ভালো তেমন ভালো সব কাজেই। কী বিনয়ে, কী ভদ্রতায়। সব কাজে তার সুনাম। বিকেলে স্কুল ছুটি হলে বাড়ি ফিরে খেয়ে বাবার দোকানে চলে আসে। বাবাকে সাহায্য করে এশার নামাজ পর্যন্ত। তারপর বাড়ি গিয়ে বই নিয়ে বসে পারভেজ। রাত বারোটা পর্যন্ত। ওর ঘরে মা খাবার ঢেকে রাখেন। সময়মত খেয়ে নেয় পারভেজ। পড়াশুনায় ঢিলেমি নেই মোটেও। পারভেজের ছোট বোনটা ক্লাস ফাইভে পড়ে। ওরও পড়াশুনায় বেশ মন। ক্লাসে ফার্স্ট না হতে পারলেও সেকেন্ড কিংবা থার্ড হয়ে থাকে। ভাই-বোনের মধ্যে বেশ মিল। ঝগড়াঝাঁটি কিংবা কোন কিছুতেই অবনিবনা হয় না।
তয়জুল মিয়াও ছোট দুটি ছেলে-মেয়ের জন্য নিজেকে গর্বিত মনে করেন। কারণ ছেলে মেয়ে দুটোকে পাড়া-প্রতিবেশী ও স্কুলের স্যারেরা প্রশংসা করেন। কোন খারাপ কাজ বা দুষ্টুমিতে ওরা নেই। ইদানীং পারভেজ তার বাবাকে মাগরিবের পর সাহায্যে করতে পারে না দোকানে থেকে। স্যারেরা জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার জন্য স্কুলে সন্ধ্যের পর থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত কোচিংয়ের ব্যবস্থা করেছেন। সেখানে মসজিদ থেকে মাগরিবের নামাজ আদায় করেই চলে যায় পারভেজ।
পারভেজের দিনগুলো এমনি করে তর তর করে খর স্রোতা নদীর মত বয়ে যায়। পাখি ডাকা ভোর হতে রাত বারোটা অবধি লেখাপড়া ও বাবার কাজে সাহায্যে সময় গড়িয়ে চলে। পারভেজ এবারের জানুয়ারি মাসে স্কুলের স্টুডেন্ট কেবিনেট ভোটে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছে। ভোটের পর সবাই তাকে ফুলের মালা পরিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছে। পারভেজ শিক্ষার্থীদের ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে ওঠে। পারভেজ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলে আমার শিক্ষার্থী ভাই ও বোনেরা, তোমাদের দোয়ায় এবং আল্লাহর ইচ্ছায় তোমাদের জন্য আমি যেন স্কুলে আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারি।
শুক্রবার স্কুল ছুটি। ওই দিন বাবার অনেক কাজে সাহায্য করতে পারে পারভেজ। বাবার দোকানের জন্য ও মালামাল আনতে যায় সাতক্ষীরার বড় বাজারে। এতে করে মালামাল আনার জন্য বাবার আর দোকান বন্ধ করতে হয় না। এক শুক্রবারের ঘটনা। পারভেজ দোকানের মালামাল নিয়ে ফিরছে মহেন্দ্রতে ওঠে। সাতক্ষীরা থেকে কুলিয়া কাউন্সিল পর্যন্ত মহেন্দ্র চলাচল করে। বড় বড় দুটো প্যাকেট ভর্তি মালামাল। মালামাল বলতে চা, বিস্কুট, কেক, কলা, পাউরুটি। বড় বাজারের সামনে থেকে উঠে আসছে বাড়ির পথে পারভেজ। ওর সামনে আরও একটি মহেন্দ্র দ্রুতগতিতে যাচ্ছে। হঠাৎ করে পারভেজ দেখতে পেলো সামনের মহেন্দ্রর এক যাত্রীর ডান পাশের প্যান্টের পকেট থেকে একটি অ্যানড্রয়েড মোবাইল ফোন রাস্তায় পড়ে গেল। কেউ খেয়াল করেনি ব্যাপারটা। পারভেজ ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললো। গাড়ি থামল। পারভেজ মোবাইল ফোনটা তুলে নিলো। গাড়ির অন্যান্য যাত্রী ও ড্রাইভার মনে করলো ওটা পারভেজের ফোন। কিন্তু না। পারভেজ দ্রুত গাড়ি চালিয়ে সামনের গাড়িটা ফলো করতে বললো। ফোনটা যে পারভেজের না। ওটা সামনের গাড়ির যাত্রীর কাছ থেকে পড়ে গেছে জানালো। ড্রাইভার আরো দ্রুত গাড়ি চালিয়ে সামনের গাড়িটিকে ওভারটেক করে দাঁড়ালো। পারভেজ গাড়ি থেকে নেমে কারো কিছু হারিয়েছে কি না জানতে চাইলো। সবাই চোখ চাওয়া চাওয়ি করে পকেটে হাত দিলো কারো কিছু হারিয়েছে কি না। তারপর এক মাঝ বয়সী ভদ্রলোক পকেটে হাত ঢুকিয়ে বলে উঠলো হ্যাঁ আমার মোবাইল ফোনটা হারিয়েছে। কথা না বাড়িয়ে পারভেজ মোবাইলটি ভদ্র লোকটির হাতে তুলে দিল। লোকটি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। ছেলেটির সততায় মুগ্ধ হয়ে একটি পাঁচশ টাকার নোট বের করে এগিয়ে দিল। পারভেজ কোন মতেই তা গ্রহণ না করে ওর গাড়িতে নিজের আসনে ফিরে এলো। গাড়ির অন্য যাত্রীরা পারভেজের এমন সততা দেখে জীবনে যেন অনেক বড় হতে পারে সেই দোয়াই করলো।
দেখতে দেখতে রমজান মাস এসে গেল। রমজান মাসের পবিত্রতা রক্ষার জন্য পারভেজের বাবা পুরো একমাস দিনের বেলা দোকান বন্ধ রাখেন। ইফতারের পর চা তৈরির কাজে লেগে যান। চলে তারাবির নামাজ পর্যন্ত। নামাজ শেষ হলে পারভেজ বাড়িতে চলে যায়। বাবা রাত দশটা অবধি দোকানে থাকেন তারপর বন্ধ করে বাড়িতে চলে আসেন। বাড়িতে ফিরে দেখেন পারভেজ ও ছোট মেয়েটা পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত। বাবা সবাইকে ডেকে নেয় খাবারের জন্য। তারপর মা বাবা পারভেজ ও ওর বোনটা এক সঙ্গে খেয়ে নেয়। খাওয়া শেষে ঘুমাতে যায়। আবার সেহেরির জন্য উঠতে হবে রাত তিনটে নাগাদ। সেহেরি খেয়ে ফজরের আজান হলে ফজরের নামাজ আদায় করে নেয়।
এখন বৈশাখ মাস। প্রচণ্ড গরম। দিনের বেলা খাঁখাঁ রোদ্দুর। যে দিকে চোখ যায় শুধু গাছে গাছে কচি নতুন সবুজ পাতা। বকুল ফুলে ভরে গেছে বকুল গাছ। ভোরবেলা ঝরা বকুল কুড়িয়ে অনেকে মালা গাঁথে। শহর হলে মালা গেঁথে বিক্রি করতো টোকাই ছেলে মেয়েরা। গ্রামে ফুল কেউ কেনে না।
রমজান মাসের পনেরোটি রোজা পার হয়েছে। শহরে গ্রামে বাজারে কাপড়ের দোকানে ঈদের কেনাকাটা শুরু হয়েছে। প্রতি বছরের মত এবারেও পারভেজকে ওর বাবা নতুন পায়জামা পাঞ্জাবি কিনে দেবে। ছোট বোনটার জন্যও লাল ফ্রক। ফাল্গুনের কৃষ্ণচূড়ার মত লাল টকটকে রঙ ওর পছন্দ। তাই লাল ফ্রক না হলে পারভেজের বোন রিমির ঈদ জমে না। পারভেজের মা বাড়িতে হাঁস-মুরগি পোষেন। সোনালি মুরগি আর ক্যাম্বেল হাঁস। ওরা প্রায় সারা বছরই ডিম দেয়। ডিম বিক্রি করে মা টাকা জমিয়ে রাখেন। টুকটাক সংসারে খরচ করেন। আর বাকি টাকা ঈদ এলে ছেলে মেয়ে দুটোর জন্য জামা কাপড় কিনে দেন।
পারভেজের বন্ধু শাওন। একই ক্লাসে পড়ে। আবার পাশাপাশি বাড়িও। হাঁকে ডাকে দু’জনকে সাথে সাথে পাওয়া যায়। বাবা ব্যস্ত মানুষ। তাছাড়া পারভেজতো এখন বড় হয়ে গেছে। বেশ চালাক চতুর। বাবা ঠিক করলেন এবারের ঈদের পায়জামা পাঞ্জাবি ওর নিজের পছন্দ মতো সাতক্ষীরা থেকে কিনে আনুক। সাথে যাবে শাওন।
দু’জন একদিন রওনা দিলো সাতক্ষীরায়। এ দোকান ও দোকান ঘুরে এক দোকান থেকে পায়জামা পাঞ্জাবি আর রিমির জন্য একটি ফ্রক কিনলো। শাওনও ওর নিজের জন্য শার্ট প্যান্ট কিনলো। ওরা দুপুরের মধ্যে বাড়ি ফিরে এলো। মা কেমন পাঞ্জাবি ফ্রক কিনলো দেখার জন্য শপিং ব্যাগ থেকে ওগুলো টেনে বের করলো। মা তো অবাক। একি ব্যাপার। মা ও বাবার দেওয়া কেনাকাটার জন্য দুই হাজার টাকা শপিং ব্যাগের ভেতর থেকে নতুন কাপড়গুলোর মধ্যে থেকে বেরিয়ে এলো। পারভেজও হতবাক। মা বাবার দেওয়া সেই দুই হাজার টাকার দুটো নোটই। তাহলে? পারভেজ বললোÑ পায়জামা পাঞ্জাবি আর ফ্রক মিলে দাম হয়েছে তেরোশত টাকা। সেলস ম্যানের কাছ থেকে ওগুলো নিয়ে ক্যাশে বসে থাকা মালিকের কাছে দিলো পারভেজ। সাথে এক হাজার টাকার দুটো নোট। ফেরত পাবে সাতশ টাকা। মালিক কাপড়গুলো শপিং ব্যাগের ভিতর পুরে ব্যালান্স সাতশ টাকা ফেরত দিল।
পারভেজ এবং ওর মা ভেবে পায় না টাকাগুলো কী করবে। শপিং ব্যাগের ওপর নজর গেল মা’র। এতে দোকানের নাম ও মোবাইল ফোন নাম্বার লেখা আছে। পারভেজ ওই নাম্বারে ফোন দিল। কিন্তু রিসিভ করে না। বারবার ট্রাই করতে করতে এক সময় মালিক ফোন রিসিভ করলো পারভেজের। গলায় বিরক্তি প্রকাশ করে বললÑ কে? বারবার ফোন করছেন কেন? এখন দোকানে ভিড়। বেচাকেনার ভিড়ের সময় আমার ফোন রিসিভ করার সময় নেই। পারভেজ বললÑ চাচাজি আমি আপনার দোকান থেকে ঘণ্টা দেড়েক আগে পায়জামা পাঞ্জাবি ও ফ্রক কিনেছিলাম। মালিক রাগত স্বরে বলল তাতে কী হয়েছে? বিক্রীত মাল ফেরত হবে না। পারভেজ বলল না না আমার কথাটা শুনুন। মালিক আরো বিরক্তি প্রকাশ করে বলল কী বলবে, বদলাতে চাও? তাও হবে না। কারণ এখন দোকানে দারুণ ঈদের ভিড়। ফেরত বা বদলানো কোনটাই হবে না। পারভেজ দোকানদার চাচাজিকে কিছুতেই ওর আসল কথাটা বলার সুযোগ পায় না। পারভেজের মা তাড়াতাড়ি ফোনটা নিজের কাছে নিয়ে বললেন আপনি আপনার বিকাশ নাম্বারটা দিন। মালিক যেন আরো তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে। ভাবে কোন প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়েছে। বিকাশ নাম্বার চেয়ে হয়তো বিকাশের টাকাগুলো ক্যাশ আউট করে নেবে। মা কোন রকম বিরক্তি প্রকাশ না করে বলে দেখুন যে ছেলেটির সাথে কথা বলছিলেন ও আমার ছেলে। এক মিনিট দয়া করে আমার কথাটা শুনুন। মালিক এবার শান্ত হয়ে বলে, বলুন। পারভেজের মা ঘটনাটা এবার পরিষ্কার করে বলে। মালিক শুনে আশ্চর্য হয়। পারভেজের সততায় বিস্ময় প্রকাশ করে।
মালিক বলল দেখুন শপিং ব্যাগে আমার দোকানের যে নাম্বারটা দেওয়া আছে ওটাই বিকাশ নাম্বার।
ইফতারের আর বেশি সময় বাকি নেই। পারভেজের মা বলল ইফতারের পর পরই আপনি টাকাটা ফেরত পেয়ে যাবেন। যথারীতি ইফতারের শেষে বাজারে বিকাশ এজেন্টের দোকানে চলে গেল। টাকাটা বিকাশ করে আবার ফোন দিল পারভেজ, টাকাটা গেছে কি না। মালিক ফোনটার মেসেজ চেক করে বলল হ্যাঁ এসেছে। তখন পারভেজ ফোনটা রেখে দিতে যাবে ঠিক ওই সময় মালিক বলল তোমার জন্য দোয়া করি বাবা। জীবনে আরো বড় হও। এমনিভাবে সততা নিয়ে এই এমনিভাবে সমাজটাকে বদলে দিও। তোমার মত এমন ছেলের দরকার আমাদের দেশে।
পারভেজের মনটা খুশিতে ভরে ওঠে। অন্যের জিনিসের লোভ সামলে শুধু নিজের যেটুকু আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চায় পারভেজ। এবার খুশি মনে পা বাড়ায় বাড়ির পথে। আকাশে এখন মিটি মিটি তারা। এক ঝলক বৈশাখী হাওয়া এসে ওর গা ছুঁয়ে যায়। মনটা আরো খুশিতে চনমন করে ওঠে পারভেজের।

SHARE

Leave a Reply