Home প্রবন্ধ বিশ্বের খ্যাতিমান কবিদের কবিতায় ঈদ -সাকী মাহবুব

বিশ্বের খ্যাতিমান কবিদের কবিতায় ঈদ -সাকী মাহবুব

মুসলমানদের জন্য বছরে দুটি ঈদ রয়েছে। একটি হলো ঈদুল ফিতর অন্যটি ঈদুল আজহা। এ দুটি দিনই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং গুরুত্ববহ। বাঁকা চাঁদের মনকাড়া সরু হাসি আর উচ্ছাসভরা উল্লাস নিয়ে আমাদের মাঝে আগমন ঘটে আনন্দের দিন ঈদের। যাবতীয় হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে সকল মুসলিম অনাবিল আনন্দে নেচে ওঠে। দুঃখ আর হতাশার পথ মাড়িয়ে রাশি রাশি আনন্দ আর হৈ হুল্লোড়ে মেতে ওঠে বিশ্ব মুসলিম। দুস্থ গরিবের মুখেও একফালি হৃদয়কাড়া স্নিগ্ধ হাসি ফুটে ওঠে। তাই এটি সকল মুসলমানের মনের ক্যানভাসে আলোড়িত করবে এটাই স্বাভাবিক। আর একজন কবির সংবেদনশীল হৃদয়ে এর ছোঁয়াতো লাগবেই। তাই স্বাভাবিকভাবেই ঈদ বিশ্বের খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকদেরও দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে, আলোড়িত করেছে। এই ঈদকে কেন্দ্র করে অসংখ্য কবি-সাহিত্যিক গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, ছড়া ইত্যাদি রচনা করেছেন। সমৃদ্ধ করেছেন সাহিত্যের ভাণ্ডারকে। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে আমরা বিশ্বের খ্যাতিমান কবিদের কবিতায় ঈদ নিয়ে আলোচনা করার প্রয়াস পাবো ইনশাআল্লাহ।
বিশ্ব সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র কবি মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমি ঈদ নিয়ে চমৎকার একটি কবিতা লিখেছেন
“রোজার মাসের চাঁদ অস্ত গেল, ঈদ আসলো, খুশি আসলো
হিজরি সালের রাত অতিক্রান্ত হলো, প্রেমিক দেখতে পেলো
ঐ সকালে বন্ধু হলো, তোমার উজির বন্ধু হলো
তোমার প্রেমাস্পদ প্রেমিক হলো,
তোমার শায়খ মুরিদ হলো”
(দেওয়ানে শামস-মাওলানা রুমি, অনুবাদ মীম মীজান)
বিশ্ব সাহিত্যের আরেক তারকা কবি শেখ সাদী ঈদ নিয়ে লিখেছেন–
“রমজান পল্লব সরবরাহ করে
ভ্রাতৃত্ববোধের ভাব হৃদে জাগ্রত করে
বন্ধু, পরিতুষ্টি দেখোনা, দ্রুত গমন করো
তোমার চমৎকার মেহমানকে মিস করো না
সুপ্রসন্ন শশী উঁচুতে উদিত
আর আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক হে রমজান
শুভ বিদায় হে আনুগত্যের ও সর্বোত্তম সময়
জিকিরের সমাবেশ ও কুরআনের বৈঠক
ভালো মানুষেরা জবানে শ্রদ্ধেয়
খারাপ আত্মা নিশ্চল, শয়তান শৃঙ্খলিত
ধরণীতে অন্যদিন আসা পর্যন্ত
ক্ষিতির কোণায় কোনায় ভ্রমণের জন্য উত্তম বুলবুলি আহাজারি করছে
যেমনটি বসন্ত থেকেও হেমন্তের বিচ্ছেদে
আমি বললাম, ফিরে আসতে চাই না
তোমার দিবস টিউলিপ ও পুদিনাময়
সে বলল, বেঁচে উঠতে ভয় পায় না
প্রত্যেক বছর পুষ্প মনোহারী হয়
বিস্তর রোজা আর ঈদ হবে
তিন মাস, বসন্ত ও গ্রীষ্মকাল
এটা জীবনের গন্তব্য পর্যন্ত ছিল
অন্য বছর কোনো অচেনা দেশে।”
(কাসিদাটি সাদির ৪৪ নম্বর কাসিদার অনুবাদ)
ফারসি সাহিত্যের শক্তিমান কবি ইসমাইল তাকভয়ি ঈদ নিয়ে সুুন্দর একটা কবিতা লিখেছেন,
“মহান পূত স্রষ্টার সহস্র কৃতজ্ঞতা
রোজা রেখেছো, তোমার মনকে কলুষমুক্ত করেছো
খোদার চাঁদ চলে গেলো, আর খোদার ঈদ
উপনীত হলো
বিশ্বাসী বান্দারা এই মাসে হৈ হুল্লোড় করেছে
হকের মাসের বিদায়ের সাথে সাথে দুস্থরা দলবেঁধে আসবে
হে দয়ালু খোদা, গরিবদের বন্ধু হওয়ার তাওফিক দাও
রোজাদারদের জন্য পয়লা শাওয়াল ঈদুল ফিতর
রোজা ভাঙার সময় হয়েছে, কার্পণ্য পরিহার করো
মুমিনের পাশে ঈদের সালাতে অংশ গ্রহণ করো
যাদের হক আছে তা পরিশোধ করো,
হে রোজাদার আত্মাকে সংকুচিত করো না।”
ঈদ নিয়ে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ এবং ইসলামের সুগভীর মর্মবাণী সমৃদ্ধ কবিতা রচনা করেছেন বিশ্বসাহিত্যের আরেক ঝড়তোলা কবি বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি লিখেছেনÑ
“ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাগিদ
তোর সোনা দানা, বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ
দে যাকাত, মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙ্গাইতে নিদ।”
এই কবিতাটি বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের কাছে একটি অসাধারণ ঈদসঙ্গীতে পরিণত হয়েছে। তার এই কবিতা না হলে ঈদুল ফিতর অপূর্ণ থেকে যায়। এর মাধ্যমেই সবুজ বাংলায় স্বাগত জানানো হয় ঈদকে।
সৈয়দ এমদাদ আলী নবনূর পত্রিকায় ১৯০৩ সালে ঈদ নিয়ে একটি কবিতা লেখেন। বাংলা সাহিত্যে এটাই ঈদবিষয়ক প্রথম কবিতা হিসেবে স্বীকৃত হয়ে আছে। তিনি লিখেছেন
“কুহেলি তিমির সরায়ে দূরে
অরুণ তরুণ উঠিয়ে ধীরে
রাঙিয়া প্রতিটি তরুণ শিরে
আজ কি হর্ষ ভরে।
আজি প্রভাতের মৃদুল বায়
মুসলিম জাহান আজ একতায়
দেখ কত বল ধরে?”
বাংলা সাহিত্যের আর এক জনপ্রিয় কবি কায়কোবাদ লিখেছেনÑ
“আজি এই ঈদের দিনে হয়ে সব এক মনঃপ্রাণ
জাগায়ে মোসলেম সবে গাহ আজি মিলনের গান।
ডুবিবে না তবে আর ঈদের এ জ্যোতিষ্মান রবি
জীবন সার্থক হবে, ধন্য হইবে এ দরিদ্র কবি।”
বিখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার চোখেও ঈদের ছবি ভাসছে এইভাবেÑ
“আজ নতুন ঈদের চাঁদ উঠেছে
নীল আকাশের গায়,
তোরা দেখবি কারা ভাই-বোনেরা
আয় ছুটে আয়।”
কবি সুফিয়া কামাল লিখেছেন
“চাঁদ উঠিয়াছে, ঈদের চাঁদ কি উঠেছে শুধায় সবে
লাখো জনতার আঁখি থির আজি সুদূর সুনীল নভে।
এই ওঠে, ওই উঠিল গগনে
সুুন্দর শিশু চাঁদ
আমিন। আমিন। রাব্বুল আলামিন
করে সবে মোনাজাত।”
কবি সিকান্দার আবু জাফর ঈদ উপলক্ষে দোয়া চেয়ে পিতার কাছে ‘ঈদের চিঠি’ কবিতায় লেখেন
“ঈদের সালাম নিও, দোয়া কর আগামী বছর
কাটিয়ে উঠতে পারি যেন এই তিক্ত বছরের সমস্ত ব্যর্থতা
অন্তত ঈদের দিন সাদাসিধে লুঙ্গি একখানি
একটি পাঞ্জাবি আর সাদা গোলটুপি
তোমাকে যেন পাঠাতে পারি
আর দিতে পারি পাঁচটি নগদ টাকা।”
সৈয়দ আলী আহসান ঈদের আগমনে, খুশির জোয়ারে নানা সাজ-সজ্জার কথা উল্লেখ করে ‘নতুন দিনের বার্তা’ কবিতায় লেখেন
“এসেছে নতুন দিন
আলো শতদল পাপড়ি মেলেছে, কুয়াশা হয়েছে ক্ষীণ
জরির জোব্বা, শেরোয়ানি আর আমামার সজ্জায়
বাতাসে বাতাসে কলরোল আজি, ভেঙ্গেছে তন্দ্রা ঘোর
সাহেবজাদীর নেকাব টুটেছে রাত্রি হয়েছে ভোর।”
আমাদের ঐতিহ্যের অনন্য পুরুষ, ইসলামী রেনেসাঁর অগ্রপথিক, কবি ফররুখ আহমদ পুরো দুনিয়াকে ঈদগাহর সাথে তুলনা করে লিখেছেন
“আজকে এল খুশীর দিন
দেখনা চেয়ে খুশীর চিন
দেখনা চেয়ে আজ রঙিন
খুশীর ঝলক ঈদগাহে।
জামাত ছেড়ে থাকবে যে
ঘরের কোণে রইবে সে
রইবে হয়ে এক পেশে
একলা থাকার দুঃখ তাই।
সবাই মিলে একদলে
এক আশাতেই যাই চলে
এক আশাতেই যাই বলে
ঈদগাহ হবে দুনিয়াটাই।”
কবি শাহাদাৎ হোসেনের মানসভূমিতে ঈদ কী রকম প্রভাব ফেলেছে তা একটু জানা যাক
“সকল ধরা মাঝে বিরাট মানবতা
সুরভি লভিয়াছে হর্ষে
আজিকে প্রাণে প্রাণে সেভাবে জাগিয়াছে
রাখিতে হবে সারা বর্ষে
এ ঈদ হোক আজি সফল ধন্য।
নিখিল মানবের মিলনের জন্য
শুভ যা জেগে থাক, অশুভ দূরে যাক
খোদার শুভাশিস স্পর্শে।”
বাংলা কবিতার প্রাণপুরুষ কবি আল মাহমুদ গৃহলতা কবিতায় মা ছাড়া ঈদ আনন্দ কেমন ফ্যাকাসে লাগে তার একটি ইঙ্গিত দিয়েছেন এভাবেÑ
“ঈদের দিনে জিদ ধরি না আর
কানে আমার বাজে না সেই
মায়ের অলংকার।
কেউ বলে না খাও
পাতের ভেতর ঠায় হলো
কোর্মা ও পোলাও।”
নাগরিক কবি শামসুর রাহমান বাঁকা চাঁদের আলোয় তিনিও রোমন্থন করেছেন ঈদস্মৃতি। শুধু ঈদস্মৃতি বললে ভুল হবে, তাতে প্রকাশ পেয়েছে আবহমান বাংলায় চলে আসা সালামি প্রথা ‘দশ টাকার নোট এবং শৈশব’ কবিতায় তিনি কলম চালিয়েছেন এভাবে
“মনে পড়ে যখন ছিলাম ছোট, ঈদে
সদ্যকেনা জামা জুতা পরে
সালাম করার পর আম্মার প্রসন্ন হাত থেকে
স্বপ্নের ফলের মত একটি আধুলি কিংবা সিকি
ঝরে যেত ঝলমলে ঝনাৎকারে আমার উন্মুখ
আনন্দিত হাতে —-”
গরিব দুঃখী ও অসহায়দের মনের আকুতি প্রকাশিত হয়েছে কবি তালিম হোসেনের ‘ঈদের ফরিয়াদ’ কবিতায়। কবির ভাষায়
“ঈদ মোবারক, সালাম বন্ধু, আজি এই খোশরোজে
দাওয়াত কবুল কর মানুষের বেদনার মহাভোজে।
কহিব কি আর চির মানুষের ওগো বেদনার সাথী,
ঈদের এদিন শেষ হয়ে আসে, সমুখে ঘনায় রাতি।”
বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান কবি সাজ্জাদ হোসাইন খান তার কবিতায় ঈদের সুুন্দর চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন এভাবে
“ঈদ আসে ঈদ যায় ঈদ থাকে ঝুলে
হৃদয়ের রেণু মেখে গোলাপের ফুলে।
আকাশের ছাদ ভেঙে ঈদ উঠে হেসে
ঈদ হাঁটে তারাদের গাও ঘেঁষে ঘেঁষে।
প্রখ্যাত কবি ও স্বনামধন্য গীতিকার গোলাম মোহাম্মদের মায়াবী উচ্চারণ এভাবে ফুটে ওঠে
“ঈদ মানেতো শালুক ফুলের হাসি
দুঃখগুলো হারিয়ে দেয়া মুক্তমনে
ভালো বাসাবাসি।”
বাংলা কবিতার স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব কবি মোশাররফ হোসেন খানের কবিতার বিশাল বিস্তৃত অংশ জুড়ে রয়েছে ঈদকেন্দ্রিক অনেক মনমাতানো জনপ্রিয় কবিতা। তাঁর অসংখ্য কবিতার মধ্য থেকে পাঠকদের জন্য উপহার দিচ্ছি মনকাড়া এই কবিতাটি
“ঈদ মানেতো খুশির খেলা
ফুলের মতো গন্ধে দোলা
ছন্দে ঝরা বিষটি ধারা
টাপুর টুপুর
ঈদ মানেতো বিভেদ ভোলা
খোকা খুকুর হৃদয় খোলা
মোমের নূপুর,
ঈদ মানেতো ভোর সকালে
দুয়ার খোলা
ঈদ মানেতো মন সাগরের ঢেউয়ের দোলা
সকাল দুপুর।”
প্রখ্যাত কবি ও খ্যাতিমান গীতিকার মতিউর রহমান মল্লিক মনের আবেগ প্রকাশ করেছেন এভাবে
“ঈদের রাতে হয় মুনাজাত কবুল
বলেছেন যে, মুহাম্মদ রসূল
এই রাতে তাই প্রার্থনা তো শুধু
ইরাকীদের জয়ী করো ওগো
জয়ী করো চেচেন যোদ্ধাদেরও
কাশ্মীরে দাও বিজয় দান
মুসলমানের পানে একটু চাও।
ঈদের রাতে হয় মুনাজাত কবুল
ভাসিয়ে দিলাম তাই দুচোখের কূল।”
কবি আসাদ বিন হাফিজের কলমে ঈদের চিত্র ফুটে উঠেছে অত্যন্ত চমৎকারভাবে
“সকল ফুলের সেরা গোলাপের ফুল
সকল মানব সেরা পেয়ারা রাসূল
সকল ঘরের সেরা কাবা মসজিদ
বছরের সেরা দিন খুশি ভরা ঈদ।
……
সকল খুশির সেরা আশা ভরা ঈদ
পৃথিবীর সেদিন হয় পরম সুহৃদ।”
এভাবেই বিশ্বের খ্যাতিমান কবিদের কবিতায় ঈদের শিক্ষা, মহিমা এবং গরিমা ভাস্বর হয়ে উঠেছে। যুগের পর যুগ রচিত হয়ে চলেছে ঈদের কবিতা। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, ঈদকে কোনো কবিই খুশি ও আনন্দের কেবল ঝর্নাধারা হিসেবে চিহ্নিত করেননি বরং তাঁদের দৃষ্টি ও মননের সীমাজুড়ে আছে সুভ্রাতৃত্ববোধ, মানবতা, ঐক্য, সাম্য আর মহামিলনের এক বৈশ্বিকবোধ। মূলত এটাই তাদের কবিতার কেন্দ্রীয় চারিত্র। রমজানুল মোবারক ও ঈদ বিষয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ও রাসূল (সা:) যে ধরনের শিক্ষা গ্রহণের কথা বলেছেন ঈদবিষয়ক কবিতায় আমরা তারই প্রতিধ্বনি লক্ষ করি। সন্দেহ নেই ঈদ মুসলিম মিল্লাতের জন্য একটি সার্বজনীন আনন্দ উৎসব। কিন্তু সেই সাথে আবার স্বাতন্ত্র্যিকও বটে। কারণ ঈদের এই সাম্যের শিক্ষা ও বৈশিষ্ট্য একমাত্র ইসলাম ছাড়া আর কোনো ধর্মে লক্ষ করা যায় না। কবিতায় ঈদের এই সার্বভৌমত্ব উদার শিক্ষা ধারণ করেই বয়ে চলেছে খরস্রোতা নদীর মতো। বিশ্বের খ্যাতিমান কবিদের কবিতায় এটাও একটা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ঐশ্বর্য বটে।

SHARE

Leave a Reply