Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস অপারেশন শনিরতলা -মহিউদ্দিন আকবর

অপারেশন শনিরতলা -মহিউদ্দিন আকবর

শহর, নগর, বন্দর ছাড়িয়ে অনেক অনেক দূরে নিভৃত এক অজপাড়াগাঁ। নাম তার অচিনগাঁও। যুগ যুগ ধরে এ গাঁয়ের লোকজন অশিক্ষা আর কুসংস্কারের অন্ধকারে ডুবে আছে। গ্রামের চারপাশে দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ। অনেকটা সমুদ্রের মাঝে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত দাঁড়িয়ে আছে অচিনগাঁও। আশপাশের কোন গ্রামের সাথে কোনোরকম যোগাযোগ নেই বলা যায়। নানারকম পালাপার্বণ আর ঝগড়াঝাঁটিতে ব্যস্ত অচিনগাঁয়ের অধিকাংশ মানুষ। গ্রামে কোন স্কুল বা মাদরাসা না থাকায় তাদের মাঝে লেখাপড়ার বালাই নেই। যারা নেহাত কৃষক, তারা সারাদিন জমিতে হালচাষ করে, নিড়ানি দেয় আর সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরে উঠোনে একত্রিত হয়ে গল্পগুজবে মেতে ওঠে। অনেক সময় এ ঘরের লোকের সাথে পাশের ঘরের লোকের ঝগড়া-বিবাদেও সময় কাটে। তবে রাত বাড়ার আগেই খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বউ-বাচ্চা নিয়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। এদিকে বাড়ির মা-বোনেরা সারাদিন ঘর-সংসারের কাজ করে ক্লান্ত হয়ে সন্ধ্যারাতেই ঘুমিয়ে যায়।
এই গ্রামের বিরাট বিলের ধারে ছিলো একটি ছাড়াবাড়ি। আর ছাড়াবাড়িতে ছিলো বিশাল এক বটগাছ। বটগাছটিতে নাকি অনেক অনেক বদজিনের বসবাস! গাছের ডালে প্রতি মাসেই দু-একজন মানুষের লাশ ঝুলতে দেখা যায়। লোকজনেরা তাই বটতলাটির নাম দিয়েছে ‘শনিরতলা’। সন্ধ্যা বা রাতের কথা তো বাদই দিলাম, অচিনপুরের লোকজন দিনের বেলায়ও ওই ছাড়াবাড়িতে যায় না। গাঁয়ের মানুষ অনেক সময় গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে ছাড়াবাড়ি থেকে অট্টহাসি আর গান-বাজনার শব্দ শুনতে পায়। লোকেরা ভাবে বিশেষ কোনো উপলক্ষে জিন-পরীরা গান-বাজনার আসর বসিয়েছে। হয়তো আজ রাতে কাউকে না কাউকে ধরে নিয়ে ঘাড়মটকে রক্ত খাবে।
পরদিন সকালবেলা ঠিকই দেখা যায়, গ্রামের কারো না কারো লাশ ঝুলছে ছাড়াবাড়ির বটগাছটির ডালের সাথে। আর তা দেখে ভয়ে ভয়ে গ্রামের পুরুষ লোকেরা ঘরে ঘরে গিয়ে মুঠো মুঠো চাল-ডাল তুলে একত্র করে। দুপুরের আগেই সবাই মিলে গাঁয়ের মাদবরের বাড়ির উঠোনে জড়ো হয়। তারপর সংগ্রহ করা চাল-ডাল দিয়ে খিচুড়ি রান্না করে। মাদবর সাহেবকে নিয়ে নিজেরা একটু একটু করে সে খিচুড়ি খায়। আর বেশিরভাগ খিচুড়ি নিয়ে দিন থাকতে থাকতে দল বেঁধে ছুটে যায় ছাড়াবাড়িতে। সেখানে তারা মাদবর সাহেবের শিখিয়ে দেওয়া মন্ত্র পড়ে মন্দজিন-পরীর নামে তপযপ করে। শেষে সাথে নিয়ে যাওয়া খিচুড়িগুলো পরিষ্কার কলাপাতা বিছিয়ে তাতে ঢেলে দেয়। সবাই ভাবে, এটা হলো জিন-পরীদের ভোগ। এই ভোগ খেয়ে জিনের রাজা খুশি হবে। তাহলে অন্তত একমাসের মাঝে আর কাউকে বদজিনরা মারবে না। তপযপ আর ভোগ দেওয়া শেষে সবাই সন্ধ্যার আগেই যার যার বাড়িতে ফিরে আসে। রাতে সামান্য ডাল-ভাত রান্না করে খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। তাদের বিশ্বাস, আজ তাড়াতাড়ি না ঘুমালে বদজিনের রাজা রেগে যাবে। তাতে পুরো গাঁয়ে প্রলয় ঘটে যেতে পারে।
মাদবর সাহেব বলেনÑ জিনরা আগুনের তৈরি। ওদের মেজাজ-মর্জিও আগুনের মতো গনগনে। কারো ওপর ক্ষেপে গেলে আর রক্ষা নেই। তার কথা কি আর অবিশ্বাস করা চলে? এমনিতে মাদবর সাহেবের দয়ার শরীর। সবার বিপদে তিনি পাশে থাকেন। অভাবে পড়ে কেউ মাদবর সাহেবের কাছে হাত পাতলে কাউকেই তিনি খালি হাতে ফেরান না। কোথাও ঝগড়া-ঝাঁটি লেগে গেলে তিনি সুন্দরভাবে তার বিচার করেন। মিটমাট করে দেন। তাই তারাও মাদবর সাহেবকে খুব সম্মান করে। তার পরামর্শ ছাড়া কোন কাজ কিংবা পালা-পার্বণ করে না। মাদবরের পরামর্শে এভাবেই কাটছিলো অচিনগাঁয়ের মানুষের দিনগুলো।
একটু দূরে হলেও পাশের গাঁয়ের লোকরাও অচিনগাঁয়ের ওই শনিরতলার নাম জানে। একে তো এ-গাঁয়ে জিন-পরীদের আস্তানা, প্রায়ই বদজিনরা লোকজনকে ধরে নিয়ে মেরে ফেলে! তার ওপরে অচিনগাঁয়ের মাদবার সাহেব এক আধামূর্খ আর শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক নারী-পুরুষ সবাই মূর্খ। সে জন্য পাশের গাঁয়ের লোকেরা কখনো অচিনগাঁয়ে আসে না। এমনকি এ গাঁয়ের কারো সাথে কোন আত্মীয়তাও করে না।
কিন্তু পাশের গাঁয়ের ঘরে ঘরে আছে শিক্ষার আলো। তিন-চারটি মাদরাসা আর স্কুলের সুবাদে ঘরে ঘরে শিক্ষিত ছেলে-মেয়ের বসবাস। স্কুল-মাদরাসার পাশাপাশি একটি বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্রও আছে। এখান থেকে অনেক বৃদ্ধজনও প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেছেন। গ্রামের শান্তি-শৃঙ্খলা আর আদব-কায়দামত জীবন-যাপনের আশায় গ্রামের তরুণ-কিশোররা মিলে একটি আদর্শ কল্যাণ সমিতি গঠন করেছে। তারা বিভিন্ন দ্বীনি ও কল্যাণমূলক কাজ করে। এমনকি স্বাস্থ্য পরিচর্যা, গাছ লাগানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং পরিবেশ রক্ষার জন্যও কাজ করে। কারো কোনো বিপদ-আপদ হলে সমিতির সদস্যরা ছুটে আসে।
এই সমিতির সাত সদস্য আবার একটু বিশেষ কিছু গুণের অধিকারী। ওরা খুব সাহসীও। বিপদ-আপদে ওরা ওদের কর্তব্য থেকে সরে যায় না। গাঁয়ের মানুষের সুখে-দুঃখে ওরা হাজির। এ জন্য গ্রামবাসীও ওদের খুব ভালোবাসে। গ্রামের মুরুব্বিরা ওদের নাম দিয়েছেন ‘সপ্তরতœ’। কোন কাজে সাহায্য সহযোগিতা লাগলে মুরুব্বিরা উদারভাবে ওদের সাহায্য করেন। শিক্ষার আলোয় আলোকিত এই গ্রামের নাম আলোকপুরী।

দুই.

একবার হলো কী! অচিনগাঁয়ে একটি পার্বণ নিয়ে দুই পাড়ার লোকদের মাঝে লেগে গেলো তুমুল ঝগড়া। সে ঝগড়া তো থামেই না। একদিন যায়। দু’দিন যায়। তিন দিন যায়। ঝগড়া আরো বেড়েই চলে। শেষ পর্যন্ত মাদবর সাহেবের কাছে এর বিচার যায়। মাদবর সাহেব বিচার শুনেই রেগে অস্থির। তিনি আফসোস করে বললেন এমনিতেই এই গ্রামের ওপর মন্দজিন-পরীদের বদনজর! সবসময় তোমাদের মিলেমিশে থাকতে বলি। তা শোনো না কেন? তা তোমরা কোন্ পার্বণ নিয়ে এমন বিবাদ লাগিয়ে দিলে? তিন দিনেও তোমাদের বিবাদ থামছে না!
একপক্ষের লোকেরা বললো- হুজুর, এবার আমাদের আশ্বিনা পার্বণ ছিলো। আপনি তো জানেন, এ পার্বণে আমরা শনিরতলায় ভোগ দিয়ে এপাড়ার সাথে ওপাড়ার আর ওপাড়ার সাথে এপাড়ার নৌকা বাইচ খেলি বিলের মাঝে। তা সব পাড়ার খেলা ঠিকঠাক মতই চলছিলো। কিন্তু দক্ষিণপাড়ার সাথে পশ্চিমপাড়ার নৌকা বাইচেই লেগে গেলো বিবাদ। সে কী বিবাদগো! পারলে দক্ষিণপাড়ার আলেপ মিয়া তো পশ্চিমপাড়ার দবির মিয়ার গলা চিপে মেরেই ফেলে। আমরা কোনমতে ছাড়িয়ে ছুটিয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরে গেলাম। পার্বণ আর সুন্দরভাবে শেষ হলো না। কিন্তু বাড়িতে ফিরেইবা লাভ কী হলো, যে বিবাদ সে বিবাদই রয়ে গেলো। কেউ কারো মুখ দেখাদেখি নেই। পরের দিন সাতসকালে চাষাবাদে নেমে যেই কারো দেখা হলো তো চললো তুমুল…।
মাদবর সাহেব এবার অধৈর্য হয়ে হাঁক ছাড়লেন- চললো তুমুল! আরে কী তুমুল চললো? তাতো খুলে বলবে।
একজন বললো কী আর চলবে হুজুর। আপনার সামনে তা আর বলতে চাই না।
এবার মাদবর আরো ক্ষেপে গেলেন আরে বেকুব, না বললে বিচার করবো কেমন করে?
এবার একবৃদ্ধ বললো সে কথা আর বলবেন না হুজুর। দুজনের দেখা হলেই দুজনার মুখ ছুটলো তুমুলভাবে। তা কী কানে শোনা যায়, না মুখে বলা যায়! তারপর তো আরো আছে। পারলে আবার হাতাহাতি বেধে যায়। এখন সে বিবাদ মাঠ থেকে দুই পাড়াতে ছড়িয়ে পড়েছে। বলতে গেলে সবাই সবাইকে অপমান করে চলেছে। এভাবে চলতে থাকলে সাংঘাতিক কিছু একটা হয়ে যাবে বলে দিলাম।
মাদবর সাহেব চমকে উঠে বৃদ্ধের দিকে তাকালেন। তারপর একটু গম্ভীর হয়ে বললেনÑ তাতো হতেই পারে। তোমাদের এসব বিবাদের কথা যদি জিনের রাজার কানে ওঠে, তাহলে কার আবার জান যায়! আমি বেঁচে থাকতে তো তোমাদের এমন বিপদের দিকে ঠেলে দিতে পারি না। আজই এ ঝগড়ার মিটমাট হয়ে যাক। কিন্তু কী নিয়ে বিবাদের শুরু তা কিন্তু এখনও জানা হলো না।
এবার দক্ষিণপাড়ার আলেপ মিয়া মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললোÑ ‘হুজুর, কথা ছিলো বাইচ দিয়ে নৌকা একবার বিলের পুব মাথায় গিয়ে লাগবে। সেখানে সবাই নৌকা থেকে নামবে। তারপর আবার উঠে নৌকা ফিরবে পশ্চিম মাথায়। যারা আগে পশ্চিম মাথায় ফিরতে পারবে তারা জিতলো। আমরা ঠিকই নিয়ম মানলাম। কিন্তু পশ্চিমপাড়ার লোকেরা নিয়ম মানলো না। তারা নৌকা বিলের পুবমাথায় ঠেকিয়েই টান দিছে। যে কারণে আমরা তাদের পিছনে পড়ে গেলাম। নাহলে তো আমরাই জিততে পারতাম। আমরা তাদের বিজয়ী মানতে রাজি না। হুজুর আপনি আমাদের পক্ষে রায় দেন।’
সাথে সাথে পশ্চিমপাড়ার দবির মিয়া চিৎকার করে বললো- ‘আলেপ মিয়া ডাহা মিথ্যা কথা বলছে। আমরাই জিতেছি। নৌকা বাইচে একমাথায় গিয়ে আবার নামার বিধান আছে নাকি? ওই বেটা তো পাগলের মতো কথা বলে। আমাদের সাথে হেরে গিয়ে ওনার মাথা ঠিক নেই। হুজুর আপনি আমাদের পক্ষে রায় দেন’।
ব্যাস, মাদবর সাহেবের সামনেই আবার লেগে গেলো ঝগড়া। বাধ্য হয়ে মাদবর বললেনÑ দুইপক্ষই আমাকে ঝগড়ায় জড়াতে চাইছো। আমি হলাম নিরপেক্ষ মানুষ। কিন্তু তোমরা তা বুঝতে চাও না। তারচেয়ে ভালো হয়, তোমরা পাশের গাঁয়ে বিচার নিয়ে যাও। তারা আমাদের কেউ না। তাদের তোমরা কারো পক্ষে টানতেও পারবে না। টানার চেষ্টাও করতে পারবে না। আমি দু’পক্ষের প্যাঁচের থেকে বেঁচে যাই।
এবার সত্যি পরিবেশ আরও বিবাদের দিকে চলে গেলো। সবাই মাদবরের ওপর কিছুটা রাগ হলেও তা প্রকাশ করলো না। নিজেরা তর্ক-বিতর্ক করতে করতে নিজ নিজ পাড়ায় ফিরে গেলো।
তিন.

পরদিন বিবাদ মিটিয়ে ফেলতে আলেপ ও দবিরকে নিয়ে সব পাড়ার প্রধানরা আলোকপুরীতে এলো। প্রথমে গেলো তারা একটা স্কুলের প্রধানের কাছে। তিনি বললেনÑ জ্ঞানের আলো ছড়ানোই আমার কাজ। আপনারা মাদরাসার বড় হুজুরের কাছে যান।
এবার তারা এলো মাদরাসার বড় হুজুরের কাছে। তিনিও বিচারের ভার নিলেন না। বললেনÑ আমাদের গাঁয়ের শ্রদ্ধেয় মুরুব্বি হাসান সাহেবের কাছে যান। আমরা সব বিষয়ে তাকেই গাঁয়ের প্রধান মানি। তিনি একজন ন্যায় বিচারক।
এ কথা শুনে বিচারপ্রার্থীরা রওনা হলো হাসান সাহেবের বাড়ির দিকে। পথেই দেখা হলো আলোকপুরী আদর্শ সমিতির এক নিবেদিত সদস্যের সাথে। সে বিচারপ্রার্থীদের উদ্দেশ্য জেনে নিয়ে পরামর্শ দিলো- এই সামান্য ব্যাপারে আমাদের শ্রদ্ধেয় মুরুব্বিকে কেন কষ্ট দেবেন। উনার হুকুম আছে এসব ছোটখাটো বিবাদ আমরা যেন সমিতিতেই মিটিয়ে ফেলি। আদর্শ সমিতিতে চলুন, সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
এ কথা শুনে তাদের মনে ধরলো। তারা সদস্যটির পিছু পিছু সমিতির বৈঠকখানায় হাজির হলো। সেখানে উপস্থিত ছিলো সাতরতœ। তারা বিবাদের সব ইতিহাস শুনে উভয় পক্ষকে সুন্দরভাবে মিলিয়ে দিলো। তারপর খোশ আলাপচারিতা জুড়ে দিলো। আলাপে আলাপে এক সময় বললোÑ আপনাদের গাঁয়ে যুগের পর যুগ ধরে মাসে মাসে একজন না একজন মানুষ ওই শনিরতলায় মরেই চলেছে, তার আসল কারণ কী?
অচিনগাঁয়ের লোকেরা বললো- সর্বনাশ! এসব কথা যখন-তখন আলাপ করতে নেই। ওনারা শুনতে পেলে আমাদের মাঝ থেকে কাউকে না কাউকে ধরে নিয়ে যাবেই যাবে।
সাতরতœ নাছোড়বান্দা। তারা তো বড় হুজুরের কাছ থেকে ভালোভাবেই জানে, জিন-পরীরা আসলে এভাবে একের পর এক মানুষ মেরে কোথাও রাজত্ব করে না। কিন্তু অচিনগাঁয়ে তাই ঘটে চলেছে। এর পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ওই গাঁয়ের মানুষগুলো একে তো মূর্খ, তাও আবার কুসংস্কারে ডুবে আছে। তারা বিভিন্নরকমের অধর্মীয় তপযপও নাকি করে। আবার কিসব ভোগও নাকি দেয়। এসব তো ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান হতে পারে না। কিন্তু কুসংস্কারাচ্ছন্ন মূর্খ লোকদের এতোসব বলে লাভ নেই।
সাতরত্ন ভাবলো, এদেরকে কেবল বদজিন তাড়ানোর কথা বললেই ভালো হবে। তাই কৌশল খাটিয়ে বললোÑ আচ্ছা, আপনাদের গাঁয়ে তো শুনেছি কোনো মসজিদ, মাদরাসা বা স্কুলও নেই। তা আপনারা নামাজ পড়েন কোথায় আর দোয়া-কালাম নাকি যেন তপযপের কথা বললেন, তাইবা আপনারা শেখেন কার কাছ থেকে?
প্রশ্ন শুনে অচিনগাঁয়ের পশ্চিমপাড়ার প্রধান কদর আলী বললেন- যার যার বাড়িতেই নামাজ পড়ি। আর বড় বড় পার্বণ এবং মান্নতের পার্বণ করি মাদবর সাহেবের বিরাট উঠানে। তিনিই আমাদের শিক্ষাগুরু। তিনি আমাদের নানান তপযপ শিক্ষা দিয়ে বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেন। তবে নামাজ কি আর ওনার কাছ থেকে শিখতে হয়? নামাজ তো আমরা পূর্ব পুরুষদের কাছ থেকে বংশ পরম্পরায় শিক্ষা পেয়েছি।
সাতরতœ বুঝতে পারলো, আসলে মূর্খতার কারণে এরা এমনভাবে শিরক আর বিদাতে জড়িয়ে গেছে যে, এদের সাথে এ বিষয়ে আলাপ করেও কাজ হবে না। তবে এই সামান্য আলাপ থেকে ওরা যা বুঝার বুঝে নিয়েছে। তাই আর কথা না বাড়িয়ে শুধু বললোÑ আপনারা চাইলে আমরা আপনাদের গাঁ থেকে খারাপ জিন-পরীগুলোকে তাড়িয়ে দিতে পারি। তবে সাবধান! এ কথা গাঁয়ের সবাইকে জানানো যাবে না। এবার বলুন, আপনারা কি সুখে শান্তিতে থাকতে চান?
সাথে সাথে অচিনগাঁয়ের একজন বৃদ্ধ বললোÑ ওরে বাবারে! তোমাদের আল্লাহর দোহাই, এ কথা মুখেও এনো না। যে ওখানে যাবে তাকেই বদজিনের রাজা ঘাড় মটকে বটগাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখবে।
বৃদ্ধলোকটির কথা শুনে সাতরত্ন হেসে বললো-আপনারা সাহায্য করলে আমরা ইনশাআল্লাহ আপনাদের গ্রামের খারাপ জিন-পরীগুলোকে তাড়িয়েই ছাড়বো।
অচিনগাঁয়ের লোকরা আর কথা বাড়ালো না। সাতরত্ন ও আর কিছু বললো না। অচিনগাঁয়ের লোকদের তারা হাসিমুখে বিদায় জানালো। বিবাদ মিটে যাওয়ায় তারাও খুশি মনে ফিরে চললো নিজেদের গাঁয়ের দিকে।
এদিকে অচিনগাঁয়ের লোকজন চলে যাবার পর সাতরত্ন বসে গেলো এক গোপন পরামর্শ সভায়। সে সভার খবর-সবর কেউই জানতে পারলো না।

চার.

অনেক দিন হলো, অচিনগাঁয়ের লোকেরা মোটের ওপর শান্তিতেই আছে। আলোকপুরী থেকে বিবাদ মিটিয়ে ফেরার পর এগাঁয়ের মানুষদের মাঝে কেমন একটু ভদ্রতার বাতাস যেন বইছে। কারো সাথে কারোর তেমন ঝগড়া বিবাদও হচ্ছে না। মনে হচ্ছে তারা যেন বুঝতে পেরেছে, সবাইই মানুষ। আর সবারই একটা মান-সম্মান আছে। প্রত্যেকটি মানুষের মাঝে কিছু না কিছু গুণাগুণ আছে। ইচ্ছে হলে সবাই সবাইকে সাহায্য করতে পারে। অপরকে সম্মান করলে নিজের ভাগ্যেও সম্মান জুটে যায়। তাই মাঝে মাঝে জমি-জমার সীমানা কিংবা একের জমির ফসল অপরের গরু-ছাগলে নষ্ট করলে পরে সামান্য বিবাদ-বচসা হলেও একেবারে মারামারি লেগে যায় না। বলতে গেলে মোটামুটি স্বাভাবিকভাবেই তাদের প্রতিদিনের কাজকর্ম চলছে।
তবে এতোটুকু শান্তির মাঝেও জিনরাজা একটা একটা মানুষ শেষ করে দিচ্ছে। অন্য পাড়া থেকে পূর্বপাড়ায় মানুষ মারা যাচ্ছে বেশি। সবাই মিলে এর একটা কারণও খুঁজে বের করেছে। তাহলো, পূর্বপাড়া বিলেরও খুব কাছে আবার ছাড়াবাড়িরও খুব কাছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই পূর্বপাড়া ছেড়ে দক্ষিণ অথবা উত্তর পাড়াতে এসে সপরিবারে বাড়ি করেছে। আর ফেলে এসেছে তাদের পুরনো বাড়ি। বলতে গেলে সেগুলোও এখন ছাড়াবাড়িতে পরিণত হয়েছে। বাড়িজুড়ে গাছপালা, লতাপাতা, বন-জঙ্গল বাড়িগুলোকে ছেয়ে ফেলেছে। এসব বাড়ির পাশের বাড়ির লোকেরাও পূর্বপাড়া ছাড়ার কথা ভাবছে।
তাদের এই ঘোর বিপদে একমাত্র মাদবার সাহেবই তাদের ভালো-মন্দের খোঁজখবর রাখেন। মাঝে মাঝে লোক-লস্কর নিয়ে পূর্বপাড়ায় ঘুরে যান। কারো অসুখ-বিসুখ থাকলে ভালো কবিরাজের চিকিৎসা নেয়ার জন্য কিছু টাকাও দিয়ে যান। এই তো ক’দিন আগেও আলেপের কড়া জ্বর হয়েছিলো। তা ছাড়া শীতটাও বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। তাই দয়াপরবশ হয়ে মাদবর সাহেব টাকা তো দিয়ে গেলেনই আবার তার একলোকের মারফত নিজের ঘরের বেশ আরামদায়ক একটা কম্বলও পাঠিয়ে দিয়েছেন। কবে কোন কালে তিনি নাকি ঢাকা শহরে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে নিজের পরিবারের জন্য তিনটি বিলাতি কম্বল কিনে এনেছিলেন। তারই একটা পেয়ে সেদিন আলেপ প্রায় কেঁদেই ফেলেছে। খুশিতে গদগদ হয়ে সে তার গিন্নিকে বলেছিলো আহা! মাদবর সাহেব না থাকলে গাঁয়ের লোকের কী বিপদ-আপদইনা হতো! আল্লাহ তাকে অনেক অনেক দিন বাঁচিয়ে রাখুন।
হঠাৎই একদিন দেখা গেলো, যে লোকের মারফত মাদবর সাহেব আলেপকে বিলাতি কম্বল পঠিয়েছিলো সেই লোকটাই প্রায় একহাত জিহ্বা বের করে সেই কুখ্যাত ছাড়াবাড়ির বটগাছের ডালে ঝুলে আছে। মনে হচ্ছে, তাকে এমনভাবে গলা চিপে মারা হয়েছে যে, তার চোখ দুটো কোটর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে যেতে চাইছে।
এই নিয়ে অচিনগাঁয়ের ঘরে ঘরে আবার নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নিজের কাজের মানুষ এভাবে বদজিনের কবলে পড়লো! এ কথা বলে বার বার কপাল চাপড়ে আফসোস করছেন মাদবর সাহেব। একদিন তো কোনো দানাপানি মুখেই তোলেননি। তার কেবল একটাই কথাÑ আমার কতো বিশ্বাসী মানুষটা এভাবে বদজিনের হাতে মরলো! আহারে, তার আগে আমার কেন মরণ হলো না।
তিনি গাঁয়ের লোককে বললেনÑ এবার আর সাধারণ ভোগ দিলে হবে না, বদজিনের রাজাকে অনেকদিনের জন্য খুশি রাখতে এবার একটা গরু জবাই করে খিচুড়ি পাকিয়ে ভোগ দিতে হবে। গ্রামবাসীর এ ব্যাপারে বেশি ভাবতে হবে না। আমার গোয়ালের সবচেয়ে কচি গরুটাই আমি দিয়ে দিলাম। তোমরা সবাই মিলে মণখানিক পোলাওয়ের চাল আর মণখানিক মুগডালের ব্যবস্থা করো। জানোই তো বদজিনের রাজার লোকলস্কর অনেক। তা ছাড়া এবার তোমাদেরও কম খেলে চলবে না। সবাই পেট পুরে খেয়ে বাকিটা আমরা ভোগ দেবো ওই ‘শনিরতলা’তে।
ব্যাস শুরু হয়ে গেলো ঘরে ঘরে পোলাও চাল তোলার আয়োজন। যাদের ঘরে পোলাওয়ের চাল নেই তারা পাড়াপ্রধানের হাতে নগদ টাকা তুলে দিলো যেন তিনি হাট থেকে পোলাওয়ের চাল কিনে আনতে পারেন। একইভাবে যাদের ঘরে মুগডাল নেই, তারাও নগদ টাকা দিয়ে যেন মহাসওয়াবের কাজ করলেন!
বেশ ধুমধামের সাথে মাদবর সাহেবের গরু জবাই দিয়ে বেশি করে ঘি মিশিয়ে খিচুড়ি পাকানো হলো। ঘিয়ের ব্যবস্থা মাদবর সাহেবই করেছেন। চারদিকে মৌ মৌ ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়েছে। আজকের খিচুড়ির স্বাদই আলাদা। গ্রামের সব নারী-পুরুষ ও ছেলে-মেয়েরা পেটপুরে খিচুড়ি খেল। মাদবর সাহেবও খেয়ে ঢেঁকুর তুলে বললেনÑ কী সর্বনাশের কথা বলো, শেষ পর্যন্ত আমার কাজের লোকের গায়ে হাত দিয়েছে বদজিনেরা। নাজানি কবে আবার আমার পরিবারের কাকে ঘাড় মটকে মারে। না, না, না। তা আর হচ্ছে না। এবার এমন ভোগের ব্যবস্থা করেছি, বদজিনের রাজা খুব খুশি হবেন। সহজে আমাদের আর কোনো ক্ষতি করবেন না।
তা ছাড়া আজ আমি তোমাদের একটা মন্ত্র শিখিয়ে দেবো। তোমরা সে মন্ত্র পড়ে আমার বাড়ির টিউবওয়েলে ফুঁক দেবে। দেখবে আজ টিউবওয়েল থেকে খুব মিষ্টি পানি উঠে আসবে। শুধুমাত্র হাতের আজলা ভরে তোমরা সে পানি পান করবে। তাতে অনেকক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের মুখও মিষ্টি মিষ্টি লাগবে। এই অবস্থায় আমরা আজকের মজাদার ভোগ নিয়ে যাবো শনিরতলায়। সেখানে তপযপ শেষ করে কলাপাতায় ভোগ সাজিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসবো।
সন্ধ্যায় ফেরার কথা শুনে ভয়ে চুপসে গিয়ে একজন বলে উঠলোÑ সে কী কথা হুজুর! তাহলে আর একজনকেও জান নিয়ে ঘরে ফিরে আসতে হবে না।
মাদবর সাহেব একগাল হেসে বললেনÑ না, না। আজ আর সে ভয় নেই। আজ শুধু উন্নত মানের ভোগ নিয়েই যাচ্ছি না, তোমাদের অমৃতসম মন্ত্রপড়া কলের মিষ্টি পানি পান করিয়ে নিচ্ছি। এই পানি যতক্ষণ পেটে থাকবে আর তোমাদের মুখ মিষ্টি মিষ্টি থাকবে, ততক্ষণ বদজিনের বাবাও তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। তা ছাড়া তোমাদের মিষ্টি মুখে আজ বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চোখ বন্ধ করে যে তপযপ করবে তাতে এমনিতেই বদজিনের রাজা খুশিতে বাগবাগ হয়ে থাকবেন।
মাদবর সাহেবের কথায় সবাই নতুন করে সাহস ফিরে পায়। এবার শুরু হয় নতুন মন্ত্র শেখার পালা। প্রথমে মাদবর সাহেব সবাইকে বাড়ির উঠানের দক্ষিণ কোণে অবস্থিত টিউবওয়েলের দিকে মুখ ফেরাতে বললেন। সবাই সেদিকে মুখ ফেরালে তিনি বললেনÑ এবার সবাই হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড় এবং দুচোখ বন্ধ কর।
মাদবর সাহেবের কথামত সবাই দুচোখ বন্ধ করলে তিনি এমনসব বাক্য বললেন, যার আগামাথা কেউ বুঝলো না। কেবল মাদবর সাহেবের সাথে সাথে উচ্চারণ করে গেলো। এবার মাদবর বাজখাই কণ্ঠে চিল্লিয়ে বললেন ওম্ মাম্ মাম্ মিঠা মিঠা জম-জম, জম-জম, ফাক্কা! ওম্ মাম্ মাম্ মিঠা মিঠা জম-জম, জম-জম, ফাক্কা!! ওম্ মাম্ মাম্ মিঠা মিঠা জম-জম, জম-জম, ফাক্কা!!!
তার আকাশ ফাটানো আর বাতাস কাঁপানো চিৎকারে অনেকের চোখ মুহূর্তের জন্য খুলে গেলেও ভয়ে দাঁত-মুখ খিচে আবার চোখ বন্ধ করে রইলো। এরপর সব নিথর নিস্তব্ধ। মনে হলো কারো নিশ্বাসও যেন পড়ছে না। মাদবর সাহেবের কণ্ঠও আর শোনা যাচ্ছে না। এভাবে কয়েক মিনিট কেটে যাবার পর ‘হক মাওলা হক’ বলে মাদবর সাহেব চিল্লিয়ে উঠে সবাইকে হুকুম করলেন একে একে উঠে গিয়ে টিউবওয়েলের মাথায় একটা করে জোরে ফুঁক মেরে এসে নিজ নিজ জায়গায় বসে পড়।
তার হুকুমে বুড়ো, জওয়ান, তরুণ-তরুণী, শিশু-কিশোর সবাই একে একে টিউবওয়েলের মাথায় একটা করে জোরে ফুঁক মেরে এসে নিজ নিজ জায়গায় বসে পড়লো। মাদবর বললেন এবার দুইজন করে কলের কাছে যাও। একজনে কল চাপবে অপর জনে আজলা ভরে মিষ্টি পানি পান করবে। এভাবে দুইজন দুইজন করে সবাই পানি পান করে নাও।
ব্যাস, শুরু হয়ে গেলো পানি পান করা আর অবাক হবার পালা। সবাই বলাবলি করতে লাগলো একি কান্ড রে বাবা! সারাদিন এই কলের পানি দিয়ে কাজ করলাম, পান করলাম তখন পানি মিষ্টি লাগলো না, এখন যে জবর মিষ্টি! তা ছাড়া এই পানি দিয়েইতো ভোগখিচুড়ি রান্না হলো। তাও মিষ্টি হলো না। অথচ এখন এমন মিষ্টি পানি এলো কোত্থেকে! তাও যা তা মিঠা নয়, মুখসহ মিষ্টি হয়ে গেছে। মনে হয় রসগোল্লার শিরা খেয়ে মুখ ভরেছি।
একজন বললো এজন্যই তো বলি, আমাদের মাদবর সাহেব আসলে বিরাট বুজুর্গ মানুষ, একেবারে কামেলে-কামেল!
আরেকজন বললো আরে বোকা এজন্যই তো আমাদের গাঁয়ের মানুষ জানে-প্রাণে বেঁচে আছি। নইলে বদজিনেরা কবেই গাঁ উজাড় করে দিতো।
সবার মন্তব্য শুনে মাদবর সাহেব একটু লজ্জিত হয়ে বললেন দূর ছাই, তোমরা কী যে বলো! আমি হলাম অধম মানুষ, বলতে পারো তোমাদের একজন নাখান্দা খাদেম মাত্র। যাক আমার অনেক প্রশংসা শুনলাম। এতে কোনো লাভ নেই। তারচেয়ে সকল পাড়ার মেয়েমানুষ আর শিশু-কিশোররা যার যার বাড়িতে ফিরে যাও। কেবলমাত্র বুড়ো আর জওয়ান পুরুষেরা চলো শনিরতলায়।
মাদবর বলতে দেরি, হুকুম তামিল হতে দেরি হলো না। সব মহিলা আর শিশু-কিশোররা যার যার বাড়িতে ফিরে গেলো। এবার মাদবর সাহেবের নেতৃত্বে কলাপাতার বোঝা এবং ভোগের খিচুড়ি নিয়ে পুরুষরা বিরাট মিছিলের মত চললো ছাড়াবাড়ির দিকে।
তারপর মাদবর সাহেবের শিখানো নিয়ম কানুন মেনে খিচুড়ি ভোগ দিয়ে সবাই সন্ধ্যার পর পরই ফিরে এলো যার যার বাড়িতে।
কিন্তু রাতের অন্ধকারে সেদিন শনিরতলায় দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো আগুনের লেলিহান শিখা। অচিনগাঁয়ের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেলো ভীষণ হৈ-হল্লা, অট্টহাসি, চিৎকার-চেঁচামেচি আর গান-বাজনার আওয়াজ। গাঁয়ের মানুষ আরামের ঘুম হারাম করে কেবল ফিসফিসিয়ে একে অপরকে বললো দেখেছো, সত্যি সত্যি আজ বদজিনের রাজা খুব খুশি হয়েছে। আমাদের মাজাদার ভোগ খেয়ে আজকে জিন-পরীরা মহা-আনন্দে মেতে উঠেছে। ওরা হলো আগুনের তৈরি। আগুন না হলে কি ওদের আনন্দ জমে। তাইতো মনে হচ্ছে পুরো ছাড়াবাড়ি জুড়েই যেন আগুন আর আগুনের শিখা। কিন্তু এসব কাছে গিয়ে দেখতে নেই। তাহলেই হলো আর কী! যে দেখতে যাবে তাকেই ওরা আগুনে ঝলসে খাবে।

পাঁচ.

এ দিকে হয়েছে কী! আলোকপুরীতে এশার আজান হয়েছে মাত্র। নামাযের জন্য যারা ঘর থেকে বেরিয়েছেন তারা বহুদূর থেকে পাশের গাঁয়ে এতো বিশাল আগুনের শিখা দেখে ভাবনায় পড়ে গেলেন। আলোকপুরীর মানুষেরা ভাবলেন, অচিনগাঁয়ের কোনো পাড়ায় নির্ঘাত আগুন লেগেছে। তারা হায় আফসোস করলেন। এশার জামাতে এসে সপ্তরত্নের নজরেও পড়লো দৃশ্যটা। ওরা ভাবলো দূর আর কতটুকু, আমরা ছুটে গেলে অচিনগাঁয়ের লোকদের আগুন নেভাতে সামান্য হলেও সাহায্য করতে পারবো। শত হলেও তারাও তো মানুষ।
যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। কাউকে কিছু না বলে একবুক সাহস নিয়ে ওরা প্রত্যেকে একটা করে মাঝারি আকারের বালতি আর শক্তপোক্ত মোটা লাঠি নিয়ে ছুটলো অচিনগাঁয়ের দিকে।
দিগন্তজোড়া কোমর সমান সরিষা আর মানুষ সমান ভুট্টা ক্ষেতের পাশ ঘেঁষে ওরা মাত্র এক কিলোমিটারের মত এগিয়েছে। অমনি ওদের থেকে মাত্র দু’শ মিটার দূরে ডানপাশে একটা হিজল গাছের আড়াল থেকে একটা আগুনের গোলক বেরিয়ে এলো। আগুনের গোলকটা দেখে থমকে দাঁড়ালো সাতরতœ। গোলকটা দ্রুত ওদের দিকেই এগিয়ে আসছে। ভয়ে সবার শরীর কাঁটা মেরে উঠলেও কেউ সাহস হারালো না। ওদের দলনেতা আবির চোখে একটু কম দেখলেও বুদ্ধিতে সবার সেরা। আবির বললো কেউ একটুও শব্দ করিস না। আমাকে ফলো করে নীরবে ভুট্টা ক্ষেতে ঢুকে পড়। তবে চোখ-কান খোলা রাখা চাই। খুব সাবধান।
ততক্ষণে আগুনের গোলাটা ওদের কাছাকাছি চলে এসেছে। ওরা আর দম ফেলতেও সাহস করলো না। সাতরত্নের একরত্ন মুয়াজ। ওর দৃষ্টিশক্তি যেমন প্রখর তেমনি কানটাও খুব সজাগ। ও ছিলো ভুট্টা ক্ষেতের আলের খুব কাছাকাছি। হঠাৎ মুয়াজ নিঃশব্দে ফিক করে হেসে আবিরের কানে কানে বললো যত্তসব! এযে হারিকেনের আলো। দশ-বারো জনের একটা কাফেলা। একজনের হাতে কেবল হারিকেন। আর সবার হাতে মনে হলো আমাদের মতোই মোটা লাঠি। দুয়েকজনের হাতে আবার বড় আকারের রাম দা দেখা যাচ্ছে।
সাথে সাথে আবির মুয়াজের মুখ চেপে ধরে বললো লোকগুলো আমাদের মত অচিনগাঁয়ের লোকদের সাহায্য করতে যাচ্ছে বলে মনে হয় না। ওরা মনে হচ্ছে ডাকাতের দল। নাজানি অচিনগাঁয়ের লোকদের বিপদের সুযোগে কোন বাড়িতে গিয়ে ডাকাতি করবে।
মুয়াজ নিজের মুখ থেকে আবিরের হাত সরিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো তাহলে তো এদের গতি রোধ করতে হয়।
আবির বললো ক্ষেপেছিস? আমরা মোটে সাতজন। ওরা দশ-বারো। তা ছাড়া কয়েকজনের হাতে রাম দা! তাকি দেখেছিস। তাহলে আর অত সাহস দেখাচ্ছিস কেন?
মুয়াজ বললো আমরা কি আর ওদের সাথে একবারে লাগতে যাবো। পেছন থেকে একজন-একজন করে মুখ জাপটে ধরবো আর আচ্ছা করে কিলিয়ে আধমরা করে বেঁধে ফেলবো।
আবির আবারও বাধা দিয়ে বলে না, এতো সাহস দেখিয়ে কাজ নেই। তার চেয়ে তুই আর নাহিদ কোনাকুনি পথ চলে ওদের কাছাকাছি চলে যা। নিঃশব্দে ওদের পরিকল্পনা বুঝতে চেষ্টা কর। তবে সাবধান, গাধার মত উল্টাপাল্টা কিছু করে জানে মরিস না। আর আমরা এগোতে থাকি আগুনের শিখার দিকে। তোরা মোটামুটি খবরসবর নিয়ে আগুনের শিখার কাছে চলে আসবি। আরেকটা সাবধান করে দিচ্ছি। তোদের হাতের টর্চ একেবারেই জ্বালবি না। একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার নেই। দেখেশুনে নীরবে পথ চললেই হবে। তবে তোদের বালতি দুটো আমাদের কছে রেখে যা।
আবিরের পরামর্শ মতো সাহসে বুক ফুলিয়ে মুয়াজ আর নাহিদ ঠিক বিড়ালের মত নিঃশব্দে পা ফেললো। কোনাকুনি পথে খুব কাছাকাছি চলে গেলো লোকগুলো। এতক্ষণে বেশ খোশ মেজাজে চওড়া কণ্ঠে ওরা আলাপচারিতা জুড়ে পথ চলছে। অনেকটা দমবন্ধ করার মতো নীরবতা বজায় রেখে মুয়াজ আর নাহিদ ওদের পিছু পিছু খানিকটা পথ চললো। হঠাৎ ক্ষেতের আলে পা হরকে নাহিদ পড়ে গেলো একটা ভুট্টা ক্ষেতে। সাথে সাথে সরসর করে একটা আওয়াজ উঠলো। হায় সর্বনাশ! মুহূর্ত দেরি না করে মুয়াজ টানটান হয়ে শুয়ে পড়লো সরিষা ক্ষেতের আলে। ওদিকে নাহিদ যেমনি পড়েছে একটুও ওঠার চেষ্টা না করে নাক মুখ বুজে উপুড় হয়ে পড়ে রইলো সেখানেই। কিন্তু কাফেলার একজন চমকে উঠে বললো ‘সর্দার, আশপাশে কিছু পড়ার শব্দ পাইলাম যেন।’
সাথে সাথে মোটা ও কর্কশ কণ্ঠের একজন চিৎকার করে বললো ‘ফেউ! ফেউ লাগছে নাকি আবার। দেখ তো কোন আহাম্মক! এককোপে ওর কল্লা ফালাইয়া দে।’
বলতে দেরি নেই, অমনি দু’তিনজন হৈ হৈ শব্দে রামদা উঁচিয়ে ছুটে এলো ভুট্টা ক্ষেতের দিকে। ওদের হল্লা শুনে ভুট্টা ক্ষেতের মাঝে লুকিয়ে থাকা একটি শিয়াল ক্ষেত থেকে বেরিয়ে ওদের সামনে দিয়েই পড়িমরি দৌড়! একদৌড়ে সরিষা ক্ষেতের ভেতর দিয়ে ছুটে সামনের দিকে পালিয়ে গেলো। তাই দেখে লোকগুলো হো হো করে হেসে বললো ‘সর্দার, এইটা তো পাতি শিয়াল।’
সর্দার ধমকের স্বরে বললো ‘যত্তসব আপদ, চল চল, সামনে চল’।
ব্যাস, ওরা ফিরে গেলো কাফেলার সাথে। ততক্ষণে নাহিদ সাবধানে উঠে ভুট্টা ক্ষেতের আড়ালে দাঁড়িয়ে গেছে। অমনি ওর ঘাড়ের ওপর কার গরম নিঃশ্বাস পড়তেই চমকে ওঠে পড়ে নেয় ‘লা-ইলাহা ইল্লা আনতা সোবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জ্বোয়ালেমিন’। সাথে সাথে মুয়াজ খিক্ খিক্ করে হেসে বলেÑ কিরে, এই সাহস?
নাহিদ মিছে রাগ দেখিয়ে বলে যা, ফাজলামো করবি না। জানিস না এটা বদজিনের এলাকা। আমি তো…।
জিনের নিঃশ্বাস তোর ঘাড়ে পড়েছে। এই তো ভেবেছিলি? আরে বোকা, শিয়ালটা দৌড়ে পালাতেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমাদের বিপদ কেটে গেছে। তাই সরিষা ক্ষেত থেকে উঠে এসে অন্ধকারে তোর খোঁজ করছিলাম। তুই যে এখানেই উঠে দাঁড়াবি তা ঠিক বুঝতে পারিনি। যাক, বিপদ কিন্তু চলে গেছে। -বললো মুয়াজ।
নাহিদ বললোÑ আমাদের যা বুঝবার তা বুঝে গেছি। এখন জলদি ডানের আল ধরে দ্রুত এগিয়ে যাওয়া দরকার। আবিরদের থামাতে হবে। আসলে বুঝলি তো, অচিনগাঁয়ে আগুন-ফাগুন কিছুই লাগেনি। আমাদেরও আর ওখানে গিয়ে কাজ নেই। আর জান থাকে তো কোনোদিন রাতেরবেলা আমরা অচিনগাঁয়ের দিকে যাত্রা করবো না। চল চল জলদি পা চালা। আবিরদের কাছে যত তাড়াতাড়ি পৌঁছা যায় ততই ভালো।
ব্যাস, আর এক মুহূর্ত নষ্ট নয়। দু’জন টর্চ জ্বেলে জ্বেলে প্রায় দৌড়ে ছুটলো আবিরদের থামাতে।

ছয়.

প্রতিদিনের মত সিমলা থানায় যথারীতি কাজকর্ম শুরু হয়েছে। থানার ওসি মোহাম্মাদ রবিউল অভ্যাসমত খবরের কাগজের শিরোনামগুলোর ওপর নজর বুলাচ্ছিলেন। অমনি সময় সিপাই এসে সালাম দিয়ে বললো স্যার, সাতজন কলেজছাত্র আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে। তাদের ভেতরে আসতে বলবো?
ওসি মোহাম্মাদ রবিউল খবরের কাগজ থেকে মাথা তুলে বললেন ওরা কী জন্য দেখা করতে চায়? বলছে কিছু?
না স্যার, শুধু বলেছে, খুব নাকি জরুরি ব্যাপার। -বললো সিপাই।
ওসি বললেন আচ্ছা, ভেতরে পাঠাও। দেখি কী বলতে চায়।
অনুমতি পেয়ে আবির আর মুয়াজ তাদের পুরোবাহিনী নিয়ে ওসি সাহেবের রুমে ঢুকে বেশ আদবের সাথে সালাম বিনিময় করলো। তারপর ওসি রবিউল সাহেবের কাছে অচিনগাঁয়ের লোকদের বিবাদ মিটমাটের কাহিনীসহ গত রাতের সব ঘটনা খুলে বললো। আবির জানালো, আসলে অচিনগাঁয়ের ওই শনিরতলা হিসেবে পরিচিত বটগাছটা মনে হচ্ছে ডাকাতদের আস্তানা।
ওসি বললেন আমি তোমাদের থানায় নতুনমাত্র জয়েন করেছি। তবে এখানে এসে অচিনগাঁয়ের শনিরতলার অতীতের ইতিহাস শুনে আমারও বেশ সন্দেহ হয়েছে। তোমরা এতক্ষণ যা যা বললে, তা যদি সত্যি হয় তাহলে তোমাদের আমি আরও কিছু দায়িত্ব দিতে চাই। সে দায়িত্ব পালন করতে রাজি আছো তো?
ওসি সাহেবের কথায় চমকে ওঠে আবির আমরা তো আপনাকে একটা খবর এনে দিলামই। আমরা তো সাধারণ ছাত্র, আপনাকে আমরা কিভাবে সাহায্য করবো স্যার?
ওসি সাহের মুচকি হেসে বললেন আরো একটু খবরসবর চাই। যেখানে আমার পুলিশ গেলে অপরাধীরা সাবধান হয়ে যেতে পারে, সেখানে আমরা গোয়েন্দা পুলিশ পাঠাই। কিন্তু অচিনগাঁ এতো ছোটগ্রাম যে, ওখানে লোকসংখ্যা খুবই কম। আমাদের গোয়েন্দারা সহজেই মানুষের নজরে পড়ে যায়। তোমরা ছাত্র। তোমরা বললে তোমরা ওদের একটা বিবাদও মিটমাট করে দিয়েছো। তাতে ওই গাঁয়ের পাড়াগুলোর প্রধান এবং কিছু সাধারণ মানুষের সাথে তোমরা পরিচিত হয়েছো। ওখানে মাঝে মাঝে তোমরা যাওয়া আসা করলে এবং তাদের ভালো-মন্দ খবরাখবর নেবার ছলে আরও কিছু গোপন তথ্য আমাকে এনে দিলেও কেউ তোমাদের সন্দেহ করবে না। আর যদি বদজিন-পরীর ব্যাপার-স্যাপার কিছু থেকেও থাকে সে জন্য তোমরা রাতে আর ওই গাঁয়ে যাবে না। দিনে দিনে গিয়ে দিনে দিনে চলে আসবে।
আবির বিনয়ের সাথে জানতে চায় যদি রাতেও যাবার দরকার হয়?
ওসি বললেন সেটা আমি ভাববো। তবে আমার সাথে তোমাদের যোগাযোগের কথা তোমাদের গ্রামের কাউকে জানাবে না। এমনকি আপাতত তোমাদের অভিভাবকদেরও জানাবে না। কি মনে থাকবে তো?
জি স্যার!
ওসি একটু হেসে বললেন এবার তাহলে কাজের কথায় আসি। এই বলে তিনি আবিরদের সাথে অনেক পরামর্শ করলেন। বুঝিয়ে দিলেন অনেক কাজ। শেষে সবাইকে চা-বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়ন করে বিদায় জানালেন। আর বিদায়ের সময় বললেন আজকের থেকে তোমরা হলে আমাদের সাত গোয়েন্দা। সব সময় সতর্ক থাকবে।
আবিররা সালাম বিনিময় শেষে নিজেদের কাজ গুছিয়ে নিতে ওদের সমিতির ঘরে এসে বসে গেলো পরামর্শ সভায়। এ সময় এদিকটায় কেউ আসে না। বিকেল হলে মূলত শুরু হয় সমিতির কাজ। সে সুবাদে ওরা নিশ্চিন্তে সমিতি ঘরকেই বানালো সাতগোয়েন্দার হেডকোয়ার্টার। অনেকক্ষণ ধরে চললো সাতগোয়েন্দার মিটিং। পরামর্শ শেষে সাতগোয়েন্দা তিনটি দলে ভাগ হয়ে ওসি সাহেবের শিখিয়ে দেওয়া কৌশল অবলম্বন করে বেরিয়ে গেলো অচিনগাঁয়ের উদ্দেশে। চলতে থাকলো তাদের অবিরাম অভিযান।
সাত.

সাত গোয়েন্দা টানা কয়েক দিনের মিশন শেষ হলে হঠাৎই একদিন সকালবেলা অচিনগাঁয়ের মানুষেরা অবাক হয়ে জানতে পারলো, শনিরতলা বদজিনের রাজ্য ধ্বংস করে দিয়েছেন সিমলা থানার পুলিশের নতুন ওসি মোহাম্মদ রবিউল সাহেব। আর এই বদজিনের রাজ্য-রহস্য উদঘাটনে সাহায্য করেছে আলোকপুরীর সেই সপ্তরত্ন, যারা একদিন বড়গলায় বলেছিলো আমরা ইনশাআল্লাহ আপনাদের গ্রামের খারাপ জিন-পরীগুলোকে তাড়িয়েই ছাড়বো।
এ কথা শুনে কুসংস্কার, অশিক্ষা ও মাদবরের শেখানো কুশিক্ষার শিকার অন্ধকারাচ্ছন্ন অচিনগাঁয়ের মানুষদের খানিকটা টনক নড়লো। তারা অনেকেই বুঝতে পারলো, আসলে শনিরতলায় বদজিনের রাজ্য বলে কিছুই ছিলো না। কিন্তু কিছু লোক তখনও বিশ্বাস করতে চাচ্ছিলো না যে, আসলেই শনিরতলায় কোন বদজিন ছিলো না অথবা এখন আর সেখানে কোন বদজিন নেই।
তখন বাধ্য হয়ে ওসি সাহেব অচিনগাঁয়ে সদলবলে উপস্থিত হয়ে বললেন সবকিছুই আপনাদের সামনে দিনের মত পরিষ্কার হয়ে যাবে। গাঁয়ের পাড়াপ্রধান যারা আছেন তারা প্রত্যেক পাড়ার বুড়োমানুষ থেকে সকল যুবক, তরুণ এবং কিশোরদের সাথে নিয়ে এক ঘণ্টার মধ্যে ছাড়াবাড়িতে উপস্থিত হবেন। সেখানে কোন নারী এবং শিশুকে আনবেন না।
পাড়ায় পাড়ায় টিন পিটিয়ে ওসি সাহেবের আদেশ জানিয়ে দেওয়া হলো। দূর থেকে শত শত পুলিশ দেখে সাহস করে সবাই জড়ো হলো ছাড়াবাড়ির বিশাল প্রাঙ্গণে অবস্থিত শনিরতলা নামের বটগাছটাকে ঘিরে। তখন ওসি সাহেবের নির্দেশে একজন পুলিশ অফিসার বললেন আপনাদের আজ আর কোনো ভয় নেই। আপনাদের এই শনিরতলার বদজিনের রাজা এবং বদজিনের গোষ্ঠীসহ সবগুলোকে ধরে আমরা বন্দি করে ফেলেছি। জিনগুলোকে আজ আপনাদের সামনে এনে দেখানোও হবে।
পুলিশ অফিসারের কথা শুনে অচিনগাঁয়ের এক পাড়াপ্রধান অবাক হয়ে বললোÑ এইটা আবার কেমন কথা! জিনকে আবার চোখে দেখা যায় নাকি!!
অমনি ওসি সাহেবের নির্দেশে ঠিক নাটকের মত শুরু হলো একটার পর একটা ঘটনা। প্রথমেই বটগাছের একটা মোটা ডালের ওপর হ্যান্ডমাইক হাতে দাঁড়ালো মুয়াজ। ও বলতে শুরু করলোÑ সপ্তাহখানের আগেকার কথা। একরাতে আপনাদের গাঁয়ে আগুন লেগেছে মনে করে আমরা সাত বন্ধু আপনাদের সাহায্য করতে ছুটে আসছিলাম।
কিন্তু পথে একটা কাফেলার প্রায় সামনা সামনি পড়ে যেতে আমরা ভয়ে ভুট্টা ক্ষেতে লুকিয়ে পড়ি। কৌশলে আড়ি পেতে বুঝতে পারলাম আসলে ওটা ডাকাতের কাফেলা। তারপর খুব সাবধানে ও কৌশলে ওদের অনুসরণ করে ওদের আসল উদ্দেশ্যটা জেনে যাই। তাতে আমাদের মাঝ থেকে আপনাদের গাঁয়ের জিনের ভয়টাও কেটে যায়। সত্যি বলতে কী, আমরাও আপনাদের গাঁয়ের বদজিনের আসর আছে জেনে মনে মনে সামান্য ভয় পেতাম। তবে এখন ভয়টা পুরোপুরি কেটে গেছে।
সে যা-ই হোক, পরের দিন আমরা ওসি সাহেবকে সব জানিয়ে দেই। ওসি স্যারের পরামর্শেই আমরা কয়েকদিন যাবৎ এই গাঁয়ে আসা যাওয়া করছি। আপনাদের কুশল জানার সুযোগে আমরা শনিরতলার আসল রহস্যটাই খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম।
গতকাল দুপুরবেলা আমি আর নাহিদ ফকির সেজে আপনাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বটগাছের তলায় এসে হাজির হই। প্রথমে পুরো ছাড়াবাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখি। তারপর এই বটতলা মানে শনিরতলাতে এসে এখানের আসল পরিবেশটা বুঝার চেষ্টা করি। অমনি হঠাৎ চোখে পড়ে যায় বটগাছের পেছনের দিকে অবস্থিত একটা শেয়ালের গর্ত। কিন্তু আমরা গভীরভাবে খেয়াল করে দেখতে পেলাম, গর্তের মুখে খানিকটা নরম মাটিতে মানুষের জুতার তলার ছাপ লেগে আছে। ভাগ্যিস গত রাতে আপনাদের গাঁয়ে সামান্য বৃষ্টি হয়েছিলো। তো, জুতার ছাপ দেখে আমরা উৎসাহ নিয়ে শেয়ালের গর্তে উঁকি মারি। আর তাতেই আমরা তাজ্জব হয়ে বনে থ হয়ে যাই। আপনারা তো সারা জীবনই এখানে ভোগ দিতে এসেছেন, কিন্তু কেউ কি কখনও এই শিয়ালের গর্তটা দেখেছেন?
মুয়াজের প্রশ্ন শুনে একজন পাড়াপ্রধান হাসান আলী বললো ওরে বাবা, বলে কী! আমরা এখানে এসে ভয়ে দুরু দুরু বুকে কোনমতে তপযপ করি। তারপর বদজিনের রাজাকে ভোগ দিয়ে নিজেদের জান নিয়ে পালাই। তা আবার শেয়ালের গর্ত খুঁজবো কখন?
পাড়াপ্রধানের কথা শুনে মুয়াজ আবার বলতে শুরু করে ফকিরের বেশে ছাড়াবাড়িতে এসে শিয়ালে গর্তে উঁকি মেরে তো আমরা আরো তাজ্জব। আমাদের বুঝতে দেরি হয় না যে, এটা শিয়ালের গর্ত হলেও এখানে এখন আর শিয়াল থাকে না। এই গর্তটা এখন দুষ্টলোকের আস্তানা। আমি আর নাহিদ তখন শক্ত হাতে লাঠি ধরে খুব সাবধানে এই আস্তানার ভেতরে ঢুকে যাই। সামান্য ভেতরে ঢুকে আমরা আরো অবাক হয়ে দেখতে পাই যে, এই গর্তের প্রবেশপথটা খুবই সরু হলেও ভেতরে তা অনেক চওড়া। এটা দেখে আমরা আরো সাবধানে এগিয়ে যাই। অমনি আমাদের কানে আসে একবৃদ্ধ লোকের কাতরকণ্ঠ। সাথে সাথে আমরা মাটির দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে যাই। কান খাড়া রেখে শুনতে পাই একটা কর্কশ কণ্ঠ। সে বৃদ্ধকে ধমক মেরে বলছেÑ ওরে বুড্ডা তুইতো এখন বুঝতেই পারছিস যে, আমরা কারা। আমরা হলাম ডাকাত রে ডাকাত! আমি এই ডাকাতদের ছোট সর্দার। হাঃ হাঃ হাঃ। তোকে ধরে এনেছি তোর ছেলেকে আমাদের সাথে কাজ করতে দিবি কি-না তাই জানতে। যদি তোর ছেলেকে আমাদের ডাকাত দলে কাজ করতে দিস, তাহলে তোকে আমরাই বাড়িতে ফিরিয়ে দিয়ে আসবো। আর নাহলে তোকে জবাই করে বটগাছের ডালে ঝুলিয়ে দেবো।
বৃদ্ধ লোকটি ডাকাত সর্দারের কথায় ভয় পেয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললোÑ বাবারা তোমাদের দোহাই লাগে, আমার ছেলেকে ডাকাত বানাইও না। আমরা তো জানতাম এই ছাড়াবাড়ি জিন-পরীদের আস্তানা। তাই এমনিতেই জিনের রাজার ভয়ে সব সময় অস্থির থাকি। কিন্তু এখন যা বুঝলাম…।
ডাকাত সর্দার চিৎকার মেরে বৃদ্ধকে থামিয়ে দিয়ে দম্ভের সাথে বললো এই বুড়া! তোদের এই গ্রামের সবমানুষ মূর্খ আর বর্বর। তোরা তো বুঝিস না, আসলে আমরাই হলাম তোদের যম জিন-পরী। তোদের মূর্খতার সুযোগে এই গ্রামে; এই ছাড়াবাড়িতে আস্তানা গেড়েছি। আর একজন-একজন করে এভাবে ধরে এনে আমাদের দল বড় করছি। কিন্তু যারা আমাদের কথা শুনতে রাজি হয় না তাদের একজন একজন করে মেরে বটগাছে ঝুলিয়ে রাখি। আমাদের মন মতো না হলে এই গ্রামকে একদিন জনহীন করে দেবো। তারপর আমরা অন্যান্য গ্রাম থেকে আমাদের অন্য সদস্যদের এই গ্রামে আমাদের স্থায়ী রাজত্ব কায়েম করবো।
ডাকাত সর্দার এবং বুড়ো লোকটির কথাগুলো শুনে আমরা আর সামনে বাড়তে সাহস করলাম না। ভাবলাম হয়তো ভেতরে আরো অনেক ডাকাত আছে। তাই তাড়াতাড়ি গর্ত থেকে বেরিয়ে আমরা পথে পথে ভিক্ষা চাইতে চাইতে আসলে থানার দিকে ছুটলাম। সেখানে গিয়ে ওসি সাহেবকে সব জানালাম এবং কিভাবে তাদের হাতেনাতে ধরবো তার জন্য ফন্দি আঁটতে লাগলাম। পরদিন ওসি সাহেব আমাদের গ্রামের চেয়ারম্যান, মেম্বার ও গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে আলোচনায় বসলেন। তারপর কখন কিভাবে ডাকাতের আস্তানায় অভিযান চালাবে তা ঠিক করার পরামর্শ চলতে লাগলো। ওসি সাহেব ভাবলেন, ডাকাতদের জব্দ করতে হলে আরো পুলিশ দরকার। তিনি আরো চারটি থানার পুলিশ অফিসারদের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করলেন। তারা সাহায্য করতে রাজি হলেন।
এ দিকে আবির গোপনে খবর নিয়ে এসেছে ডাকাতদের ছোটসর্দার শনিরতলা আস্তানা দেখাশুনা করে এবং এখান থেকে বিভিন্ন গ্রামে ডাকাতি পরিচালনা করা হয়। আর তাদের বড়সর্দার মাসের শেষ শুক্রবার রাতে তাদের বন্ধু-বান্ধবদের দাওয়াত করে আস্তানায় নিয়ে আসে। তারপর ডাকাতি করা ধন-সম্পদ ভাগ-বাটোয়ারা শেষে রাত ভর আনন্দ করে।
এ কথা শুনে ওসি মোহাম্মদ রবিউল স্যার বললেন তাহলে আমরা ওই রাতটাই বেছে নিতে পারি।
সে হিসেবে সময় করা হলো রাত নয়টার মধ্যেই পুলিশ খুব সাবধানে শনিরতলা আস্তানার চারপাশ ঘিরে ফেলবে। ঠিক রাত বারোটায় পাঁচজন পুলিশ আর আমাদের গ্রামের পাঁচজন যুবক ডাকাত সেজে বটগাছতলাতে যাবে।
এই পরিকল্পনা অনুসারে মাসের শেষ শুক্রবার সন্ধ্যা হবার সাথে সাথেই আমরা ওসি সাহেবের নির্দেশমত সব প্রস্তুতি নিয়ে ফেলি। ধীরে ধীরে রাত বাড়লে ঘনিয়ে আসে ঘুটঘুটে অন্ধকার। হাত বাড়ালে হাত দেখা যায় না। এদিকে সন্ধ্যা থেকেই পাঁচ পুলিশ আর পাঁচ যুবক ডাকাত সেজে থানায় বসে আছেন। ওদিকে রাত বাড়ার সাথে সাথে ডাকাতেরাও আপনাদের গ্রামের শনিরতলা আস্তানায় এসে বেশ আড্ডা জমিয়ে ফেলেছে। আর খুবই নীরবতার সাথে চারটি থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী রাত নয়টার মধ্যেই একটু দূরত্ব বজায় রেখে পুরো আস্তানাটা ঘিরে ফেলেন। রাত বারোটার দিকে একজন দুজন করে নকল ডাকাতও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আস্তানায় প্রবেশ করে কৌশলে আসর জমিয়ে ফেললো। এরই মধ্যে দশ-বারোজন বডিগার্ড নিয়ে হাজির হলো ডাকাতদের বড়সর্দার।
আমরা যারা নকল ডাকাত সেজে আস্তানায় ঢুকেছিলাম তারা ডাকাতের বড়সর্দারকে দেখামাত্র চিনে ফেললাম। কিন্তু নিজেদের চোখকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারলাম না। আমরা আরো সাবধান হয়ে গেলাম। বড়সর্দার আসার পর গত একমাসের ডাকাতি করা সোনা-রূপা, ধন-দৌলন বিভিন্ন ছালার বস্তা থেকে এটা পাটিতে ঢালা হলো। আস্তানার ভেতরে জ্বালানো অনেকগুলো চার্জলাইটের আলোতে সেগুলো ঝলমল করতে লাগলো। বড়সর্দার নিজ হাতে ধন দৌলতগুলো ভাগ করলো এবং ছোটসর্দারসহ সব ডাকাতকে যার যার ভাগ বুঝিয়ে দিলো। সবার মুখেই মুখোশ থাকার কারণে আমরা যারা নকল ডাকাত তারাও ভাগ পেলাম। তার একটু পরই বড়সর্দার বেশ আনন্দের সাথে তিনটা হাততালি দিলো। অমনি বিপুল আনন্দ, উল্লাস আর নাচ-গানের মাঝে শুরু হলো খানাপিনা। আর আমরা আনন্দ করার ছলে কৌশলে খাবারের পানিতে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিলাম।
তাতে আস্তানার ভেতরের আসল ডাকাতেরা একে একে অজ্ঞান হতে লাগলো। সুযোগ বুঝে ডাকাতের বেশ নেওয়া একজন পুলিশ সবার চোখ এড়িয়ে আস্তানার বাইরে এসে ওসি সাহেবকে সংকেত পাঠালেন। সংকেত পেয়ে চার থানার পুলিশ কমান্ডো অভিযান চালিয়ে ঝড়ের গতিতে ডাকাতের আস্তানায় ঢুকে পড়লো। তারপর এক এক করে ডাকাতদের ধরে শক্তকরে বেঁধে ফেললো। অনেক চেষ্টা চালিয়েও ডাকাতদের ছোটসর্দার এবং বড়সর্দারও পালিয়ে যেতে পারলো না।
এ পর্যন্ত বলতেই ওসি সাহেব ইশারায় মুয়াজকে থামিয়ে দিলেন। তারপর মুয়াজের হাত থেকে হ্যান্ডমাইকটি নিজের হাতে নিয়ে বললেন- এটা হলো জিন-পরীদের আস্তানা দখল নাটকের একটা অংশ। এবার বাকিটা বলবে আমার সাতগোয়েন্দা দলের প্রধান আবির।

আট.

ওসি সাহেবের ইশারায় আবির এবার হ্যান্ডমাইক নিয়ে বটগাছের মোটাডালে দাঁড়িয়ে শুরু করলো নাটকের আরেক পর্ব। শুরুতেই আবির বললোÑ আসলে আমাদের এই সফলতার নায়ক হলেন আমাদের শ্রদ্ধেয় ওসি সাহেব। তিনিই বিজ্ঞতার সাথে পুরো অভিযান সাজিয়েছেন। তো ডাকাতদের ধরে সবগুলোকেই এখনও কিন্তু এই শিয়ালের গর্ততে রাখা হয়েছে। আপনারা মুয়াজের কাছে শুনেছেন। এই শিয়ালের গর্তটা আসলে শিয়ালের গর্ত নয়। এটা ডাকাতদের মাটির তলের আস্তানা। আমরা একে বলি আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাম্প। ডাকাতরা মাটি খুঁড়ে বেশ বড় করে এই আস্তানাটা বানিয়েছে। এই আস্তানার ভেতরে এখন ডাকাতদের বড়সর্দার, ছোটসর্দার এবং সব ডাকাত সদস্য মিলে মোট বত্রিশজনকে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে। এই শয়তানগুলোকেই আপনারা অশিক্ষা-কুশিক্ষা আর কুসংস্কারের কারণে জিন-পরী বলে মনে করতেন। আসলে ওরা আপনাদের আশপাশের গ্রামের দুষ্ট লোক। তাদের মাঝে আপনাদের গ্রামেরও কয়েকজন আছে। কিন্তু কুসংস্কারের কারণে আপনারা মনে করতেন যে, তাদেরকে জিনরা ধরে নিয়ে ঘাড় মটকে খেয়ে ফেলেছে। এবার দেখুন তাদের চেহারা।
এইটুকু বলে আবির থামতেই দারোগা সাহেবের নির্দেশে পুলিশরা টেনে হিঁচড়ে মোট ত্রিশজন ডাকাতকে বের করে আনলেন মাটির তলের আস্তানা থেকে। এরই মধ্যে ডাকাতদের মুখোশ খুলে নিয়েছেন পুলিশরা।
গ্রামের মানুষ অবাক দৃষ্টিতে ডাকাতগুলোকে দেখলো। আসলেই তো এরা মানুষ। এর মাঝে তিন ডাকাতকে দেখে তিন বৃদ্ধ ছুটে গিয়ে তাদের জড়িয়ে ধরে কান্না জুড়ে দিলো। ওসি সাহেব বুঝতে পারলেন এই তিন ডাকাত এই গ্রামের ছেলে। আর যারা কান্না জুড়েছে তারা ওদের পিতা। ওসি সাহের দারোগা সাহেবকে ইশারা করতেই তিনি বৃদ্ধ তিনজনকে টেনে সরিয়ে আনলেন এবং বললেনÑ আপনাদের ছেলেদেরকে আপনারা ফেরত পাবেন। তবে ডাকাতরা তাদের জোর করে দলে ভেড়ালেও তারা এখন আইনের চোখে অপরাধী। আমাদের ওসি সাহেব আছেন। তিনি সবই বুঝতে পেরেছেন এবং গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুসারে সব খবরই জানতে পেরেছেন। অন্য শয়তানগুলোর চেয়ে যাতে এদের সাজা কম হয় সে ব্যবস্থা তিনি করবেন। এখন শুধু শুধু কান্নাকাটি করে কোনো লাভ নেই। এখনও আসল নাটক বাকি রয়ে গেছে। আগে সেটা দেখেন।
এই বলে তিনি আবার আবিরকে ইশারা দিলেন। আবির বলতে শুরু করলো হ্যাঁ, এবার আপনারা দেখবেন জিনের রাজা আর তার মন্ত্রীকে। সাথে সাথে মুখোশ পরানো অবস্থায় আস্তানার ভেতর থেকে দুজনকে ওপরে তুলে আনা হলো। অমনি ওসি সাহেব মুচকি হেসে একটানে দুজনের মুখোশ খুলে ফেললেন। তাদের দেখেতো গ্রামবাসী নিজেদের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারলো না। তারা বারবার চোখ কচলে চোখ পরিষ্কার করে নিলো। এরই মধ্যে পুবপাড়া থেকে জিনের ভয়ে যারা বাড়িঘর ফেলে অন্যান্য পাড়ায় গিয়ে বসত গড়েছে তাদের বেশ কয়েকজন রাগে আগুন হয়ে গেলো।
মুহূর্তেই ছুটে গিয়ে ডাকাত সর্দারদের লাগিয়ে দিলো কয়েক ঘা জুতোর বাড়ি। বিশেষ করে পুবপাড়ার বেনু বেপারী ডাকাতের বড়সর্দারের মাথায় জুতোর বাড়ি মারতে মারতে বললো ‘এই বুঝি আমাগো জনদরদি মাদবর! তুই যে আদতে শয়তানেরও শয়তান তা মোটেও বুঝবার পারি নাই। আমাগো মিছামিছি তন্ত্রমন্ত্র শিক্ষা দিয়া নানান রকম পাপের মধ্যে ডুবাইয়া খালি খালি জিন-পরীর ডর দেখাইয়া রাখতি। আর জিনের রাজারে ভোগ দিবার নামে ভণ্ডামি কইরা আমাগো রান্ধা ভালো ভালো খাওন দিয়া তোর ডাকাত দলরে লালন-পালন করতি! ওরে শয়তানের ঘরের শয়তানরে!!
ওসি সাহেবের ইশারায় দারোগা সাহেব বেনু বেপারীকে মাদবরের কাছ থেকে সরিয়ে আনতে আনতে বললেন ঠিক আছে বেনুমিয়া, এখন সে ধরা পড়ে গেছে। এখন তার আইনমত উচিত বিচার হবে। গ্রামের অনেক লোককে হত্যার দায়ে এদের ফাঁসিও হতে পারে। আপনাদের আর চিন্তা নেই। তাই আইন নিজেদের হাতে তুলে নেবার দরকার নেই। আমরা তো আছি।

নয়.

এবার ওসি সাহেব আবিরের কাছ থেকে হ্যান্ডমাইক নিয়ে বললেন- আপনারা এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন আসলে শনিরতলাতে কোনো বদজিনের আস্তানা কখনও ছিলো না আর এখনও নেই। কেবলমাত্র মূর্খতা আর কুসংস্কারের কারণে আপনারা এতদিন বোকা হয়ে ছিলেন। আবির বাহিনীর সহযোগিতায় আজকে আমাদের শনিরতলা অপারেশন সফল হয়েছে। এখন থেকে এই শনিরতলা নামে পরিচিত বটতলাতেই সরকারের পক্ষ থেকে একটি মাদরাসা এবং একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হবে। আপনাদের ছেলেমেয়েদের এখানে ভর্তি করে দেবেন। আর আপনাদের গ্রামের এই ডাকাতদের ধরিয়ে দেবার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আমরা আপনাদের পাশের গ্রামের সাহসী ছেলে আবির-মুয়াজদের পুরস্কার দেবো। ওরা যখন বড় হয়ে লেখাপড়া শেষ করবে তখন প্রত্যেককে যেন গোয়েন্দা বিভাগে অফিসার হিসেবে চাকরি দেওয়া হয় সে ব্যাপারে আমি সরকারের কাছে জোর সুপারিশ জানাবো।
এ কথা শুনে অচিনগাঁয়ের সব মানুষ খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠলো। তাদের মাঝে থেকে এক বৃদ্ধ বললেন তোমরা কেবল তোমাদের গ্রামের রত্নই না, তোমরা এখন থেকে আমাদের গাঁয়েরও রত্ন। সবসময় তোমরা আমাদের গাঁয়ে আসবে। আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে লেখাপড়া শিখে সভ্য হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। তোমরা তোমাদের মায়েদের ধন্য সন্তান। আমরা তোমাদের ঋণ শোধ করতে পারবো না। আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে খাস দিলে দোয়া করছি। ওসি সাহেব! আপনি অনুমতি দিলে আমিও এই সাতরত্নকে একটা ছোট উপহার দিতে চাই। তারা আমাদের গাঁয়ের মানুষের চোখ খুলে দিয়েছে। তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, শিক্ষা ছাড়া কোনো মানুষ মানুষ হতে পারে না। তাদের প্রত্যেকের লেখাপড়ার জন্য আমি গরিবানা হালে দুই হাজার করে টাকা দিতে চাই। আর ওসি সাহেবের ঘোষণা দেওয়া স্কুল ও মাদরাসা বানানোর জন্য দশবান টিন দিতে চাই। যাতে আমাদের এই অচিনগাঁয়ের প্রতিটি ঘরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যেতে পারে।
বৃদ্ধের কথা শুনে ওসি সাহেব খুশি হয়ে বললেন নিশ্চয়ই দিবেন। এই স্কুল এবং মাদরাসা গড়ে তুলতে তো আপনাদেরও সাহায্য প্রয়োজন।

SHARE

Leave a Reply